ক্যাটেগরিঃ সালতামামি

সতেরোর সকাল কুয়াশার না হোক। একটা নির্বিঘ্ন আলোক ধারায় ভাসুক বাংলাদেশ। বছরটা অনেক ভালো যাক। অনেক শান্তি-সমৃদ্ধির চাষ হোক। বুকভরা শুভ কামনা। আমরা নিতান্ত পিছিয়ে নেই। দূরবর্তী দূর্গম গ্রামগুলোও এখন আগের বেহাল দশা থেকে ওঠে এসেছে। নগরের ভিড়, জীবনের গতি আর আগামির চ্যালেঞ্জ নিয়ে এই ক্রমশ উষ্ণ বায়ুমণ্ডলের দুনিয়ায় এই বিখ্যাত ব-দ্বীপটাতে উন্নয়নের রূপরেখা আরও রঙিন হোক। অনেকটা পথ পেরিয়েছে বাংলাদেশ। বিভিন্ন উন্নয়ন সূচকে আমাদের অবস্থান সম্মানজনক হয়েছে। ২০১৬-তে দেশটি যতোখানি দৌড়েছে, তারও চেয়ে আরও বেশি অগ্রগামী নিশ্চয়ই হবে ২০১৭-তে।

image-8

বৈশ্বিক জলবায়ুতে পরিবর্তন অব্যাহত আছে। এক বছরে এই গ্রহে গ্রিনহাউস গ্যাসের পরিমাণ বেড়েছে আরও কয়েক শতাংশ। পৃথিবীময় সংঘাত আরও তুমুল হয়েছে। দীর্ঘতর হয়েছে এসব সংঘাতে মৃত আর বাস্তুবিহীন মানুষের তালিকা। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সাথে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে অনিশ্চয়তা। বেকারত্ব কমেনি, কমেনি সন্ত্রাস, জঙ্গিবাদ, বিচার বহির্ভূত হত্যা। একদিকে মানবাধিকার সংস্থাগুলো প্রতিবাদ জানিয়ে আসছে, অন্যদিকে আরও আরও নির্বিচার হত্যা, আরও আরও অধিকার বঞ্চনার ইতিহাস জমা হয়েছে ২০১৬-তে। দেশে দেশে আরও অস্ত্র মজুদ করেছে সরকারগুলো।

.

কোরিয়ার পারমাণু পরীক্ষার ঘোষণা বিশ্বময় টেনশন বাড়িয়ে দিয়েছিলো বিদায়ী বছরটির শুরুতেই। দেশ হতে দেশ-দেশান্তরে অস্থিরতা সংক্রমিত হয়েছে। সাগরের অধিকার নিয়ে ফিলিপাইনের সাথে চীনের ঝামেলা, কাশ্মীরকে কেন্দ্র করে পাকিস্তান-ভারত উত্তেজনা ছিলো। সুচি’র দল ক্ষমতায় গেলো; থেইন সেইন এসে মেইন শান্তি মেইনটেইন-এ আত্মনিয়োগ করলেন মিয়ানমারে। রোহিঙ্গা নিধন চরম আকার ধারণ করলো,  শান্তির দূত ঘুমিয়ে থাকলো। সিরিয়ায় যুদ্ধবিরতির নিকুচি করে ফের তাণ্ডবে বিদ্রোহী পক্ষ-সরকার পক্ষ। ফলে আরও আরও ধ্বংস-মৃত্যু শুরু। এক সময়ের আলেপ্পোর বুকে দাঁড়িয়ে থাকা সুরম্য অট্টালিকা, প্রার্থনাগৃহ, পর্যটনকেন্দ্রগুলো বিরান এখন। ওদিকে মার্কিন মুলুকে চূড়ান্ত অসভ্য এক ধনকুবের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে জয়ী হয়েছে। পৃথিবী স্তম্ভিত হয়েছে। দ্য নিউ ইয়র্কারের সম্পাদক চেঁচিয়ে ওঠলেন, “ট্রাম্পের জয় আমেরিকা প্রজাতন্ত্রের জন্য একটি ট্রাজেডি। দেশের সংবিধানের জন্য ট্রাজেডি। যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাস এবং উদার গণতন্ত্রের জন্য একটি গভীর ক্ষত।” আর এই একই ব্যক্তি ট্রাম্প টাইম ম্যাগাজিনের বিচারে ‘পারসন অব দ্য ইয়ার’ তথা বছরের সেরা ব্যক্তিত্বর অধিকারি হয়েছেন। 

.

বাংলাদেশও গত বছরে বিভিন্ন ক্ষত তৈরি হয়েছে। সরকার তার সাধ্যমতো চেষ্টা করেছে ক্ষত নিরাময়ে। চেষ্টা করেছে সফল হওয়ার, হয়েছে। ব্যর্থ হবার কোনো চেষ্টা ছিলো না, হয়েছে। চেষ্টা চলছে আরও সাফল্যের। বছরের শুরুতেই, অর্থাৎ ফেব্রুয়ারিতে পঞ্চগরে পুরোহিত যগেশ্বর রায়কে গলা কেটে হত্যা করা হয়। এরপর সেই ধারাবাহিকতায় খুন হন আরও আরও লেখক-ব্লগার-শিক্ষক-অধিকারকর্মী। হত্যার শিকার হন বান্দরবনে বৌদ্ধ ভিক্ষু, নাটোরে খ্রিস্টান ব্যবসায়ী, ঝিনাইদহে হিন্দু পুরোহিত। হাসিনার সরকার এলে দেশে সংখ্যালঘু সম্প্রদায় আরও নিরাপদ থাকবে বলে যারা ভেবেছিলেন, বিদায়ী এই বছরের এসব ঘটনা তাদেরকে চরমভাবে হতাশ করেছে।

.

২০১৬ জুলাইয়ের প্রথম রাতে ঘটে যায় স্মরণকালের এক ভয়াবহ জঙ্গি হামলার ঘটনা। হোলি আর্টিজনে সেদিন রাতে ঘটে যাওয়া ঘটনাটি জঙ্গি সম্পর্কে সরকার এবং জনগণের ধারণাকে ভুল প্রমাণ করে চোখ খুলে দেয়। সে রাতের ঘটনায় পুলিশের সাহসী ভূমিকা আরও অনেক সম্ভাব্য হত্যা প্রতিরোধ করেছে। এরপর শোলাকিয়ায় জঙ্গিদের হামলা সাফল্যের সাথে মোকাবেলা করেছে সরকার। পুলিশের সাফল্য সহ্য না করতে পেরে কুখবর ফেরিওয়ালারা সে সময়ে হামলায় নিহত একজন পুলিশ অফিসারের নৈতিক স্থূলতা ও পেশাগত অনিয়ম নিয়ে তৈরি খবর ও ভিডিও প্রচার করতে থাকে, যা এক ধরণের রুচিবিকৃতি বৈ কিছু নয়। আরও অনেক চাঞ্চল্যকর হত্যার ঘটনা ঘটে গেছে এই একটি বছরে। মনে পড়ছে তনুর কথা, আফসানার কথা, মিতুর কথা।

.

এছাড়াও বেশ কয়েকজন কীর্তিমান মানুষ আমাদেরকে ছেড়ে চলে গেছেন এ বছর। কবি রফিক আজাদ, কবি শহীদ কাদরী, কবি সৈয়দ শামসুল হক, কবি মাহবুবুল হক শাকিল, শিক্ষাবিদ মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান মিয়া, সাংবাদিক নূরজাহান বেগম, অভিনেত্রী দিতিসহ আরও অনেকেই আর নেই আমাদের মাঝে। তাঁদের জন্য শ্রদ্ধা। তাঁদের অবদান অবিস্মরণীয়। ভালোবাসার যে জালে প্রাণে প্রাণে বেঁধেছেন তাঁরা আমাদেরকে, তার তুলনা নেই।

.

জাল ষড়যন্ত্রেরও হয়। সেই জালে জালিয়াতি, কেলেঙ্কারির বীজ থাকে। এসবের বাড় বাড়ে। আর এসব তো এখন কোনো দেশেই কমবেশি না ঘটে কোনো বছর যায় না। এদেশেও অনেক ঘটেছে। তবে সাম্প্রতিক সময়ের হল-মার্ক, বিসমিল্লাহ গ্রুপ কর্তৃক অর্থ লুট; বেসিক ব্যাংক, সোনালী ব্যাংক কেলেঙ্কারি কিংবা এটিএম কার্ড জালিয়াতির ঘটনাগুলোকে বিপুল ব্যাবধানে হারিয়ে দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ লুটের ঘটনা। ২০১৬-র ইতিহাসে ওই আটশো দশ কোটি এক ভয়ানক সংখ্যা বটে।

bangladeshi-flag-image

বিশ্বাস করি, দেশের বর্তমান নেতৃত্ব বাংলাদেশের অপরাপর যেকোনো রাজনৈতিক দলের নেতৃত্বের চেয়ে অভিজ্ঞ, দক্ষ। বিভিন্ন বিপর্যয়ে দেশের পরিস্থিতিকে আরও খারাপ হওয়ার হাত থেকে রক্ষা করে সরকার তার দক্ষতার প্রমাণ রেখেছে ইতোমধ্যেই। স্বভাবতই সরকারের নৈতিক ভিত দুর্বল হলে তার ঘাড়ে সুবিধাবাদিরা আগাছা হয়ে বসে। আর তখন তাকে উপড়ে ফেলতে দ্বিধা হয়। প্রশাসনকে দলের পক্ষে কাজ করনোর প্রয়োজনের যে তীব্রতা থাকে সেটি প্রজাতন্ত্রের কর্মকর্তা, কর্মচারিদের দায়িত্বশীল হতে বাঁধা দেয়। এ ধরনের বাঁধা-বিপত্তি ২০১৬-তে নাসিরনগর ট্রাজিডিতে রাজনৈতিক হীন স্বার্থপ্রেমিদের ষড়যন্ত্র সফল করেছে। সরকার বিব্রত হয়েছে। সুতরাং কলুষ মোটেই কমছে না। দুর্নীতি দুর্বার হয়েছে আরও।

.

তারপরও আগামির জন্য আশা মরছে না। কয়েকদিন আগে ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে গিয়ে এই আশাটা আরও দৃঢ় হয়েছে। ওখানে সেবা নিতে গিয়ে দালাল-দূষণ-অনিয়মুক্ত, পরিচ্ছন্ন পরিবেশ দেখে মুগ্ধতা আর বিস্ময়ের সীমা ছাড়িয়ে গেলো। শ্রদ্ধেয় সাংবাদিক নিয়ামুল করিম সজলের এক রিপোর্ট থেকে জানা গেলো, সেবার নিম্নমান আর অনিয়ম-দুর্নীতিতে জর্জরিত হসপিটালটিতে এই অভূতপূর্ব ইতিবাচক পরিবর্তনের নেপথ্যে যিনি নিরলস কাজ করে যাচ্ছেন তার নাম বিগ্রেডিয়ার জেনারেল নাসির উদ্দিন আহম্মদ। বছরখানেক আগে এখানে পরিচালক হিসেবে যোগ দিয়েছেন তিনি। হাসপাতালের উন্নত সেবা আর পরিচ্ছন্ন পরিবেশ দেখে দেশের ব্যাপারে আশাবাদী হওয়ার কী আছে তা স্পষ্ট করতেই এখানে উক্ত রিপোর্টের কিছু অংশের উদ্ধৃতি দিচ্ছিঃ

.

“পরিচালকের দায়িত্ব নিয়ে মাত্র এক বছরে ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের চেহারা পাল্টে দিয়েছেন ব্রিগেডিয়ার জেনারেল নাছির উদ্দিন আহম্মদ। হাসপাতালের এ ইতিবাচক পরিবর্তনের কথা সেবাগ্রহীতাদের মুখে মুখে। কিন্তু বিষয়টি ভালোভাবে নিতে পারছে না দীর্ঘদিন ধরে হাসপাতাল থেকে সুবিধাভোগী বিভিন্ন গোষ্ঠী। বেশ কিছুদিন ধরেই ওই ‘অপশক্তি’ হাসপাতালের পরিচালকের বিরুদ্ধে নানা ষড়যন্ত্রে লিপ্ত। এমনকি পরিচালককে বদলি করাতে কোটি টাকার ফান্ড সংগ্রহের খবরও চাউর হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে। বর্তমান প্রেক্ষাপট সামনে রেখে ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল নাছির উদ্দিন আহম্মদ সম্প্রতি ফেসবুকে একটি স্ট্যাটাস দিয়েছেন।

সেখানে তিনি লিখেছেন, ‘প্রিয় ময়মনসিংহবাসী আসসালামু আলাইকুম। আপনাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা ও অভিনন্দন। আপনাদের অকুণ্ঠ সহযোগিতায় আমরা ধীরে ধীরে ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালকে অপরাধীচক্র থেকে মুক্ত করে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে নিয়ে এসেছি। হাসপাতালে এখন সকল সেবা প্রদান নিশ্চিত করার চেষ্টা করা হচ্ছে। উন্নয়নের স্বার্থে হাসপাতাল থেকে দালাল, এমআর বিতাড়িত করা হয়েছে। সকল ওষুধ দেওয়ার চেষ্টা করে যাচ্ছি। কোনো ইনভেস্টিগেশন যেন বাইরে না করতে হয় তার ব্যবস্থা নিয়েছি। দুর্নীতিপরায়ণ কর্মচারীদের বদলি ও শাস্তি দিচ্ছি। সব পর্যায়ে জবাবদিহি নিশ্চিত করেছি। এগুলো যদি কোনো পরিচালকের অপরাধ হয়, তাহলে আমার আর কিছু বলার নেই।

হাসপাতালের বর্তমান সুষ্ঠু ব্যবস্থা ও উন্নতির কারণে একটি মহল যারা নিজেদের ক্ষতিগ্রস্ত মনে করছে তারা, কিছু ফার্মেসির মালিক, বিতাড়িত দালাল, কমিশনভোগী চক্র, কিছু ক্লিনিক, ডায়াগনস্টিক সেন্টার, কিছু মেডিক্যাল রিপ্রেজেন্টেটিভ আজ গভীর ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়ে হাসপাতালে নৈরাজ্যকর অবস্থা তৈরি ও পরিচালককে বদলি করতে মরিয়া হয়ে উঠেছে। জনশ্রুতি রয়েছে, পরিচালককে বদলি করার জন্য তারা কোটি টাকার ফান্ড সংগ্রহ করছে। এতে কিছু নীতিহীন রাঘববোয়ালদেরও বিশেষ সমর্থন রয়েছে। আমি খোলা মন নিয়ে আমার কথাগুলো আপনাদের জানালাম। এই শহর আপনাদের, এই হাসপাতাল আপনাদের। আপনারা যাকে পছন্দ তাকে পরিচালক হিসেবে আনতে পারেন। আমি আমার ওপর অর্পিত দায়িত্ব পালনে যথাসম্ভব চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। আমি যেখানেই থাকব আপনাদের জন্য সকল শুভ ও কল্যাণের জন্য আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করব। আমিন।’ (সূত্রঃ http://www.kalerkantho.com/print-edition/news/2016/12/22/443699)”

.

হাসপাতাল আর দেশের মধ্যে অমিলের চেয়ে মিল বেশি। আর সেকারণেই নতুন বছরে দেশ থেকে দুর্নীতি আর অনিয়ম দূর করে, দালালমুক্ত করে আইনের শাসন এবং মানুষের নিরাপদ জীবন নিশ্চিত করা সরকারের পক্ষে মোটেই অসম্ভব নয় বলে মনে করি। তবে সবার আগে সর্ষেতে যে ভূত, তাকে দূর করার কাজটাকে জরুরি ভাবতে পারার যোগ্যতা থাকা চাই।

২০১৭ সবার জন্য কল্যাণ বয়ে আনুক। হ্যাপি নিউ ইয়ার!

ছবিঃ গুগল থেকে।