ক্যাটেগরিঃ চিন্তা-দর্শন

মানুষের ভালো কাজের পুরস্কার আর মন্দ কাজের শাস্তি প্রাকৃতিকভাবে প্রদত্ত হওয়ার মাধ্যমে যে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হয় তা-ই পোয়েটিক জাস্টিস। সাহিত্যে ভাগ্যের নির্মম পরিহাস (Ironic twist) বোঝানোর জন্য একে উপাদান হিসেবে ব্যবহার করা হয়। পোয়েটিক জাস্টিস মানেই ন্যাচারাল জাস্টিস। কাব্য আর প্রকৃতির এমন কোলাকুলি বিচারকেও কেমন নান্দনিক করে তুলেছে! বাস্তবে বিচার এতো নান্দনিক হয় কি নয় বড়ো কথা নয়; বড়ো কথা হলো, জনগণ ন্যায়বিচার চায়।

বুড়ো নাবিকের গল্পটা নিশ্চয়ই মনে আছে। ওই যে,   বৌভাতের অনুষ্ঠানের এক অতিথিকে হঠাৎ থামিয়ে তাকে বুড়ো ওই নাবিক নিজের এক করুণ সমুদ্রযাত্রার গল্প শুনিয়েছিলো। নাবিকদের কাছে সৌভাগ্যের প্রতীক হিসেবে পরিচিত পাখি এ্যলবাট্রসকে অহেতুক গুলি করে মেরে ফেলার অপরাধে তার কঠিন শাস্তিভোগ এবং শেষে একদিন জাহাজের কাছে কিলবিলরত কতিপয় পাইন্যা সাপের চেহারা দেখে ওগুলোর প্রতি ভালোবাসা জেগে ওঠায় স্রষ্টার কৃপা আর মুক্তির গল্প। কোল্‌রিজের এই কবিতায় (দ্য রাইম অব দ্য এইনশ্যান্ট মেরিনার) বর্ণিত কাহিনীটি আমাদের অনেকেই উচ্চ মাধ্যমিকের ইংরেজি বইয়ে ‘দ্য এইনশ্যান্ট মেরিনার’ নামক গদ্যরূপে পড়েছি। অনেকদিন আগের কথা।

কবি তার কবিতায় প্রাকৃতিকভাবে কর্মফল পাওয়ার চিত্র তুলে ধরেছেন। এরকম অটোম্যাটিক ফলাফল যুগে যুগে মানুষের প্রিয় ছিলো, এখনও আছে। সেটা অদৃষ্টবাদের চরম বিশ্বাসজাত না হলেও বিশাল আশাবাদের তো বটেই। সে হিসেবটি বিবেচনায় নিলে, বিচার ব্যবস্থা সে যে দেশের কিংবা যেরকমই হোক না কেনো– সেটির প্রতি অশ্রদ্ধা অমূলকই তো। অমূলক যা কিছু আছে, তা সর্বদা পরিত্যজ্য। আমাদের ভালো লাগে ছায়া, বৃষ্টি, বাতাস পেতে। ভালো লাগে জনগণের ভিড় হতে।

বিপদাপন্ন জনগণের বড়ো আশ্রয় যখন ভবিষ্যৎ, তখন বর্তমানে আমরা ফেরারি কিনা তার চেয়ে বেঁচে থাকা যদি আরও বেশি সুন্দর হয়, তবে কি দোষ হয়? আমাদের অনেকের ভয় হয়। দিন শেষে রাত হয়। সকলেরই ভয় বাড়ে, ভালোবাসা বাড়ে। জীবনের মায়া বাড়ে। আমাদের সকল প্রবল ইচ্ছের শেষ গিয়ে ওই কাব্যিক বিচারেই ঠেকে, সুদূর ভবিষ্যতে। পোয়েটিক জাস্টিজ।

প্রাণী মাত্রই আরামপ্রিয়। আমরা জনগণও তার ব্যতিক্রম নই। সুন্দর ভবিষ্যতের  মূলারং বাতাসা খেয়ে আমাদের ঘুম ভালো হয়। সর্বোপরি আমরা আশাবাদী। পোয়েটিক জাস্টিস-এর মতো নিরীহ, কাব্যিক প্রত্যাশায় আমাদের জনগণমন ফুরুৎ করে ওড়তে জানে। বৃষ্টির জলে ভাসতে জানে। আমরা পাখি হয়ে যাই। কবি হয়ে যাই। আষাঢ়ে, শ্রাবণে যখন পাহাড়ি ঢল নামে খুব, তখন মনে মনে প্রিয় নদে কি নদীতে যার যার নৌকায় বসে চোখ বুঁজে অনায়াসে নাবিকও হওয়া যায়। আমাদের স্বপ্নের দেশ সুন্দর, খুব সুন্দর হয়।