ক্যাটেগরিঃ ইতিহাস-ঐতিহ্য

 

বাংলাদেশ ছাড়ার পর থেকে এখন আর কলাম, গল্প, ফিচার, কবিতা খুব বেশি একটা লিখিনা।  প্রবাসে এসে মাত্র দুটো গান লিখেছি তাও রিলিজ হয়ে গেছে গত ঈদে। এফ সিরিজের ব্যানারে। ব্যাস্ততার কারণে কলম ধরা হয়না। লিখবো সে তো সময়ের প্রয়োজন। তাই অনেক দিন পড় ব্লগে এলাম জুতা নিয়ে। আজ থেকে প্রায় চল্লিশ হাজারেও বেশি বছর আগে আমাদের পুর্বপূরুষেরা নুড়িপাথর, বালি দিয়ে অনুপযোগি আবহাওয়া থেকে তাদের পা’কে রক্ষা করতে প্রথমে পা ঢাকতে শুরু করেন। তাদের ব্যাবহারের জন্য তখন পরত সেন্ডেল জাতীয় জুতা।

যতদূর জানা যায় সে জুতো  প্রথম আবিস্কার হয়েছিল মিশরে। পেপাইরাস নামক এক গাছের পাতা দিয়ে সেন্ডেল বানানো হত। ইতিহাসের অনেক সমালোচক ধারণা করেন মিশরীয়রাই প্রথম প্রফেশনাল জুতা তৈরি শুরু করেন। এরপর পার্সিয়ানরা নরম চামড়া দিয়ে জুতা তৈরি করেছিল। আবার অনেকে ধারণা করেন ঠিক একই ধরনের জুতা একই সময়  ব্যবহার করত গ্রীস, রোমান ও মেসোপটেমিয়ানরা। সে সময়কার জুতার কোন ডান-বাম পার্থক্য ছিল না। জুতার মানের উপর নির্ভর করত সামাজিক মান মর্যাদা। জুতা বহন করার জন্য সে সময় অনেকে ক্রীতদাস রাখতেন। নানান অনুষ্ঠানে এসব দাস-দাসীদের কাজ ছিল জুতা সংরক্ষণ করা ও মনিবের পা ধুয়ে দেয়া। আবার নিষেধ ছিলো ক্রীতদাস থাকা অবস্থায়, ক্রীতদাসরা জুতা ব্যাবহার করতে পারত না।

চিত্র: জুতা আবিষ্কারের প্রথম দিককার নকশা

অন্যদিকে শাস্তি দেওয়ার জন্য ক্রিমিনালদেরকে পরানো হত কাঠের তৈরি এক প্রকার হেভি ওজনের বড় জুতা যাতে তারা পালাতে না পারে। সে সময় মধ্যযুগে শুধুমাত্র পা ঢাকতে পেরেই থেমে থাকেনি। নানা রকমারি ডিজাইনের জুতা তৈরির কায়দাও রপ্ত করেছিল।  কিছু মানুষ সেন্ডেল পরিত্যাগ করে বুট জাতিয় জুতা পরা শুরু করে। মধ্যযুগের শেষের দিকে  জুতার উপর বিভিন্ন কারুকাজ করে অলংকারের কাজ শুরু করেন। আমেরিকার আদিবাসি রেড ইন্ডিয়ান এবং এস্কিমোরা বুট জাতিয় জুতা ব্যবহার করত।

খুব বেশি দিনকার কথা নয়,  চার’শ বছর আগ পর্যন্ত আমেরিকাতে মানুষ শুধু এক ধরনের জুতাই পরত। প্রথম আমেরিকাতে সু-মেকার নিয়ে আসে থমাস বিয়ার্ড নামের এক ভদ্রলোক এবং নিজেও  সুমেকার ছিলেন। ১৫’শ সালের শেষের দিকে তিনি প্রথম লন্ডন থেকে জুতা তৈরির কারিগর নিয়ে আসেন। এরাই পরবর্তিতে জুতার মান উন্নয়ন সহ বিভিন্ন প্রকার মেশিনারি আবিস্কার করে অনেক  জুতা বাজারজাত করা শুরু করে। তারই ধারাবাহিকতায়  লাইমেন ব্লেইক প্রথম জুতার বিভিন্ন অংশ জোড়া দেবার মেশিন আবিস্কার করেন। গর্ডন মেকাই জুতার উপরিভাগের সাথে তলার সংযোগের উন্নয়ন করেন।

১৮’শ সালে গোড়ার দিকে জন এডাম ডাগির প্রথম জুতার ফ্যাক্টরী চালু করেন। জান মেটলিঞ্জার সেসময় যে জুতা তৈরির মেশিন আবিস্কার করেন তা দিয়ে প্রতিদিন ৭০০ জুতা তৈরী করা যেত। যখন হাতে জুতো বানানো হতো কেউ তখন কোনদিন ভাবতেও পারেনি যে শুধুমাত্র মেশিন দিয়ে কখনো জুতা তৈরি করা সম্ভব। ১৬’শ সালের কথা; ফ্রান্সের মেয়েরা তখন হাই হিল পরা শুরু করে। উচ্চ বিলাসিতা  শ্রেণীর মেয়েদের তখন প্রত্যেকের প্রায় ২০ জোড়া জুতা থাকত।

প্রতিটি ভিন্ন অনুষ্ঠানে তারা আলাদা ধরনের জুতা ব্যাবহার করত। তবে বর্তমানে আমেরিকার ধনাঢ্য পরিবারে লোকেরা তাদের উচ্চমূল্যের জুতা সংরক্ষণের জন্য আলাদা ওয়াকিং রুম ব্যবহার করে থাকে যার তাপমাত্রা বিশেষভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হয়। তবে একটি চরম সত্য বিষয় হলো ক্রয় ক্ষমতার বাইরে থাকায় পৃথিবির বেশিরভাগ মানুষ এখনো জুতা ব্যবহার করেনা।

সাংবাদিক ও কলামিস্ট

খোরশেদ মাহমুদ

ইউনিট ফাইভ, হেমার্স্কাল, সাউথ আফ্রিকা