ক্যাটেগরিঃ আন্তর্জাতিক, ফিচার পোস্ট আর্কাইভ

আমেরিকা বার্মায় গনতন্ত্র পুনর্জাগরণের জন্য উদার হস্তে ঝাঁপিয়ে পড়েছে, ইউরোপের নানান দেশ থেকে সাহায্য-সহযোগিতার অঙ্গীকার বগলদাবা করছেন অংসান সুচি, আর অন্যদিকে ইউএন ও ইউএস বাংলাদেশেকে অনুরোধ জানাচ্ছে রোহিঙ্গাদের গ্রহণ করতে। বার্মার সাথে পশ্চিমাদের সম্পর্ক যখন এতই জমে উঠেছে তখন কেনো তারা তাদের বলতে পারে না রোহিঙ্গা উৎখাত থামাতে? পররাষ্ট্রমন্ত্রী দীপু মনি এই কথাটিই বলেছেন কাল সংসদে। আমি তার সাথে ১০০% একমত।

পশ্চিমারা যেহেতু চায় বার্মা থেকে সকল রোহিঙ্গা উৎখাত করতে সেহেতু বৌদ্ধ ধর্মের শান্তিপূর্ণ অনুসারীরা রোহিঙ্গাদের গায়ের রঙ ও দেখতে কুশ্রী বলে যখন ফেসবুক ও মিডিয়াতে বর্ণবিদ্বেষী মন্তব্য করে যায় – সেসব ইউএনের চোখে পড়ে না। সমগ্র বার্মা জুরে চলছে রোহিঙ্গাদের প্রতি অবমাননামূলক ও অপমানজনক মন্তব্য ও জনমত সংগঠন, যে ভাষা ও বিদ্বেষ প্রকাশ পাচ্ছে – তা খুবই জঘন্য মানের রেসিস্টের পরিচয় বহন করে।

দু:খের বিষয় হলো আমাদের পার্শ্ববর্তী একটা রাষ্ট্রে যে এত ভয়াবহ রকমের রেসিজম বিরাজ করছিলো – আমরা সম্ভবত এতদূর ভাবি নাই। পশ্চিমারা এখন বার্মার দরজা ওপেন করে তাদের ভেতরে এই ঘৃনা ও বিদ্বেষ ঢুকিয়ে দিলো, নাকি তারা এমনই বরাবর বুঝতে পারছি না।

সপ্তদশ শতকে প্রায় ৮০ বছরের মত চট্টগ্রাম আরাকানের শাসনাধীন ছিলো। আরাকান যখন পর্তুগীজদের হাতে পদানত হয় তখন বঙ্গের (গৌড়ের শাসক) সমর্থনে রাজ্য পুনরুদ্ধার করেছিলো তখনকার আরাকান সম্রাট এমনকি মুসলমান নামও নিয়েছিলেন। চট্টগ্রাম অঞ্চলের বাঙালী ও আরাকানের রাখাইনদের মধ্যে সামাজিক সম্পর্ক, বিবাহ প্রথা থেকে শুরু করে সবকিছুতেই ঐতিহাসিক সুসম্পর্কের নিদর্শন বহন করে। একটা শঙ্কর জাতির উন্মেষ ঘটেছে বিগত ৫০০ বছর যাবত, বাস করেছে আরাকান আর পার্বত্য চট্টগ্রামে – যার প্রমাণ পাওয়া যায় বাংলাদেশ ভূখণ্ডেও উল্লেখযোগ্যসংখ্যক রাখাইনদের উপস্থিতি।

তারপরেও কেনো এই বর্নবিদ্বেষের উৎপত্তি? কিভাবে বার্মিজদের ভেতরে বাঙ্গালী বিদ্বেষের সূচনা ঘটলো? ইন্ডিয়ান-ধরণের চেহারা-সুরত দেখলেই বোঝা যায়, যেমন চেনা যায় বার্মিজ ধরনের বা সাধারণত মানুষ চাইনিজ-টাইপ বলে ধরে নেয় – এসব নিয়ে বাংলাদেশে কখনও বর্নবিদ্বেষী কথা শোনা যায়না। বাংলাদেশে বার্মিজদের মগ বলে, মগদের চেহারা দেখলে অনেকে প্রভেদ করতে পারে না তাও বলে থাকে কিন্তু সেজন্য তাদের আগলি বা কুৎসিত বলতে শুনি নাই। কিন্তু বার্মায় তো পরিষ্কার রোহিঙ্গারা বাঙালীদের মত দেখতে বলে তাদের বর্ণবিদ্বেষী মন্তব্য করে যাচ্ছে এবং যার সূত্র ধরেই ৮ লাখ রোহিঙ্গা নির্মূলের অভিযান চালাচ্ছে। ইউএস, ইউএন, অংসান সুচি নতুন একটা ভূ-রাজনৈতিক মেরুকরণ তৈরীর চেষ্টা চালাচ্ছেন বোঝাই যাচ্ছে – যার প্রধান ও একমাত্র লক্ষ্য বাংলাদেশ। এবং এটা ধারণা করা যায় এই নতুন ষড়যন্ত্রের অংশ হতে যাচ্ছে পার্বত্য চট্টগ্রাম ও রোহিঙ্গা – হয়তো নতুন কোনো রূপে। এর সূচনা করেছিলো বৃটিশরাই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় – রোহিঙ্গাদের রাখাইনদের বিরুদ্ধে লেলিয়ে দিয়ে যা পরবর্তীতে রাখাইনদের মধ্যে বর্নবিদ্বেষের জন্ম দেয় রোহিঙ্গাদের প্রতি।

পশ্চিমাদের কূটকৌশলের কাছে পর্যুদস্ত হতে যাচ্ছে বাংলাদেশ – ইউএস যেখানে বার্মা-ভারত নতুন বলয় তৈরী করে ঘিরে ধরছে চায়নাকে। জামাত ও ইসলামী জঙ্গী গ্রুপদের আরাকানে তৎপরতা ও পার্বত্য চট্টগ্রামে মাঝেমাঝে অস্থিরতা তৈরীর মাধ্যমে বড় ধরণের রাজনৈতিক ক্ষেত্র তৈরী করা সম্ভব পশ্চিমাদের জন্যই। এবং রোহিঙ্গা-রাখাইন সংঘর্ষ হোক বা না হোক – এই উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন ছাড়া পশ্চিমাদের স্বার্থ রক্ষা কোনভাবেই সম্ভব নয়। জাতি বিদ্বেষ ছড়িয়ে কেবল সেই ক্ষেত্রটাই প্রস্তুত হচ্ছে পশ্চিমাদের জন্য যেখানে তামাটে চামড়ার অধিকারী রোহিঙ্গাদের থাকছে না কোনো নাগরিকত্ব।

এক প্রস্থ চামড়া গায়ে তারা রওনা দিতে পারলো
বাড়তি কিছু নয়, রক্ত-শিরা-হৃদপিন্ড ঢেকে
তামাটে চামড়ায় বাকী সব লজ্জাকে ফেলে
যখন নাফ নদীর বুকে,
তখনই সাগরের ফেনা থেকে ঘূর্ণি, বাতাসের উচাটান
তীর থেকে আবার নিয়ে ফেললো বুদ্ধদেবের পায়ে।

এক প্রস্থ তামাটে চামড়াই তাদের সম্বল
তাই ঢেকে রাখে ধর্ম, তাই বেঁচে থাকা বর্ম
এবার বুদ্ধদেব বললেন, ভদ্রে, ওটা রাখা যাবে না,
খুলে ফেলতেই হবে!
দেখো না আমার পুত্র-পুত্রীদের রাঙাদেহ
তোমার চামড়ার আড়ালেই যেমন রাঙারক্ত
ওটাই ঢেলে দাও, ওতেই কেবল নাগরিকত্ব।

***
ফিচার ছবি: http://www.bbc.co.uk -এ প্রকাশিত ভিডিও প্রতিবেদন থেকে নেয়া স্ক্রিনশট