ক্যাটেগরিঃ রাজনীতি

 

প্রথমেই সাইমুম স্যারকে ধন্যবাদ দিতে চাই এত সুন্দর একটি লেখা আমাদের সাথে শেয়ার করার জন্য যেখানে বাংলাদেশের বর্তমান রাজনীতির ময়দানে বিএনপি ও জামায়াতের অবস্থান বিস্তারিত তুলে ধরা হয়েছে। সম্ভবত স্যারের মত দেশের আরো অনেকেই বিশেষ করে দেশের প্রধান দুই রাজনৈতিক দলের নীতিনির্ধারকবৃন্দও জামায়াত-শিবিরকে সাথে রাখার প্রশ্নে লাভ-ক্ষতির হিসেব কষছেন।

প্রশ্ন হলো কেন অন্য কোন দল নয়? কেন এই দলটিই হুট করে অনেকের চোখে ট্রামকার্ড হিসেবে ধরা দিচ্ছে? কিংবা আদেও দলটির কোন গুরুত্ব আছে কিনা।

জামায়াত প্রশ্নে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকটি হলো যুদ্ধাপরাধের বিচার প্রসঙ্গ যার কারনেই দলটির নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিবর্গ রয়েছেন কারাগারে। ডিসেম্বরের ভেতরই আশা করা হচ্ছে রায় ঘোষনা করা হবে যার প্রতিবাদেই মূলত পুলিশের উপর চড়াও হতে দেখা যাচ্ছে সমর্থকদের। কিন্তু মূল আকর্ষনটি সম্ভবত অন্য জায়গায়।

চট্টগ্রাম সফরে গিয়ে বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়া জামায়াতের সাথে আওয়ামী লীগের আঁতাতের চেষ্টা সম্পর্কিত যে মন্তব্য করেছেন তা অনেকে হালকাভাবে নিলেও আদতে তা যথেষ্ট গুরুত্ব বহন করে। নির্বাচনী হাওয়া বইতে শুরু করায় খালেদা জিয়া তথা বিএনপি’র মাপা মাপা পদক্ষেপ আমাদের চোখে স্পষ্ট। প্রথমত, খালেদা জিয়ার মন্তব্যের বিরুদ্ধে জামায়াতের কোন প্রতিবাদ শোনা যায়নি। বরং তারা দিয়েছে মৌন সমর্থন। দ্বিতীয়ত, আওয়ামী লীগ যে কোন কালেই জামায়াতকে সাথে নিতে আগ্রহী ছিলো না তাও নয়। কিন্তু যে দলটি যুদ্ধাপরাধের বিচারের পক্ষে পরিষ্কার অবস্থান গ্রহন করেছে তাদের পক্ষে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া কিভাবে সম্ভব তার ব্যাখ্যাও রয়েছে। পত্রপত্রিকার কিছু অনুসন্ধানী প্রতিবেদন বলছে যে জামায়াতের ভিতরে যুদ্ধাপরাধের বিচারের বিষয়ে বিভক্তি দেখা দিয়েছে। একটি পক্ষ চাচ্ছে আটক নেতাদের মুক্ত করে দলের পূর্বের অবস্থান পূনঃপ্রতিষ্ঠা করা এবং সেই লক্ষ পূরন করতে গিয়ে তারা দেশব্যপী ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে বর্তমানে খবরের শিরোনামে। পাশাপাশি জামায়াতের অপর একটি অংশ চাইছে যুদ্ধাপরাধে অভিযুক্তদের ব্যতিরেকেই এগিয়ে যেতে। বলা বাহুল্য দ্বিতীয় অংশটিকেই আওয়ামী লীগ কাছে টানতে চাইছে [সূত্রঃ প্রথম আলো, ১৩ নভেম্বর ২০১২] যা বিএনপি’র জন্য কখনই সুখকর নয়।

কিন্তু প্রশ্ন থেকেই যায় যে জামায়াতকে বিএনপি’র এত কি প্রয়োজন? বরং তাদেরকে তফাতে রেখে নির্বাচনে যেতে পারলেই বরং বিএনপি ‘দেশবিরোধী তকমা’টি ঝেড়ে ফেলতে পারে, সুসংহত করতে পারে তাদের নতূন ভারত নীতিও। আওয়ামী লীগই বা এই মুহূর্তে আগ্রহী কেন? এক্ষেত্রে আমাদের কয়েকটি দিক বিবেচনায় আনতে হবে।

প্রথমত, জামায়াত-শিবিরকে আমাদের দেশের তৃতীয় বৃহৎ ও সক্রিয় রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে মেনে নিতেই হবে যারা বর্তমানে বিভিন্ন কারনে জোট থেকে পৃথক হতে আগ্রহী। [সূত্রঃ কালের কন্ঠ, ১৪ নভেম্বর ২০১২] সরকারের প্রশাসনিক কাঠামো থেকে শুরু করে বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়, ব্যাংক, বীমা, ইলেক্ট্রনিক ও প্রিন্ট মিডিয়াতে তাদের রয়েছে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ প্রভাব। অপরদিকে বিগত তত্বাবধায়ক সরকারের দুই বছরকাল সময়ে বিএনপি’র শিরদাঁড়া একেবারে ভেঙে পড়ে। পরবর্তীতে নাজমুল হুদার মত নেতার দলত্যাগের মত বিবিধ ঘটনা আজ অবধি বিএনপিকে তার পূর্বের অবস্থায় ফিরে যেতে দেয়নি। এমতবস্থায় জামায়াত-শিবিরের মত নতূন একটি প্রতিপক্ষ সৃষ্টি করা বিএনপি’র জন্য ভয়াবহ পরিনতি ডেকে আনতে পারে। জামায়াতের যেই সমস্যাটির কারনে সুইং ভোটাররা বিএনপি’র বিপক্ষে ভোট দিয়ে থাকে সেই যুদ্ধাপরাধীদের বাদ দিয়ে যদি তারা সামনে এগোতে চায় সেক্ষেত্রে এমন অনেক কিছুই ঘটতে পারে যা কেউ আগে ভাবেনি। তাছাড়া রাজপথের সক্রিয় আন্দোলনে সহযোগীতা না হোক অসহযোগিতা এড়াতে জামায়াতকে বিএনপি ছাড়তে চাইবে না।

দ্বিতীয়ত, এই দুর্বল দল নিয়ে বড় ধরনের কোন আন্দোলনের সূচনা করা বিএনপি’র পক্ষে সম্ভব নয়। ফখরুল ইসলাম আলমগীর আর মওদুদ আহমেদ তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যাবস্থা পুনর্বহাল করার দাবিতে ঘন ঘন আল্টিমেটাম দিলেও শেষ পর্যন্ত মাঠে নামতে পারেননি। এক্ষেত্রে জামায়াত-শিবির নেতাকর্মীদের কাছ থেকে উল্লেখযোগ্য সহায়তা আসেনি সত্য কিন্তু এত শীঘ্রই আশাহত হবার মত কিছু সম্ভবত ঘটেনি। কারন এখনো বিএনপি’র ডাকা কর্মসূচী ক্ষেত্রবিশেষে জামায়াতময় হয়ে উঠছে। [সূত্রঃ বিডিনিউজ টুয়েন্টিফোর ডটকম, ১২ নভেম্ভর ২০১২]

তৃতীয়ত, বিএনপি যেমন মাত্র কিছু পুর্বে ভারতবিরোধী বলে বিবেচিত হত ঠিক একই সাথে তারা জিয়াউর রহমানের সময়কাল থেকেই পরিচিত ছিল পাকিস্তানপন্থী হিসেবেও। তাদের সাথে উষ্ণ সম্পর্ক বিদ্যমান ছিলো বিভিন্ন ইসলামিক রাষ্ট্রসমূহেরও। বিএনপি’র পরিবর্তিত ভারতনীতির দিকে উক্ত রাষ্ট্রসমূহ বাঁকা চোখে তাকাবে তাতে কোন সন্দেহ নেই তবে সম্পর্কের ক্ষেত্রে কোন পরিবর্তন আসবে কিনা সেটি স্পষ্ট নয়। কিন্তু পাকিস্তান এবং মধ্যপ্রাচ্যের রাষ্ট্র গুলোর মতাদর্শগত সমর্থন ও আর্থিক সাহায্যপুষ্ট জামায়াতকে বর্জনের পর একটি তিক্ত সম্পর্কের সূচনা হওয়ার সমূহ সম্ভাবনা রয়েছে যা কিনা আওয়ামী লীগের জন্য সৃষ্টি করতে পারে সুবিধাজনক অবস্থান। অপরদিকে বিএনপি সেটা চাইবে কিনা সেটি একান্তই তাদের বিবেচনা।

চতুর্থত, আওয়ামী লীগ ও জামায়াতের নতুন কর্মী সংগ্রহের ক্ষেত্রে বিএনপি’র কর্মকাণ্ড স্থবির। এক্ষেত্রে দলগুলোর ছাত্র সংগঠন সমূহের একটি বড় ভূমিকা থাকে। দেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গুলোতে বিএনপি সমর্থিত ছাত্রদলের বর্তমান অবস্থা বোঝার জন্য গবেষনার প্রয়োজন নেই। তাই একটি শক্তিশালী ছাত্র সংগঠন যদি নিজেদের পক্ষে তাদের রাখতেই হয় তবে জামায়াতের সাথে একাত্বতা বজায় রাখা ছাড়া বিএনপি’র সামনে দ্বিতীয় কোন পথ খোলা নেই।

একথা সত্য যে সারা দেশে সুসংগঠিত ভাবে জামায়াতের সমর্থকদের অবস্থান থাকলেও নির্বাচনে জয়লাভ করার জন্য উপযুক্ত নেতার অভাব রয়েছে। এবং এই কারনেই তাদের জোটে আবদ্ধ হওয়ার প্রয়োজন পড়ে। তবে একটি বিষয় আমাদের ভুলে গেলে চলবে না যে জামায়াতের মতাদর্শের সাথে ধর্মের মত একটি স্পর্শকাতর বিষয় জড়িত রয়েছে এবং সে কারনেই আওয়ামী লীগ কিংবা বিএনপি তাদের খুব সাবধানে নাড়াচাড়া করবে সেটাই স্বাভাবিক।

নতূন ভারতনীতি নিয়ে জামায়াতের সাথে বিএনপি’র সম্পর্কে শীতলতা তৈরী হয়েছে বটে। তবে তা ‘ভারতনীতি’ নাকি ‘ভারতের নীতি’ সেই প্রশ্ন কিন্তু থেকেই যায়। বিএনপি নয় বরং ভারতই প্রথম তাদের মধ্যকার সম্পর্ক উন্নয়নে আগ্রহ প্রকাশ করে। যার পেছনে প্রাথমিক ভাবে দু’টি যুক্তি দাড় করান যায়। ১. আঞ্চলিক পরাশক্তি হওয়ার লক্ষ অর্জন করার পর ভারত এখন আন্তর্জাতিক পরাশক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে সচেষ্ট এবং সেই কারনে প্রতিবেশী রাষ্ট্রসমূহের শুধুমাত্র কোন নির্দিষ্ট একটি অংশের সাথেই উষ্ণ সম্পর্ক যথেষ্ট নয়। এবং ২. প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন নৌ শক্তি বৃদ্ধি প্রশ্নে বাংলাদেশের অবস্থান গুরুত্বপূর্ণ। যেটি আবার প্রথম যুক্তিটির সাথে অনেকটাই সম্পর্কিত। পাশাপাশি ভারতের সাথে সম্পর্কের উন্নয়ন বিএনপি কিংবা জামায়াতের জন্য লাভ ছাড়া ক্ষতি ডেকে আনবে না এই বিষয়টিতে উভয় দলই ঐক্যমত পৌছুবে এমনটা আমরা আশা করতেই পারি।