ক্যাটেগরিঃ স্বাস্থ্য

Ohio State University-র গবেষকগণ তাঁদের এক সাম্প্রতিক সমীক্ষায় তরুণদের মধ্যে লিভ টুগেদার তথা কোহেবিটেশন (বিবাহ বহির্ভূত দাম্পত্যরূপ বসবাস) –এর প্রভাব এবং বিবাহিতদের জীবনের মানের সাথে তার গুণগত পার্থক্য নির্ণয় করতে গিয়ে চমকপ্রদ তথ্য পেয়েছেন। সমীক্ষাটি পরিচালিত হয় মোট আট হাজার সাতশো মানুষের উপর, যাদের সবারই জন্ম ১৯৮০ থেকে ১৯৮৪-র মধ্যে। এদের প্রত্যেক্যেই ২০০০ সাল থেকে ২০১০ সান পর্যন্ত প্রতি এক বছর পর পর গবেষকদের কাছে সাক্ষাৎকার প্রদান করেছেন। এসব ডেটার ভিত্তিতেই এই রিসার্চের ফলাফল প্রকাশ করা হয়। গবেষকদের কাছে তারা তাদের লিভ টুগেদার কিংবা ম্যারিড লাইফ-এর পার্টনারদের সাথে সম্পর্কের সার্বিক অবস্থা, আবেগিক খরা, সুখ-বিষণ্নতা ইত্যাদি নিয়ে কথা বলেছেন। এই দীর্ঘ সময় ধরে পরিচালিত সমীক্ষার ফলাফল হলো, কোহেবিটেশন শুরু করার পর সিঙ্গল তরুণীদের আবেগিক পীড়া (ইমোশনাল ডিসট্রেস) তুলনামূলকভাবে কমেছে। আর চমকপ্রদ ব্যাপার হলো যারা সরাসরি বিয়ে করেছে তাদের ক্ষেত্রেও একই ফলাফল পেয়েছেন গবেষকগণ।  অন্যদিকে ছেলেদের ক্ষেত্রে এই ইতিবাচক পরিবর্তন তখনই দেখা গেছে যখন তারা বিয়ে করেছেন।

.

ফলাফলটি চমকপ্রদ কারণ গত দেড় দশক পূর্বে কোহেবিটেশন সম্পর্কে যেসব রিসার্চ হয়েছিলো (অন্তত যেগুলো অনলাইনে পাওয়া যাচ্ছে) তার প্রায় সবগুলোতেই এই সম্পর্কের মারাত্মক নেতিবাচক রূপটিকেই দেখানো হয়েছে অর্থাৎ তুলনামূলকভাবে ম্যারিড লাইফকে বেশি সুখি দেখানো হয়েছে। বাংলাদেশে কোহেবিটেশন এক সময় কল্পনাতীত মনে হলেও এখন আর সেরকমটি নেই। রাজধানীসহ বিভিন্ন নগরে বসবাসরত স্টুডেন্ট এবং এমপ্লয়েড তরুণ-তরুণীদের অনেকেই ইদানিং লিভ টুগেদার করছেন। এ ব্যাপারে পরিসংখ্যান তৈরি করা অসম্ভব কারণ এলজিবিটি ইস্যুর মতো কোহেবিটেশনও একটি সযত্নে ঢেকে রাখা ইস্যু। লিভ টুগেদার করছেন এমন ছেলেটির বা মেয়েটির বাবা-মা তো দূরের কথা নিজের পার্টনার ছাড়া অন্য কেউ কিচ্ছুটি জানে না–এটি অস্বাভাবিক নয়। আর যেসব বাবা-মা তাদের ইউনিভার্সিটিতে পড়ুয়া ছেলে বা মেয়েটিকে টাকা পাঠিয়ে আর ফোনে কথা বলাতেই শান্তি পেয়ে অভ্যস্ত, তারা তো ঘূর্ণাক্ষরেও জানবেন না যদি এমন কিছু হয়ে থাকে। জানাজানি হলে ভালো হয়েছে, এমন শোনা যায়নি।
file-1

যা হোক, কথা হলো, আমাদের দেশের নৃবিজ্ঞনী বা সোশ্যাল সাইকোলজিস্টগণ এসব নিয়ে গবেষণায় আগ্রহী হলে হয়তো এখানকার প্রেক্ষিতে লিভ টুগেদারের শান্তি-অশান্তি বা পরিণতি কী হয় না হয় সে সম্পর্কে একটি স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যেতো। ভৌগোলিক অবস্থান, সংস্কৃতি, ধর্মীয় ও সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গিজাত ভিন্নতার কারণে এক দেশের নৃতাত্ত্বিক রিসার্চকে অন্য দেশের জনগোষ্ঠীর যাপনের জীবন সম্পর্কে ধারণার প্যারামিটার হিসেবে ব্যবহার করা বোকামি হলেও আপাতত, এই রিসার্চের ফলাফল এখনকার প্রজন্মের এদেশীয় তরুণ-তরুণী যারা লিভ-টুগেদার করছেন, বা শুরু করতে চাচ্ছেন তাদের জন্য উৎসাহব্যঞ্জক মনে হতে পারে।

.

লিভ টুগেদার সম্পর্কে বেশি জানা, অল্প জানা এবং না জানা মানুষের এ ব্যাপারে আগ্রহের শেষ আছে বলে মনে করবার কোনো কারণ দেখি না। এ নিয়ে http://firstthings.org/ -এ প্রকাশিত একটি আগ্রহোদ্দীপক লেখা পাঠকদের কাছে পেশ করার ইচ্ছে জাগলো। আসুন পড়ে নিই-

.

লিভ টুগেদার সম্পর্কে যতো মিথ

মিথ: বিয়ে করার আগে পরিক্ষামূলকভাবে সম্পর্কটাকে একটু দেখে নেওয়ার একটি ভালো উপায় হলো লিভ টুগেদার।

সত্যিঃ গাড়ি কিনবার আগে তাকে চালিয়ে দেখে নেওয়ার আইডিয়া ভালো হলেও, বিয়ের ক্ষেত্রে তা প্রয়োগ করা যায় না। লিভ টুগেদার আসলে “ভূয়া বিয়েসুলভ” এবং সত্যিকার কিছুর মতো এটি নয়। লিভ টুগেদার করছেন এমন কাপ্‌লরা ভাবেনঃ “যে কোনো সময় ওকে ছেড়ে দিতে পারি”, কিংবা “আমার টাকা বনাম তোমার টাকা” যেমনটি বিবাহিত দম্পতিদের বেলায় সাধারণত হবার নয়। ম্যারিডদের মধ্যে স্থায়িত্বের একটি প্রতিজ্ঞা থাকে আর এ কারণেই তাদের সম্পর্কের ভিত প্রায়শ মজবুত হয়ে থাকে। তাছাড়া ম্যারিড কাপ্‌লদের সম্পর্কের মধ্যে দোদুল্যমানতা খুব কম দেখা যায়।

.

মিথঃ লিভ টুগেদার আমাদের দুজনের বৈবাহিক জীবনকে আরও সুদৃঢ় করবে।

সত্যিঃ যদিও অনেক কাপ্‌ল মনে করে থাকেন যে, লিভ টুগেদার তাদের আসন্ন বৈবাহিক জীবনের একটি চমৎকার সূচনা হয়ে কাজ করবে, কিন্তু বাস্তবে এটি তাদের বৈবাহিক জীবনের  ক্ষতি সাধন করতে পারে। বিয়ের আগে যারা এরকম এক ছাদের নিচে বাস করেন তাদের বিয়ের পর ডিভোর্সের হার অন্যদের তুলনায় পঞ্চাশ ভাগ বেশি।

.

মিথঃ সব কিছুর খরচ দুজনে শেয়ার করবো, এতে সবকিছুই খুব সহজে করা সম্ভব হবে।

সত্যিঃ খরচ শেয়ার করার ব্যাপারটি শুরুতে খুব সহজ মনে হলেও, পরে এটি আর তেমন থাকে না। যে কোনো কাপ্‌লের মতোই এদের ক্ষেত্রেও টাকা-পয়সা নিয়ে ক্যাঁচাল তৈরি হয়। দুজন এক সাথে বাস করলে আর্থিক চাহিদাও বৃদ্ধি পায়, কারণ অনেক ধরণের প্রয়োজন মেটাবার তাগিদ থাকে। কে কোন্‌ বিলটা পরিশোধ করবে, এবং কার টাকা কীভাবে খরচ করবে এ নিয়ে একজন আরেক জনের উপর চড়াও হয়, সৃষ্টি হয় সংঘাতের।

.

মিথঃ বিয়ে করলে সেক্স লাইফের বারোটা বাজে।

সত্যিঃ লিভ টুগেদার যারা করেন তাদের তুলনায় ম্যারিড কাপ্‌লদের সেক্সুয়াল সেটিসফেকশন আরও বেশি হয়ে থাকে। লিভ টুগেদারের কাপ্‌লদের পরস্পরের প্রতি আস্থা কম থাকে।

.

মিথঃ বিয়ে তো কেবল এক টুকরো কাগজ মাত্র।

সত্যিঃ আবেগিক, দৈহিক এবং আধ্যাত্মিকভাবে বিচার করলে, বিয়ে শুধু এক টুকরো কাগজ নয়। এটি একটি কমিটম্যান্ট। বিয়েকে কেবল একটি আইনি দলিল হিসেবে বিবেচনা করা মানে এর সত্যিকার মর্মার্থ বুঝতে ব্যর্থ হওয়া এবং নিজেদের সম্পর্ককে  ব্যর্থ করার ঝুঁকি নেওয়া।

 .

মিথঃ এটা তো সাময়িক একটা ব্যাপার।

সত্যিঃ অনেকেই লিভ টুগেদার শুরু করেন এই  আশা নিয়ে যে, শীঘ্রই তারা বিয়ের পিঁড়িতে বসবেন। কিন্তু বাস্তবে প্রায়শ তা হয়ে ওঠে না। পরিসংখ্যান থেকে জানা যায়, কোহেবিটেশনে আছেন এমন ৬০% কাপ্‌ল পরবর্তীতে পরস্পরকে বিয়ে করেন না কারণ হয় তাদের ব্রেক-আপ হয়ে যায় (৩৯%), নয়তো তারা শুধু লিভ টুগেদারই করতে থাকেন (২১%)।

 .

মিথঃ যদি বাচ্চা-কাচ্চা থাকে তবে লিভ টুগেদারই সবচে ভালো।

সত্যিঃ বাচ্চাদের উপর কোহেবিটেশন ব্যাপক প্রভাব ফেলে। এরূপ ক্ষেত্রে বাচ্চারা বিভিন্ন ঝুঁকির সম্মুখীন হয় যেমনঃ আবেগিক ও সামাজিক সমস্যাবলি, স্কুলে রেজাল্ট খারাপ করা, অতি অল্প বয়সে যৌন সম্পর্ক স্থাপন, পরিণত বয়সে স্থায়ী আবেগিক সম্পর্ক স্থাপনে সমস্যাক্রান্ত হওয়া। আর কোহেবিটিং যুগলের পুরুষ লোকটি যদি ওই সন্তানের সত্যিকার বাবা না হয়ে থাকেন, সেক্ষেত্রে সন্তানের শারীরিক ও যৌন নিপীড়নের ঝুঁকি অনেক বেশি থাকে।

8a39376399defcb5b0cf75f3ca31c73c_screeshots_4

.

কীভাবে নিশ্চিত করবেন স্বাস্থ্যকর, দীর্ঘস্থায়ী সম্পর্ক?

সম্পর্কে ভেঙে যাওয়ার যন্ত্রণা কেউই সইতে চান না, সেটা বিয়ে কিংবা লিভ টুগেদার যা-ই হোক না কেনো। লিভ টুগেদারের বেশ কিছু স্বল্প-মেয়াদি সুবিধা আছে, তবে এগুলো অনেক চড়া মূল্যে অর্জিত সুবিধা। আপনার লক্ষ্য যদি হয় একটি স্থায়ী, স্বাস্থ্যকর এবং পরিপূর্ণ সম্পর্ক, তবে এই টিপ্‌সগুলো কাজে লাগাতে পারেনঃ

.

সময়ঃ যার সাথে জুটি বাঁধতে চাচ্ছেন, তিনি সত্যিই আপনার উপযুক্ত কিনা তা যাচাই করার সবচে ভালো পন্থা হলো সময় নেওয়া। জীবন আপনাকে যেসব পরিস্থিতিতে ফেলে (দুঃসময়, সুসময়, কিংবা দৈনন্দিন রুটিন লাইফের বিভিন্ন সময়) সেগুলোতে সঙ্গী মানুষটির সাড়া কেমন, পরিস্থিতি সামলানোতে তার সামর্থ্য, তার আচরণ কেমন—এসব দেখে নেওয়ার সুযোগ পেতে সময় নেওয়া চাই। এসব দেখেটেখেও যদি লোকটিকে আপনি ভালোবাসতে পারেন, তাহলে বুঝতে হবে আপনাদের সম্পর্কটি স্থায়ীত্বের সুযোগপ্রাপ্ত হয়েছে।

.

যোগাযোগঃ সম্পর্ক সর্বদা মদ বা গোলাপের মতো নয়। মনে রাখবেন, আপনার পার্টনার কখনো কখনো আপনাকে হতাশ করবে, মন বিষিয়ে দেবে। যদি আপনি যোগাযোগ স্থাপনে দক্ষ হয়ে ওঠেন তবে আপনি বুঝে যাবেন এসব পরিস্থিতে কখন কী করতে হবে।

.

বিয়ের কথা ভাবুনঃ লিভ টুগেদারের তুলনায় বিয়ে যে কারণে বিশেষ হয়ে ওঠে সেটি হলো, ‘স্থায়িত্বের সংকল্প”। পার্টনার দুজন জনসম্মুখে প্রমিজ করবেন একসাথে থাকার, চলার পথে যতো বাধা বিপত্তিই আসুক— দুজনে পাশাপাশি থাকবেন এবং পরস্পরকে সাপোর্ট দেবেন।

 .

প্রাক-বৈবাহিক শিক্ষাঃ যেসব কাপ্‌ল বিয়ের আগে দাম্পত্য বিষয়ক জ্ঞানার্জন করে থাকেন, তারা অন্যদের তুলনায় বৈবাহিক সাফল্যে ৩০% এগিয়ে থাকেন। তাদের আন্তঃযোগাযোগ দক্ষতা, বিবাদ-নিরসন সক্ষমতা অনেক বেশি হয়ে থাকে এবং তারা নিজেদের পার্টনারের প্রতি আরও বেশি নিবেদিতপ্রাণ হয়ে থাকেন, যুগল জীবন গুণগত মানের দিক থেকে অনেক এগিয়ে থাকে।

(মূল:http://firstthings.org/myths-about-living-together/)

PC: Google