ক্যাটেগরিঃ মতামত-বিশ্লেষণ

 

ভালবাসা অপার্থিব। স্বর্গীয়। শান্তিময়। সুখ ও সমৃদ্ধির সোপান। আর ভালবাসার সূতিকাগার পরিবার। যাদের ভালবাসায় আমাদের সৃষ্টি সেই পিতা-মাতা কত আদর যত্নে আমাদের প্রতিপালন করেন।অতুলনীয় তাদের ভালবাসা। আমাদের ভালবাসার প্রথম আধার।ভালবাসার এ ঋণ আজীবন অপরিশোধ্য। যে সন্তান পিতা-মাতাকে ভালবাসে না সে অন্যকেও ভালবাসতে শেখে না। তার ভালবাসায় অপূর্ণতা থাকতে বাধ্য।নিখাদ ভালবাসার স্বরূপ সে অনুধাবনে ব্যর্থ। যে আশা-আকাঙ্খা নিয়ে পিতা-মাতা সন্তান প্রতিপালন করেন, সন্তানের উচিত তা রূপদান করা। যে সন্তান পিতা-মাতার হৃদয়ের ভাষা উপলব্ধি করতে পারে না, অন্যের হৃদয়ে সে প্রবেশ করতে পারে না। কৃত্রিমতার আবরণে তার হৃদয় ঢাকা থাকে। কোন পিতা-মাতাই চান না, তাদের সন্তান খারাপ থাকুক। যথাসাধ্য তারা তাদের সন্তানের মঙ্গল কামনায় সচেষ্ট থাকেন। পারিপার্শ্বিকতা ও সামর্থ্যের ভিন্নতার কারণে অনেকেই হয়ত সন্তানের আশা-আকাঙ্খার রূপায়নে পেরে ওঠেন না।

সন্তানকে তা উপলব্ধি করতে হবে। বাস্তবতা অনুধাবন করতে হবে। পিতা-মাতার সুখ-দু:খকে ভাগ করে নিতে হবে।এতে পিতা-মাতার প্রতি সন্তানের প্রকৃত ভালবাসা বিকশিত হবে।বাস্তব বুদ্ধির বিকাশ ঘটবে। অপরের সুখ-দু:খ উপলব্ধির অনুশীলন হবে। সংকীর্ণতা, স্বার্থপরতা ও ভেদবুদ্ধির সৃষ্টি হবে না।ঘাত-প্রতিঘাত ও দু:খ-কষ্ট মোকাবিলা করার মানসিকতা গড়ে উঠবে। পরিবারে ভাই-বোন থাকলে ভালবাসার বন্ধনে আবদ্ধ থাকতে হবে। সকলেই একই পরিবারে একই পিতা-মাতার আদরের ধন। সকল সন্তান যেমন পিতা-মাতার নিকট সমান আদরের, অনুরূপভাবে সকল সন্তানের নিকট সমান ভালবাসা পিতা-মাতার প্রাপ্য।

এখানে বরং সন্তানদের মধ্যে কে কত পিতা-মাতাকে ভালবাসতে পারে, তার সুস্থ্য প্রতিযোগিতা থাকা উচিত।এতে ভালবাসার প্রতিযোগিতায় যে অনাবিল আনন্দ আছে, তার বিকাশ ঘটবে।ভাই-বোনের মধ্যেও পারস্পরিক ভালবাসার বন্ধন দৃঢ় ও মজবুত হওয়া প্রয়োজন, যেন স্থুল সংকীর্ণতা, স্বার্থপরতা ও ভেদবুদ্ধির সৃষ্টি না হতে পারে।একে অপরের হৃদয়ের ভাষা বুঝতে হবে।পরস্পরের সুখ-দু:খ ভাগ করে নেয়ার মানসিকতা অর্জন করতে হবে। ছোট-খাট ত্রুটি-বিচ্যুতি ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখতে হবে। এতে উদার মানসিকতা গড়ে উঠবে।ভাই-বোনদের মধ্যেও ভালবাসার সুস্থ্য প্রতিযোগিতা থাকা প্রয়োজন যেন, কে কত বেশি কাকে ভালবাসতে পারে। এতে মনকে বড় করার সুযোগ সৃষ্টি হবে। মন বড় না হলে বিশাল পৃথিবীতে বাস করেও নিজেকে সংকীর্ণ গণ্ডীবদ্ধ রাখা হবে।শতকোটি লোকের মধ্যে থেকেও নিজেকে একা মনে হবে। বড়কে শ্রদ্ধা-ভক্তি ও ছোটকে আদর-যত্ন করার অনুশীলন ভাই-বোনদের মধ্যে গড়ে ওঠে। পরিবারে সন্তান যখন উপযুক্ত হয়ে বিবাহ করে, ছেলে হলে অন্য পরিবার থেকে স্ত্রী নিয়ে আসে এবং মেয়ে হলে অন্য পরিবারে স্ত্রী হিসেবে গমন করে। চিরন্তন এ রীতি সমাজের ভিত্তিভূমি।

যখন অন্য পরিবারের আদরের কন্যাসন্তানকে স্ত্রী হিসেবে নিয়ে আসা হয়, সে পবিবারের আদরণীয় সদস্য হয়ে যায়। কী সামাজিকভাবে, কী আইনগতভাবে তাকে আর পর ভাবার অবকাশ বা যুক্তি নেই। সে তার অতি আদরের পিতা-মাতা, ভাই-বোন, আত্মীয় স্বজন ছেড়ে অজানা-অচেনা পরিবেশে স্বামীর সংসারে চিরজীবনের জন্য চলে আসে।এটাই তার নিজের সংসার। এক্ষেত্রে তার ব্যথা ও কষ্ট স্বামী ও স্বামীর পরিবারের সকল সদস্যকে আন্তরিকভাবে উপলব্ধি করতে হবে। তাকে যেমন আপন করে নিয়ে আসা হয়েছে, ভালবাসা দিয়ে তার অন্তরকে পূর্ণ করে দিতে হবে। সেও তখন সকলের সঙ্গে ভালবাসার প্রতিযোগিতায় নিজেকে উজার করে দিতে পারবে। স্বামীসহ শ্বশুড়-শ্বাশুড়ি, দেবর-ননদ সকলকে ভালবাসার পবিত্র বন্ধনে আবদ্ধ করতে পারবে।এভাবেই পরের মেয়ের উপর আপন সম্পর্কের ভিত্তি রচিত হয়ে থাকে।পরিবারের কনিষ্ঠ সন্তানেরাও পরকে আপন করার আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়। এভাবে ভেদবুদ্ধি তিরোহিত হয়। স্ত্রী নির্যাতনের মতো পাশবিক প্রবৃত্তির জন্ম হতে পারে না। পরিবারে যে কাজের লোক বা ছেলে-মেয়ে থাকে, তাকেও পরিবারের সদস্য ভাবতে হবে। নিজের অনুভূতি দিয়ে তার সামর্থ ও সুখ-দু:খ উপলব্ধি করতে হবে। ভালবাসার বন্ধনে তাকেও আবদ্ধ করতে হবে।

বাস্তব সত্য হলো, সকলেই মানুষ, কিন্তু সমান সুযোগ-সুবিধা নিয়ে জন্মগ্রহণ করে না।পারস্পরিক সহযোগিতার সমন্বয়ে সমাজের সৃষ্টি হয়েছে। সুতরাং পারস্পরিক সহযোগিতার বিষয়টি জীবনের সর্বক্ষেত্রে উপলব্ধি করে এর প্রয়োগ ঘটাতে হবে। যে পরিবারে কাজের লোকের প্রতি দুর্ব্যবহার ও বৈষম্যমূলক আচরণ করা হয়, সে পরিবারের সন্তানেরা শৈশব থেকেই অহংকার, নীচতা, সংকীর্ণতা, স্বার্থপরতা, হিংসা-বিদ্বেষ, নিষ্ঠুরতা ও মানুষকে অবজ্ঞা করার মতো ভয়ঙ্কর অমানবিক দোষগুলি নিজেদের অবচেতন মনেই আয়ত্ব করতে থাকে। আর এগুলো নিজেদের পিতা-মাতা, ভাই-বোন ও পরবর্তীতে নিজের স্ত্রী-পুত্র-পরিজনসহ সকলের প্রতি প্রয়োগ করতে দ্বিধাবোধ করে না। পরিবারে যদি ভালবাসাপূর্ণ পরিবেশ বিরাজিত থাকে, সে পরিবার সুখের আগার। সে পরিবারের সদস্যগণ সংকীর্ণ স্বার্থের উর্ধ্বে উঠে পারস্পরিক ভালবাসার অনাবিল বন্ধনে আবদ্ধ থাকায় সেখানে কোনপ্রকার হিংসা-বিদ্বেষ, ক্রোধ, ঘৃণা, হানা-হানির মতো জঘন্য প্রবৃত্তিগুলো জন্ম নিতে পারবে না। তারা নিজেদের চরিত্র মাধুর্যে আত্মীয়স্বজন, বন্ধু-বান্ধব, পাড়া-প্রতিবেশী, গ্রামবাসী, দেশবাসী ও বিশ্ববাসী সকল মানুষকে আপন করে নিতে কুণ্ঠাবোধ করবে না। সকল মানুষ হয়ে উঠবে তাদের আপনজন।

এভাবেই সমগ্র বিশ্ববাসীকে ভালবাসার বন্ধনে আবদ্ধ করতে হবে। ভালবাসাকে নিজেদের পরিবারে জন্ম দিয়ে লালন করে ছড়িয়ে দিতে হবে বিশ্বময়।