ক্যাটেগরিঃ ধর্ম বিষয়ক

 

প্রায় ২০০ বছর আগের কথা। বর্তমান লক্ষ্মীপুর জেলার রায়পুর উপজেলা ছিল মেঘনার মোহনা হতেলক্ষ্মীপুর জেলার রায়পুর উপজেলা জ্বীনের মসজিদ ডাকাতিয়া নদীর বুকে জেগে উঠা বিশাল এক চরভূমি। তখন মধ্য প্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ হতে অনেক বিজ্ঞ মুসলিমজনেরা এই রায়পুরে শাস্তির ধর্ম ইসলাম প্রচার করতে এসেছেন। আনুমানিক ১৮২৮ইং (বাংলায় ১২৩৫ সাল) এ মৌলভী আবদুল্লাহ জন্ম গ্রহণ করেন এখানের এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে। শিশু আবদুল্লাহর ধর্মজ্ঞানে প্রবল আগ্রহ ও আধ্যাত্মিকতার জন্য তার পরিবার হতে ভারতের দেওবন্দ মাদ্রাসায় দারুল উলমে ভর্তি করানো হয়। সেখানে তিনি ১৭ বছর জ্ঞান অর্জনের পরে দেশে ফেরার সময় দিল্লীতে কিছুদিন অবস্থান করেন। দিল্লীর শাহী জামে মসজিদের শৈল্পিকতায় মুগ্ধ হয়ে তিনি দেশে ফিরে হুবাহু তেমন একটি মসজিদ নিমার্ণের কাজে হাত দেন। মসজিদটির ভিটি ১৫ ফুট। মসজদটির তিনটি বিশালাকর গুম্বুজ এবং দৈর্ঘ্য ১১০ ফুট ও প্রস্থ ৭০ ফুট প্রায় এবং মসজিদটির দেওয়ালের প্রস্থ ৮ ফুট। ১৮৮৮ সালে স্থাপিত লেখা থাকলেও প্রকৃত অর্থে মসজিদটি কখন স্থাপন করা হয় তা কেউ নির্দিষ্ট করে বলতে পারেনা।

মৌলভী আবদুল্লাহ দিল্লীর শাহী মসজিদের ন্যায় ১৬ গম্বুজের পরিকল্পনা করেন যাহা বর্তমানে ৩ গম্বুজে সমাপ্ত হয়। চুন-সুরকি আর ইট-পাথরে নির্মাণাধীন মসজিদটির বাহিরের একেকটি পিলারের বেড় প্রায় ২৪ ফুট । সামনের বারান্দা ভিতরের ডিজাইন সবই দিল্লীর শাহী মসজিদের অনুকরণে নির্মিত হয়।

মজার দিক হচ্ছে মসজিদটির তলদেশ মানে আন্ডার গ্রাউন্ডে প্রথম গম্বুজের নিচের অংশে রয়েছে ৪টি বিশালাকার পিলারের চুন-সুরকি দ্বারা তৈরি গোপন কামরার ইবাদতখানা, যা দিল্লীর নিকটবর্তী আল্লামা মাওলানা রশীদ আহম্মদ গঙ্গহিরের গোপন ইবাদতখানার অনুকরণে তৈরি। তিনটি গোপন কামরায় বসে আল্লাহর ধ্যানে গভীরভাবে মগ্ন মুমিনেরা রাতভর ইবাদত করতেন এবং সেখানে সর্বদা ইবাদত করতেন মৌলভী আবদুল্লাহ।
আরো একটি আকর্ষণ হলো মসজিদের তলদেশে রয়েছে পুকুর যাহা অন্ধকারে আচ্ছন্ন যেখানে নাকি জ্বীনের অযু করে এ মসজিদে নিয়মিত নামাজ আদায় করতো। রাতের গভীরে তারা মানুষের আকার ধরে মসজিদে বসে আল্লাহর ইবাদত, তাদের জিকিরের আওয়াজ ভেসে আসত।
আমার দাদার মুখে শুনেছি মসজিদটি নির্মাণের কাজ মৌলভী আবদুল্লাহ তার কিছু জ্বীন শীর্ষদের ভাগ করে দেন। যাহা তাহারা রাতের আঁধারে সম্পূর্ণ করতো। মসজিদের সম্মুখে অসম্পূর্ণ ২৫ ফুট উচ্চতার মিনারটি নাকি সম্পূর্ণ না হতেই মৌলভী সাহেব জ্বীনদেরকে বাঁধা প্রদান করেন। কথিত আছে ঐ মিনারের ব্যাবহৃত ইট বালির টাকা নাকি জ্বীনেরা পুরোপুরি পরিশোধ করতে পারছিলনা। তাই মৌলভী সাহেব মিনারের নির্মাণ কাজ স্থগিত করে দেন। এজন্য নাকি জ্বীনের মসজিস নামকরন হয়। আবার সাধারণ মানুষ নাকি বহুবার জ্বীনকে তাদের কাতারে নামাজ আদায় করতে দেখেছে সেজন্যও নাকি জ্বীনের মসজিদ নাম চলে আসে।

জৌনপুরের পীর সাহেবও নাকি জ্বীনদের সে সময় দেখেছেন এ মসজিদের কাজ করতে। কিন্তু জ্বীনরা ইট বালি সিমেন্টের টাকা পরিশোধ না করে মসজিদ তৈরি করছে জেনে তিনি বাধা দেয়ায় জ্বীনেরা মসজিদের কাজ ফেলে চলে যায়। ১৬ গম্বুজবিশিষ্ট দিল্লীর জামে মসজিদের হুবহু অনুকরণে তৈরি মসজিদের ভিটির ওপরে ৩ ফুট পর্যন্ত কাজ করিয়েছেন মৌলভী আবদুল্লাহ। বাকি অংশ স্থানীয় মুসল্লি ও জনগণের দান ও সহযোগিতায় সমাপ্ত হয়। এরপর তিনি মারা গেলে তার পুত্র আল্লামা মাওলানা মোহাম্মদ উল্যা দেওবন্দ মাদ্রাসা থেকে সর্বোচ্চ ডিগ্রি নিয়ে দেশে ফেরার পর তার ওপর অর্পিত দায়িত্ব অনুসারে তিনি মসজিদের তিন গম্বুজের কাজ সমাপ্ত করেন। তারপর তার ছোট ভাই মাওলানা ছালামত উল্যা ৩ গম্বুজের কার্নিশ সিঁড়ি দানবাক্স নির্মাণ করেন। পুকুরের ঘাটলা দুইটা ও পাঁচটা বাথরুম মাওলানা আবদুল্লাহ করে গেছেন।
বর্তমানে মসজিদটিতে একসঙ্গে প্রায় পাঁচশত (৫০০) মুসল্লি নামাজ আদায় করতে পারেন। মসজিদের বর্তমান খাদেম নারায়ণগঞ্জ বন্দর ইসলামিয়া ফাজিল মাদরাসার (অব.) প্রিন্সিপাল মওলানা মোহাম্মদ উল্যা মাহমুদী, যিনি আল্লামা মাওলানা মোহাম্মদ উল্যা সাহেবের পুত্র এবং আল্লামা মৌলভী আবদুল্লাহ সাহেবের নাতি। তিনি জানান, ১৯৮০ সালে তৎকালীন সরকারের আর্থিক সহায়তায় মসজিদের উন্নয়ন কাজ শুরু হয়। ক্রমান্বয়ে ১৬ গম্বুজের কাজ শেষ হওয়ার মধ্য দিয়ে উন্নয়ন কাজ সমাপ্ত হবে। তিনি আরও জানান, এই মসজিদ পরিদর্শনে মহাত্মা গান্ধী ও ইন্ধিরা গান্ধী ১৯৪৬-এর হিন্দু মুসলিম সামপ্রদায়িক দাঙ্গা বন্ধের পর এবং ১৯৪০ সালে ডব্লিউ ডব্লিউ হান্টার এসেছিলেন। এছাড়াও বিশিষ্ট ইসলামী চিন্তাবিদ হুসেইন আহম্মদ মাদানী, সুলতান আল মাদানী, নওয়াব ছলিমুল্লাহ মসজিদের ইমাম মাওলানা বরাত বলাকী, মদিনা থেকে হাফেজ তোয়াহা আবদুল্যাহ সাহেবের মেয়ের জামাতা হাজী শরীয়ত উল্যাহর বংশধর পীর বাদশা মিয়া এসেছিলেন এ মসজিদ পরিদর্শনে।

এটি রায়পুর পৌর শহর থেকে প্রায় নয়শত গজ পূর্বে দেনায়েতপুর গ্রামে পীর ফয়েজ উল্যা সড়কের দক্ষিণ দিকে মনোরম পরিবেশে অবস্থিত। এ মসজিদটির পরিচর্যার জন্য একজন ইমাম ও খোৎবা ইমাম রয়েছেন। পবিত্র এই মসজিদটির নান্দনিক রূপায়ন ও অদ্ভুত অবকাঠামো এবং শৈল্পিক অবয়বের দিক থেকে এটি লক্ষ্মীপুর জেলায় একটি প্রাচীন নিদর্শন। এর নির্মাণ কৌশল ও স্থাপত্য দেখতে প্রতিদিন হাজার পর্যটকের সমাগম ঘটে। আপনিও আসতে পারেন মসজিদ-ই জামে আবদুল্লাহ বা জ্বীনের মসজিদের সৌন্দর্য অবলোকন করতে।