ক্যাটেগরিঃ পাঠাগার

“জন্মান্ধ জঙ্গলে পৃথিবীটা ক্রমশ গোপন;

মূলত শেওলাগ্রন্থে লেখা

        আমাদের পিচ্ছিল জীবন”

হ্যাঁ, জীবন সত্যিই পিচ্ছিল। তারও চেয়ে পিচ্ছিল জীবনের পথ-ঘাট। জন্মালেই তো জীবন। ইরি ধানের পোকার দেশ লাগে? লাগে না। কিন্তু মানুষের জন্য লাগে, আর স্বাভাবিক বেঁচে থাকা, নানারঙ স্বপ্নের বুননধারণ, আকাঙ্ক্ষার আসা-যাওয়ায় যাপন উদযাপন মানুষের জীবনের স্বাভাবিক প্রয়োজন। মানুষ মানুষকে পণ্য করে, জীবিকা করে। মানুষ দানব হলে লজ্জা বুঝি বনবানুষের হয়; মানুষের নয়। আমাদের দয়াদ্র হৃদয়ে দাগ কেটে কেটে বিপন্ন মানুষের কষ্ট এক সময় আর ভাবনার অনুষঙ্গ হয় না। আলো ঝলমল বিশাল অট্টালিকার অদূ্রেই বস্তির অভূক্ত পরিবারগুলোও কেমন মানিয়ে যায়, যায় না?

 

“ফলিত মরুর বুকে প্রার্থিত সন্তোষ;

পরিপাটি হাসির দেয়ালে

বস্তুত রক্তিম শয়তান।”

শয়তান বাসা বাঁধে অন্তরে অন্তরে। শয়তান কেলি করে, আরও আরও শয়তান ভুরভুরিয়ে ওঠে। শয়তান জানে ভাণ, সম্মোহনি গান। প্রতিটি হত্যার উৎসব শয়তানের মন্ত্রণাজাত। ধর্ম কেবল বর্ম হয়ে, ফানুস হয়ে ঝুলে থাকে পণ্যসুলভ। আমরা কি দেখিনি শয়তান আর তার ধর্মের ট্যাগ লাগানো শিরস্ত্রাণ? দেখিনি কি কী উল্লাসে মানুষ ছিনিয়ে নিয়েছে শিশু আর মায়েদের বাবাদের ভাই-বোনদের প্রাণ! 

“মানুষ দেখছে লাশ; দূরে শিশুটিও;

নাফ নদী উগরে দিয়েছে তাকে;

স্ফীত অভিমান শরীরে ফুলছে ক্রমাগত

সদ্যমৃত শরীরের বেলুন-বিস্তার”

 

কী যেনো ছিলো না এদের। কী যেনো থাকবার কথা নেই। কিছুটা ‘আহা…আহা’র পর কেমন বেমালুম ভুলে যাচ্ছে সবাই। আর কতো মনে রাখা যায়। এত কার দায়? আমাদেরও কি নেই আর কাজ কোনও? ওরা প্যারিসের, আমেরিকার, ইউরোপের শিশু নয়; ওরা রোহিঙ্গাশিশু। সমব্যদনাকেও নিয়মমাফিক অভিজাত হতে হয়, বিনোদন যেমন হয়। রোহিঙ্গা মায়ের কান্না, আহাজারি, মৃতদের রক্তের স্রোত কেমন স্তিমিত দেখুন, এই ক’দিনেই! হবারই তো ছিলো। আমাদের স্বস্তি এসেছে। কারণ-

“মানবতা মাতৃত্ব চেয়েছে

জঠর দিয়েছে বাংলাদেশ”

হ্যাঁ, দরিদ্র সব উন্নত দেশগুলোর নিকুচি করে বাংলাদেশই পেরেছে এই কোনও রকমে জীবন বাঁচিয়ে আসা দশ লাখ রোহিঙ্গাকে ঠাঁই দিতে। আমাদের নিজেদের সংকট কম নেই। তবু আমরাই, এবং আমরাই পেরেছি। কিন্তু আমরা তো দেখেছি-

“অবগত সত্যের বাইরে

চাড়াল চন্দ্রিমা ঢাকে

      আমাদের যতটা মুখোশ

সেখানে মানবপ্রেম

উদ্বৃত্ত সম্পদে

আবাসিক ঘরের উঠোন;

কাড়ি কাড়ি ভালোবাসা,

       উপভোগ্য টাকার উন্মেষ;

বহুতল বাণিজ্যে চূড়ান্ত ওঠবস

ফণা ও আগুন সন্নাসীর।”

 

নৃশংস ওই রাজার লোকেরা অনেকের সাথে সুর মিলিয়েছে। এই উদার আশ্রয়দানকেও তারা কটাক্ষ করতে ছাড়েনি। কিন্তু তারা কি জানে বাংলাদেশ কতোকিছু পারে? আমরা আশ্রয় দিতে জানি। আমরা ভালোবাসতে জানি। নিজেদের সংকট নিযুত কিংবা কোটি হোক, আমরা তো পেরেছি। তবুও আশঙ্কা নিঃশেষ– এমন ভাবনার স্থান কই? আমাদের ঐকান্তিক চেষ্টার পরও আরও কিছু থাকে না কি? আমরা তো জানি ঠিকই

“কখনও বোতলবন্দী জলের কোটরে

সাঁতারের ইতিহাস নেই।” 

 

কিন্তু আমরা কতোটুকু পারি? যারা ব্যবসা বুঝে, তারা ব্যবসা খুঁজে। পুঁজিবাদের খাই ধেই ধেই করে আরাকানে নামে সন্তোষে। আর এদিকে বিপন্ন মানুষের তরে দাতাদের, সুধীদের আগ্রহে ভাঁটা। সঙ্কট ঘনীভূত হচ্ছে। দশ লক্ষ মানুষের জন্য প্রতিমাসে পঁচিশ মিলিয়ন ডলার খরচ। ওয়ার্ল্ড ফুড প্রোগ্রামের পরিচালক ডেবিড বিজলি নিজেই বলেছেন, দাতারা হাত গুটিয়ে নিচ্ছেন। এদিকে বর্ষা সমাগত। আছে পাহাড় ধ্বসের ঝুঁকি। আছে আরও নানাবিধ সঙ্কটের আশঙ্কা। যারা ভাবছি, সঙ্কট ঘুচে গেছে, তারা ভাবতালুতায় আছি। হয়তো এ মানুষগুলোকে রিলোকেট করা হবে। তার মানেই সব হয়ে গেলো, তা তো নয়। আমাদের অনেকের উদ্বেগের ফেকাল্টিতে ঠাঁই নাই যে টেনশনের, সে টেনশনকে ঘাঁই দিয়ে আবারও সামনে এনেছেন কাজী নাসির মামুন।

 

‘রোহিঙ্গাপুস্তকে আত্মহত্যা লেখা নেই’ কাব্যগ্রন্থে শব্দের ঝঙ্কারে ফুটিয়েছেন নৃশংসতার ইতিহাস, বিপন্ন মানুষের কাতর চাহনি। কবি তার নিজস্ব দায় থেকে লিখেছেন। এই কাব্যগ্রন্থের শব্দের ভাঁজে ভাঁজে রক্তের দাগ, পাতায় পাতায় বঞ্চিত, বিতাড়িত নিরীহ মানুষের হাহাকার। বেমালুম ভুলে যাওয়া এতো এতো মানুষের আর্তনাদের কথা কবির বলিষ্ঠ উচ্চারণে জ্বলজ্বল। বইমেলায়। বহেরাতলায়। ঋজুপ্রকাশের স্টলে।

 

পদ্মাসেতু অনিশ্চয়তায় পড়েছিলো, হবে কি হবে না। হতে যাচ্ছে, যাচ্ছে না? মানে যা বলতে চাইছি তা হলো, এই কাব্য নিয়ে সেরকম কোনো আলোচনা, উচ্ছ্বাস হয়তো মহান বোদ্ধামহলে হবে না এখনই। আজ অনেকেই ভ্রু কুঁচকাবেন, এটিও ঠিক কথার কথা নয়। তবে মন বলছে,এই কবিতা খুব খুব কথা কইবে, আর গ্রন্থটি নিয়েও ডিসকোর্সের প্রলিফারেশন হবে দেশে কি বিদেশে; এখন যা হচ্ছে, আর যেটুক এবছর হতে বাকি, তার চেয়েও ঢের ঢের বেশি। আর আমি যে আজ এই এই বলে ফেললাম এবং এই এই শব্দার্থের এই যে আপাত অতিশয়োক্তিবোধ যেখানে যেমন জনে জনে যেভাবে ফোঁসফোঁস করে ওঠছে, আগামির ওই দিনে জ্বলজ্বলে শব্দের এসব বুনন তাদের বিতংবাজিরও পিণ্ডি চটকে দেবে। 

 

কাজী নাসির মামুনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কাব্যের ট্যাগ নিয়ে এটির যখন আরেকটি সংস্করণ হবে, ও বেলাতেও এক কপি খরিদ করবার অভিলাষ মোটেই বিলাসজ্ঞান করি না। কবির জন্য, কাব্যের জন্য শুভকামনা।