ক্যাটেগরিঃ প্রকৃতি-পরিবেশ

একটা পাখি খাঁচায় বন্দি রেখে নিজের আয়ত্ত্বে আনার ব্যর্থ চেষ্টা জীবনে কম করিনি। ছোট বেলায় পাখি পালনের প্রতি আলাদা একটা শখ ছিল। স্কুল ছুটি হলে নতুবা বন্ধ থাকলে পাখির খোঁজে বের হতাম।

গ্রামের যে কারো বাড়িতে পোষা পাখি দেখলে খুব আফসোস হতো। মনে মনে ভাবতাম আমারও যদি একটা পোষা পাখি থাকতো; কথা বলতে পারতো!

সাধারণত গ্রামের বেশির ভাগ পাখিপ্রেমী মানুষের ভাত শালিক পাখির প্রতি বেশি টান থাকে। গ্রামে আমরা এই পাখিটাকে শালিক বা শাড়ো পাখি বলি।

আমি বেশ কয়েকটা ভাত শালিকের বাচ্চা নানাভাবে সংগ্রহ করেছিলাম। ভাত শালিক পাখি সংগ্রহ করা খুব যে কঠিন ছিল তা নয়।

গাছের ফোঁকড়ে বা কারো ফলস টাঙ্গানো গাছে সাধারণত ভাত শালিক পাখিরা বাসা বাঁধে। বছরের একটা সময় ভাত শালিক পাখিরা বাচ্চা দিত। সেই বাচ্চা যেভাবেই হোক জোগাড় করতাম। মঝে মধ্যে কিছু টাকা দিয়ে ভাত শালিকের বাচ্চা কিনে নিতাম। কিন্তু অনেক চেষ্টার পরেও পাখিগুলোকে পোষ মানাতে পারিনি।

ভাত শালিকের বাচ্চা যখন নিয়ে আসতাম তখন স্কুল শেষে কাঁচের একটা বোতলে ফড়িং শিকার করতাম। ভাত শালিকের প্রিয় খাবার হলো ঘাস ফড়িং।

সাধারণত ভাত শালিক সর্বভূক প্রাণি হলেও তাদের পছন্দের খাবার ছিল ঘাস ফড়িং কেঁচো, ফল, শস্যদানা, বীজ, ছোট সরীসৃপ এবং মানুষের ফেলে দেওয়া খাবারের উচ্ছিষ্ট তাদের প্রধান খাবার ছিল।

বগুড়ার ফুড ভিলেজে ভাত শালিকের দল

ভাত শালিকের আরেকটা পছন্দের খাবার হলো খেজুরের রস। খেজুর রসের কলসে বসে তারা রস খেতে খুব পছন্দ করে। আমি স্কুল শেষে ফড়িং ধরার কাজ শেষ করে বাচ্চাগুলোকে নিজের মত করে খাওয়াতাম। রাতের বেলায় সন্তানের মত যত্ন করে খড় কিংবা ঘাসের শুকনো পাতা বিছিয়ে রাখতাম যাতে বাচ্চাগুলো কষ্ট না পায়।

টিয়া বা ময়নার মত ভাত শালিকও মানুষের কথা নকল করতে পারে। ভাত শালিকের নামের পিছনে তাদের চলাচল ও আচার ব্যবহারের উপর ভিত্তি করে নাম রাখা হয়েছে অ্যাক্রিডোথিরিস যার অর্থ হলো পঙ্গপাল বা শিকারী।

এরা একটু বড় হতেই খাঁচা থেকে বের করে দিতাম আর তারা সেই সুযোগে নিজেদের ঠিকানায় পাড়ি জমাতো। এভাবে আমি কম করে হলেও দশটা বাচ্চাকে পোষ মানানোর চেষ্টা করেছি কিন্তু পারিনি।

অনেক বছর পর সেদিন এক সঙ্গে কয়েক শত ভাত শালিক দেখতে পেয়ে আমি অবাক হয়ে গিয়েছিলাম। ঢাকার উদ্দেশ্যে যেতে বাসের বিরতিতে বগুড়ার ফুড ভিলেজে দুপুরের খাবার জন্য নামেছি। নেমেই দেখি শত শত ভাত শালিক এক জায়গায় জড়ো হয়ে মানুষের ফেলে দেওয়া উচ্ছিষ্ট খাচ্ছে।

ব্যাগ থেকে ক্যামেরাটা বের করে তাদের সঙ্গেই কুড়ি মিনিট ভালোবাসায় আবদ্ধ হলাম। চানাচুর আর ভাজা চিড়ার প্যাকেট কিনে  পাখিগুলোকে জড়ো করলাম। একটু খাবারেই তারা খুব আপন হয়ে যায়।

হলুদ রাঙ্গা ঠোঁটের পাখিগুলোকে ছেড়ে যেতে খুব কষ্ট হচ্ছিল। কিন্তু গাড়ির সুপারভাইজারের ডাক পড়েছে ততক্ষণে। যেতে হবে। ভালোবাসার ভাত শালিকগুলোকে ছেড়ে গাড়িতে উঠতেই হলো।