ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

 

“অন্যায় যে করে আর অন্যায় যে সহে, তব ঘৃণা যেন তারে তৃণ সম দহে”- কবিগুরু রবি ঠাকুর এই বাণীর মাধ্যমে মানুষকে বুঝাতে চেয়েছিলেন, যে অন্যায় করে এবং যে অন্যায় সহ্য করে তারা দুজনই সমান অপরাধী। বর্তমানে আমরা এমন পর্যায়ে গিয়ে পৌঁছেছি যে, অন্যায় না করেও প্রতিনিয়ত অন্যায় করছি। অর্থাৎ অন্যায়কারীকে ছাড় দিচ্ছি। ফল, কয়দিন পর আরো বড় কোন অন্যায় সংগঠিত। তখন আমাদের আরো বেশি ধৈর্য ধরে সেই অন্যায়টিও গিলতে হয়। এতক্ষণ তো শুধু অন্যের ধান ক্ষেত নষ্ট হওয়া দেখলেন। অন্যায় নামের ড্রাগনটি অন্যের ঘার মটকাতে মটকাতে যখন নিজের ঘারে এসে কামড় বসাবে তখন কি করবেন? আমরা নিজেদের কর্মের প্রতি এতটা ধৈর্যশীল না হলেও অন্যায় সহ্য করার ক্ষেত্রে আমাদের সাথে বিশ্বের আর কোন দেশের মানুষ পারবেনা। আর বিশ্বের উন্নত দেশগুলোর মানুষ কর্মে ধৈর্য ও নিষ্ঠা আর অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার থাকে সবসময়। আমাদের আর তাদের তফাৎ এতটুকুই।

এবার মূল কথায় আসি। গত কয়েকমাস আগে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আলোচিত বিষয় ছিল সড়ক দুর্ঘটনায় এক সাংবাদিকসহ তিন মোটরসাইকেল আরোহী নিহত। গত ২৭ জুন ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় এক মর্মান্তিক সড়ক দূর্ঘটনায় আজম রাজু নামে এক সাংবাদিকসহ নিহত হন তিন মোটরসাইকেল আরোহী। আর পুলিশের কারণেই এই দূর্ঘটনা ঘটেছিল। ওই সময় পুলিশ রাস্তার পাশে দাড়িয়ে সিএনজি চালিত অটোরিকশা থেকে চাঁদা নিচ্ছিল। তখনই ওই রাস্তা দিয়ে যাচ্ছিল সেই মোটরসাইকেলটি। মোটরসাইকেলটিতে ছিল সাংবাদিক আজম রাজুসহ তিনজন আরোহী। তখন পুলিশ লাঠি দিয়ে এক সিএনজিকে ঢিল ছোড়লে সেই ঢিল গিয়ে পরে সেই মোটরসাইকেলের চাকায়। তখন প্রচন্ড গতিবেগের সেই মোটরসাইকেল নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে রাস্তাই পরে গেলে সাথে সাথেই বিপরিত দিক থেকে আসা একটি ট্রাক পিষে দেয় তিন জনকেই। ঘটনাস্থলেই নিহত হন সাংবাদিকসহ জেলা ট্যাঙ্কলরী মালিক সমিতির তিন নেতা।

এঘটনার প্রতিবাদে সাথে সাথেই যে এলাকায় দুর্ঘটনা ঘটেছিল সেই এলাকার মানুষ বিক্ষোভে ফেটে পরেছিল। ঢাকা-সিলেট মাহাসড়ক প্রায় ২ ঘন্টার মতো অবরুধ করে রেখেছিল। শুধু তাই নয়, পুলিশের গাড়ি ভাংচুর ও তাদের উপর হামলাও করে এলাকাবাসী। এসব ঘটনা ওইদিন দুপুরের। কিন্তু ওইদিন বিকেলেই আবার ওই এলাকায় ঘটনা যাচাইয়ের জন্য কয়েকজন সাংবাদিক গেলে পুলিশ কর্তৃক মোটরসাইকেলে ঢিল ছোড়ার বিষয়টি এলাকাবাসী সাংবাদিকদের কাছে লুকিযে লুকিয়ে বলেছে। তখন এসব কথা পুলিশের সামনে বলতে বললে তারা ভয়ে মুখ খুলতে রাজি হয়নি। এসব খবর পত্র পত্রিকায় আসতে শুরু করলে পুলিশের উর্ধতন কর্মকর্তারা অভিযুক্ত কয়েজন পুলিশ সদস্যকে প্রত্যাহরের নির্দেশ দেন।

পরে এই অন্যায়কে ধামাচাপা দেওয়ার জন্য পুলিশের পক্ষ থেকে ওই নিহতের তিন পরিবারের সাথে আপোষ করার চেষ্টা হয়েছে এবং তাতে পুলিশ সফলও হয়েছে। তবে সেটা ফ্রী তে নয়, টাকার বিনিময়ে। নিহত তিন জনের জন্য তাদের পরিবারকে পুলিশ দিয়েছে ৬ লক্ষ টাকা। তাহলে একটি জীবনের মূল্য ধরা হয়েছে ২ লক্ষ টকা। কম কিসের? অবাক কান্ড! জীবন এতটাই সস্তা হয়ে গেলো?

তবে পুলিশ বনাম নিহতের পরিবার, এই দুইয়ের মাঝখানে আছে আরেকটি দল। সেটা হলো, ব্রাহ্মণবাড়িয়া ট্যাঙ্কলরী মালিক সমিতি। এই কথায় পরে আসছি। তার আগে বলি, শনিবার (০২.০৭.২০১৬) তিনজন নিহতের ঘটনায় দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যাবস্থা গ্রহণের জন্য মানববন্ধন করার কথা ছিল কয়েকটি সংঘঠনের। কিন্তু এর আগেই পুলিশ ও নিহতের পরিবারের এমন সিদ্ধান্তে হতবাক মানববন্ধনের আয়োজকরাও। তবে এই মিমাংসায় কতটা তৃপ্ত নিহতের পরিবার? নিহত সাংবাদিক আজম রাজুর স্ত্রী জানিয়েছেন, ট্যাঙ্ক লরী মালিক সমিতি যা বলে তাই মেনে নিতে হচ্ছে, এ ছাড়া আমার কোন উপায় নেই।

যেকোন কারণেই হোক, এভাবে যদি প্রতিনিয়ত অপরাধীকে বিচারের কাঠগড়ায় না দাঁড় করিয়ে তাকে প্রশ্রয় দিয়ে অন্যায়কে মেনে নিতে হয় তাহলে বুঝতে হবে সেই দিন বেশি দূরে নয় যেদিন কেয়ামত সমন্ধে কোরআনের আয়াত বাস্তবে রুপ নেবে।

লেখক: সাংবাদিক

ই-মেইল send2khokon@gmail.com
০১৭২৬ ৩৩৫০৮৬