ক্যাটেগরিঃ ভ্রমণ

 

ডিসেম্বর ২০০৮, সামনে ঈদ। ছুটি আছে কযেকদিন। এর সাথে একদিন ছুটি নিয়ে শুক্রবার যোগ করলে ৫ দিনের টানা একটা ছুটি হয়। চিন্তা করলাম কথাও ঘুরে আশা যায়। যেই ভাবা, সেই কাজ, ফোন দিলাম আমাদের সবার প্রিয় শান্তূনু ভাই কে। ওস্তাদ সাথে সাথে রাজি। জুটে গেল আরো কযেকজন। দেখতে দেখতে ১২ জনের একটা গ্রুপ হয়ে গেল। ঢাকা শহর এর যান্ত্রিক জীবন থেকে কিছু দিন এর জন্য নিস্তার পাবার এই একটা সুযোগ।

যাব কই? একেক জনের একেক মত। শেষমেষ ঠিক হলো বান্দরবান। আমাদের টিম লিডার শান্তূনু ভাই চোখের নিমিষেই বাসের টিকেট, বান্দরবান এ হোটেল রুম বুকিং সব সেরে ফেলল।

অবশেষে আসলো যাবার দিন। সবাই সময় মত বাস কাউন্টার এ এসে হাজির। চোখে মুখে সবার এডভেঞ্চার এর গন্ধ। বাস ছাড়ল ২০ মিনিট দেরী করে। শুরু হলো আমাদের “এস্কেপ ফ্রম ঢাকা”।

বান্দরবান পৌছালাম সকাল ১০ টায়। হোটেল এ উঠেই গোসল সেরে বসলাম নাস্তা খেতে। রুটি, ভাজি আর ডিম খেতে অমৃত এর মত লাগছিল। ততক্ষণে আমাদের লোকাল গাইড কবির ভাই চলে এসেছে। শান্তূনু ভাই এর সাথে আলাপ হছে আমাদের স্পট নিয়ে। আমরাও যোগ দিলাম, স্পট ঠিক হলো চিম্বুক, নীলগিরি, নীলাচল, শৈল প্রপাত, রিজুক ঝরনা ও বগা লেক।

নাস্তা সেরে, চা পর্ব শেষ করেই বেরিয়ে পরলাম। আজকে যাব চিম্বুক ও নীলগিরি। পথেই পরবে শৈল প্রপাত। পাহাড়ের আকা বাকা পথে গাড়ি চলতে শুরু করলো। প্রকৃতি এখানে অন্যরকম, যেখানেই তাকাই, শুধু সবুজ আর সবুজ। লিখে এই সৈন্দর্য প্রকাশ করা সম্ভব না।

চিম্বুক পৌছে হালকা নাস্তা করলাম। এখানে মেঘ ছুতে পারবেন চাইলে। নীলগিরি পৌছে অবাক হয়ে গেলাম। মনে হছে পৃথিবীর সমস্ত সৈন্দর্য যেন এই জায়গায় এসে স্থির হয়ে আছে। পুরো বান্দরবান শহর দেখা যায় এখান থেকে। উপভোগ করতে পারবেন সাঙ্গু নদীর একা বাকা পথ। অসাধারণ দৃশ্য।

সন্ধায় হোটেল এ ফিরে কিছুক্ষণ আড্ডা মেরে কেউ কেউ শুয়ে পড়ল। কেউ আবার ভোর রাত পর্যন্ত আড্ডা চালু রাখল।

বগা লেক যাব, তাই উঠলাম ভোর ৫ টায়। নাস্তা সেরে গাড়িতে উঠলাম, গন্তবো খেয়া ঘাট। সেখান থেকে ইঞ্জিন বোট এ রুমা বাজার। খেয়া ঘাট পৌছে আর্মি কাম্পে নাম লেখালাম। তারপর উঠে বসলাম বোটে। শুরু হলো একটি রোমাঞ্চকর যাত্রা। সাঙ্গু নদী, খুব সুন্দর। একে বেকে বয়ে যাছে আপন মনে। দুই পাশে পাহাড়। ইঞ্জিন বোট এর শব্দ ছাড়া কোনো শব্দ নেই। অদ্ভূত এক অনুভূতি। প্রায় ২ ঘন্টা লাগলো রুমা বাজার পৌছাতে। তখন প্রায় ২ টা বেজে গেছে। দুপুরের খাবার সারলাম একটি হোটেলে। চাদের গাড়ি ভারা করে রওনা দিলাম বগা লেকের উদ্দেশ্যে। এ যেন আরেক এডভেঞ্চার, যাকে বলে এক্সট্রিম বাম্পি রাইড। এই রাস্তা টা অন্যরকম। পাহাড়ি এবরো থেবরো রাস্তা, হাটু পানি, গাছ গাছালি কি নেই এখানে। অসাধারণ। গাড়ি আমাদের নামিয়ে দিল যেখানে, সেখান থেকে বগা লেক আরো প্রায় 4০০ ফুট উপরে। কিন্তু পাহাড়ি রাস্তায় টা যেন ১০০০ ফুট এর মত লাগছে। উঠছি তো উঠছিই, পথ যেন শেষ হয় না। অবশেষে যখন বগা লেক পৌছালাম তখন সন্ধা হয়ে গেছে, প্রচন্ড ক্লান্ত। কিন্তু লেক টা চোখে পরতেই সেই ক্লান্তি নিমিষেই উধাও। পাহাড়ের উপরে এরকম বড় একটা লেক, এ যেন এক রুপকথা।

বগা লেক পারায় বম উপজাতিই বেশি। তাদের ঘর গুলোই হছে থাকার হোটেল। যাই হোক, রাতে খেতে বসে আরেকটা এক্সপেরিয়েন্স হলো, জুম চাষের ভাত খেলাম, একটু শক্ত কিন্তু খেতে ভালই লাগলো। সাথে খেলাম পুই শাক আর ডিম ভাজা। পেট এ খিদা, তাই খেলাম মন ভরে। রাত এ একটা গ্রুপ আয়োজন করলো গান বাজনার। পাশে বিশাল লেক আর গিটার এর মুর্ছনায় মন টা অন্যরকম হয়ে গেল। সারা রাত জেগে, হই হুল্লোর করে কাটিয়ে দিলাম। এ এক অসাধারণ অনুভূতি।

এবার ফেরার পালা। মনটাই খারাপ হয়ে গেল। চলে যেতে হবে এই অপুরূপ সৈন্দর্যের লীলাভূমি ছেরে। কিন্তু কিছু করার নাই। যেতে হবেই। রওনা করলাম একটাই উদ্দেশ্য নিয়ে, আবার এসব এখানে।