ক্যাটেগরিঃ চিন্তা-দর্শন

আমি ছোট বেলা বিভিন্ন ইসলামী ওয়াজ নসিহতে এই কথা বলতে শুনেছি – পশ্চিমারা-প্রথম বিশ্ব-ইউরোপ-আমেরিকার লোকরা এত যে উন্নত ও ধনী আর বাংলাদেশ এবং আফ্রিকার মুসলমানরা এত গরীব ও কষ্টে থাকে তার কারণ হইলো মুসলমানদের জন্য পৃথিবী শান্তি করার জন্য না, তাদের জন্য লাইফ-আফটারে এমন শান্তির ব্যবস্থা আছে বেহেশতে যা প্রথম বিশ্ব-ইউরোপ-আমেরিকার লোকজন কল্পনাও করতে পারবে না, চোখে দেখা তো দূরের কথা। আর যেহেতু উহাদের মৃত্যুর পরে দোযখ তাই আল্লাহ তাদের দুনিয়াতে একটু সুখ-শান্তি এলাউ করতেছে।

তখন অবশ্য আরব এবং পূর্ব-এশিয়ার মুসলমান কয়েকটা দেশও যে অনেক উন্নত ও ধনী সেই প্রসঙ্গটা আসতো না। আসলে আমি তখন জানতামও না যে মুসলমান কিছু দেশও অনেক উন্নত-ধনী। তাহলে প্রশ্নটা করতে পারতাম। বা হয়তো করার মত ঘিলু তখন থাকতো না।

তখন অবশ্য এই প্রসঙ্গও আসতো না যে পশ্চিমা/প্রথম বিশ্ব বা ইউরোপ আমেরিকায় প্রচুর মুসলমান বাস করে এবং তারাও ঐসব দেশসমূহের অন্যান্যদের মত উন্নত ও ধনী। আমি অবশ্য মনে করতাম এইসব দেশে মুসলমানই থাকে না। ফলে ওয়াজ নসিহতে যা শুনতাম বিশ্বাস করতাম।

এখনও এদেশের বেশীরভাগ মানুষ এইধরনের কথা বিশ্বাস করে যে মুসলমানদের জন্য দুনিয়া শান্তির জন্য না – এখানে শান্তি করবে কেবল বিধর্মীরা, যেহেতু তাদের মৃত্যুর পরে কোনো শান্তি নাই। বিশ্বের বেশীরভাগ দেশের মুসলমানরা অনুন্নত এবং দরিদ্র সুতরাং এই বিশ্বাস তাদের জন্য মানসিক শক্তি-দায়ক। তাছাড়া তাদের এই দারিদ্র, ল্যাক অব এডুকেশনাল অপরচুনিটি, অনুন্নত জীবন-ব্যবস্থা ও চিন্তা-দর্শনের ফলে যে ভুল ও মিথ্যা তথ্য ও সংবাদের সাথে পরিচিত হয় বা পরিচয় করিয়ে দেয়া হয় সেসব কারণে তারা এটা বিশ্বাস করে যে দুনিয়াতে তাদের জন্য কোনো শান্তি নাই, এখানে শান্তি থাকবে শুধু বিধর্মীরাই।

যখন বেশীরভাগ মুসলমান পৃথিবীতে তাদের জন্য শান্তি নাই বলে নিশ্চিত হয় তখন তারা পৃথিবীর শান্তির বিষয়ে যেকোনো প্রচেষ্টাকে কর্তব্য মনে করার বিষয়ে অত বেশী আগ্রহী হবার কারণ দেখে না। বরঞ্চ এখানের শান্তিতে একমাত্র বিধর্মীদের লাভ মনে করে এবং এই বিধর্মীদের জন্য যা কিছু অশান্তির হতে পারে তার প্রতি সমর্থন বোধ করে।

মুসলমানদের দারিদ্র ও অশিক্ষা যদি কমে তাহলে বিশ্ব থেকে অশান্তি দূর হবে কিনা তা নিয়ে বিতর্ক করা যায় অবশ্য। এবং মুসলমানদের দারিদ্র ও অশিক্ষাই যে অশান্তির বড় একটা কারণ তা নিয়েও বিতর্ক করা যায়। বলা যায় মুসলমানরা দারিদ্র ও অশিক্ষা থেকে মুক্ত হলেও কি পশ্চিমা বিশ্বের শোষণ কমে যাবে? তারা কি নিউক্লিয়ার ও অন্যান্য সমরাস্ত্রিক সক্ষমতার বলে বলীয়ান হয়ে তুলনামূলক কম উন্নত দেশসমূহকে (ধরে নিচ্ছি মুসলমান দারিদ্র দেশসমূহ তখন উন্নত হবার পথে, কিন্তু ততদিনে ফাস্ট ওয়ার্ল্ড আরো উন্নত হয়ে যাবে) ভয় দেখানো বন্ধ করবে? তৃতীয় বিশ্ব কি আসলেই কখনও প্রথম বিশ্ব হতে পারবে বা পৃথিবীতে সকল রাষ্ট্রসমূহের ক্ষমতা কি একই হবে? বা সবচেয়ে বেসিক কোয়্যেশ্যেন পৃথিবীর সকল মানুষ কি কখনই একইভাবে এবং একই ধরণের উন্নত শিক্ষার ও দর্শনের একটা ইকুয়াল অবস্থানে পৌঁছাবে? পৃথিবী কি কখনও বৈষম্য-রহিত অবস্থায় যেতে পারবে? শক্তিশালী রাষ্ট্রের শোষনবাদ কখনও মুক্ত হওয়া কি আসলে সম্ভব, যেকোনো উন্নত ও পরিবর্তিত পরিস্থিতিতেই?