ক্যাটেগরিঃ রাজনীতি

 

‘গুম’ কিংবা ‘গুপ্ত হত্যা’ যেটির কথাই বলিনা কেন বিষয়টি আমাদের দেশে মোটেও নতুন কিছু নয়। তবে বছর তিনেক আগে থেকে এই ব্যাপারটি নতুনরূপে আমাদের সামনে ধরা দিচ্ছে। হটাৎ করে এই ধরনের ঘটনার সংখ্যা বেড়ে যাওয়াই এর প্রধান কারন হিসেবে আমরা ধরে নিতে পারি। এর সাথে আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিশেষ করে এলিট ফোর্স(RAB) এর নাম জড়িয়ে পড়ায় বিষয়টি আরো চাঞ্চল্যকর হয়ে উঠেছে। তাছাড়া নতুন করে মাথাচাড়া দিয়ে ওঠা এই বিষয়টি নিয়ে যখন পথের টোকাই থেকে শুরু করে মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রী পর্যন্ত চিন্তিত, সেখানে এটিকে খুব একটা ছোট করে দেখার মত পরিস্থিতি সম্ভবত এখন আর নেই।

পত্র পত্রিকার রিপোর্ট অনুযায়ী গুম হয়ে যাওয়া মানুষের তালিকায় রয়েছেন ছাত্রদল, যুবদল, শিবির নেতা, ব্যবসায়ী, জনপ্রতিনিধি ও বিরোধী মতের মানুষ।[সূত্রঃ দৈনিক আমার দেশ, ২০ এপ্রিল ২০১২] কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে কারা করছে এই ধরনের অপকর্ম? মানবাধিকার সংগঠন সমূহের দাবী এটি আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সেই বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের একটি নতুন রুপ। পার্থক্য শুধু এতটুকুই যে আগে লাশটা অন্তত পাওয়া যেত, কিন্তু এখন সেটিরও কোন হদিস মিলছে না। যদিও RAB এর পক্ষ থেকে এধরনের অভিযোগ পরিপূর্ণ রুপে অস্বীকার করা হয়েছে। RAB মুখপাত্র কমান্ডার সোহাইল আহমেদ এর ভাষায়, “RAB এর ওপর দেশের শতকরা ৯৮ ভাগ মানুষের পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস রয়েছে। এই বাহিনীর সুনাম ক্ষুন্ন করতে ভিত্তিহীন এসব অভিযোগ তোলা হচ্ছে।”

কিন্তু মিডিয়া এবং মানবাধিকার সংস্থা সমূহ একযোগে আঙুল তুলছে RAB এর দিকেই। এমনকি কাতার ভিত্তিক টেলিভিশন চ্যানেল আলজাজিরাও তাদের একটি রিপোর্টে একই ধরনের ইঙ্গিত দিয়েছে। সেই সাথে মানবাধিকার রক্ষার দিক থেকে RAB এর ইতিহাসও খুব একটা গৌরবউজ্জল নয়। গত বছরেরই ১২ আগস্ট ঢাকায় RAB এর গুলিতে যে পাঁচ জন নিহত হয়। সেখানে বন্দুক যুদ্ধের কথা বলা হলেও প্রত্যক্ষদর্শীদের কথা বার্তায় প্রকাশ পায় ভিন্ন কিছু।[সূত্রঃ The Daily Star] অপর দিকে মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্ট জানায়, ‘অধিকার’ সহ স্থানীয় মানবাধিকার সংগঠনগুলোর মতে চলতি বছরেই RAB কমপক্ষে ৪৩ জনকে হত্যা করে। আগের বছর এর সংখ্যা ছিল ৬৮ জন। মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী এযাবতকালে ২১৬ জন পুলিশ হেফাজতে নিহত হয়েছে। এদের ১১৬ জন কারাগারে মারা যায়।

এই গুমের কারনেই থানায় হয়েছে অসংখ্য জি ডি, গঠিত হয়েছে তদন্ত কমিটি, জারি হয়েছে হাই কোর্টের রুলও। তথাপি কোনরূপ সন্তোষজনক ফলাফল মেলেনি। এহেন পরিস্থিতিতে সকলের সন্দেহের তীর আইন প্রয়োগকারী সংস্থা সমূহের দিকে ধাবিত হবে সেটাই স্বাভাবিক। তবে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার দাবীও একেবারে ফেলনা নয়। এধরনের ঘটনার সাথে সন্ত্রাসীদের জড়িত থাকারও প্রমান মিলেছে। কিন্তু রক্ষক যেখানে ভক্ষকের ভূমিকায় অবতীর্ণ, ভক্ষক তো সেখানে প্রায় নির্দোষের পর্যায়ে পড়ে যায়।

সরকারি পদক্ষেপঃ ক্রস ফায়ার কিংবা গুপ্ত হত্যা সবই নিঃসন্দেহে বিচার বহির্ভুত হত্যার অন্তর্ভুক্ত যেটা কিনা শুরু হয়েছিলো বিগত বি এন পি সরকারের আমল থেকেই। তখন থেকেই মানবাধিকার সংস্থা গুলো এর বিরুদ্ধে গলা ফাঁটালেও সরকার ব্যাপারটাকে বরাবরই গুরুত্বহীনের তালিকায় রেখেছে। অন্যান্য সকল দিকে ঘোর বিরোধপূর্ণ সম্পর্ক হলেও আওয়ামিলীগ ও বিএনপি সরকারের মধ্যে এইদিক থেকে কোন এক আশ্চর্য কারনে অদ্ভূত রকমের মিল খুজে পাওয়া যাচ্ছে। অনেকের মতে এর পেছনের কারনটি হলো সরকার নিয়ন্ত্রীত বাহিনীগুলোকে বর্তমানে সরকার রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যাবহার করছে।

ইস্যুর নীচে ইস্যুঃ দেশের সর্বশেষ গুরুত্বপূর্ন গুমের ঘটনাটি ঘটে বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতা এম ইলিয়াস আলীর ক্ষেত্রে। অনেকে মনে করছেন বর্তমান দপ্তর বিহীন মন্ত্রী সুরঞ্জিত সেন গুপ্তের অর্থ কেলেঙ্কারীর ঘটনাটিকে ধামা চাপা দেয়ার জন্যই পরিকল্পিত ভাবে এই ঘটনা ঘটানো হয়েছে। ব্যাপারটাকে একটু বড় আঙ্গিকে বিবেচনা করা যাক। খেয়াল করলে আমরা সহজেই বুঝতে পারবো যে ইলিয়াস আলীর গুমের ঘটনাটি কিন্তু আর প্রথম কয়েকদিনের মত রমরমা অবস্থায় নেই। এখন মিডিয়া এবং মিডিয়ার দর্শক/পাঠকগন মেতে রয়েছেন সাংবাদিকদের উপর পুলিশী ও সন্ত্রাসী হামলার ঘটনা গুলো নিয়ে। এমনকি বিএনপির কাছেও তাদের এই তথাকথিত ‘প্রিয় নেতা’র গুমের ঘটনাটি এখন তেমন একটা গুরুত্ববহ মনে হচ্ছে না। তাই চলতি সময়ের ইস্যু সমূহের চেইনটা আমরা একটু লম্বা করে দেখতে পারি। সম্প্রতি সাংবাদিকদের উপর সন্ত্রাসী ও পুলিশী হামলা, ১৮ এপ্রিল ইলিয়াস আলীকে গুম, ১০ এপ্রিল সুরঞ্জিত সেনের অর্থ কেলেংকারীর ঘটনা, আরও পেছনে যেতে পারি আমরা, সৌদি দূতাবাসের কর্মকর্তা কালাফ আল আলীর হত্যাকান্ড কিংবা ১১ ফেব্রুয়ারির সাগর-রুনি হত্যাকান্ডের ঘটনাকে পেছনে ফেলে হয়তো কেউ কেউ টিপাই মুখ কিংবা তিস্তা ইস্যু পর্যন্তও যেতে চাইবেন। যার কারনে ব্যাপার গুলোর উপর অনেকে বহিঃর্বিশ্বের নিয়ন্ত্রনের অস্তিত্ব খুজে পাবেন। চট্টগ্রামের বহদ্দারহাট এলায় এক সমাবেশে বিএনপি নেতা আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী তো বলেই বসেছেন, “রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের মাধ্যমে শেখ হাসিনা দেশে হত্যা, গুম ও অপহরণের রাজনীতি প্রতিষ্ঠা করতে চায়। এ জন্য হাসিনাকে অন্য একটি দেশ সহযোগিতা করছে।” [সূত্রঃ প্রথম আলো, ২৯ এপ্রিল ২০১২]

ব্যাপারটাকে আরো সমৃদ্ধ কিংবা রসালো করতে চাইলে আমরা প্রতিটির ঘটনার সাথে সরকারের একটি বুদ্ধি বিবেচনাহীন মন্তব্য জুড়ে দিতে পারি। যেমন সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ডের ক্ষেত্রে প্রধান মন্ত্রীর বানী, “সরকারের পক্ষে কারও বেডরুম পাহারা দেওয়া সম্ভব নয়”[সূত্রঃ প্রথম আলো, ২৩ ফেব্রুয়ারী ২০১২] কিংবা সাংবাদিকদের উপর পুলিশী হামলার ক্ষেত্রে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী সাহারা খাতুনের সাংবাদিকদের প্রতি পুলিশের কাছ থেকে দূরে থাকার আহ্বানের কথা বলা যেতে পারে। তবে প্রতিটি ঘটনাকে একই সূতোয় গেঁথে সাজালেই আমরা বুঝতে পারব একটির সাথে অপরটির সংশ্লিষ্টতা থাক বা না থাক একটি ইস্যু তার পরবর্তী ইস্যুটির নীচে কিন্তু ঠিকই চাপা পড়ে যাচ্ছে। এই প্রক্রিয়ার শেষ কোথায়, আদৌ কখনো শেষ হবে কিনা তা সম্ভবত প্রক্রিয়া পরিচালনাকারীগন নিজেরাও জানে না।

সকল অনিশ্চয়তার মধ্যে কিছু নিশ্চয়তা: এত কিছুর পরও আমরা কিছু বিষয়ে মোটামুটি নিশ্চিত হতে পারি। বর্তমানে আমাদের জাতীয় রাজনীতি যে ঘোলাটে রুপ ধারন করেছে তার কোন সহজ সমাধান নেই। কঠিন কোন সমাধান হিসেবে আমরা হয়ত শীঘ্রই পেতে পারি নতূন কোন ১/১১ আর নতূন এক আধাসামরিক শাসন। সামরিক শাসন প্রতিষ্ঠিত হবার সম্ভাবনাও একেবারে ঊড়িয়ে দেওয়া যায় না। তবে এতটুকু নিশ্চিত যে সামনে আমাদের জন্য খুব ভালো কিছু অপেক্ষা করছে না।