ক্যাটেগরিঃ দিনলিপি

স্কুলের গণ্ডী পেরিয়ে কৈশরের সব বন্ধুরা গ্রামছাড়া হয়েছি বহুকাল আগে। আমি চলে আসি ঢাকায়। কৈশরের টগবগে আবেগের কারনে প্রথম প্রথম খুব খারাপ লাগত। এর প্রতিক্রিয়ায় হাতে তুলে নেই বিড়ি। রাজধানীর রাজপথে সিনা টান করে বিড়ি ফুঁকে এক ধরনের স্বাধীনতার স্বাধ পেতাম। যাই হোক, সময়ের সঙ্গে ধীরে ধীরে আবেগ হ্রাস পেতে থাকে। এক পর্যায়ে তা বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য ঘটায় খারাপ লাগার মাত্রাও কমে যায়। নিজেকে খাপ খাইয়ে নেই শহুরে জীবনের সঙ্গে।

অনেকদিন কৈশরের কোনো বন্ধুর সঙ্গেই দেখা হয় না। কৈশর জীবনে বেড়ে ওঠা জায়গাগুলোর প্রতি দুর্বলতা থেকে এখনো প্রতিবছরই গ্রামে যাই। কাওকেই না পেয়ে একাকী স্মৃতিজড়িত জায়গাগুলোতে খুঁজে ফিরি পুরনো স্মৃতি। দু-একদিন ভাল লাগে, তারপর জীবিকার তাগিদে চলে আসি ঢাকায়।

২০১০ সালের জানুয়ারিতে গ্রামে গেলে হঠাৎ করে দেখা হয়ে যায় বাল্য বন্ধু পলাশের সঙ্গে। তারপর দুজন মিলে ঘুরে বেড়াই মাঠেঘাটে, বন বাঁদারে, কখনো বা নদীর কুলে।

একদিনের ঘটনা এক জ্যেস্নাস্নাত রাতে আমরা বসে ছিলাম নদীর কূলে বাধা একটি নৌকায়। সঙ্গে ছিল প্যাকেট ভর্তি সিগারেট। গল্পের এক পর্যায়ে ওঠে আসে পলাশের বিয়োগাত্মক প্রণয় কাহিনী। কাহিনীর আবেগঘন মুহুর্তে পলাশের তামাকপানের ইচ্ছে জাগে। সিগারেটে জ্বালাতে গিয়ে উপলব্ধি হয়-আমরা সঙ্গে কোন অগ্নিসংযোগের বস্তু আনি নি। দুজনেরই মনটা খুব খারাপ হয়ে যায়। হঠাৎ আমাদের থেকে কিছুটা দুরে এক লোককে দেখলাম। তিনি তখন প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিচ্ছিলেন। মুখমণ্ডল সমেত পুরো দেহটা চাদরে ঢাকা থাকলেও লোকটার মুখে ছিল জ্বলন্ত সিগারেট। শিগগিরই আগুন পাওয়ার সম্ভবনায় পলাশের চোখমুখ উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। দুজনেই গেলাম তার কাছে। পলাশ লোকটার খুব কাছে গিয়ে বললো, ‘চাচা… ! ও… চাচা…! মোতেন নাকি? যাইহোক কামডা শ্যাষ হলে আগুনডা দিয়া যাইয়েন।’

ফিরে এলাম নৌকায়, কাহিনী আবার শুরু হলো। কিছুক্ষণ পর দেখতে পেলাম, বহু কাঙ্খিত আগুন নিয়ে লোকটা আমাদের দিকে এগিয়ে আসছে। প্রায় কাছাকাছি আসামাত্র আমাদের স্কুল শিক্ষক নিতীশ স্যারের মুখটা স্পষ্ট হয়ে উঠলো। গল্পে মশগুল পলাশ ব্যাপারটা খেয়াল করে নি। আমি ওকে বললাম, ‘তুই থাক আমি আসছি! এক মিনিট।’

দ্রুত নেমে নৌকার অপর পাশে চলে এলাম আমি। আড়াল থেকে শুনতে পেলাম স্যার পলাশকে বলছেন, কিরে আগুন লাগবে না তোদের, নে ধর আগুন নে। আর একটা গেল কোথায়?
স্যারের কথা শেষ হতে না হতেই ধপাস করে পানিতে কিছু একটা পড়ে যাওয়ার শব্দ শুনতে পাই। আড়াল থেকে বের হয়ে দেখি পলাশ পানির মধ্যে। দ্রুত পালাতে গিয়ে ও পানিতে পড়ে যায়। আমি আর স্যার মিলে ওকে কূলে টেনে তুললাম। স্যার বলল, ‘তোরা এখনো ছোটই রয়ে গেছিস।’

আমরা বাড়িতে ফিরতে শুরু করলাম। পথে আমার চাপা হাসি আর পলাশের কটূ বাক্য সমানতালে চলতে লাগল।