ক্যাটেগরিঃ পাঠাগার

 

বঙ্গবন্ধুর কোনো জীবনীগ্রন্থ আমি পড়ি নাই। বঙ্গবন্ধুর সাথে আমার পরিচয় এমন একটা সময়ে যখন বঙ্গবন্ধু একপ্রকার নিষিদ্ধ টিভি, রেডিও ও পত্রিকায়। এরশাদের শাষনামলের প্রথম দিকে। পাঠ্যপুস্তকে তার নাম এসেছে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস অংশে, প্রাথমিক বিদ্যালয় স্তরে। আর তার ভাষণ শুনেছি মাইকে স্বাধীনতা দিবস, বিজয় দিবস আর ১৫ই আগস্টে। সে ভাষণ শুনে আমার বুক ফুলে উঠতো, নিজেকে এবং নিজের দেশকে পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ দেশ ও তার নাগরিক মনে করতাম। তখন ‘এমন দেশটি কোথায় খুঁজে পাবো নাকো তুমি’ এমন অপূর্ব গানের প্রতিটা কথা আরও স্পষ্টভাবে বিশ্বাস করতে সহায়তা করতো।

বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার স্বপ্নদ্রষ্টা, বাংলাদেশ জাতির জনক, রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, মহান নেতা এমন সব বিশেষণেই তাকে আমি চিনি। তার ভাষণ মানুষের কাছে যতটা আবেদন তৈরী করতো বলে আমার মনে হতো, তা ধারণা করতাম পৃথিবীর আর কারো ভাষণে এমন হয় নাই বা হবে না। হি ইজ ওনলী ওয়ান এন্ড ইউনিক। এখনও তাই মনে হয়। নানা বিখ্যাত জননেতাদের ভাষণ শুনেছি কিন্তু বঙ্গবন্ধুর ভাষণ যে কটা শুনেছি তাই আমার কাছে বিশ্বের শ্রেষ্ঠ ভাষণ।

বঙ্গবন্ধুর এসব পরিচয়ের সাথে কখনও তাকে লেখক হিসাবে কেউ সম্বোধন করেনি, পরিচিতি তুলে ধরে নি। সেটা সম্ভবও না। লেখকদের তো সাহিত্য সৃষ্টি করতে হয়। বঙ্গবন্ধুর লেখা, তা যে অঙ্গনের হোক, নিবন্ধ, প্রবন্ধ, গল্প – এসব কোনো কিছুই আমার জানামতে নাই বা চোখে পড়ে নাই। ফলে তিনি লেখক হিসাবে কেমন ছিলেন বা হতে পারতেন তা জানারও উপায় নাই। তবে বঙ্গবন্ধু তো চিঠি লিখেছেন, আর চিঠিতে একজন মানুষ কেমন লেখক তার প্রকাশ পায়। পত্রসাহিত্যের মাধ্যমেও পৃথিবীর অনেক মানুষ বিখ্যাত সাহিত্যিক হিসাবে পরিচিত হয়েছেন এবং খ্যাতি লাভ করেছেন। বঙ্গবন্ধুর এমন কিছু চিঠি আমার চোখে পড়েছে বিভিন্ন বইতে, কিন্তু পড়া হয়নি। ফলে তার লেখক হিসাবে কেমন বৈশিষ্ট্য তা আমার অজানাই থেকে গেছে। এই সেদিন পর্যন্ত।

মানে যেদিন আমি বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত আত্মজীবনী পড়া শুরু করলাম, প্রথম পৃষ্ঠাটা পড়লাম – সেই দিন পর্যন্ত। এই আত্মজীবনী পড়ার আগে এর সম্বন্ধে আমার উচ্চধারণা ছিলো না। আমি ধরেই নিয়েছিলাম বঙ্গবন্ধু লেখক হিসাবে খুব ভালো মানের হবেন না। এই ধরে নেয়ার কারণ, প্রথমত, তার লেখালেখি সম্বন্ধে আমার অজ্ঞতা এবং দ্বিতীয়ত, সকল ভালো বক্তাই ভালো লেখক নয় বলে একটা পূর্বনির্মিত ধারণা। কিন্তু বঙ্গবন্ধুর আত্মজীবনীর প্রথম পৃষ্ঠা পড়তে গিয়ে আমি কেমন যেনো চোখ সরাতে পারলাম না। তার গদ্য আমাকে বাধ্য করলাম পড়ে যেতে। একটা বাক্য শেষ হলে পরবর্তী বাক্য যেনো জুম হয়ে সামনে এসে পড়তে লাগলো বাধ্যতামূলকভাবে। লাইনের উপর দিয়ে আমার চোখ বয়ে চললো পলকহীন এবং প্রতিটা লাইনের মমার্থ বুঝতে পারলাম খুব সহজে এবং সেই লাইনের মধ্যে ঢুকে চলে গেলাম একটা দৃশ্যে। দৃশ্যটা তার সমস্ত ডাইমেনশন ও রঙ সহ পূর্ণমাত্রায় সচল চলচ্চিত্র হয়ে উঠলো এবং এর কোলাহল ও মানুষগুলো আমার চোখের সামনে নেমে এলো। আমার পড়ার টেবিল সরে গিয়ে সেখানে একটা গ্রাম উপস্থাপিত হলো, কাচা সড়ক, পোড়ো বাড়ি, টিনের চালা ঘর, বৃক্ষরাজি মিলে এক অভিনব চিত্র আমি দেখতে শুরু করলাম। পুরোপুরি অদৃশ্য হয়ে গেলো আমার চারিপাশ, আমার রিয়েলিটি।

বঙ্গবন্ধু লেখক হিসাবে কেমন ছিলেন সেটা আমার বোঝা হয়ে গেলো। এই অসাধারণ লেখার প্রতিটি লাইনকে আমার জীবন্ত মনে হয়েছে। এমন লেখক একটা আত্মজীবনী লিখেই সুসাহিত্যিক হিসাবে পরিগণিত হতে পারেন। তিনি একজন শক্তিশালী সাহিত্যিক হিসাবে ইতিহাসের পাতায় ঠাঁই করে নিয়েছেন মাত্র একটা বই লিখে।