ক্যাটেগরিঃ জনজীবন

উত্তরবঙ্গের সর্ববৃহৎ জেলা দিনাজপুর। ঐতিহ্যবাহী এই জেলার দেশজুড়ে নাম আছে সাদাসিধে মানুষের বসবাসের জন্য। লিচু আর কাঠারিভোগ চালের জন্যও বিখ্যাত দিনাজপুর জেলা। জেলার সর্ববৃহৎ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান দিনাজপুর সরকারি কলেজের কলেজ মোড়ের ফুটপাত ধরে কিছু চায়ের দোকান! তুষারের গল্পটা সেখান থেকেই।

শ্যাম বর্ণের ছেলেটিকে এক নামেই চেনে দিনাজপুর সরকারি কলেজের বেশিরভাগ ছাত্র-ছাত্রী। সাদাসিধে ছেলেটির মুখে একটা মলিন হাসি লেগে থাকে সবসময়! র চা বিক্রি করে বাবার সাথে। কলেজে হাঁপিয়ে পড়লে ঠিক পেছন গেটেই এসে একটা বিস্কুটের সাথে চায়ের কাপে চুমুক দেয় শিক্ষক, ছাত্র-ছাত্রীসহ কলেজের কর্মচারীরাও!

তু্ষার এবার দশম শ্রেণিতে। আর দশটা ছেলেমেয়ের মত স্কুলের নেশা তুষারের থাকলেও বাকি সময়টা তার কেটে যায় চায়ের দোকানে। বাবা মোঃ হেলাল ইসলাম বহুদিন ধরেই চা বিক্রি করে আসছেন একই জায়গায়! তুষার বাবাকে সাহায্য করে স্কুল পড়ার ফাঁকেফাঁকে। দশম শ্রেণির ছাত্র তুষার পড়ালেখা করে চেহেলগাজী শিক্ষা নিকেতন স্কুল এন্ড কলেজে।

সমাজে এই বয়সে অন্য ছেলেমেয়েরা যখন খেলাধূলা কিংবা আয়েশে সময় কাটায় ঠিক তখন তুষার চায়ের কেটলিতে পানি ঢেলে ভোক্তার গলা ভিজিয়ে দেয়। কেউ তুষারের সত্যিকার গল্পটা জানতে চায়না। চায়ের দাম দিয়েই শোধ হয় তু্ষারের পরিশ্রম।

সামান্য চায়ের দোকানদার হেলাল চাচাও চেষ্টা করে তুষারকে স্কুলে পড়াতে। স্বপ্ন দেখে কলেজের ছেলে-মেয়েদের মত আমার সন্তানটাও একদিন বই হাতে কলেজে যাবে। উৎসাহ দেওয়ার মত কেউ না থাকলেও তুষার নিজে থেকেই উৎসাহ পায় অন্যকে দেখে। তুষার খুব ছোট থেকেই বাবাকে সাহায্য করে আসছে। এভাবেই সফলতার সাথে চেহেলগাজী শিক্ষা নিকেতন স্কুল এন্ড কলেজ থেকে জেএসসি পরীক্ষায় পাস করেছে।

ইদানিং চায়ের দোকানটা ভেঙ্গে দিয়েছে সরকার। শুধু তুষারদের দোকানটাই নয়, সরকারি জমিতে যাদেরই দোকান ছিল সবার দোকানই ভেঙ্গে ফেলা হয়েছে।
যেখানে সন্তানদের খাওয়া দাওয়া, লেখাপড়া করানোটাই অনেক কঠিন সেখানে সামান্য এসব চায়ের দোকান ভেঙ্গে দিয়ে সরকার কি মজা পায় জানিনা!

আগামিতে এসব দোকানের মালিকরা কিভাবে জীবন অতিবাহিত করবে জানিনা, তবে তাদের মুখের দিকে তাকালেই কেমন জানি অসহায়ত্ব ধরা পড়ে চোখে। তাদের কথা শোনার মত কেউ নেই! ভেঙ্গে ফেলা দোকানগুলো দুয়েক দিনেই ঘেরা হবে কাটাতারের বেড়া দিয়ে!

তুষার স্কুলে যাবে। সামনে তার এসএসসি পরীক্ষা। বাবাও চিন্তায় থাকেন সারাক্ষণ। কী হবে তাদের ভবিষ্যৎ? কোথায় দাঁড়াবেন তুষারদের নিয়ে? উত্তর জানা নেই।

তুষাররা সমাজের খেটে খাওয়া নিম্ন শ্রেণির মানুষ! সমাজ, রাষ্ট্র তাদের কিছুই দিতে পারেনা! সরকারি জমিতে ভ্রাম্যমান দোকানটাও বারবার ভেঙ্গে দেওয়া হয়! এবার আর দোকান তুলতে দেবেনা বলে দিয়েছে সরকারি কর্মকর্তা।

আমার তুষারদের জন্য ভয় হয়, এরা আবার পড়ালেখা ছেড়ে জীবনের দায়ে অন্য কিছু করতে বাধ্য হবে না তো?যদি হয়ে থাকে  তাহলে এর দায় কে নেবে? সমাজ? রাষ্ট্র?

প্রশ্নটা আমার, উত্তর কে দিবে? তুষারও উত্তর খোঁজে, হেলাল চাচাও দোকান খুঁজে, আমিও আপনাদের কাছে উত্তর জানতে চাই। অপেক্ষা! কিন্তু উত্তর মেলেনা!