ক্যাটেগরিঃ স্বাধিকার চেতনা

 

ফারজানা ব্রাউনিয়া যখন বলছিলো আমরা জাতীয় সংগীত গাইবো সেই ছোটবেলার স্কুলের মত, দুইপাশে হাত নামিয়ে স্থিরভাবে যেরকম গাইতাম, তখন আমার চট করে ফ্লাশ ব্যাক হলো স্কুল-স্মৃতি। এসেম্বলির সময় যাকে আমরা পিটিও বলতাম লাইনের সামনে তিন/চারজন দাঁড়াতো জাতীয় সংগীত গাওয়ার জন্য। তার সাথে আমরা সবাই গলা মেলাতাম। কি অপূর্ব ছিলো…কি উজ্জীবিত লাগতো। আমার পরিচিত অসংখ্য মানুষকে বলতে শুনেছি সম্মিলিতভাবে যখন জাতীয় সংগীত গাওয়া হয় তখন তাদের চোখে পানি চলে আসে। তবে এখন তো আমাদের সিনেমা হল ছাড়া জাতীয় সংগীত শোনা হয় না। তারপরেও ঐ সিনেমাহলের জাতীয় সংগীত শোনা আর উড়ন্ত জাতীয় পতাকা দেখেও আমি ভীষণ আপ্লুত হই। জাতীয় সংগীত বিষয়ে হাজারো মানুষের হাজারো অভিজ্ঞতা ও লেখা পড়েছি, এবং যাই পড়ি এবং শুনি সবই ভালো লাগে। সম্প্রতি পড়লাম ক্রিক-ইনফোর একজন ইন্ডিয়ান সাব-এডিটর মুম্বাই নিবাসী অভিষেক পুরোহিতের ‘দি অ্যানথেমস কল’ যার মা বাঙালি এবং বাবা চাকুরী-সূত্রে অনেকদিন আগে নারায়ণগঞ্জ থাকতো। অভিষেকের লেখাটা আমার এক কলিগের সাথে শেয়ার করার পরে সে বললো জাতীয় সংগীত কোথাও শুনলে সে থেমে যায়, অটোমেটিক চোখ দিয়ে পানি চলে আসে। এই বিষয়টা আমার মাথায় কোনভাবে ঢোকে নাই, কেনো মানুষের কান্না পায়? পাবে? আমারও পায়…..ক্ষ’র গাওয়া সোনার বাংলা শুনলেও আমার কান্না পায়, এমনকি ইনস্ট্রুমেন্টাল শুনলেও চোখ ছলছল করে।

অভিষেকের লেখা পড়ে আমার আবারও অশ্রুভারাক্রান্ত হতে হলো। কি আছে এই গানে? সে অবাক হয়েছে আরেকটা দেশের জাতীয় সংগীত শুনে তার ভেতরের তোলপাড় দেখে। মনে হয়েছে গানের ভেতরে তার অংশ রয়েছে, যেনো এর থেকে বিচ্ছিন্ন কিছু নয়। আমার মনে হয় জাতীয় সংগীত শুনলে আমরা সরাসরি যে বিষয়টার সাথে সংযুক্ত হয়ে যাই তা হলো ৭১ এর রক্তাক্ত ৯ মাস আর ত্রিশ লক্ষ শহীদের আত্মত্যাগের সাথে। আমাদের মনের গহীনে এই গান ঢুকিয়ে দেয় মনে করিয়ে দেয় যে এই সোনার বাংলাদেশের জন্য আমাদের কি ভয়ংকর মূল্য দিতে হয়েছে, কি ভীষণ আত্মত্যাগ করতে হয়েছে। কত কষ্ট, দু:খ সহ্য করতে হয়েছে। আমাদের, আমাদের পূর্বপুরুষদের পরাধীনতার কথা, তাদের সাথে সংঘটিত অত্যাচার, নিপীড়ন আর অসম্মান অপমানের কথা মনে করিয়ে দেয় জাতীয় সংগীত। সেজন্য গানটি শোনা মাত্র আমাদের রক্তের মধ্যে এক অসাধারণ অনুভূতির উদ্ভব ঘটে, স্বজন হারানোর ব্যথার সাথে স্বাধীনতার আনন্দ মিলেমিশে এক অভূতপূর্ব অনুভবের সম্মিলন ঘটায়। আমাদের উন্মাতাল করে দেয়। আমাদেরকে কাঁদায়, উজ্জীবিত করে, শপথে বলীয়ান করে।