ক্যাটেগরিঃ চিন্তা-দর্শন

 

জন্মের শুরুতে শরীর। শিশুর প্রথম খাবারের উৎস শরীর। পুলিশি রিমান্ড, জব ইন্টারভিউ, মাছ-মাংস-ডিম-দুধ-ফল-সব্জি, পোষাক-পরিচ্ছদ, কসমেটিক, খুন-ধর্ষণ মূলত শরীরকে কেন্দ্র করেই। শরীর সস্তা হোক, কিংবা দুর্মূল্য হোক—জীবিতজনের কাছে এর গুরুত্ব অপরিসীম। আমাদের সঞ্চয়, সুখের সংজ্ঞা, আমাদের লোভ-লালসা, আদর-সোহাগ, দাম্পত্য, পরকীয়া শরীর ছাড়া অনর্থক। শরীর বাঁচলেই মন বাঁচে। পেটে ক্ষুধা নিয়ে প্রেম হয় না। পূর্ণিমার চাঁদ ঝলসানো রুটি হয় এই শরীরের কারণেই। ছেলেটা মেয়েটার চোখে, মেয়েটা ছেলেটার চোখে ইলিশের ভাজা দেখে এই শরীরের কারণেই। কদমের, গোলাপের ঘ্রাণ আগে শরীরকেই স্পর্শ করে। মনের ব্যাপারটি পরে। জন্মদিনের কেক, মৃতের কাফন, গর্ত খোঁড়াখুঁড়ি, চিতার কাঠ-খড়, ধূপকাঠি, এতো কার্বন নিঃসরণ, মদ-মাংস, আয়েশ-আরাম, ক্ষমতার চেয়ার– সে তো শরীরটা আছে বলেই। ঘ্রাণের ইন্দ্রিয় আছে বলেই যেমন বাজারের এতোসব ডিওডোরেন্ট, পারফিউমের আয়োজন, তেমনি মুখ আছে বলেই এতোসব বাহারি খাবার বাসায়, রেস্তোঁরায়। চোখের জন্যেই এতো সাজগোজ, এতো ছায়াছবি। কান আছে বলেই তো এতো গানটান, আইপড, মোবাইল ফোন, কনসার্ট আর যতোসব সুর-লহরী। গাল-ঠোঁট-পেট-জঙ্ঘা-নিতম্ব-যোনি-শিশ্ন আছে বলেই ঊরুর উত্থানে এতো মনযোগ, শরীরের বয়স সে যতোই হোক না কেনো। দৃশ্যের ডামাডোলে মনের যতো ভালোমন্দ, তা বুঝি এই শরীরকে ঘিরেই। অদ্ভুত কুতকুতে চোখের মানুষ কেমন ভদ্র বনে যায়; না দেখার, না শোনার ভান করে–সেও শরীরের কারণেই। শরীরের শিরশির শরীরে মিলায়; মুখে কইতে লজ্জা ভীষণ। মানুষ বলে কথা। তলে তলে তল্লাটে, চুরে ভেঙে গুঁড়ো গুঁড়ো সব আঠালো ভদ্দর লোক। গতরের গোপন কথা মুখে কইতে মানা। আমরা ভদ্দর লোক না!
file

আমাদের উত্তরাধুনিক মন খুব সর্মিন্দা টাইপের হয়। আমরা কাজের বুয়াকে গৃহ পরিচারিকা, বেশ্যাকে যৌনকর্মী বলি। আমরা ঘুষকে বলি ‘পে টু প্লে’। সরকারি বন্দুকওয়ালারা যেমন ঠাণ্ডা মাথায় খুন করাকে ‘ক্রসফায়ার’ বলে। জনৈক সন্মানিতের জন্য এক দিন অন্তর অন্তর নতুন নতুন যোনি চাই। তার একটি বাংলো আছে। তার একটি হোটেল আছে। আছে একটি বিশেষ এ্যাপার্টম্যান্ট। ওখানে একশো একটি লাল গোলাপ চাই। জীবন তো একটাই। ওই  যেমন তিনটে বিলাসবহুল বাড়ি সৌদি শেখের, সেগুলোও ফুলে ফুলে সাজানো চাই প্রতি সন্ধ্যায়। কোন্‌ দিন কোন্‌টায় যান বলা যায় না। এদিকে অফিসের বস দয়ালু হয় শরীর উদার হলে। স্রষ্টাও তো গিভ এ্যন্ড টেইকে বিশ্বাসী, তাই না? স্বর্গ চাও তো স্বর্গের চাবি নাও। রোজা করো। হজ্ব করো। যাকাত দাও। তো মানুষের বেলায় গিভ এ্যন্ড টেইকে সমস্যা কী? ইউনিভার্সিটিতে নিয়োগের আগে একদিন শুতে হলো যার, তার নিজস্ব বোধের দেওয়ালে বিশেষ বিশেষণ ডিলিট করা গেলে ক্ষতি কী? এই যেমন নীলার চাকরি হলো বসুন্ধরায়। বিশাল দোকান। বাচ্চাদের, বড়োদের দামি সব পোষাকের সমাহার। ওখানে চকচকে আলোয় ভরা ফ্লোরে, হিম হিম পরিবেশে সারাদিন গ্রাহক সেবায় নিবেদিত মন তার। ছোট্ট একটা মেয়ে বাসায় মা-মা করে কাঁদে। নীলার বুকের দুধ উপচে পড়ে। জীবিকা নির্মম হয়। একদিন বস তাকে ডেকে পাঠালেন। নীলা বসের কথা রাখতে পারেনি। সরে গেছে। মাস শেষ হয়নি। বেতনটা পায়নি। পরাজিত। যে সতীর্থরা থেকে গেলো ওই ঠাণ্ডা শো-রুমে, তারা জয়ী, তারা ভাগ্যবতী।

.

সুস্মিতার জব হলো একটা এনজিও-তে। ডেস্ক জব। সারাদিন বসে থাকা। ইমেইল চেক করা, রিপ্লাই দেওয়া। একদিন তার ড্রয়ার খুলে সে চমকে উঠলো। ব্যাপারখানা কী? তার ড্রয়ারে চটি একখানা পুস্তক। যৌন গল্পের বই। ওই ঘরে বস আর সুস্মিতা ছাড়া কেউ বসে না। বারোটার দিকে বস এলেন। জিজ্ঞেস করলেন, “তুমি কি তোমার ড্রয়ারে কিছু পেয়েছো? আমার একটা বই খুঁজে পাচ্ছি না”। সুস্মিতা বললো, “না স্যার, আমি তো ড্রয়ার খুলিইনি। আচ্ছা দেখছি। ওহ, এই তো, আপনার বইটা।” পরদিন থেকে সুস্মিতা আর অফিসে এলো না। ওর বাবা খুব কষ্ট পেলেন। বললেন, “সে কী? আমার বন্ধুর এনজিও। এতো বলে-কয়ে চাকরিটা ম্যানেজ করে দিলাম। আর তুই বলছিস আর যাবি না? কেনো?” সুস্মিতা কথা বলে না।

.

সানজিদা ভালো আছে। সে এখন ম্যানেজার হয়েছে। সংসারে শান্তি ফিরে এসেছে। একমাত্র মেয়ের পড়াশুনা নির্বিঘ্ন হয়েছে। আশি হাজার টাকা কম কথা নয়। মেয়ের সিমেস্টার ফি প্রায় চল্লিশ হাজার টাকা। কম কথা নয়। স্বামীটা তো ভাদাইম্যা। একটু শরীর যদি এতো সুবিধা দেয়, তো ক্ষতিটা কী? সানজিদা দেখতে মন্দ নয়। নিয়মিত পার্লারে যায়। প্রতিবার পার্লারে যাওয়ার সময় সে ভাবে, এই শরীরই তাকে দিয়েছে নির্ভাবনার নিশ্চয়তা, একে পরিপাটি রাখায় কার্পণ্য কেনো? একদিন তার দেরি হলো অফিসে যেতে। বস ডেকে পাঠালেন। “কী ব্যাপার? দেরি কেনো?” সত্যি বললো সে।  “স্যার, পার্লারে গিয়েছিলাম, আর রাস্তায়ও বেশ জ্যাম ছিলো।” “ওকে, ইট্‌স গুড টু সি দ্যাট ইউ আর সিরিয়াস এ্যবাউট ইউর বিউটি। আই লাইক দ্যাট। এ্যন্ড ওয়ানা সি ইউ কিপ ডুইং অল আদার ওয়ার্ক্‌স বিউটিফুলি। নাউ গৌ গেট টু দ্য ওয়ার্ক। বাই দ্য ওয়ে, ক্যান ইউ মিট মি আফটার ওয়ার্ক? এ্যন্ড ইয়েস, নট অফিশিয়ালি।” “ওকে স্যার, আই নৌ। নো প্রোবলেম।”

.

শুভ। সুদর্শন ছেলে। অনার্স পাশ করার পর থেকে হন্যে হয়ে ঘুরেছে বহুদিন। একটা চাকরি চাই। দেড় বছর ধরে নানান জায়গায় এ্যপ্লাই করছে। কেউ পাত্তা দেয়নি। একদিন ওর ডাক এলো। মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানি। অনেক টাকার হাতছানি। বস তার বাই কিউরিয়াস। শুভ রাজি হয়ে গেলো। পরিবার এবং পাড়ার সবাই এখন শুভ শুভ বলে অস্থির। এলাকার যুব সংঘে শুভ এখন মোটা অংকের খয়রাত দেয়। সবাই তাকে খুব সমীহ করে। শুভ’র এটা কখনোই মনে হয় না যে, সে কোনো পাপ করছে। শুধু মনে হয়, গায়ে-গতরে খেটেখুটে নিজের মনকে, আরও অনেকের মনকে ভালো রাখছে সে।

..

রুনি চলে গেলো। সাগর চলে গেলো। তাঁদের সন্তান বেঁচে রইলো। তনু গেলো। মিতু গেলো। আরও কতো জন গেলো এবং যাচ্ছে। তাদের শরীর ক্ষত-বিক্ষত হয়ে ক্যামেরায় বন্দী হয়, তারপর ছড়িয়ে যায়। কেউ জানলো না, কী এমন দোষ ছিলো। শরীরটা কোরবানি হয়ে গেলো। কতো রকমের কোরবানি হয়! নীলা জানলো না, সুস্মিতা জানলো না, কিন্তু সানজিদারা জানলো, এতোদিন ধরে কী এমন কোরবানি নিয়ত সংহত করেছে সংসার। চাপাতির কোপে, ক্রসফায়ারে, গণ ধর্ষণে প্রাণ হারানো অভাগা-অভাগীরা জানলো না, কতোটা তীব্র ক্ষুধার গ্রাস হলে এভাবে উচ্ছিষ্ট হয় শরীর। জীবিতরা জেনেও ভান করে না জানার। তাতে কিচ্ছু আসে যায় না। শরীর বাঁচে তো মন বাঁচে। শরীর নেই তো মনও ফুরুৎ। কারও কিচ্ছু আসে যায় না। নোবডি কেয়ার্স। নোবডি কিপ্‌স স্কোর্‌স।

thediplomat_2014-02-21_18-31-32-386x255

শীতের ওই সকালগুলো মনে পড়ে সজীবের। মনে পড়ে টিএ্যন্ডটি কলোনির শুক্লাকে। খুব কুয়াশার ভোরে ছুটে আসতো সে। একটা গভীর চুমু, এক-আধটা গভীর স্পর্শ, একটু ঘ্রাণের টান—আর তো কিছু নয়। একটা নিরাপদ আশ্রয়। যার আছে আসতো, সর্বস্ব লুটে নেওয়ার লোক সে নয়। শীতের সে দিন ফুরিয়েছে। তাই ডালেতে লড়িচড়ি, চাতকি ময়না হয়ে বুনো উড়ালে যে ঐশ্বর্য শুক্লা তার শরীরে জড়িয়েছিলো, এখন তাকে ভোলা প্রয়োজন। এখন আরও বড়ো বিসর্জনের ইতিহাস রচিত হয়েছে তার জীবনে। কিন্তু সে ভুলতে পারছে না। প্রথম স্পর্শ, প্রথম চুম্বন, প্রথম শিহরণের স্মৃতি কী করে ভোলা যায়? শুক্লার ঘর এখন বিদেশ বিভুঁই। জানলা দিয়ে আকাশপানে তাকিয়ে থাকে রাতভর। আগডুম বাগডুম ভাবে সে। খলনায়ককে নায়ক মনে হয় আজকাল। কিন্তু সত্যি কথাটা শুক্লা কাউকে বলতে পারে না। সব সত্যি সবাইকে বলা যায় না। শুক্লার ঠোঁটে অনেক চুম্বনের দাগ পড়েছিলো। এখন সে দাগ মুছে গেছে। কেউ জানে না। স্ফীত মাংসের ইতিহাসও অব্যক্ত থাকে। অনেক ঘ্রাণের শরীর লেপ্টে গেছে গত চারশো দশ দিনে। তবুও পুরনো সেই ঘ্রাণের স্মৃতি কিছুতেই দূরে সরাতে পারেনি সে। এতোদিন ভেবেছিলো, স্নান করলেই ঘ্রাণ মুছে যায়, দাগ মুছে যায়। আজ সে মর্মে মর্মে বোঝে, শ্রাবণে, মাঘে বাঘের শরীরে অসুখ হলে পরে পূর্ণিমার জ্যোৎস্নায় এতো এতো দাগ সব ফের জেগে ওঠে। সবটুকু সেরে ওঠে না। কিছুটা তার থাকে বাকি। পুরনো সাইকেলের স্মৃতির মতো। জং ধরা রিমে এবং ফ্রেমে। শুক্লার আকাশে কৃষ্ণপক্ষ আজ। ভেজা জ্যোৎস্নার আবেশ বুকে চুপচাপ। হারানো ঘ্রাণের সওদগরকে মনে পড়ে। রাজা কা রাণী, খাপছা কা খাপছি, ভূত কা ভূতনি–সত্যি নাকি? শুক্লা ভীষণ বিষণ্ন হয়। পাশে শুয়ে থাকা ক্লান্ত যুবক তার খোঁজ জানে না।

.

খালেদ সাহেব তিনটে গরু কিনেছেন। কোরবানি দেবেন। গতবার কিনেছিলেন দুটো। দুই গরুতে এবার আর হচ্ছে না। তিন গরু চাই। গরুর শরীর মোটাতাজা, যদিও খালেদ সাহেব আগের চেয়ে বেশ শুকিয়ে গেছেন। বয়স ছাপ্পান্ন পেরিয়েছে দেড় বছর আগেই। হুট করে কোন্‌দিন মরে যান, ঠিক নেই। বেশি বেশি কোরবানি দিয়ে পারলৌকিক যাত্রা শুভ হোক তার। পশুর জীবন যায়– মানুষ ভালো থাকে, মানুষের শরীর ভালো থাকে। মাংসল যতো ভোগ আর উপভোগ–সব মানুষের হোক। মানুষের শরীরগুলো ভালো থাক। বায়বীয় মন পরজীবী হোক।

.

 **  সবগুলো বাস্তব চরিত্র। প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে  ছদ্মনাম ব্যবহৃত হয়েছে।