ক্যাটেগরিঃ মুক্তমঞ্চ

 

মৃত শিশু ভেসে আসে আমার দেশের সমুদ্রসীমায়। আমার বুক হুহু করে উঠে না। ওই যে শয়তান সুচি, যে কিনা বিশ্বের সবচেয়ে নন্দিত পুরস্কার বাগিয়েছে শান্তির লাগি, যখন রাষ্ট্রময় মৃত্যুর উৎসবে নেতৃত্ব দিয়ে চলে, আমার খারাপ লাগে না। ওদিকে মওত কা সওদাগর মোদি যখন ধর্মীয় সম্প্রীতির বাণী শোনায়, আমার হাসি পায় না। আবার যখন দেখি মহানবীর জন্মভূমির শাসককুল ইজরাইল, আমেরিকার সাথে হাতে হাত রেখে চলে যুগের পর যুগ ধরে, অবাক লাগে না। আর সেই পবিত্র মাটিতে জন্ম নেওয়া রাজপুত্তুররা যখন য়্যুরোপের বিলাসবহুল হোটেলে, প্রমোদ উদ্যানে ফুর্তি করে উড়ায় হাজিদের টাকা, আমার পিত্তি জ্বলে না।
.
আমার দেশের মানুষের নিরাপত্তা নেই। আইনের শাসন নেই। যে যেমন পারছে লুটে নিচ্ছে সম্পদ। একদিকে বিচার ছাড়াই গুলিতে মরছে মানুষ প্রতিদিন, অন্যদিকে সাজাপ্রাপ্ত ভয়ংকর অপরাধী রাষ্ট্রপতির ক্ষমা পেয়ে হাসিমুখে বেরিয়ে যাচ্ছে। সাগর-রুনি, মিতু-তনুসহ আরও কতো বহুল আলোচিত হত্যাকাণ্ডের বিচার হয়নি এদেশে। ঘুষ ছাড়া চাকরি নেই। চরম অবিবেচকের মতো এক শ্রেণীর মানুষের আয় বৃদ্ধি করে সমাজে অসম্ভব অর্থনৈতিক বৈষম্য সৃষ্টি করে, হকার আর রিক্সা সরিয়ে, হতদরিদ্রের পেটে লাথি মেরে সেতু আর বনসাই দিয়ে উন্নয়নের চিত্র আঁকা হচ্ছে। চামচা পুনর্বাসন প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে ত্যাগী, নিষ্ঠাবানদেরকে অপাংক্তেয় করে তৈরী হচ্ছে রাজনৈতিক রূপরেখা। এদিকে বানভাসী মানুষের দুর্দশার কূলকিনারা কোথায়, জানা নেই।
.
এসব ছাপিয়ে কোন্ দেশের কোন্ বঞ্চিতদল মরে ভেসে গেলো, তাতে বিগলিত হয়ে আমার দেশে কেনো আশ্রয় দেওয়া হচ্ছে না ভেবে, কিংবা কেনো কূটনৈতিকভাবে রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে না ইত্যাদি ভেবে সরকারের উপর রাগ করবো– এমন ভাবালুতার জায়গাটা কোথায়, ভাই?
.
স্বাধীন আরাকানের জন্য সোচ্চার হবার আগে নিজের দেশটাকে স্বাধীন দেখতে ইচ্ছে করে না? নতজানু পররাষ্ট্রনীতি একটু উঠে দাঁড়াক– ইচ্ছে করে না? প্রায় একশোটা ইসলামিক দল গড়ে উঠেছে এখানে, যাদের কেউ কাউকে দেখতে পারে না। ইসলামকে আদর্শ মেনে কী ভয়ানক বিদ্বেষ নিজেদের মধ্যে দিচ্ছে ছড়িয়ে। এই খণ্ড-বিখণ্ড মুসলিম সমাজের নেতৃস্থানীয়রা, যারা নিজেদের সঙ্কীর্ণতাকে জয় করে একত্রিত হতে পারে না, বরং সাধারণকে ইমানি চেতনার দোহাই দিয়ে বিপদগামি করে তোলে, পারস্পরিক বিদ্বেষ ছড়িয়ে একে অন্যের জন্য অনিরাপদ করে তোলে, এরা যখন আরেক দেশের মুসলিম জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তা নিয়ে আহাজারি করে, অন্যদেরকে তা করতে উৎসাহিত করে– এইটা আমার খুব ভালো লাগে। খুব ভালো লাগে।

.

আমি ঠিক দেখতে পাচ্ছি, মুসলিম নির্যাতিত হলে বিশ্ববিবেকের ঘুম ভাঙে না। সমাধানের নামে সবাই খালি ধানাই-পানাই করে। আর লাশের সারি দীর্ঘতর হয়। আগেও তো এমনই হয়েছে। নাগরিক হিসেবে আমি আমার অধিকার ও নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন। মুসলিম হিসেবে আমার ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন। আমি রোহিঙ্গা নির্যাতনের চিত্র দেখে বরং নিজের বিপদের কথা ভেবে, প্রজন্মের বিপদের কথা ভেবে অস্থির হই।

.

আজ যারা ওদেশে জুলুমের শিকার, তাদের জন্য নিরবে সমবেদনা জানাতে পারি বড়োজোর; হাউকাউ আমাকে মোটেই মানায় না। নিজেদেরই আরও অনেক সংকটের বিষয় আছে যেগুলোকে নিয়ে কথা বলা অহেতুক ভাবি। তাহলে রোহিঙ্গা নিয়ে ভাববার টাইম কই? এইতো, এইতো আমি বাস্তববাদি, বিশ্বমানের আশরাফুল মাখলুকাত।