ক্যাটেগরিঃ চিন্তা-দর্শন

গরু ঘাস খায়। মানুষ ক্রাশ খায়। মানুষের ভোজনে আইটেমের শেষ নেই। পান-জর্দা, মদ-মাংস, বিড়ি-সিগারেট, সুদ-ঘুষ-কমিশন, কুত্তা-বিলাই-গরু-ছাগল, লতা-পাতা তো বটেই, মানুষের মাংসও মানুষ খেয়ে থাকে। খাদ্য তালিকায় এতোসব নামের সম্ভার কোনো জীবের কপালেই জোটেনি আর। আশরাফুল মাখলুকাত বলে কথা। খাদ্যবস্তু সাধারণত চর্ব, চোষ্য, লেহ্য এবং পেয়—এই চার প্রকারের হয় এবং মুখ দিয়েই এগুলো চালান করা হয়ে থাকে। কিন্তু আমরা জানি, খাদ্যদ্রব্যের সংজ্ঞায় শর্করা, আমিষ, ফ্যাট, ভিটামিন আর মিনারেল সমৃদ্ধ খাবার ছাড়াও যেমন আরও অনেক কিছু আছে, তেমনি খাদ্যগ্রহণ প্রক্রিয়া মুখের কোনোরূপ ব্যবহার ছাড়াও সম্পন্ন হতে পারে।

.

‘খাবার’ শব্দটির আকারগুলো বাদ দিলেই ‘খবর’ হয়, এবং কে না জানে আজকাল এই খবরও এক ধরণের নিয়মিত খাবারে পরিণত হয়েছে। কাঠ-বাঁশের তৈরী কাগজের পৃষ্ঠা থেকে খবর যখন কম্পিউটার আর ফোনের স্ক্রিনে খুব করে গড়ালো, তখন থেকে খবরের খাদ্যরূপ গুণাগুণ এবং ব্যবহারও ব্যাপকভাবে বেড়ে গেলো। অবশ্য খবরের শিরোনামে চৌম্বকিয় শব্দ ব্যবহারের রীতি সব সময়ই ছিলো। অনেক বছর আগে, যখন আমাদের জাতীয় সংসদ সরকারি-বিরোধি দলের অংশগ্রহণে মুখর ছিলো, তখনকার ডেইলি স্টারের একটি শিরোনাম এই মূহুর্তে মনে পড়ছে, “Murcury High at JS”। প্রথমে বুঝতে গিয়ে সামান্য টাস্কি খেয়েছিলাম। জাতীয় সংসদে আবার পারদ কোত্থেকে এলো? পরে বুঝেছি, শব্দটি দিয়ে সাংসদগণের উত্তপ্ত বাক্য বিনিময়কে বোঝানো হয়েছিলো। সেরকমই আপাত দুর্বোধ্য কিন্তু আগ্রহোদ্দীপক খবরের আরেকটি লাইন ২০০৭ এর। সেই ভয়াবহতম সাইক্লোন ‘সিডর’-এর রাত শেষে কাগজের খবরে ওটা দেখে ভিমড়ি খাওয়ার যোগাড় হয়েছিলো। বাক্যটির শুরু ছিলো এরকম, “A deadly incubus dated with Bangladesh….”। পৌরাণিক চরিত্রগুলোর নামধাম সম্পর্কে একেবারে অজ্ঞ না হওয়া সত্ত্বেও ‘ইনকিউবাস’ নামক কোনো দৈত্য যে আছে, যে কিনা ঘুমন্ত নারীর স্বপ্নে এসে তাকে বলাৎকার করে থাকে, সেটা তখনই প্রথম জানা হয়েছিলো। এ ধরণের শিরোনামের একটা বিশেষ শৈল্পিক মাত্রা রয়েছে।

.

তবে শিরোনামে শিল্প ফলাতে গিয়ে দেশের এক বিখ্যাত বেক্কলের হ্যাকার বানানোর কোচিং বিজ্ঞাপনের মতো দুঃখজনক ঘটনা সংবাদের ক্ষেত্রে আগে যে ঘটেনি  তা নয়। তখন অবশ্য দায়ি ব্যক্তিকে শাস্তিও পেতে হতো। একটি উদাহরণ  দেওয়া যেতে পারে। একবার দেশের প্রত্যন্ত এক এলাকায় বর্ষায় পাহাড়ি ঢল নেমে ফসলের মাঠ সব ডুবে একাকার। এরকম দুঃসময়েও জীবন থেমে থাকবার নয়। মানুষকে খেতে হয়। খাবার যোগাড় করতে হয়। অন্য কাজের সুযোগ কমে যাওয়ায়, এসময় গ্রামে মাছ ধরার ধুম পড়ে যায়। একদিন দুপুরে ওই এলাকার এক কিশোর বড়শিতে মাছ ধরতে গেলো। কৈ মাছ। সাথে কোনো পাত্র না থাকায় বড়শি থেকে খসিয়ে নিজের লুঙ্গির কোঁচে গুঁজে নিচ্ছিলো মাছগুলো। এক পর্যায়ে ওখানে জায়গা সংকুলান না হওয়ায় বিকল্প বুদ্ধি কাজে লাগালো সে। হাতে ধরা জ্যান্ত মাছটিকে নিজের মুখে পুরে নিয়ে বড়শিতে ধরা অন্য মাছটিকে হস্তগত করতে চেয়েছিলো। গ্রামের ছেলেদের এমন অদ্ভুত সাহস অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু দুর্ঘটনাটা ঘটে গেলো। কৈ মাছটি গলা দিয়ে ঢুকে পড়েছিলো তার পাকস্থলিতে। হাসপাতালে নেওয়ার পথে ছেলেটি মারা যায়। বহু বছর আগের কথা। চট্টগ্রামের ‘দৈনিক পূর্বকোণ’-এ প্রকাশিত এ খবরের শিরোনামটিকে একটু ড্রামাটাইজ করে লেখা হয়েছিলো, “কৈ গেল কই?”।অতি রসিক ওই শিরোনামকারিকে এরপর আর ওখানে কাজ করতে হয়নি। জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলার অধ্যাপক ডক্টর সাহাবুদ্দিন স্যারের কাছ থেকে শোনা ঘটনা এটি। ওই সংবাদকর্মী ছিলেন তাঁর পরিচিতজন।

.

এখন সময় পালটেছে। হিটখেকো নিউজপোর্টাল আর খবরখেকো অনলাইন রিডারের খাইখাই সমান তালে এগিয়ে চলছে। খবর বায়বীয় হোক, তাতে কোনো সমস্যা নেই। শিরোনামে থকথকে রস থাকা চাই। খাবারের উৎপাদক আর ভোক্তার জয়জয়কার। হিট দে, আর খবর খা। শিক্ষিত জনগণ কি কম নাকি বাংলাদেশে? আর এই বাস্তবতা যে শুধু এদেশেই বিরাজমান, তা তো নয়। সবখানেই একই ট্রেন্ড চলছে। আজকাল তো সেলিব্রেটিদের বাতকর্ম নিয়েও নিউজ হয়ে থাকে (https://www.bustle.com/articles/104366-11-celebrities-whove-farted-in-front-of-the-camera-they-really-are-humans-like-you)

.

শুরুতে ক্রাশ খাওয়ার কথা বলছিলাম। হুট করে অন্য প্রসঙ্গে চলে না গেলেই ভালো হতো। যা হোক, কবি বলেছেন, “গরু ঘাস খায়, আমি খাই উহাদের দিবস যাপন।” দিবস যাপনকে তবে খাওয়াও যায়; কিন্তু সেটা কোন্‌ প্রত্যঙ্গ দিয়ে সে ব্যাপারে কবি কিছু বলেননি বলে জানা সম্ভব হচ্ছে না। তবে ক্রাশ খাওয়ার অভিজ্ঞতা যাদের হয়েছে তারা সকলেই জানেন, এতে প্রাথমিক পর্যায়ে মুখের ব্যবহার একেবারেই নেই। ক্রাশ খাওয়ার জন্য চোখ  আর মন থাকাই যথেষ্ট। ক্রাশ একই সাথে মূর্ত ও বিমূর্ত খাদ্যবস্তু। যে মানুষটির এখনও কোনো রোমান্টিক রিলেশনশিপ হয়নি, তিনি সকাল-বিকাল-রাত তিন বেলাই ক্রাশ খেতে পারেন। এটা তার অধিকার না হলেও স্বাভাবিক অনুসন্ধান প্রক্রিয়ার অংশ। এভাবেই ক্রাশ খেতে খেতে একদিন কাঙ্ক্ষিত প্রেম তার শুষ্ক জীবনে সৌরভময় বসন্তের সূচনা করে থাকে। আর এভাবেই রোমান্টিক সম্পর্কের প্রতিটি সূচনাতেই ক্রাশ অনিবার্য হয়ে ওঠে।

.

আবার ইতোমধ্যেই রিলেশনশিপে আছেন যিনি, তিনিও ক্রাশ থেকে বঞ্চিত হবেন, তা কেনো? ক্রাশ কিনে খেতে হয় না। তাছাড়া, এটি ক্ষুধা লাগা, না লাগার সাধারণ কার্যকরণ সম্পর্কের সূত্র মেনে চলে না। এটা হতে পারে যে, সঙ্গী ভিন্ন অন্য কারও প্রতি ক্রাশ মানে সঙ্গীর মাঝে কিছু একটা মিসিং আছে যা ওই ‘অন্য কারও’ মাঝে এভেইলেব্‌ল। কিন্তু এই ‘এভেইলেবিলিটির’ যে বিশ্বাস তা আসলে সম্পূর্ণরূপে অনুমিত, ক্রাশমূহুর্তে অপ্রামাণ্য, এবং যার উপর ক্রাশ খাওয়া হলো তার আর সব আচরণগত বা আবেগিয় বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে অজ্ঞতা দূর হলে ক্রাশের মাথায় বাজ বা বাঁশ পড়তে পারে কি পারে না সেটি বলা যায় না। সেকারণেই এক্ষেত্রে ক্রাশ পরবর্তি সচেতন কর্মপ্রক্রিয়ায় সাবধানতার বিকল্প নেই।

.

ক্রাশবিজ্ঞানীদের গবেষণায় এটি খুবই স্পষ্ট যে, ক্রাশ খাওয়া কোনো অদ্ভুত বা অনৈতিক কোনো কিছু নয় এবং এটা যে কোনো বয়সেই খাওয়া যেতে পারে। ভালোলাগা সব সময় ভ্যালু-জাজম্যান্টের শপিং লিস্ট সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে হয় না। আবেগিয় আচরণে এটি তাৎক্ষণিক, স্বতঃস্ফূর্ত এবং দুর্বার। আর এটিও তো খুবই সত্যি কথা যে, “just because you’re on a diet, it doesn’t mean you can’t look at the menu.” কিন্তু ইতোমধ্যেই সিরিয়াস সম্পর্কে জড়িয়ে আছেন যিনি, তার ক্ষেত্রে নতুন ক্রাশ যৌক্তিক হলেও এর মাইলেজের ব্যাপারে বিচক্ষণতার পরিচয় দিতে ব্যর্থ হলে এ্যক্‌সিডেন্টের সমূহ সম্ভাবনা রয়েছে। ক্রাশ খাওয়া বা এর পরিপাকে পাকস্থলির কোনো ভূমিকা না থাকলেও ক্রাশ সংক্রান্ত বদহজম খুবই মারাত্মক পরিণতি বয়ে আনতে পারে। কিছু সুন্দরের খুব কাছে না আসাতেই, তাকে ছুঁয়ে না দেখাতেই বেশি মঙ্গল।

.

ওহ! বাঁশ খাওয়ার কথাটা শেষে না বললেই নয়। হ্যাঁ, কচি বাঁশকে রান্না করে খাওয়া যায়। বাঁশের রেসিপি চাইলেই পেতে পারেন একটু সার্চ করে। বিদেশে হাঁস দিয়ে বাঁশ খাওয়া হয়। পুষ্টিকর খাবার। তবে বাঙালি হিসেবে আমরা সাধারণত রান্না ছাড়া আস্ত বাঁশ বেশি বেশি খেয়ে অভ্যস্ত। বিমূর্ত এই বাঁশকে আইক্যাওয়ালা বাঁশ বলা হয়। এটির পুষ্টিগুণ নিয়ে কোনো গবেষণা হয়েছে বলে জানা নেই। কিন্তু প্রাপ্ত বয়স্ক সকলেই এর স্বাদ পেয়েছেন এবং সকলেই জানেন, বাঁশ দেওয়া তথা পরিবেশন বা সঞ্চালন করার কাজটি আরামদায়ক হলেও এ ধরণের বাঁশ খেতে সুস্বাদু নয়। তবু খেতে হয়। তবু দিতে হয়। এ জাতীয় বাঁশ খাওয়া ভালো হলে কিংবা না হলেও ক্রাশ খাওয়া কিন্তু খারাপ কিছু নয়। তবে বি কেয়ারফুল, ক্রাশের পরে বাঁশ— ওরে সর্বনাশ! না, কিছুতেই না।