ক্যাটেগরিঃ চিন্তা-দর্শন

 
জীবনের যেকোনোরূপ যাপনের জন্যই দীর্ঘ ডিস্ট্রাকশন (Distraction) খুব খতরনাক হয়। মনে পড়ে গেলো, এই ডিস্ট্রাকশন শব্দ নিয়ে একবার বিকট আলোচনা হয়েছিলো এই ব্লগে। আজ আর সে কথায় গিয়ে কাজ নেই। কথা হলো, আকস্মিক কোনো  ঘটনায় মনোযোগের বিচ্যুতি মানবিক অবশ্যই, কিন্তু তাতে আটকে থেকে আমাদের সহজাত ক্ষোভ, কষ্ট আমাদের প্রত্যাশার পথে কাঁটা হয়ে দাঁড়াক এটা আমরা কেউই চাই না। আমরা মুক্তিকামি, উন্নয়নকামি জনতার কাতারে দাঁড়িয়ে সমগ্র বাংলাদেশকে একটি দেশ হিসেবেই দেখতে ভালোবাসি। পার্টনারশিপে পরস্পরিক বিশ্বাস, আস্থা খুবই ব্যবসা বান্ধব হয়–এটা ব্যবসায়িরাই শুধু যে জানেন তা তো নয়; সুতরাং সমবায়ে সকলের স্বার্থ সুষম থাকে।  ভুল বোঝাবোঝি হবে কেনো, বালাই সাট?
 .
বাঁচতে হলে অনুকূল পরিবেশের আয়েশ অবিমিশ্র মনে করা বুদ্ধিমানের কাজ নয়। প্রতিকূলতা অপ্রত্যাশিত হলেও এর অবশ্যম্ভাবিতাকে অগ্রাহ্য করে বনমানুষ হওয়ার সুযোগও নেই । ফেইস করতে পারাই বড়ো চ্যালেঞ্জ। সাহসে না কুলায় যদি, তবে বিকল্প একটা আছে–র‍্যাবিট হোলে ঢুকে টাস্কি মেরে থাকা। কিন্তু প্রতিবেশির কাজ কী? বিপদে হাত বাড়িয়ে দেওয়া। বিপদে আমরা ঐক্যবদ্ধ থাকতে চাই, বিভাজিত হতে চাইনা, চাইনা। সামনে এগোতে চাইলে বুক দিয়ে বাধার পাহাড় ঠেলতে জানতে হবে, মানে ফেইস করা শিখতে হবে। এর জন্য চাই দৃঢ় সংকল্প এবং পরস্পরের প্রতি হাত বাড়িয়ে দেওয়ার মানসিকতা। উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে আমরা তো বরাবরই ফরেইন কলসাল্টেন্সি নিয়ে থাকি, থাকি না? তারপরও একদম টেনশনে অহেতুক অনেক সময় চলে যায়; অনেক কাজ পড়ে থাকে, করা হয় না। ঘটনার আকস্মিকতায় মনোযোগ সরে গিয়ে পড়ে থাকে লাশের সংখ্যায়, রক্তের দলায়, এখানে ওখানে। অথচ দেশের এমন গুরুত্বপূর্ণ সময়ে সময় নষ্ট করা ঘোর অন্যায়।
 .
প্রশ্ন হলো, এ ধরণের ডিস্ট্রাকশন তথা মনোযোগ বিচ্যুতির ঘোর থেকে মুক্তির ত্বরিৎ উপায় কী? ব্যক্তিগত প্রশান্তির সব দায়-দায়িত্ব রাজনৈতিক অভিভাবকত্বের উপর ছেড়ে দেয়া গেলেই ভেতরে শান্তি মিলবে কিংবা দৈনন্দ্যিন কাজে গতি ফিরে আসবে–এমন নয়। নিজেদের ভালো থাকবার উপায় নিজেদেরকেও জানতে হবে। এক্ষেত্রে কাঁটা দিয়ে কাঁটা তোলা ভালো পন্থা। বিষে বিষ ক্ষয়; মানে একটা দীর্ঘ, আনপ্রোডাকটিভ ডিস্ট্রাকশন থেকে বেরিয়ে আসতে আরেকটা স্বল্পদৈর্ঘ্য প্রোডাকটিভ ডিসট্রাকশনের দ্বারস্থ হওয়া যায়। চারদিকে দরজা খোলা। আপনি কোন্‌ দিকে যাবেন? আমার কাছে বৃষ্টি এবং শৈশব খুব ইফেক্টিভ সমাধান বলে মনে হয়। ময়মনসিংহে দু’দিন ধরেই এক-আধটু করে বৃষ্টি হচ্ছে। বাতাসও বইছে। কবি আল মাহমুদের এক সাক্ষাৎকারের কথা মনে পড়ছে। তিনি খুব খাঁটি কথা বলেছেন বৃষ্টি নিয়ে। বৃষ্টির সাথে আলস্যের সম্পর্কটি আসলেই খুব নিবিড়। এই আলস্য সুন্দর হয়।
 .
গ্রামীণ জীবনে আমার কৈশোর অবধি যতো ঝড়-বৃষ্টি দেখেছি ওগুলোতে অসুন্দরের চেয়ে সুন্দর বেশি। ঝড়গুলো বইতো অনেক জোরে, কিন্তু উপড়াতো খুব কম— বছরে বড়োজোর দু’চারটা বড়ো গাছ আর খুব ভাঙাচোরা বাড়িটাড়ি দুয়েকটা কোথাও কোথাও। মামার বাড়িতে না হলেও নিজেদের বাড়িতে আম কুড়ানোর সুযোগ ছিলো। বাড়ির বাইরের আঙিনায় যে বড়ো গাছটা ছিলো, জ্যৈষ্ঠে কি বৈশাখের ঝড়ে ওটা থেকে আমগুলো পড়তো। আমরা ভাই-বোনেরা হৈ-হুল্লোড় করে কুড়াতাম। আমাদের সেমিপাকা ঘর। ওটার চালে বাঁশ আর পেয়ারার পাতা পড়ে ভরে থাকতো শীতে, গ্রীষ্মে। বৃষ্টি এলে ওগুলো ধুয়ে যেতো আর এরপর টিনের গায়ে রোদ লেগে চকচক করে ওঠতো। আবার পাতা পড়তো। বৃষ্টি হতো। আবার রোদ ওঠতো।
 .
এখন যেমন মেঘলা দিনে অনেকেরই মন খারাপ থাকে, তখন আমাদের তেমন ছিলো না। বাদলা দিনে তো বটেই, সকালবেলা আকাশটা খুব কালো হয়ে গেলে আমাদের স্কুলে যেতে হতো না। আমরা বৃষ্টির অপেক্ষা করতাম। দখিনের বিস্তীর্ণ ক্ষেতের কিনারে দাঁড়িয়ে থমথমে গাছেদের আড়াল ছাপিয়ে দূরে মেঘেদের গায়ে সাপখেলা দেখতাম। কোনো কোনো দিন ওমন কালো আকাশটা হঠাৎ ফর্সা হয়ে যেতো। তখন আমাদের খুব মন খারাপ হতো। বৃষ্টিতে পুকুরের জলে খেলতে খুব মজা। তবে খুব একটা ডুব দিয়ে চুপ করে জলের পরে বৃষ্টি পড়ার শব্দ শুনতে আমার বেশি ভালো লাগতো। টিনের চালে বৃষ্টির শব্দ তো ভালো লাগতোই। কিন্তু সেটা দিনে নয়, রাতে। এখনও তাই।
 .
গতবছর বর্ষাকালে বৃষ্টির কিছু ভিডিও করেছিলাম। সবগুলো এক করে নাম দিয়েছি ‘Monsoon Music’। এবার এখনও তেমন বৃষ্টি শুরু হয়নি। রাতে বিদ্যুৎ না থাকলে, কিংবা খুব গরম লাগলে ফুল ভলিউমে ভিডিওটা চালিয়ে দিয়ে স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকি। বৃষ্টি দেখি, বৃষ্টি শুনি। আরাম লাগে। বারবার দেখি, বারবার শুনি। আমি মিছেমিছি ভাবতে থাকি, এই বৃষ্টিই সেই বৃষ্টি। গরমে আরাম লাগে।
 .
এখন বর্ষাগুলো কেমন যেনো, বৃষ্টিগুলো কেমন যেনো। এই আমিটাও কেমন যেনো। এখন বৃষ্টি হলে আমার খালি ঘুম পায়।
চোখ বন্ধ করে জীবনানন্দের মতো করে দেখতে চেষ্টা করি, শুনতে চেষ্টা করিঃ

তবুও সমুদ্র নীল ; ঝিনুকের গায়ে আলপনা;

একটি পাখির গান কী রকম ভালো।