ক্যাটেগরিঃ ধর্ম বিষয়ক

 

প্রতিবছরের মতো এবারও ঈদে অনেক পশু কোরবানি হবে, কোনো সন্দেহ নেই। লাখ লাখ গরু-খাসির পাশাপাশি কিছু উটও কোরবানি হয়ে থাকে প্রতিবারই। ইসলাম ধর্মাবলম্বিদের সবচে’ বড়ো এই উৎসবে এবার তার ব্যাতিক্রম হওয়ার কারণ নেই। বিত্তবান ব্যক্তিদের মধ্যে যারা নামাজ-রোজার ধার ধারেন না, তারা কোরবানিতে কেউ পিছিয়ে থাকবেন এমনটি মনে করারও কারণ নেই। নামাজ-রোজাতে প্রদর্শন বাতিক চর্চার সুযোগ না থাকলেও হজ্জ্ব আর কোরবানিতে এটির ব্যবস্থা আছে। একটির জায়গায় দশ-বিশটি কিংবা তারও বেশি গরু কোরবানি দিচ্ছেন এমন সামর্থ্যবানের সংখ্যাও নেহায়েত কম নয়। অবশ্য বিত্তবান মুসলিম মাত্রই লোক দেখানোর জন্য এসব করেন— নিতান্ত দুর্মূখ, নিন্দুক না হলে এমন ঢালাও মন্তব্য করা অসম্ভব।

.

ঈদ-উল-আযহায় পশু কোরবানি যেহেতু শুধু সামর্থ্যবানের পালনীয় আচার, সুতরাং বিত্তবানরা এ ব্যাপারে যতো বেশি এগিয়ে আসবেন ততোই ভালো। তারপরও কতো বেশি অতি বেশি—সেই বিবেচনা বিবেকবানেরই মানায় বেশি। অবশ্যই প্রচুর রক্ত বয়ে যাবে ঈদের দিন। শহরে বর্জ্য অপসারণ কার্যক্রম ব্যাপকভাবে পরিচালিত হবে। ঈদের দিন কোথাও কোনো অব্যবস্থাপনার চিত্র দেখা না গেলেও দুয়েকদিন পর এসব বর্জ্য মাটির নিচ থেকে উৎকট গন্ধ উগলে দেবে, একটু রোদের পর বৃষ্টি হলে এই গন্ধের তীব্রতা সুনামির বেশে নাসারন্ধ্রে আক্রমণ করবে। খুবই স্বাভাবিক। গরুর স্বাদের বিনিময়ে এসব দুর্গন্ধ সয়ে নেওয়া যায়। তবে যিনি গরু খান না—সে যে কারণেই হোক—তার জন্য সান্ত্বনার কিছু আছে বলে মনে হয় না, যদি দয়া করে একটু সয়ে না যান। বিভিন্ন ধর্মের মানুষ পাশাপাশি থাকলে পরস্পরের রিচুয়্যালে নাক সিঁটকালে হয় না। এটা শিক্ষিত হলেই কেউ বুঝবে এমনটি মনে করার কারণ থাকা উচিৎ ছিলো।  তবু পাশের দেশের চরম ধর্মীয় অসহিষ্ণুতার চিত্র দেখে বাংলাদেশি হিসেবে গর্ববোধ করার যথেষ্ঠ কারণ রয়েছে। তারপরও ভুলে গেলে চলবে না, কিছু লোক সব ধর্মেই আছে যারা ইনসুলারিটিতে আক্রান্ত ক্রীড়ামোদি।

.

গরু খাওয়াতে অনেকের যেমন এ্যলার্জি হয়, তেমনি কোরবানি নিয়েও অনেকের এ্যলার্জি আছে। কোরবানিকে পশু হত্যার নির্মম উৎসব মনে করেন যারা, তারা খুব পশুপ্রেমি না হলেও কিছু আসে যায় না। “মাছ, মুরগিতে আপত্তি নেই; ছোট প্রাণী। গরু জবাই করলেই নির্মমতা। কারণটা হলো, গরুর রক্ত গলগল করে বের হয় অনেক্ষণ ধরে। গলা কাটা মানুষের রক্তের মতো। এই হত্যা বর্বরোচিত। ধর্মের নামে গণহত্যা। এসব দেখে দেখে মুসলিম বাচ্চারা পরে জঙ্গি হয়। মানুষের গলা কাটে।”— যুক্তি কিন্তু শুনতে ভালোই শোনায়।

.

গত বছরও ঈদ-উল-আযহা উপলক্ষ্যে নিজের প্রত্যাশার কথা লিখেছিলাম (লিঙ্ক দেখুন)। সেরকম প্রত্যাশা এখনও করি। সেই সাথে এবারের এবং প্রতিবারের বড়ো ঈদে কোরবানিদাতাদের কাছে খাছ দিলে যা কামনা করি-

.

০১। দশটা, বিশটা গরু কোরবানি দেন যিনি, তিনি সর্বোচ্চ তিনটি গরু কোরবানি দেবেন, আর বাকি সাত বা সতেরোটি (কিংবা আরও বেশি) গরু কেনার টাকাটা অন্তত চার-পাঁচজন হতদরিদ্রের আত্মকর্মসংস্থানে ব্যয় করবেন।

.

০২। এলাকায় অন্য ধর্মাবলম্বিদের উপাসনালয় থাকলে, সেখান থেকে যথেষ্ঠ দূরত্বে কোরবানির স্থান নির্ধারণ করুন। প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট উপাসনালয়ের ধর্মগুরুর সাথে পরামর্শ করে স্থান নির্বাচন করুন। এতে সৌহার্দ্য বাড়ে বৈ কমে না

.

০৩। কোরবানির পশুটা সৎ রোজগারের টাকা থেকে কেনা হোক।

.

০৪। অমুক তো অসৎ পয়সায় গরু কিনেছে, ওর কোরবানি হবে না— ফেৎনা সৃষ্টিকারি এমন মন্তব্য থেকে নিজ জিহ্বাকে সংযত রাখুন।

.

০৫। পশু জবাই ও মাংস-হাড় কাটাকাটির জন্য উপযুক্ত যন্ত্রপাতি আগে থেকেই মজুত রাখুন। আরেক জনেরটা ধার করার ছ্যাবলামি অভ্যেস ত্যাগ করুন।

.

০৬। পশু জবাইয়ের পর তার চামড়া ছড়ানো, মাংস কাটাকাটি, বণ্টন-বিতরণের তাড়া থাকে। এ কারণে পশুর রক্ত, গোবর ইত্যাদি বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় উদাসিনতা দেখা দেয়। এটি যেন না হয়—সচেতন নাগরিক হিসেবে তা নিশ্চিত করুন।

.

০৭। কোরবানির গরুর গোস্‌ত নিয়ে রাক্ষুসপনা করবেন না; মানে অন্যদেরকে দেবার বেলায় কার্পণ্য করে নিজের ঘরকে মাংসের গুদাম বানাবেন না।

.

০৮। “পাশের বাসার লোকেরা তো কুরবানি দিয়েছে, ওদেরকে আর মাংস পাঠিয়ে কী হবে”—এরূপ ধারণার বশবর্তী না হয়ে প্রতিবেশিদের বাসায়ও কোরবানির মাংস পাঠানোর ধর্মীয় নির্দেশ পালন করুন।

.

০৯। অতি ভোজন রোগের কারণ। তাই গরুর গোস্‌তের সাথে স্বাদের সুসম্পর্কের জেরে পরিমিতিবোধকে বিসর্জন দেবেন না। একই সাথে, যিনি খেতে বসেছেন, তাকে গরু খাওয়ার কুফল সম্পর্কে জানানোর লোভ সংবরণ করুন।

.

১০। অনেকেই আছেন, গরু রান্না হয়েছে যে বাড়িতে সে বাড়িতে কিছু খান না। সুতরাং কেউ আপনার দাওয়াতে সাড়া না দিলে তাকে স্বাভাবিকভাবে নিন।

.

স্রষ্ট্রা সকলের কোরবানি কবুল করুন, সকলের সাথে ঈদের আনন্দ উপভোগ করার সুযোগ করে দিন, ঈদের ছুটি পরিবারে আরও শান্তি বয়ে নিয়ে আসুক, আর সত্যিকারের ত্যাগের শিক্ষা আমাদের সবাইকে আলোকিত করুক। ঈদ মোবারক।