ক্যাটেগরিঃ দিনলিপি

এসএসসির পর ও এলো আমাদের ক্লাসে। দু’মাসের জন্য। এখন যেমন ওরকম দু’মাস প্রায় শেষ হয়ে এলো। ক’দিন পরেই তো রেজাল্ট বেরুচ্ছে। দু’বছর আগে এরকম সময়েই আমাদের দেখা হতো। সপ্তাহে তিন দিন। চোখজোড়া মায়াভরা, খুব অনুসন্ধিৎসু। এমনিতে ভীষণ চুপচাপ। তবে শুরুর দিকের স্বাভাবিক জড়তা কাটিয়ে উঠতে সময় লাগেনি খুব। এরপর ও যখন সবার সামনে দাঁড়িয়ে বলতে থাকতো, তখন ওর অনর্গল ইংরেজি সবার সাথে সাথে আমাকেও তাক লাগিয়ে দিতো; প্রতিবারই। ওর বাবা অবশ্য আগেই বলেছিলেন মেয়েটা ইংরেজিতে খারাপ নয়। খারাপ সে কোনো  সাবজেক্টেই ছিলো না।

15423753_10207551746662826_1250987039_n

.

যেমনটি আশা ছিলো, তেমন ভালো রেজাল্ট নিয়েই উচ্চ মাধ্যমিকে ভর্তি হয়েছিলো। মুমিনুন্নিসায়। এরপর ম্যাসেঞ্জারে যোগাযোগ ছিলো। কোনো কোনো দিন রাস্তায় দেখা হতো। আবার এমনও হয়েছে, অনেকদিন কোনো দেখা নেই, কথা নেই। আমরা পরস্পরের প্রিয় হয়ে গিয়েছিলাম অনেক আগেই। তবে একবার ঘটলো বিপত্তি। ওর নামটা চট করে মনে পড়ছিলো না। যা  আশঙ্কা করেছিলাম, তা-ই হলো। সেদিনই ইনবক্সে অভিমান–

.

OMG!!!! স্যার, আপনি আমার নাম টা পর্যন্ত ভুলে গেছেন?? জারিন কে জিজ্ঞেস করলেন???

 Now I believe the proverb that….””Out of Sight, Out of Mind””
-I knew u wud ask me ….
Asking u about this is not so wrong……what will u say?
-It’s love… I have no other name for it. I m a little hippy, may be, with some bad things but once I enter someone’s heart, I keep living despite all that are not good. Likewise, Once i said how much it is to be with u and how much u mean. So no worries, my DEAR.
If it’s true, that’s my pleasure…… but after hearing this from Zarin, I was really shocked…I just can’t believe that u have forgotten me  …even my name……Anyway, It’s ok..

.

ওর ভালো লাগতো বৃষ্টি। ভালো লাগতো মেঘ। সন্ধ্যা। ওর লেখাতেও পাই, “বৃষ্টির দিনে ইচ্ছা থাকলেও না ভিজে ঘরে বসে বৃষ্টি দেখার চেয়ে দুঃখের বিষয় আর হতে পারে না।” “পড়ন্ত বিকেলে ছাদে দাঁড়িয়ে আকাশে মেঘের মাঝে আলোর লুকোচুরি খেলা দেখতে ভালোই লাগে।” ওর ভালো লাগতো নদের তীর, ঠাণ্ডা বাতাস, নৌকা ভ্রমণ। আমি সেবার বেশ কিছু কাকের আর ফুলের ছবি তুলেছিলাম ক্যামেরায়। এইসব ছবিটবি ওর ভালো লাগতো।

.    .

ওকে কখনও ফেইসবুকে নিজের ছবি পোস্ট করতে দেখিনি। তবে একবার আমার ক্যামেরায় ওর মুখখানা ধারণ করা গিয়েছিলো। অনেকদিন পর ওর ইনবক্সে ওই ছবিটি পাঠিয়েছিলাম। ওর সে কী আনন্দ! ক্লাসে ছোটখাটো প্রতিযোগিতা হতো। উপস্থিত বক্তৃতার। বরাবরই প্রথম হয়েছে ও। একটা চকলেট বার, ক্যান্ডি কিংবা ওরকম যৎসামান্য পুরস্কারগুলোও ওকে ভীষণ আপ্লুত করতো। খুব অল্পতেই এতো খুশি হতে পারার সামর্থ্য ক’জনের আছে আজকাল?

.D

 .

ওর ল্যাঙ্গুয়েজ স্কিল্‌স সার্টিফিকেটটাতে সামান্য ভুল ছিলো। ওর জন্য নতুন আরেকটি তৈরি করে রেখেছিলাম। ও নিতে এসেছিলো। গত ফেব্রুয়ারির শেষ সপ্তাহের কোনো একদিন সম্ভবত। সেদিন আমার তাড়া ছিলো। ওকে প্রাণবন্ত লাগছিলো। এইচএসসি পরিক্ষার প্রস্তুতি ভালো বলে জানালো।

.E

 .

মার্চ ২৫, ২০১৭। ওর শেষ স্ট্যাটাস। সে লিখলো–

 .

A

 .

এপ্রিলের আট তারিখেও এক্সাম ছিলো। ইংরেজি দ্বিতীয় পত্র। পরিক্ষা দিয়ে সেদিনের মতো বাড়ি ফিরেছিলো। পরদিন চলে গেছে না ফেরার দেশে। খুব কষ্টে নাকি ওই চারটে পরিক্ষা দিয়েছিলো সে। তবে কি সেদিনও, পরিক্ষার আগে আগে, অসহ্য যন্ত্রণা নিয়েই অমন হাসিমুখে শেষ দেখা করে গেলো? একটি বারও জানতে দেয়নি যে! তিন সপ্তাহ পেরিয়ে গেছে। আর এতোদিনে আমার সময় হলো জানবার।

.F

 .

ওর টাইমলাইনে ওকে পড়ি। বুঝতে চেষ্টা করি ওর কেমন লেগেছে শেষ দিনগুলো। কেবলই মনে হয়, কতো কিছু করার ছিলো, কতো কিছু বলার ছিলো।

. .

জিনানের লেখা পড়ে পড়ে ওর ভাবনাকে ছুঁতে চাই। আমি পারি না। আমার ভেতর যন্ত্রণা হয়। আমার চোখ ঝাপসা হয়ে আসে। রূপকথার রাজ্যের লালপরী আর নীলপরীর কাছে যেতে চেয়েছিলো। ও কি সব জেনে গিয়েছিলো আগেই? কেনো তবে বলেনি একবারও?

.K

 .

‘আমি ওর খোঁজ নেই না’-এরকম অভিযোগ ছিলো ওর। কিন্তু কখনও খুব অভিমানে দূরে সরে যায়নি। আমি জানি, ও জানে ওকে ভালবাসি। ওকে অনেকবার বলেছি, ‘আমাদের মেয়েটাকে তোমার মতো গড়ে দিও।’ ওর গল্প করেছি নিজের কন্যার কাছে। শেষ দেখার সময় বলে রেখেছিলাম ওর এইচএসসি পরিক্ষার পর ওদের দু’জনের দেখা হবে।

 .

.G

ভুলে ভুলে আমার কেবলই দেরি হয়ে যায়। আমি বলেছিলাম, ‘এমনকি যদি ভুলেও গিয়ে থাকো, মাঝে মাঝে জানতে দিও ভুলে গেছো।’ জিনান আমাকে বলেছিলো, কোনোদিন ভুলবে না।’ ভুললে চলবে কী করে? ভালবাসি বলতে পারার মানুষ খুব যে নেই আমার।