ক্যাটেগরিঃ ক্যাম্পাস

 

‘উত্তাল ক্যাম্পাস’ কথাটি আমাদের জন্য খুব একটা নতুন ব্যাপার না হলেও বিগত ও চলতি মাসে ইলেক্ট্রনিক ও প্রিন্ট মিডিয়া গুলো যেসকল সংবাদ কভার করেছে সেখানে বেশিরভাগই হলো দেশব্যাপী উগ্র ছাত্রদের তান্ডবের বিবরন। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রলীগ শিবির কর্মীদের সংঘর্ষ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগের দুই পক্ষের মধ্যকার সংঘর্ষ কিংবা চট্টগ্রামেরই অন্তর্গত ওমরগনী এম ই এস কলেজের তান্ডব বা দিনাজপুরের কলেজে সংঘর্ষের ঘটনা কিংবা দেশব্যাপী ছাত্রশিবির কর্মীদের পুলিশের উপর হামলায় ভরে গিয়েছে পত্র পত্রিকার পাতা আর টিভির পর্দা। কেন এইধরনের ঘটনা সারা দেশে একই সময়ে সংঘটিত হলো সেই প্রসঙ্গে একটু পরে আসি। তার পূর্বে আমাদের লাভ ক্ষতি হিসেব মেলান দরকার।

এধরনের ঘটনায় ঘটিত ক্ষতির ব্যাপারেও নতূন করে বলার কিছু নেই। তবে লাভবান হচ্ছে সংবাদ ভিত্তিক টিভি চ্যানেল গুলো যাদের সংবাদ সঙ্কটে পড়ে একই খবর বারবার আওড়াতে হচ্ছে না, দর্শকদেরও আসছে না বিরক্তি। আমরা সেসব সংবাদ সমূহ দেখছি, সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমগুলোতে দুঃখ প্রকাশ করছি, পত্রিকায় দু কলম লিখছি, অতঃপর ভুলে যাছি। নিজের অজান্তেই অপেক্ষা করছি পরবর্তী সহিংসতার ঘটনা শোনার জন্য।

বাংলাদেশের ছাত্র রাজনীতির ইতিহাস গৌরবউজ্জল সেই ব্যাপারে কারো কোন সন্দেহ নেই। কিন্তু আমাদের বর্তমান পরিস্থিতিতে প্রফেসর আব্দুল মান্নান স্যারের মত ঘোর আওয়ামী লীগ সমর্থকও তার লেখা একটি কলামে বলতে বাধ্য হয়েছেন “ছাত্রলীগের লাগাম টেনে ধরুন”। মূল দলের ছাত্র সংগঠনের উগ্র আচরন যে বছরখানেক পরেই অনুষ্ঠিতব্য নির্বাচনে তাদের জন্য ভালো কিছু বয়ে আনবে না সেটি তিনি বুঝতে পেরেছেন। এমন কাজ আপনারা কেন করছেন এমন প্রশ্নই করেছিলাম নেতাগোছের এক ছাত্রসংগঠনের কর্মীকে। তার কাছ থেকে উত্তর পেয়েছিলাম যে, কিছু পেতে হলে কিছুতো হারাতেই হবে। ছাত্রসংগঠন সমূহের মধ্যকার সংঘর্ষের ঘটনা গুলো সেই ‘হারানোর’ তালিকায় ফেলতে হবে। এই অনাকাঙ্খিত উত্তর পেয়ে তার কাছে ফের প্রশ্ন করে বসি যে এসব কিছু আমরা তাহলে কি পাওয়ার বিনিময়ে হারালাম? কিসের বিনিময়ে লক্ষ লক্ষ ছাত্র ছাত্রী সেশন জটে আটকে রয়েছে? ঠিক কোন জিনিসটি পাওয়ার আশায় প্রতি বছর দেশের বিভিন্ন সরকারী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীকে প্রান হারাতে হয়? এসকল প্রশ্নের উত্তর আরো অনাকাঙ্খিত। উক্ত কর্মী অনেক কথাই বললেন যার সারমর্ম করলে এইরকম দাঁড়াবে যে আমরা এখনো তেমন কিছু হয়তো পাইনি, তবে পাওয়ার চেষ্টা করছি এবং আমরা পাবই। অর্থাৎ দেশের স্বার্থে আমাদের কিছু কিছু ত্যাগ স্বীকার করতেই হবে, সহ্য করে নিতে হবে চলমান অরাজকতা। এহেন অযৌক্তিক কর্মকান্ডের পক্ষে এর চেয়ে গ্রহনযোগ্য যুক্তি যে হতে পারে না তাতে কোন সন্দেহ নেই, তবে আমরা চাই এইসবের একটি পরিসমাপ্তি ঘটুক। আর সেই কারনেই এই ধরনের ঘটনা সমূহের পেছনের কারন গুলো নিয়ে আমাদের ভাবতে হয়।

মানুষ বিচিত্র প্রানী যাদের অনেকেই সংঘর্ষ প্রিয়। তাদের এই অতি বিচিত্র ধরনের পছন্দের দিকটিই দাঙ্গা হাঙ্গামার জন্ম দেয় বলে অনেকে মনে করেন। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সমূহের শিক্ষকদের রাজনীতির সাথে সংশ্লিষ্টতাকেও গোলযোগপূর্ন ছাত্ররাজনীতির একটি অন্যতম কারন হিসেবে আমরা দেখতে পারি। আমরা যারা কাছ থেকে দেখেছি তারা জানি যে ছাত্র সংঘর্ষের ঘটনা গুলোর সাথে শুধুমাত্র কতিপয় কাণ্ডজ্ঞানহীনতায় ভোগা ছাত্ররাই জড়িত নয়, জড়িত প্রশাসন, জড়িত পুলিশ।

পত্রিকার পাতা একটু খেয়াল করে ওল্টালেই আমাদের চোখে ব্যাপারটা ধরা পড়বে। ৩ অক্টোবরের দেশের প্রায় সকল দৈনিকের প্রধান খবর ছিলো রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের লীগ-শিবির সংঘর্ষ। তবে ছাপানো ছবিতে আর ইলেকট্রনিক মিডিয়ার ভিডিও ফুটেজে আমরা শুধুমাত্র ছাত্রলীগের হাতেই আগ্নেয়াস্ত্রর খেলা দেখতে পাই, ছাত্রশিবিরে কর্মীদের মিলিত আক্রমনের কোন প্রমান মিডিয়া আমাদের সামনে আনতে ব্যার্থ হয়েছে। সংঘর্ষের সময় পুলিশের নিরাপত্তা বলয়ের ভেতর থাকতে পেরেছে মিডিয়া কর্মী আর সরকার সমর্থকরা। তাই আমরা খালি একটি দলের সহিংস আচরন দেখছি। এটা খুবই স্বাভাবিক বর্তমান সময়ে। কিন্তু পরিস্থিতি আমাদের কাছে আরো নাজুক মনে হতেই পারে যখন আমরা জানব যার হাতে অস্ত্র থাকা অবস্থায় ওঠা ছবিতে মিডিয়া ছয়লাভ হয়ে গিয়েছে সেই হলো প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে করা মামলার বাদী। রাজশাহীর ঘটনায় সরকার পন্থীদের বিরুদ্ধে কোন মামলা হয়নি। আর এই ব্যাপারটিও বিরোধীপক্ষ কাজে লাগাতে ভুল করেনি। জামায়াতপন্থী হিসেবেই পরিচিত একটি পত্রিকা ৪ অক্টোবর তাদের শিরোনাম করেছে “রাজশাহীতে শিবিরের উপর ছাত্রলীগের হামলার ঘটনায় শিবির কর্মীদের বিরুদ্ধে মামলা” যা অনেকের কাছে প্রশাসনের প্রহসন বলে মনে হতেই পারে। মাত্র কয়েক মাস পুর্বে চট্টগ্রাম বিশবিদ্যালয়ে ঘটে যাওয়া ছাত্র সংঘর্ষের ঘটনায় প্রশাসন তথা পুলিশের পক্ষপাত দুষ্টতা যদি না থাকতো তবে যেকোন প্রত্যক্ষদর্শীই নিশ্চিতরুপে বলতে পারবে যে সেই ঘটনায় দু’জন ছাত্রের প্রানহানী ঘটতো না। নিহত ছাত্র কোন দলের কর্মী সেটা বিবেচনায় না নিয়ে আমাদের তাকে ছাত্র হিসেবেই মুল্যায়ন করতে হবে।

বর্তমান সময়ে আমাদের ছাত্র রাজনীতির ইমেইজটা স্পষ্টরুপে বোঝা দরকার। ছাত্ররাজনীতি কথাটি বলার সাথে সাথে আমাদের চোখের সামনে অস্ত্র হাতে দাঁড়িয়ে থাকা কোন যুবকের ছবি কেন ভেসে উঠবে? চলমান অসুস্থ রাজনৈতিক সংষ্কৃতির কারনে আমরা ভুলতে বসেছি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ছাত্র সংগঠন গুলোর কাজ কি? কোন উদ্দেশ্যকে সামনে নিয়ে পৃথিবীতে প্রথম ছাত্রসংগঠনের সৃষ্টি হয়েছিলো? বামপন্থী কিছু সংগঠনের হাতে গোনা কিছু কর্মকান্ড বাদ দিলে দেখা যাচ্ছে সাধারন ছাত্রদের অধিকার রক্ষায় তাদের কোন ধরনের কোন কার্যক্রম আমাদের দৃষ্টিসীমার বাইরে। কোন আন্দোলন হয় না শিক্ষার্থীদের আবাসন সঙ্কট সমাধানের ক্ষেত্রে, হলের খাবারের মান নিয়েও আমাদের দেশের কোন ছাত্র সংগঠনকে কখনো কথা বলতে শোনা যায় না। সমস্যা সমাধানের লক্ষেই যাদের কাজ করার কথা ছিলো তারা নিজেরাই আজ প্রধান সমস্যায় পরিনত হয়েছে। তাই এই মূল সমস্যাটি সমাধানের লক্ষে নতুন কোন সমাধেন্র কথা হয়তো আর উঠছে না। ছাত্ররাজনীতি বন্ধ ঘোষনা মাথা ব্যাথার ভয়ে মাথা কেটে ফেলার মত ব্যাপার। ভবিষ্যতের রাষ্ট্র পরিচালনাকারী গড়ে তুলতে রাজনীতি চর্চার সুযোগ থাকা আবশ্যক। তবে রাজনীতির নামে আমাদের বর্তমান ধংসাত্বক কর্মকান্ড হটিয়ে বিদায় করা দু’একদিনের কাজ বলে মনে হয় না।