ক্যাটেগরিঃ ক্যাম্পাস

 

শাহবাগ থেকে ফার্মগেট পর্যন্ত কেউ যদি ফুটপাত ধরে হেঁটে যায়, কমপক্ষে একশ জন পথবাসী মানুষের সাথে তার সাক্ষাৎ হবে। এদের অধিকাংশ বৃদ্ধ, শারিরীক প্রতিবন্ধী, শিশু, অসহায় নারী – যাদের শরীরে মাংশ নেই, শতচ্ছিন্ন পোষাক – কখনও হয়ত আপনার পা জরিয়ে ধরবে।

এমন শত শত মানুষকে আমরা চোখের সামনে দেখি অনবরত। দেখে আমাদের আবেগ টলমল করে ওঠে হয়ত, কেউ দু’দশটাকা হাতে গুঁজে দেই।

এমন দরিদ্র-অসহায় মানুষেরই কোনো খবর যখন মিডিয়াতে, টিভিতে, পত্রিকায় – কেউ খুব চমৎকারভাবে লেখে, তার শব্দ ও বাক্যের মধ্যে আমরা ঐ মানুষদের অসহায়ত্বকে নিবিড়ভাবে উপলব্ধি করতে পারি, আমাদের হৃদয় ছুঁয়ে যায় – তখন একটা বাড়তি কিছু করার জন্য আবেগ আমাদের তাড়িত করে। কখনও আমরা আরেকটু বেশী সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেই। কেউ কেউ সংঘবদ্ধ হয়ে কিছু করার চেষ্টা করে, অনেক সময় সেটা সারা দেশে আলোড়ন তোলে – এবং একটা মহৎ কাজের জন্ম দেয়।

দেখা যাচ্ছে মিডিয়ায় যখন গরীব দুখী মানুষদের অসহায়ত্বকে শিল্পের অপূর্ব কারুকাজে উপস্থাপন করে – তখনই কেবল আমাদের মধ্যে ব্যাপকমাত্রায় একটা আলোড়ন তৈরী হয়। এসব মানুষকে নিত্যদিন চোখের সামনে দেখে, তাদের মাড়িয়ে চলে গেলেও – আমরা সেই মাত্রায় আলোড়িত হই না – যতক্ষণ না পর্যন্ত শিল্পের ছোঁয়ায় সেই অসহায়ত্বের চিত্র আমাদের ড্রইং রুমে উপস্থাপনযোগ্য হয়ে হাজির হয়।

আমরা প্রতিনিয়ত নিজেকে বাঁচানোর সংগ্রামে লিপ্ত, নিজের পরিবার, নিজের সন্তান, নিজের ক্যারিয়ার – এই কঠিন বাস্তবতায় বাঁচিয়ে রাখতে প্রাণপন উদ্যমে ছুটে চলি। আমাদের অন্যের জন্য, কল্যাণার্থে, সমাজসেবায় কিছু করার মত সময় ও সুযোগ খুব কমই থাকে। ফলে যখন দেখি কাউকে মানবিকতার আহবান জানাতে, কাউকে দেখি নি:স্বার্থ ভাবে এসব মানুষের জন্য কিছু কাজ করছে – আমরা ভীষণ আবেগাতুর হয়ে পড়ি। আমরা সেইসব মানুষকে স্যালুট জানাই, সম্মান জানাই – নিজেরা কিছু না করতে পারার অনুশোচনায়। তারা আমাদের চোখে শ্রদ্ধার্ঘ, যারা নিজের সময়, শ্রম ও অর্থ খরচ করে আন্তরিকভাবে অসহায় মানুষদের জন্য কিছু করতে চেষ্টা করে। এমন উদ্যোগে আমরা যথাসাধ্য নিজেদের ক্ষুদ্র অবদান রাখতে চেষ্টা করি।

কিন্তু এসবই আমাদের যখন আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়া হয় তখনই। আমাদের সাথে ঐ অসহায় মানুষগুলোর মধ্যে, মানে বাংলাদেশের বেশীরভাগ মধ্যবিত্ত-নিম্নবিত্তের সাথে ঐ নি:স্ব, অসহায় মানুষদের মধ্যে আকাশ পাতাল পার্থক্য নেই। দশ হাজার-বিশহাজার-ত্রিশ হাজার টাকার পার্থক্য – যা তারা মাসে আয় করতে পারে না। একটা ঘরের পার্থক্য – যা তারা ভাড়া নিতে পারে না। বিদ্যুৎ, গ্যাস আর সন্তানদের স্কুলের পার্থক্য – যা তারা অর্জন করতে পারে না।

এসব মানুষদের দু:খ কষ্ট দেখলে আমরা কখনও আলোড়িত হই, কিন্তু যখন মিডিয়াতে, যখন কোনো যাদুস্পর্শী শিল্পীর তুলিতে তাদের দুর্দশাগ্রস্থতাকে মহীয়ান করে উপস্থাপন করা হয় – তখন আরো বেশী হই। আমরা আমাদের এই মানসিক অবস্থিতিকে কিভাবে ব্যাখ্যা করবো? নাকি আদৌ দরকার আছে ব্যাখ্যা করার! আমরা তো এমন – এটা আমরা জানি-ই।

এমন অসহায় বাচ্চাদের জন্য একটা স্কুল হয়েছে যার নাম ‘আমাদের পাঠশালা’। যেখানে এত উঁচু মানের শিক্ষা দেয়ার চেষ্টা করা হয় – প্রথম দেখায় আমার মনে হয়েছিলো অভাবনীয়। এর প্রধান শিক্ষক আবুল হাসান রুবেলের বক্তব্যই অসাধারণ – তার মতে, গরীব শিশুদের জন্য আমাদের দেশে প্রচলিত হয়েছে গরীবী শিক্ষা – এনজিওর মাধ্যমে, যেখানে বিভিন্ন বয়সী বাচ্চাদের গাদাগাদি করে একই ক্লাসে পড়ানো হয়, অক্ষর জ্ঞান দেয়া হয়, প্রাথমিক কারিগরী শিক্ষা দেয়ার একটা প্রচেষ্টা থাকে মানে সব মিলে মাল্টি পারপস ইন ওয়ান ক্লাস। এমন শিক্ষার থেকে পূর্ণাঙ্গ একাডেমিক শিক্ষা এবং তাও অতি উঁচু মানের, দেয়া কি সম্ভব নয় এই অসহায় বাচ্চাদের? যারা শিশু বয়সেই ঝুঁকিপূর্ণ শ্রমের জন্য বাধ্য হয়?

আমাদের পাঠশালা একটা আদর্শ ধারণ করে, এখানের শিক্ষকরা সেই আদর্শকে লালন করে। বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী ছাত্র, চারুকলায় মেধাবী শিল্পীরা খুবই নামমাত্র পারিশ্রমিকে নিবেদিত হয়েছেন এসব বাচ্চাদের শিক্ষাদানে। একটা মানসিক বন্ধন তৈরী হয়েছে এই বাচ্চাদের সাথে। যে কেউ যদি এই স্কুলে যায় সে তাদের আন্তরিক প্রচেষ্টাকে উপলব্ধি করতে পারবে।

এই নি:স্বার্থ প্রচেষ্টা আমাদের চারিপাশে খুব কম দেখা যায়। জীবন দৌড়ে আমরা এমন উদ্যোগী মানুষ খুব কম দেখি। কিন্তু আমাদের পাঠশালা – একটা ভিন্ন মডেলের চিত্র আমাদের সামনে উপস্থাপন করছে। দেশের প্রাথমিক স্তরে শিক্ষাদানকারী এমন প্রতিষ্ঠান রয়েছে যেখানে পাঁচ হাজার/দশ হাজার/বিশ হাজার টাকা মাসিক স্কুল ফি দিতে হয় কিন্তু এই আমাদের পাঠশালায় যে কারিকুলাম, শিক্ষার সাথে সংস্কৃতির যে পাঠ তার জন্য মাসে মাত্র দশ/বিশ টাকা স্কুল ফি। এটা একটা আন্দোলন – এটা একটা বিপ্লব। এর উদ্যোক্তাদের ত্যাগকে সম্মান করি, শ্রদ্ধা করি।

৫ তারিখ সন্ধ্যায় ইফতারির সময় ঐ স্কুলে গিয়ে আমরা ব্লগারদের দেয়া সাড়ে বাইশ হাজার টাকা প্রধান শিক্ষক আবুল হাসান রুবেলের হাতে তুলে দিয়ে এসেছি। আমাদের সাথে ছিলেন আইরিন সুলতানা, সাইদ হোসেন আরিফ, সবাক পাখি। আপনাদের এই টাকা সেই বাচ্চাটির মুখে হাসি ফোটাবে – যে স্কুল থেকে বেড়িয়ে কোনো ঝুঁকিপূর্ণ পেশায় নিযুক্ত হয়। পড়াশুনার পাশাপাশি স্কুলে যে চমৎকার ছবি আঁকতে শিখেছে, চমৎকার গান গাইতে শিখেছে। ঐ বাচ্চাদের কাছে আমাদের পাঠশালা যেনো ঘর হয়ে উঠেছে, যতক্ষণ পারে যেনো স্কুলেই থাকতে চায়। স্কুলের বাউন্ডারি ওয়ালের ভেতরে ছোট্ট মাঠে ক্রিকেট খেলা যেনো তাদের সব আনন্দ, তাদের গানের ক্লাস যেনো তাদের মুক্তির কথা বলে, তাদের তুলির আচড় যেনো তাদের পৃথিবীকে দেখার নতুন দৃষ্টি।

এদের জন্য আমরা কি আরো কিছু করতে পারি না? এখন একশ সত্তর জনের মত স্টুডেন্ট। ক্লাস সেভেন পর্যন্ত পড়ানো হয়। সামনের বছর থেকে ক্লাস এইট চালু হবে। স্থানীয় লোকজন বছর শেষে স্কুলে ভর্তি করানোর জন্য তার বাচ্চাটিকে যখন নিয়ে এসে ভর্তি করাতে না পেরে কান্নাকাটি করে – তখন…সেই কষ্ট হয়ত কোনভাবে প্রকাশ করা সম্ভব নয় রুবেলের, কিন্তু এমন হাজার হাজার শিশু পড়ে আছে চারিপাশে – যাদের জন্য কোনো মানসম্পন্ন শিক্ষার ব্যবস্থা করা অভিভাবকদের জন্য কেবল অসম্ভবই না – রীতিমত আকাশ কুসুম কল্পনা।

কেউ যোগাযোগ করতে চাইলে প্রধান শিক্ষক আবুল হাসান রুবেলকে ফোন করতে পারেন এই নম্বরে ০১৭২১৬২৩৬২৭