ক্যাটেগরিঃ মুক্তমঞ্চ

 

প্রতিদিন পত্রিকায় পেট্রোল বোমা মারার এবং মানুষ দগ্ধ হবার সংবাদ দেখছি। প্রথম দিকে মনোযোগ দিয়ে দেখতাম এখন তেমন গুরুত্ব দেই না। চোখে পড়লে চোখ সরিয়ে নেই। মানুষ পোড়ার ঘটনা এত সংবাদে দেখছি যে দেখতে দেখতে ভয়ের অরুচি ধরে গেছে। কেউ দগ্ধ হলে এখন আর স্পর্শ করে না আমাকে, কষ্ট পাই না। আমিও একদিন দগ্ধ হবো হয়তো – তখন অন্যদেরও তা স্পর্শ করবে না। যদি দগ্ধ হয়ে সাথে সাথে কয়লা হয়ে যাই, কেউ আর ফিরেও তাকাবে না। একটা প্লাস্টিকের সাদা বডি-ব্যাগে দেহের পোড়া অবশিষ্টাংশ ঢোকানোর আগে কেউ ছবি তুলবে মোবাইলে। যারা ছবি তুলবে তাদের মন খারাপ হবে না। যদি অর্ধ পোড়া হয়ে হাসপাতালে যাই তাহলে কেউ এসে আমার বিকৃত মুখের শৈল্পিক ছবি তুলবে, তাদের সামনে আমার পোড়া হাত তুলে ধরবো – ডানে বামে উপরে নিচে। আমার দেহের পুড়ে যাওয়া কোনো অংশ থেকে এক টুকরো মাংস যদি ব্যান্ডেজের ফোঁকর থেকে খসে পড়ে তাহলে তার দিকে লোভাতুর দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকবে মিডিয়া – দশটা ক্যামেরা নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়বে সেই মাংসটুকুর ফটো-সেশনে।

আমাকে দেখতে আসবে কূটনীতিক। ব্লগার। রিপোর্টার। শিল্পী। পেইন্টার। হাসপাতালের বেডে কাৎরাতে কাৎরাতে আমার অনেক গুরুত্বপূর্ণ ইন্টার্ভিউ দিতে হবে, টকশোতে অংশ নিতে হবে। শরীরের ভেতরে জাহান্নামের পেইন গেঁথে নিয়ে আমাকে আলোচনা করতে হবে রাষ্ট্রের রাজনীতির মত জটিল বিষয়গুলো নিয়ে, এবং গুরুত্বপূর্ণ মতামত দিতে। আমার মতামতের উপরে নির্ধারিত হবে পেট্রোবলবোমাবাজদের ভবিষ্যৎ।

আমার ব্যাংক একাউন্ট হবে। একাউন্টে দশ লাখ টাকা জমা হবে। প্রতি মাসে দশ হাজার টাকা আমার ব্যাংকে জমবে।

সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরলে আমার দেয়ালে ঝুলবে চমৎকার একটা পোট্রেট। বাংলাদেশের শ্রেষ্ঠ কোনো এক ফটোগ্রাফারের তোলা বিমূর্ত আমার ফটোগ্রাফ।

কেবল প্রতিদিন ঘর থেকে যখন বের হবো – তখন রাস্তার মোড়ে দাঁড়িয়ে থাকা চিরপরিচিত কুকুরটি আমাকে না চিনতে পেরে ঘেউ ঘেউ করবে। বাকিরা ঠিকই চিনে নিবে – মেনে নিবে একদিন।