ক্যাটেগরিঃ চিন্তা-দর্শন

 

ক্যালেন্ডার থেকে দিন-রাত খসে পড়ছে বেশ। প্রকৃতিতে হেমন্ত, বুকে সোনার বাংলাদেশ। বারবার আসে সোনারোদ-বৃষ্টি-বাতাস-ধান। আকণ্ঠ ভালোবাসায় সোনামন বহুদূর বাহাদুর হয়। সোনারং প্রেম হয়। সোনা কাদামাটি, দূর্বাদল। তরল, কঠিন, বায়বীয় সোনা। কেউ দেখেও দেখে না, না দেখুক, নদীজলে রূপালি ইলিশ কেমন তুমুল ওঠে। ওঠে চাঁদ আসমানে; রূপালি বান ডাকে। সোনার দেশে রূপার কদর থাকতেই পারে। একে অনিয়ম ভেবে নিলে কী আর আছে করার, অনুকম্পা ছাড়া? আর এটা তো জানাই আছে, অনিয়ম যতোই যেখানেই হোক, জীবনটা যাপিত হয় নিয়মিতই। মাথার মধ্যে কথার কুণ্ডলি, ধোঁয়াধূসর স্মৃতির গ্যালারি— কয় টেরাবাইট, কেউ জানে না। নোবডি কেয়ার্স, নোবোডি কিপ্‌স স্কোর্‌স।

.

“মোর মন যেতে চায় উড়ে

ঐ ঘর ভুলানো সুরে”

তবে কিনা এই উড়ে যাওয়া নানারূপ হয়টয়। ঘরকে ভুলেও সেই ঘরেই যেনো ফিরে ফিরে আসা হয়। আমাদের বহুবিধ ভালোবাসা যাপনে রঙিন। ভালো দিন, মন্দ দিন ঘুরেফিরে আসে। দুঃসময়কে জাপটে ধরেও জীবন কেমন টিকে থাকে হাসপাতালে, ঘরে-বাইরে! দুর্দিনের প্রাণ কৈ মাছেরটার মতো। তাই বলে লাইফ ইম্প্রিজনম্যান্ট মানে তো আর সারাজীবনের কারাবাস নয়। আর আঁকড়ায় শুধু কাঁকড়ায় না। আঁকড়ানো মানুষেরও শোভা পায়। আমাদের বেশ বেঁচে থাকা হয়। সরকার বেশ টিকে থাকে। সুন্দরবনও যতোদিন পারে আল্লাহ্‌র রহমতে মাটি কামড়ে টিকে থাকবে। মানুষ থাকতেছে না!

.

এ জীবন দ্বিতীয়বার যাপনের নহে। ওই যে পাতাঝরা দিন, বিশিষ্ট সন্ধ্যাসব—ওসবও আর ফিরে আসবার নয়। তাই বলে স্মৃতিসব ঝরে যাচ্ছে—তেমনটি তো নয়। এই যেমন, গাছপাতা ছায়ার তলে বসে আয়েশে একদিন কী কথা বলার ছলে কী বলেছিলো কে তার ছবি ভেসে ওঠে, এই যে এতো কিছুর দিনক্ষণ উদ্‌যাপন— সে তো স্মরণের ছলা-কলাই। আসল কথা হলো, বেঁচে থাকা। স্মৃতিভার বয়ে, সয়ে, ক্ষয়ে ক্ষয়ে নিঃশেষ হতে যতোদিন, ততোদিন জীবন। ক্ষয়িষ্ণু এ জীবনে বেঁচে থাকার/টিকে থাকার আকাঙ্ক্ষার চেয়ে বড়ো কিছু নেই আর। টিকে থাকার স্বার্থে একটু আধটু কৌশলগত পন্থা বেছে নিতে হয় আর কী। সবকিছু সাধারণকে বুঝিয়ে বলা যায় না। তাতে সাধারণের অপমান হয়। গোপালের সাথে নন্দলাল গেলে, রামপালের সাথে ধর্মপালও যেতে পারে। সে না হয় গেলো। এখন সেটা কোন্‌ দিক দিয়ে গেলো, কিংবা আদৌ গেলো কি না গেলো সে দিয়ে আমার কী? আপনার কী?

.

দিনটা গেলে রাতটা আসবেই। “রাত পোহাবার কতো দেরি”—সেটা আর পাঞ্জেরিরে কে জিগায় আজকাল? থাকিতে নিজের হস্ত, পরের দ্বারস্থ কে হতে চায়, যখন জনে জনে, হাতে হাতে ডিজিটাল ঘড়ি? মান্না দে গাইলেন, “আলো জ্বালতে যে ভয় করে, এই ঘরে”। কেনো ভয় করে? “অন্ধকারে আলো লেগে যদি পুরনো দুঃখ চোখে পড়ে!” মোলায়েম সঙ্গীত বটে। কিন্তু স্মৃতি কি আর আলো-আঁধার মেনে চলে? চলে না। আলোটাকে জ্বালতে হয়। বব ডিলান যখন গান “Honey, give me one more chance/ To ride your aeroplane; Honey, give me just one more chance/ To ride your passenger train” তখন তো মজাই লাগে। তো আসুন না, আমরাও না হয় সবে মিলে ‘হানি’ হই। প্যাসেঞ্জার তো হয়েই আছি।