ক্যাটেগরিঃ পাঠাগার

 

সাহিত্যানুরাগী হলেই কী না হলেই কী, সবাই কবিতা পড়েন না। তাতে কবিতার বা কবির কিছু আসে যায় না। তবে গল্প, উপন্যাসের পাঠকের তুলনায় কবিতার পাঠক একেবারেই কম—এরকম ভাবতে গিয়ে ইদানিং খটকা লাগছে। এটা ঠিক যে, কবিতার বই কিনে নিয়মিত পড়েন এমন পাঠকের সংখ্যা বিরাট কিছু নয়। কিন্তু ইন্টারনেট ভিত্তিক সামাজিক যোগাযোগের সাইটগুলোতে কবিতার শক্তিশালী প্রবাহ অনেক নতুন পাঠক সৃষ্টি করেছে—এটি বেশ বুঝতে পারা যায়। ফেইসবুকের হোমপেইজে আর সবকিছুর সাথে কবিতাও এখন নিয়মিত আসে। কবি বন্ধুদের নিজেদের লেখা, কিংবা অন্য কোথাও প্রকাশিত কবিতার লিঙ্ক নিজেদের টাইমলাইনে শেয়ার করে থাকেন অনেকেই। যারা কবিতা খুঁজে পড়তে ইচ্ছে করেন না, কবিতাই এখন তাদের সামনে চলে আসছে। দেখতে গিয়ে কারও কারও মনে ধরে। অনেকটা পড়া হয়। না হলে পুরোটা পড়া হয়। কখনও দুয়েক লাইন পড়া হয় মাত্র। এভাবেই ভালোলাগা তৈরি হয়। জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে কবিতাকে গানের মতোই উপভোগ্য এবং ব্যবহার্য করে নিই আমরা।

আবার মুরোদ থাকা সত্ত্বেও অনেকেই কাব্যগ্রন্থ পড়ার চেয়ে কবিতার আবৃত্তি শুনে থাকেন। কবিগণ তাঁদের শ্রোতাদের কথা আরও ভাবলে অডিওতে কবিতার বৈচিত্র্য দীনতামুক্ত হতে পারতো নশ্চয়ই। তারপরও চোখের পাশাপাশি কানের উপযোগি কবিতার বিস্তারগতি কমে এসেছে এ কথা বলা যাবে না। এখন কবিতার সাইটগুলোতে লাখ লাখ হিট পড়ে প্রতিদিন। ফেইসবুক যখন ছিলো না, তখন এমনটি কল্পনাতীত ছিলো। এভাবেই প্রযুক্তিসুবিধা কাব্যগ্রন্থের বিক্রি বৃদ্ধিতে না হলেও কবিতার অনলাইন পাঠক বৃদ্ধিতে ব্যাপক ইতিবাচক ভূমিকা রেখে চলেছে।

কবিতার পাঠে অকবি পাঠকের উপলব্ধি কী হলো না হলো তাতে কবির কিছু আসে যায় না নিশ্চয়ই। তেমনি কবিতার আদলে কিছু লিখলেই কবি হওয়া যায় কি না সে নিয়ে পাঠকের কোনো খচখচ নেই। কোনো কিছু কবিতা হয়ে উঠলো কি না, সে সিদ্ধান্তও অকবি পাঠকের নয়। মাত্রা-ছন্দের পরিপূর্ণ জ্ঞান পাঠকের জন্য আবশ্যক নয়, গল্পের পাঠকের কাছে যেমন গল্পকারের প্রযুক্ত কৌশল আর রীতি মূখ্য হয়ে ওঠে না।

মনে হয়, গল্পকার চাইলেই গল্পটা মোটাদাগে বলে ফেলতে পারেন, কবি হয়তো তা পারেন না। পারলেও বলেন না। গল্পে যেমন কাব্যময়তা থাকে, কবিতাও তেমনি গল্পের ঘ্রাণ নিয়ে বড়ো হয়, বেঁচে থাকে। নজরুল আর রবীন্দ্রনাথের কিছু কবিতার বই কতো বছর থেকে পড়ে পড়েছিলো ঘরে, জানা হয়নি। তবে তার সুবাদে শৈশবে পাঠ্য বইয়ের বাইরে এই দু’জনের কবিতা পড়া গিয়েছিলো। অন্যদের কবিতা ক্লাস এইটের আগে পড়া হয়নি, মনে আছে।

ছোটবেলা থেকেই জাতীয় কবি আর বিশ্বকবির কণ্ঠে তাঁদের সৃষ্টির উচ্চারণ শোনার ইচ্ছে ছিলো। পরে যেদিন সে ইচ্ছে পূরণ হলো, অর্থাৎ নজরুলের কণ্ঠে গান আর রবীন্দ্রনাথের কণ্ঠে কবিতা(16:16) শোনা হলো, সেদিন থেকে এই দুই কবির জন্য খুব মায়া হয়। অবশ্য গান বা আবৃত্তির গলা কবি মাত্রেরই সুন্দর হতে হবে এমন কোনো কথা নেই। তবু কবিকণ্ঠে উচ্চারণ এমন ভয়ানক বোধ করি আর কোনো বাংলাভাষী কবির কণ্ঠে অসম্ভব। সে যাই হোক, অকবি পাঠকের রুচিতে কবিতার উচ্চারণ শুনতে যতো ভালো লাগে, নীরব পাঠের ভালো লাগা অতোটা নয় হয়তো। তবে ব্যতিক্রমও কম নয়।

কবিতায় কী খুঁজি কিংবা আদৌ কিছু খুঁজি কি না সেটি কখনও ভেবে দেখা হয়নি। এখন লিখতে গিয়ে ভাবতে ইচ্ছে হচ্ছে। মনে হচ্ছে, আমি খুঁজি দৃশ্য। শব্দের বিন্যাস বেয়ে বেয়ে আকাশ, বাতাস, ঝড়-বিদ্যুৎ, জলের ছাঁট, হাট-ঘাট, ছায়া-রোদ-জ্যোৎস্নার মায়ামাখা জনপদে, কিংবা নৈঃশব্দ্য, রোমাঞ্চ, সুখ-দুঃখের নানারূপ আয়োজনে পর্যটনের বিলাস মেলে কবিতায়। কিছু দৃশ্যকল্প অন্তরে শান্তি দেয়, কিছুতে ছলকে পড়ে বিষাদ, মৌনতা, অস্থিরতা।  কবির কথায় নিজের অভিজ্ঞতার স্বরূপ খুঁজে পাওয়া যায় কখনও কখনও। পাঠক হিসেবে আমি কবিতায় দৃশ্যের টান খুঁজি। আরও অনেকে অন্য কিছু, অনেক কিছু খুঁজে পায় নিশ্চয়ই। ‘তুমি এক পশলা চায়ের মতো এক পেয়ালা বৃষ্টি’র কথা বলে কবি হয়তো তার কোনো প্রিয়জনকে একই সাথে উত্তল এবং অবতল লেন্সে দেখতে চাচ্ছেন এবং একটা ডাব্‌ল ভিশন তৈরির চেষ্টায় আছেন, কিন্তু পড়তে গিয়ে সবার আগে ওই ‘এক পেয়ালা বৃষ্টি’র ছবিটা চোখে পড়ে। কবি কী বুঝিয়েছেন তা জানবার আগ্রহ থাকলেও উপায় সব সময় মিলবে—এমন আশা করা অনুচিত। বরং পাঠক তার নিজের মতো করে কবিতাকে বুঝে নেবেন, এতেই কবিতার মজা। কবিতা এ্যনিগম্যাটিক হবে–এটাই স্বাভাবিক। বিক্ষিপ্ত ইমেজের অদ্ভুত কিছু সুন্দর দেখার লোভ হয় কবিতায়। আমি ‘এক পশলা চায়ের’ ছবি, এক পেয়ালা বৃষ্টির ছবি দেখি—এই দৃশ্যের সুন্দরকে উপভোগ করি।

ইদানিং অনেকের কবিতা পড়া হয়। অনেকগুলো ভীষণ ভালো লাগে। এখানে যাদের কবিতার কথা বলছি, তাদের সবার কবিতাই কমবেশি পড়া হচ্ছে গত পাঁচ-ছয় বছর ধরে। কারো কারোটা আরও কম সময় থেকে।  কাজী নাসির মামুনের কবিতা পড়া হচ্ছে আরও বেশিদিন থেকে। তাঁর সব কাব্যগ্রন্থই আমার সংগ্রহে আছে। তাঁর কবিতার পাঠক হিসেবে ভালোলাগার পাশাপাশি নিজের অসহায় বোধের কারণ খুব সম্ভবত তাঁর কবিতার শব্দের বুননের অসামান্যতা। আমার মতো অনেক পাঠকের সামর্থ্যের সীমা ছাড়িয়ে যায়। তবে তাঁর কবিতায় অদ্ভুত সুন্দর সব ইমেজ পাই। দেখা দৃশ্যকে নতুন করে দেখানোয় তাঁর জুড়ি নেই।

জামার অতলে তুমি গজারির বন পাংশুল

টমেটোর পাকা রঙে লজ্জাবতী চিরল পাতায়

নুয়ে আছো ছেঁড়াখোঁড়া মুখ

সংক্রামক

মৃন্ময়,

তোমাকে দেখার নামে আমি তবে পাতা ছুঁই। নিজেকে ভাসিয়ে তুলি নদী সরোবরে।

কিংবা

ধানগাছ চিরদিন থাকে না; কদম্বে

থাকে না ভোরের জবা। ওই নীলে আকাশপাতায়

বৃষ্টিরা দেখে না গাছ, ধানগাছ চিরদিন

                               থাকে না।

ঘাসের নরম প্রাণে ছাপ রেখে ঘুমিয়েছে সব
আমিও ফড়িং, বন্ধু, আজ হোক উড়ার উদ্ভব

এরকম অনেক কবিতায় প্রকৃতিকে কবি এক ভিন্ন মাত্রায় চোখের সামনে বোধের সীমায় তুলে ধরেন। কাজী নাসির মামুনের কবিতায় নদী, ধান, বৃষ্টি, টোমেটো, লজ্জাবতী, আকাশ, রোদ্দুর, ফড়িং ছাড়াও প্রকৃতির আরও বহুবিধ উপাদান ইত্যাদি নতুন নতুন চেহারায় উঠে আসে, কঠিন পৃথিবীর কঠিন মনের মানুষের ভিড় ছেড়ে, কোনো এক মাঠের ঘাসের নরম গায়ে পায়ের ছাপ কেমন হয় তা কল্পনা করতে গিয়ে চোখের সামনে আমার শৈশব ভেসে ওঠে; জিগার গাছের আঠা বাঁশের কঞ্চিতে মেখে ভর দুপুরে যেসব ফড়িংয়ের পিছু ছুটেছিলাম তাদেরকে আবার দেখতে ইচ্ছে করে। শেষ বার লাল ফড়িং দেখেছি মুক্তাগাছার বনে, কাসাবার ক্ষেতে —সেও অনেকদিন হয়ে গেছে।

ফেইসবুকে আরও অনেকের কবিতা পড়া হয়। তাঁদের মধ্যে তানজির খানের কবিতা খুব অল্প সময়ে প্রিয় হয়ে উঠেছে। তাঁর কবিতায় নাগরিক জীবনের টুকরো টুকরো দৃশ্য থাকে, থাকে নিজস্ব উপলব্ধি, আকাঙ্ক্ষা, অস্থিরতার বিবরণ। কখনও কখনও পরামর্শও মেলে।

“ঘৃণার পথে হাঁটবেন না 
এতে হৃদয়হানি ঘটে, 
পৃথিবীতে তার হাত ধরে ডিঙি নৌকায় উঠুন 
যার ঘৃণা করার ক্ষমতা নেই, 
আপনি বেছে নিন সেই পুরুষকে 
যার হৃদয় একশত পদ্ম পুকুরের সমান,
সেই নারীকে খুঁজে নিন যার হৃদয় স্তনের চেয়ে বড়…”

এতো সুন্দর করে এমন কথা ক’জন কইতে পারে? তাঁর কবিতায় নাগরিক সন্ধ্যার বিশেষ বিশেষ  উল্লেখ পাওয়া যায় প্রায়শ। তাঁর শব্দবিন্যাসে অদ্ভুত এক সারল্য আছে। ভাণ নেই। অতিরঞ্জন নেই। তাঁর কবিতায় কাম-লালসা-প্রেম ছাড়াও জীবনের বিবিধ চাপ, অস্থিরতা, এক ভিন্ন মাত্রায় বাঙময় হয়ে ওঠে। আমার ভীষণই ভালো লাগে-

“সান্ধ্যকালীন সময়টা ভয়াবহ ভ্রমের-
এ সময় শত্রুমিত্র একই দোকানে চা পান করে,
স্ত্রীরা অযথা নরম গলায় কথা বলে
আর পুরুষ বোধবুদ্ধি হারায়,
রাষ্ট্র ক্ষমতা দখলের চক্রান্ত হয়
ক্যান্টনমেন্টের সুদর্শন কোন মেজরের বাসায়।”

কিংবা

“সন্ধ্যা পেরিয়ে রাত অবধি আমাদের আলাপ হয়
শেষ কথা বন্ধুই বলে ‘এ শহরে টাকাই ঈশ্বর’,
কথা শেষ না হতেই হর্ন বাজিয়ে গাড়ী থামে
সুন্দরী বেশ্যা নামে – গটগট করে উঠে যায় থ্রী স্টার হোটেলে, 
আমরা বসে আছি তিন রাস্তার মোড়ে,
আমি বলি টাকার ঈশ্বর নিপাত যাক।”

মানস সান্যালের কবিতাও অনেক দিন থেকে পড়ি। মানসের কবিতার এরকম নস্টালজিয়ার প্রকট প্রভাবটা দারুণ-

“ঝরাপাতার উপর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে কতবার
আমাদের ঢেউগুলো ছুঁয়ে গেছে শঙ্খ নদীর কিনার
ভেবেও দেখিনি, শুধু বিকালের প্রতি মমতাবশতঃ
কিছু দূর গিয়ে ফিরে ফিরে আসি ছাই রঙ নিয়ে

কোথায় বেহালা, কোন দূর পরবাসে আজ…”

কিংবা

“ঘুরে দাঁড়ানোর শব্দে এইবার চমকে উঠি, সুপ্রিয় আগুন
তুমি একবারও এই পথ দিয়ে বেড়াতে এলে না, 
অথচ বনের ফুল একা একা ফুটে আছে”

নদীর কিনার, একটি বিকেল, ছাই রঙ, মনখারাপ, প্রবাস, আগুন, ফুল, বেহেলা… একটা অদ্ভুত করুণ সুন্দর সুর কোথাও গভীর স্তব্ধতায় ভেসে থাকে চোখের সামনে।

তানভীর রাসেল লিখে যাচ্ছেন। কখনও একটু পড়তে গিয়ে বারবার পড়তে ইচ্ছে করে।

“খাওয়ার নামে নিজেকেই খাচ্ছো খুব।
নাড়ার আগুনে বেদম পুড়ছে হেমন্তের বাতাস…
পোড়া বাতাসের ঘ্রাণ উস্কে দিচ্ছে তোমার উদগ্র ক্ষুধা,
আর তুমি খাচ্ছো অবলীলায় জীবনকেই খাচ্ছো খুব।

তুমি নিশ্চয়ই মানুষ………..দেবতা হলে
জিউসের মতো এমালথিয়ার দুধ খেতে পারতে।”

কিংবা

“খানিক আলাপচারিতায় যাকে তুমি জলের জাতক ভেবে নাও,
সে আসলে গোপনে পোষে আগুন;
আপন কক্ষপথে ঘুরেফিরে মূলত নিজেকে পোড়ায়।
অথচ ভেবেছিলে তুমি
বোধের সাগরে তার উঠেনা কখনো যাতনার ঢেউ।”

নীহার লিখন ব্রহ্মপুত্র শিরোনামের সিরিজ কবিতা লিখে চলেছেন অনেক দিন হলো। ওগুলোর কোনো কোনোটি খুবই ভালো লাগে। যেমন-  

“…

ধূমায়িত পৃথিবীতে, আমাদের বুকে 
বুঝিনা কখন,গোধূলি জড়াতে চায় ভোরের মায়ায়;
বর্ণান্ধ জীবনের আবছা ছায়ায়।

কোনো প্রত্যাশায় বাঁধা যায়না। তাই বাঁধিনাতো ঘর
তুমিও বোধহয় না, গড়িয়ে যাচ্ছো জল, প্রাণের ভিতর।

প্রতিজ্ঞাকেও বলিনা, খুব অপেক্ষায় থেকো
ডুবে গেলে, টেনে তুলে রেখো”

এভাবেই প্রতিদিনই কারও না কারও কবিতা পড়া হয়ে যাচ্ছে ফেইসবুকে। মন্দ কী!