ক্যাটেগরিঃ দিনলিপি, ব্লগার উৎপল চক্রবর্তী স্মরণে

 

আগুনঝরা দিন। পথে পথে এমন ভীষণ রোদ— চশমাটা সাথে নেই। রিক্সাচালক ভাইয়ের শরীর থেকে ঘামের গন্ধ আসছে। নিজেও ঘামছি। কিন্তু নিজেরটা নিজের কাছে মোটেই উৎকট নয়। কে না জানে, মন্দ-গন্ধ নিজের হলে সেটা আপন হয়। আপন গন্ধ প্রিয় না হলেও চলে। সহনীয় তো। ডিওডোরেন্ট ফুরিয়েছে দুদিন হলো। মনে হলো, নিজের জন্য নয়, রিক্সার ড্রাইভারকে একটা ডিওডরেন্ট কিনে দিই। কিন্তু উদ্ভট মনে করে কেনা হয় না। অথচ কতো উদ্ভট কাণ্ডের সংঘটক হয়েছি কতোবার!

ঘ্রাণ সম্পর্কিত অনেক গল্প আছে। নিজেরই গল্প। সব বলা যাবে না। আমরা কেউই সব গল্প করি না। কেবল নির্বাচিত গল্পের খই দিয়ে আম-দুধ খাই ও খাওয়াই। একদিন এক ভাই তার এক কলিগের স্ত্রীর ঘ্রাণপ্রীতির গল্প করে প্রায় সবাইকে হাসালেন। সেই কলিগ লোকটিই তাকে নাকি বলেছেন যে, স্ত্রী তার আন্ডার আর্মের ঘ্রাণ খুব পছন্দ করেন। এই শুনে উপস্থিত সবাই ছিঃ ছিঃ করলো। কারও কারও বমি বমি ভাব। অথচ ব্যাপারটা অদ্ভুত কিছু নয়। ভালোবাসলে এমন হয়। আবার হতেই হবে, নয়তো সেখানে ভালোবাসা নেই—এমনও নয়। আমার সত্যি অদ্ভুত লাগলো, যখন দেখলাম ওই কথা শুনে নাক সিঁটকানো একজন ওখানেই তার বাইকের চাবি দিয়ে নিজের কান খুঁচিয়ে সেটা আবার শুঁকে নিলেন– একবার নয়, দুইবার।

শিশুর মলমূত্রের ঘ্রাণও নাকি মায়ের কাছে প্রিয় হয়ে ওঠে। বয়োবৃদ্ধ, অসুস্থ বাবার-মায়ের ভেজা বিছানা। তাঁদেরকে পরিচ্ছন্ন করে, চাদর বালিশ ধুয়ে ধুয়ে সন্তানেরও সয়ে যায় ঘ্রাণ; প্রিয় যদিও হয় না।

নিজ ভিন্ন অন্য ঘ্রাণকে প্রিয় হতে হলে সাধারণত তার উৎসকে সুস্থ হতে হয়। আমাদের ধূপকাঠি, চুয়িংগাম, আতর-গোলাপ-বডি স্প্রে-পারফিউমটিউমসহ ঘ্রাণের যতো আয়োজন তার অনেকটাই এজন্য যে, ঘ্রাণের গন্তব্যে উৎসটা আকর্ষণীয় হবে।

ঘ্রাণের টান যেমন থাকে, তেমনি তার ঋণও থাকে। প্রিয় মানুষদের ঘ্রাণ মনে থাকে। ঘ্রাণের টানে প্রিয় মুহূর্তকে খুব বেশি মনে পড়ে। ঘ্রাণ ছিলো বলে খুব মনে আছে জাঁক দেওয়া পাটের মৌসুম, চিনিগুঁড়ি ধানের ক্ষেত, নাড়াময় মাঠে শীতের শিরশির বিকেল, তুমুল বর্ষায়, বৃষ্টিতে পিছল পথের সোনারঙ। তিব্বত স্নো-এর ঘ্রাণে আমার মায়ের মুখ মনে পড়ে। স্কুলের হোস্টেলে বন্ধুর রুমে আড্ডার স্মৃতি খুব স্পষ্ট হয়ে আছে ঘ্রাণের জন্যই। ওই রুমের জানলার পাশে একটা লাইফবয় সাবান থাকতো। আমাদের চারপাশ সেই ঘ্রাণে ম-ম করতো। এখনও ওই সাবানের গন্ধে ঠিক ওই সময়টি চট করে চলে আসে চোখের সামনে।

সিগারেট বা চা যতোটা পানের, ঠিক ততোটাই ঘ্রাণের। বাসি সিগারেট, ছত্রাক পড়া চা স্বাদে স্বাভাবিক—এমনটি হবার কথা নয়। স্বপন স্যারের বাসায় অংক পড়তে যেতাম। পড়তে পড়তে ধূপের ঘ্রাণ এসে লাগতো আমাদের নাকে-মুখে। এখনও যখন যেখানেই ধূপের গন্ধ পাই, চট করে স্যারের চেহারা ভেসে উঠে। আমাদের মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের স্বপন স্যার। তাঁর সাথে দেখা নেই বহুকাল। চোখের আড়াল হলে মনের আড়াল হয় না কখনও কেউ, বুকে যদি ঘ্রাণের ইতিহাস থাকে।

ঘ্রাণে ঘ্রাণে শীত সকালে খানখান ঘুম… এলোচুল কুয়াশার বালিকা, বাসিমুখ আদরের সত্যমিথ্যা সব, রস কষ সিঙ্গারা বুলবুলি মস্তক, ভেজারাত জ্যোৎস্নার ধারা, ছাতিমের পাতার-ফুলের ফাঁক গলে নিঃশব্দ বৃষ্টির ফোঁটা, ছলকে ওঠা জলের জাতক ভুল করে খুব ভোরে আকাশ পথে অনেক দূর, নদের পরে ঢেউয়ে ঢেউয়ে কেউ কেউ সন্তর্পণে মৃত্তিকার মায়ায় কাতর, স্টেশনে রাত দুপুরে জং ধরা ‘যমুনা’র লোহার গতর—গন্তব্যের পথে পথে ঘ্রাণ। দূরে-কাছে জনে জনে ঘ্রাণের কতক সতেজ সবুজ আজ অনন্য বটে।

উৎপল দা চলে গেলেন। তিনি তাঁর লেখায় ঘ্রাণ রেখে গেছেন। আমি সেই ঘ্রাণ পাই। সেদিন ঢাকায় তাঁর সাথে প্রথম কথা হলো। কথা বলতে গিয়ে টের পেলাম, তিনিও মাত্রই সিগারেট খেয়ে এসেছেন। আমাদের আর দেখা হবে না। খুব বেশি দিনের পরিচয় নয়। আমরা কেউই কারও নই। অথচ আমি তাঁর ঘ্রাণ পাই প্রতিদিন। হ্যাঁ, এভাবেই ঘ্রাণে ঘ্রাণে আমাদের ভালোবাসা বেঁচে থাকে। বেঁচে থাক।