ক্যাটেগরিঃ আর্ত মানবতা

কিছুদিন আগে ফেসবুকে এক বৃদ্ধা মা’কে নিয়ে লিখেছিলাম। লেখাটা দেখে এক ভাই পাঁচশ টাকা পাঠিয়েছিলেন, সেই মাকে ফল কিনে দেওয়ার জন্য। একটু ব্যস্ততা কাটিয়ে উঠে সীমা আপুর সাথে যোগাযোগ করলাম। সীমা আপু হলেন আমার শিক্ষিকা, তিনিই ঐ বৃদ্ধা মায়ের সন্ধান দিয়েছিলেন। একশ বছরের বেশি বয়সের বৃদ্ধা মা থাকেন মেয়ের বাড়িতে। একটা বস্তিতে ছোট দুইটা ঘর, বারান্দার একটা টিনের বেড়ায় থাকেন মা।

 

 

তিন ছেলে দুই মেয়েসহ পাঁচ সন্তানের জননী এই মা। দুর্ভাগ্যবশত কোনো ছেলেই বৃদ্ধা মাকে দেখাশোনা করেন না। সবাই দিনাজপুরে থাকেন। এক মেয়ে থাকেন ভারতে, তার সাথে কোনো যোগাযোগ নেই বৃদ্ধা মায়ের। ছেলেরা যেহেতু মাকে দেখেন না, সেক্ষেত্রে এক মেয়ে দেখাশোনা করেন। দেখাশোনা বলতে সেটাও যা দেখলাম খুবই করুণ অবস্থা। মেয়ে আর নাতি-নাতনিরা মিলে অমানবিক নির্যাতন করেন এই বৃদ্ধার সাথে।

কিছু ফলমূল নিয়ে সীমা আপুর হাজবেন্ডকে সাথে নিয়ে বৃদ্ধা মায়ের কাছে গেলাম। বয়সের ভারে নুয়ে পড়লেও মনের ইচ্ছে শক্তি দিয়ে চলছেন বুড়ি মা। হাতের বেশ কয়েক জায়গায় ক্ষত। বৃদ্ধা মাকে ডাক দিতেই খোয়ারের মত ঘরটা থেকে হুংকার দিয়ে বের হলেন।

বাড়িতে তখন কেউ ছিল না, একটু পরে বুড়ি মার নাতি আসলো। ছেলেটা অটোরিকশা চালায়। দেখেই মনে হলো কেমন একটা ছেলে। চেহারার মধ্যে একটা মাস্তানি ভাব। কথা বলে ছেলেটাকে বোঝানোর চেষ্টা করলাম, আমরাও একদিন এই বয়সে আসবো। আমাদেরকেও তো মরতে হবে। একদিন আমাদেরও নাতি-নাতনি হবে, বুড়ি মাকে যেন একটু দেখাশোনা করেন।

 

 

আমি জানি, আমার এই মিষ্টি কথায় কোনো কাজ হবে না, তারপরেও কিছু কথা বলে আসছি। এটাও বলে আসছি মাঝে মধ্যে খোঁজ-খবর নিতে আসবো। বৃদ্ধা মা ফলের ব্যাগটা হাতে নিয়ে অনেক খুশি, একটা কলা বের করে খাইয়ে দিলাম। সাথে বুড়ি মার ওষুধ কেনার জন্য সীমা আপুর হাসবেন্ড নামজুল হক বিপ্লব ভাই একটা একশ টাকার নোট বের করে দিলেন।

জানি না আদৌ সেই টাকাটা দিয়ে বুড়ি মার জন্য ওষুধ কেনা হবে কিনা। তবে বুড়ি মা দোয়া করলেন খুব কাছ থেকে। এই বয়সে তিনি যা আমাকে দিলেন সেটা পৃথিবীর সেরা প্রাপ্ত পুরস্কার। মাথায় হাত, কপালে চুমু, আর কি যেন দোয়া পড়ে বেশ কয়েকবার চুমু খেলেন। আমার গাঁ শিহরিত হলো! বুঝতে পারলাম তিনি মন থেকেই আমার জন্য দোয়া করেছেন। যদিও দোয়া পাবার কথা যেই ভাই টাকাটা পাঠিয়েছেন সেই ভাইয়ের।

মহান সৃষ্টিকর্তা হয়ত এই দোয়ার ভাগ আমাদের সবাইকে দিবেন। কষ্ট লাগলেও সেখান থেকে প্রস্থান করলাম। খারাপ লাগলেও কিছু করার নেই। আমাদের সমাজে তো এরকম বৃদ্ধা মায়েরা অনেক আছেন। আমরা কতজনের মুখে হাসি ফোটাতে পারি বলেন? তবুও পৃথিবী চলছে তার নিয়মে। বয়স বাড়ছে তার গতিতে। এই তো কয়েক বছর পরই আমি-আমরা এরকম একটা বয়সে এসে পৌঁছাবো।

সীমা আপু, মাহবুব মিনার ভাই (ডোনার), নাজমুল ভাইকে অনেক অনেক ধন্যবাদ। আপনাদের প্রতি রইল অকৃত্রিম ভালোবাসা। একদিন এভাবেই পৃথিবী বদলে যাবে সবার ছোট ছোট সহযোগিতায়। বদলে দিতে চাই আমাদের সমাজ, সমাজের মানুষ তথা রাষ্ট্রকে। চলুন বদলে ফেলি আমাদেরকে।

বিঃদ্রঃ কিছুদিন পর বুড়ি মার কাছে আবার যাবো। কেউ যেতে চাইলে বলতে পারেন। মিনার ভাই আরো কিছু জিনিস পাঠাতে চেয়েছেন, সেগুলো নিয়ে যেতে হবে। অনেকে বলতে পারেন, লোকটা অন্যের দেওয়া দানে বড় বড় স্ট্যাটাস মারে। বলতে পারেন, কিন্তু অন্যের আমানত খেয়ানত না করে একটু লিখলেই যদি কারো উপকারে আসে তাহলে খারাপ কিসে?

 

পূর্ব প্রকাশিত