ক্যাটেগরিঃ মুক্তমঞ্চ

 

“আমার লাইন হইয়্যা যায় আঁকাবাঁকা, ভালো না হাতের লেখা”— গানটি এখন কোথাও আর বাজে না নিশ্চয়ই। জানা কথা, কলমে লেখার সময় অনেকেরই লাইন বাঁকা হয়। শৈশবে স্যার বলতেন, “লেখার লাইন সোজা না হইলে তো শাইন করতে পারবা না।” স্যারের ভবিষ্যদ্বাণী দারুণ ফলেছে। যা হোক, লাইনের কিন্তু আবার অনেক রকম-সকম। লাইন, বে-লাইন ডিফাইন করার কর্তৃপক্ষ আছে। অনেকেরই যৌবনের ফাইন ট্রেনখানি সঠিক লাইন থেকে কিছুটা বাঁয়ে-ডাইনে সরেটরে গেলেও লাইনে ঠিকই চলে আসে ভারী বয়সের কালে। তবে যে যা-ই বলুন, লাইন তার নিজস্ব আইন ঠিকই মেনে চলে। তাই বলে পুলিশ লাইনে পুলিশ সর্বদা লাইন ধরে থাকবেন এমনটি ধারণা করা যেমন ঠিক নয়, তেমনি ‘ডেডলাইন’ কখনও জীবিত ছিলো মনে করাও অযৌক্তিক। আর ভোটের জন্য না হলেও, টিকিটের জন্য লাইনে দাঁড়ানোর অভিজ্ঞতা আমাদের সচরাচর হয়েই থাকে। এছাড়া কবিতার লাইন, পানির কিংবা গ্যাসের-বিদ্যুতের লাইনের সাথে পরিচয়ও নতুন নয়।

.

‘লাইন’ শব্দের এসব মানে কে না জানে? কিন্তু তবুও ওই ছোটবেলায়  একবার বড়োদের আলোচনায় কান পেতে ‘লাইন’ শব্দটি শুনে কিছুতেই নিজের জানা মানেগুলোর সাথে খাপ খাওয়ানো গেলো না। মনে আছে, গ্রামের ওই ভাইসকল সদ্য দেখা এক বাংলা ছায়াছবি নিয়ে কথা বলছিলেন। নায়ক নাকি তার পাশের বাড়ির মেয়ের সাথে ‘লাইন’ করেছে। প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়ুয়া উৎসুক বালক তখন সেই লাইনের অর্থ ‘বুঝিতে ব্যাকুল’। আলাপে মশগুল ভাইসকলের কাছে অর্থ জানতে চাইলে একজন খেঁকিয়ে উঠলেন, “এ্যাঁ…!! নাক টিপলে অহনও দুধ বাইরইবো, আর হে আইছে লাইন বুঝতে! গেলি!” সেদিনের বিতাড়িত উৎসুক বালক যদিও বড়ো হয়ে পরে লাইনের মানে উদ্ধার করতে সক্ষম হয়েছিলো, কিন্তু নাক টিপে দুধ বের করা কোনোদিনও সম্ভব হয়নি। এখন সে বোঝে, নাক দিয়ে পানি, এবং বড়োজোর রক্ত বেরুতে পারে। দুধ কিছুতেই নয়। দুধ বের হওয়ার জন্য আল্লাহ্‌ পাক জীবের শরীরে আরও সুন্দর ব্যবস্থা করে রেখেছেন।

.

দুধ। ভূমিষ্ঠ শিশুর প্রথম খাবার। তবু বড়ো হয়ে সবাই দুধপ্রিয় হয় না। দুগ্ধজাত বিভিন্ন খাবারে প্রচণ্ড আগ্রহ থাকা স্বত্ত্বেও দুধ কখনও প্রিয় তালিকায় উঠে আসেনি। মাকে দেখতাম দুধ-ভাত খেতে। দুধের সাথে চিনি মেশালেও লবণ একটু না দিলে নাকি সুস্বাদু হয় না। এক সময় দেশের প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ছাত্রছাত্রীদেরকে বিলেতি দুধ খাওয়ানো হতো। আহ! সে এক অপূর্ব স্বাদের অভিজ্ঞতা। কিন্তু মুখস্ত গুঁড়ো দুধ উচ্চারণ উৎপাদনের অন্তরায়— এই সত্য শৈশবে মুখে-দুধে শিখে নিয়েছিলাম। বর্তমানে তরল দুধে অনাসক্তি থাকলেও গুঁড়ো দুধ খুবই প্রিয়। তবু “সুস্থ থাকতে হলে নিয়মিত দুধ খান।”—এই উপদেশের মান রক্ষার্থে মাঝে মাঝে দুয়েক ঢোঁক চলে আরকি।

.

সম্ভবত দুধই একমাত্র প্রাণিজ পানীয়, স্বর্গে যার প্রাচুর্য আছে বলে ধর্মগ্রন্থে বলা হয়েছে। ‘মান্না’ নামক যে স্বর্গীয় খাবার বনি ইসরাইলিদেরকে মুছা (আঃ)-এর সময় খাওয়ানো হয়েছিলো বলে জানা যায় তাও নাকি দুগ্ধজাত। দুধের সাথে কলা খুব যায়। দুধ দিয়ে বাঙালির মতো এতো বৈচিত্র্যময় খাবার আর কেউ পারে কিনা বানাতে সন্দেহ। এক রসগোল্লার কাছেই তো দুনিয়ার তাবৎ দুগ্ধজাত খাবার পরাস্ত হতে বাধ্য। এটি এই মহাদেশেই প্রথম তৈরি করা হয়। স্তন্যপায়ী না হয়েও অনেক প্রাণী দুধের ভক্ত। এদের মধ্যে সাপ অন্যতম।  দুধ কলা দিয়ে কালসাপ পোষা যায়। সাপের বিষ মহামূল্যবান। কিন্তু সাপ পালনে কোনো প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা না থাকায় এটির বাণিজ্যিক ভিত মোটেও আশাব্যঞ্জক নয়। আবার ব্যক্তিগত উদ্যোগে ঝুঁকি নিয়ে অনেকেই সাপ পালন করছেন, কেউ কেউ পালিত সাপের কামড়ে মারাও পড়েছেন। তবে ‘বিষধর’ বৈশিষ্ট্য যে শুধু ইতর প্রাণীর ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য তা কিন্তু নয়। মানুষও সর্পরূপ বিষাক্ত হয়ে থাকে। আর দুধ-কলা দিয়ে জনগণও নিয়মিত সাপ পোষে থাকে বৈকি। হ্যাঁ, দুধ-কলা দিয়ে, জনগণও কালসাপ পোষে। মনুষ্য সর্প সর্বদা ছদ্মবেশী হয়। অবশ্য দু-চার-দশটা সাপ কোনো সমস্যা নয়। কিন্তু এরা খুব দ্রুত বংশবিস্তার করে। এদের আবার আত্মীয়-স্বজন আছে। বিপদে-আপদে নিজেদেরকে প্রোটেকশন দেওয়ার ব্যবস্থা আছে। আহারে! কী গরল করিলা সঞ্চয়, দ্বি-পদ শ্বাপদ!

.

সাপ নিয়ে আর আতঙ্কের কথা নয়। আসুন একখান ‘টুনা-টুনি’ গল্প শুনিঃ

টুনির খুব দুধ পছন্দ নিজেদের গাইয়ের দুধ তাই আর বেচা হয় না টুনার নিয়ে অবশ্য টুনার কোনো খেদ নেই এমন তো নয় যে, বউটা খুব খুব খেয়ে পরে বেঁচে আছে দৈনিক ওই তিন কেজি দুধই তো টুনার নিজেরই বরং অপচয়ের স্বভাব রোজ এত্তোগুলো পানসুপারিতামাক পাতা না হলে তার চলেই না বহুদিন থেকেই সেইরকম পানখোর টুনির পছন্দ নয় মাঝে মাঝেই নিয়ে দুজনের মাঝে ঠোকাঠুকি হয় সেদিনও টুনাকে বলে বসলো টুনি, “পান খাওয়া ব্যাটাছেলে আমার দুই চক্ষের বিষ এতো পাতা খাইতে পারে একটা মানুষ? ছাগল একটা

.
পান খাওয়া নিয়ে টুনি কতো কথাই তো বলেছে এতোগুলো বছরেকিন্তু ওসব গায়ে মাখেনি টুনা আজ মাখলো মন চাইলো রক্তারক্তি কাণ্ড ঘটিয়ে দিতে কিন্তু না টুনির গায়ে কোনোদিন হাত তোলেনি সে গায়ের রঙটা কুচকুচে হলেও মেয়েটার মনটা সাদাদুধের মতো চুপ করে শুনে গেলো টুনির কথাগুলো তারপর ঠাণ্ডা মাথায় টুনিকে বললো, ‘পাতা খাই বইলা তুমি আমারে ছাগল কইলা, টুনি? তুমি যে এতো দুধ খাও, আমি কি তোমারে কাল নাগিনী কইছি কোনোদিন?”

.

মোরাল অব দ্য স্টোরিঃ

১। নিজে আকাম করিয়া আরেক জনের আকামে বাঁহাত ঢুকাইও না।

২। অতিরিক্ত কোনো কিছুই ভালো নহে।