ক্যাটেগরিঃ ফিচার পোস্ট আর্কাইভ, রাজনীতি

 

উল্লেখযোগ্য প্রশ্নসমূহ

প্রার্থীদের মধ্যে সুবক্তা শামীম ওসমানকে মনে হলো। তিনি বেশ স্পষ্টভাবে বললেন তার অবদানের কথা। শহরের জন্য কি করেছেন ইত্যাদি। আইভি বেশ ঘরোয়া ভঙিতেই কথা বললেন। তার অতীত ইতিহাসের কথা। যা শ্রদ্ধার সাথে এলাকার মানুষ স্মরণ করে। তৈমুর দীর্ঘ ৪০ বছরের শহর সম্পৃক্ততা ও তার সেবামূলক কর্মকান্ডের কথা বললেন।

একজন দর্শক প্রশ্ন করলো – নারায়নগঞ্জে পার্ক তৈরীর বিষয়ে কার কি চিন্তা? তৈমুর সাহেব উত্তর দিলেন, এমনভাবে তিনি পার্ক তৈরী করবেন যেনো সব বয়সীদের জন্য সেটা মানানসই হয়। শামীম ওসমান বললেন, তিনি নদীর পাশে একটা আন্তর্জাতিক মানের এমিউজমেন্ট পার্ক তৈরী করবেন, যেখানে নারী ও শিশুদের জন্য আলাদা লেন থাকবে। আইভি বললেন, আমি অলরেডি একটা পার্কের কাজ উদ্বোধন করে এসেছি। এছাড়া শিশুদের জন্য একটা পার্ক করার উদ্যোগ আমি নেবো। কিভাবে পার্কের অর্থ সংস্থান হবে? এমন প্রশ্নের উত্তরে বললেন শামীম ওসমান – এই অর্থের সংস্থান নগরীর অধীবাসীরাই করবে।

দর্শকদের সারি থেকে একজন প্রশ্ন করলেন বেশ তীব্রই। আমি একটু হতচকিত। সবাই মোটামুটি। সরাসরি বললেন তৈমুর সাহেবকে যে আপনি আগে যত দূর্ণীতি করেছেন এবং সেটা করে যে বাড়ি গাড়ি বানিয়েছেন তারপরে এই নির্বাচনে জিতে নগরের জন্য আর কি করবেন বলে মনে করেন? সম্ভবত প্রার্থীরা এতটা সরাসরি প্রশ্ন প্রত্যাশা করেনি।

বিতর্কের ভূমিকা

তৌফিক ইমরোজ খালিদী সবাইকে স্বাগত জানালেন। প্রার্থীরা তার চারপাশে বসেছেন। একটু পরেই শুরু হবে প্রশ্নবান। অবশ্য এটা করবেন দর্শকরাই। এ পর্যায়ে সঞ্চালক প্রার্থীদের পরিচিতি দিচ্ছেন। যেখানে জানা যাচ্ছে তাদের আয় ব্যয়ের উৎস থেকে শুরু করে নানাবিধ তথ্য। অবশ্য এসব আগেই ওয়েবে এসেছে। কিন্তু সামনাসামনি শুনতে মন্দ লাগছে না। প্রধান দুই প্রার্থী রাজনৈতিক পরিবারের উত্তরসূরী। মানে যাদের মধ্যে উত্তেজনা বেশী বিরাজ করছে। আইভি এবং শামীম – তাদেরকে দেখে নির্বাচনী প্রচারণার ধকল পোহানো মনে হলো।

প্রার্থীদের পরিচিতি দেবার পরে একটা ডকুমেন্টারী প্রদর্শন করা হচ্ছে। যেখানে জানা যাচ্ছে নারায়নগঞ্জের ইতিহাস। সদ্য সিটি কর্পোরেশনে রূপান্তরিত হওয়া এই শহরের এই নির্বাচন দারূন অর্থবহ।

বিতর্ক শুরুর পূর্বক্ষণ

৭টা ৫৩ মিনিটে এখন যখন লিখছি – তখন ১৫০ জন দর্শক মানে ভোটার সারিবদ্ধ ভাবে বসেছেন। মাননীয় নির্বাচন কমিশনার এম শাখওয়াত হোসেন ইতোমধ্যে এসে পৌঁছিয়েছেন। যদিও স্টেজে নয়, ঐতিহ্যবাহী নারায়নগঞ্জ ক্লাবের অভ্যর্থনা কক্ষে তিনি আছেন। আর অন্যদিকে নির্বাচনী বিতর্ক মঞ্চে দর্শকদের নানা রকম প্রশ্ন করে আইসব্রেকিং চলছে। ৮টা ২০ মিনিটে প্রার্থীরা মঞ্চে এসে উপস্থিত হলেন।

বাগযুদ্ধের প্রস্তুতি হাইলাইটস

নারায়নগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের মেয়র নির্বাচন ৩০শে অক্টোবর। প্রার্থী ৬জন। আজকে ২৫ শে অক্টোবর প্রার্থীরা বাগযুদ্ধে অবতীর্ণ হচ্ছেন নারায়গঞ্জ ক্লাব চত্বরে। রাত ৮টায় শুরু হবে এই বিতর্ক। মঞ্চ প্রস্তুত। সঞ্চালকের ভূমিকায় থাকবেন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম- এর প্রধান সম্পাদক তৌফিক ইমরোজ খালিদী। বিটিভি, বেতার ও বিডিনিউজ এ সরাসরি প্রচারের আগে নানান কারিগরি বিষয়গুলো ওকে করার জন্য আয়োজকরা একটা মক ডিবেট করলেন। এ মুহূর্তে সাউন্ড, লাইট, বিদ্যুৎ ব্যবস্থা সন্তোষজনক। সন্ধ্যা ৬ টা ১৮ মিনিট, যখন আমি লিখছি, অপেক্ষায় আছি প্রার্থীদের আগমনের। শুধুমাত্র আমন্ত্রিত অতিথিরাই এই অনুষ্ঠানে যোগ দিতে পারবেন। বাইরে উৎসুক জনতা। তবে এই উৎসুক্যতা কেবল এই বিতর্ক নিয়ে নয়, সমগ্র নারায়নগঞ্জ এখন নির্বাচনী হাওয়ায় উত্তাল। পোস্টারে ছেয়ে গেছে নগরী বললে ভুল হবে। বলতে হবে পোস্টারে নিচে চাপা পড়েছে নারায়নগঞ্জ। এত অধিক পোস্টার আমি কোনো নির্বাচনে রাস্তায় দেখি নাই। এবং এবার এই পোস্টার প্রস্তুত প্রণালীতে একটা নতুনত্ব আবিষ্কার করলাম। প্রতিটা পোস্টার পলিথিনে মোড়ানো। বৃষ্টি ও রোদের হাত থেকে রক্ষা করতে এই অভিনব পদ্ধতি আবিষ্কার করেছেন প্রার্থীরা।

আমার কলিগ এক চমৎকার অভিজ্ঞতার কথা জানালেন। মঞ্চের দর্শক সারির সামনের দিকে পুলিশ কর্মকর্তা প্রশাসনের এক কর্মকতাকে বসানোর জন্য চেয়ারের ব্যবস্থা করতে অনুরোধ জানায়। এসময়ে বিটিভির দায়িত্ব নিয়োজিত এক কর্মকর্তা জানালেন, এসব চেয়ার শুধু নারায়নগঞ্জের ভোটারদের, সে রিকশাওয়ালা হলেও তার সামনে বসার সুযোগ রয়েছে। প্রশাসনের কোনো কর্মকর্তা চাইলেও আজ সামনের সারিতে বসার সুযোগ নেই। তাকে পিছনেই বসতে হবে। দর্শক সারির পরে আমন্ত্রিত অতিথির সারি।

কয়েকজন ভোটারের সাথে কথা বললাম।
প্রার্থীদের সংক্ষিপ্ত পরিচিতি

সেলিনা হায়াৎ আইভী: নারায়ণগঞ্জ শহর আওয়ামী লীগের সহসভাপতি আইভী এর আগে নারায়ণগঞ্জ পৌরসভার মেয়র ছিলেন। সাত বছর এ দায়িত্ব পালন করেন তিনি। নিজের দল আওয়ামী লীগের সমর্থন না পেলেও নির্বাচনী লড়াই থেকে পিছু হটেননি পেশায় চিকিৎসক আইভী। আইভীর বাবা আলী আহম্মদ চুনকা নারায়ণগঞ্জ পৌরসভার চেয়ারম্যান ছিলেন। আইভীর বিরুদ্ধে কোনো ফৌজদারি মামলা নেই।

শামীম ওসমান: নারায়ণগঞ্জ আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী পরিবারের সদস্য শামীম ওসমান ১৯৯৬-২০০১ মেয়াদে সংসদ সদস্য ছিলেন। প্রার্থিতার ক্ষেত্রে দলের সমর্থনও পেয়েছেন তিনি। এলএলবি ডিগ্রিধারী শামীম নির্বাচন কমিশনে দেওয়া হলফনামায় পেশা উলে¬খ করেছেন ব্যবসা। শামীমের বিরুদ্ধে বেশ কয়েকটি মামলা রয়েছে। শামীমের দাদা খান সাহেব ওসমান আলী ছিলেন আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাকালীন সদস্য। তার বাবা এ কে এম শামসুজ্জোহা সংসদ সদস্য ছিলেন। শামীমের বড় ভাই নাসিম ওসমান বর্তমানে জাতীয় পার্টির সংসদ সদস্য। তার আরেক ভাই সেলিম ওসমান ব্যবসায়ীদের সংগঠন বিকেএমইএ’র সভাপতি।

তৈমুর আলম খন্দকার: সরকারি দলের দুজন হলেও প্রধান বিরোধী দল বিএনপি সমর্থিত একমাত্র প্রার্থী হিসেবে তৈমুর আলম খন্দকার মেয়র পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। এলএলবি ডিগ্রিধারী ৫৮ বছর বয়সি তৈমুর জেলা বিএনপির সভাপতি। তার দল ক্ষমতায় থাকার সময় বিআরটিসির চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেন তিনি। এর আগে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল। তৈমুরের বিরুদ্ধে মামলা রয়েছে বেশ কয়েকটি।

আতিকুর রহমান নান্নু মুন্সী: ইসলামী আন্দোলনের নেতা আতিকুর রহমান নান্নু মুন্সী স্বাক্ষরজ্ঞানসম্পন্ন। ৫৩ বছর বয়সি এ প্রার্থীর পেশা ব্যবসা। নান্নু মুন্সীর বিরুদ্ধে বর্তমানে ছয়টি ফৌজদারি মামলা রয়েছে।

আতিকুল ইসলাম জীবন : তরুণ ব্যবসায়ী আতিকুল ইসলাম জীবন মেয়র পদে প্রার্থীদের মধ্যে সবচেয়ে কমবয়সি তিনি, তার বয়স ২৭ বছর। আতিকুলের শিক্ষাগত যোগ্যতা অষ্টম শ্রেণী পাস। কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত নন আতিকুল।

শরীফ মোহাম্মদ: নির্বাচন কমিশনে জমা দেওয়া হলফনামায় শিক্ষাগত যোগ্যতার ছকে ‘অক্ষরজ্ঞান’সম্পন্ন লিখেছেন শরীফ মোহাম্মদ। কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সম্পৃক্ত নন ৫১ বছর বয়সি এ ব্যক্তি। একটি ফৌজদারি মামলা রয়েছে তার বিরুদ্ধে।

ইভিএমের প্রথম ব্যবহার

দেশে প্রথম নারায়ণগঞ্জে ইভিএম বা ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন ব্যবহার করা হচ্ছে। সিটি কর্পোরেশনের ২৭ ওয়ার্ডের মধ্যে নয়টিতে বুয়েট প্রকৌশলীদের উদ্ভাবিত ইভিএম ব্যবহার হচ্ছে। এর আগে গত বছর চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে একটি ওয়ার্ডের ১৪টি কেন্দ্রে ইভিএম ব্যবহার হয়েছিলো। এর আগে ভিএম নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনার পর নির্বাচন কমিশনের বক্তব্য অনুযায়ী, ক্ষমতাসীন দলসহ অন্তত ৩০টি রাজনৈতিক দল স্থানীয় নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহারের পক্ষে মত জানিয়েছিলো। ইসিতে নিবন্ধিত দলের সংখ্যা ৩৮টি হলেও বিএনপি এবং এর মিত্র দলগুলো ইভিএম নিয়ে সংলাপে যায়নি। আগামী ৩০ অক্টোবর অনুষ্ঠেয় নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে ৭, ৮, ৯, ১৬, ১৭, ১৮, ২২, ২৩, ২৪ নম্বর ওয়ার্ডের মোট ৫৮ কেন্দ্রের ৪৫০টি বুথে একটি করে ইভিএম থাকছে। এসব ওয়ার্ডে ভোটার রয়েছে ১ লাখ ৪৮ হাজার ৬২৯ জন।

নারায়ণগঞ্জে ব্যবহারের জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যক ইভিএম বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) তত্ত্বাবধানে তৈরি করেছে গাজীপুরের রাষ্ট্রায়াত্ত প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ মেশিন টুলস ফ্যাক্টরি। ইভিএম দুটি ইউনিট সমন্বয়ে গঠিত- একটি কন্ট্রোল ইউনিট ও অন্যটি ব্যালট ইউনিট। কন্ট্রোল ইউনিটটি ব্যালট দেওয়া এবং ব্যালট সংরক্ষণের কাজ করে। কন্ট্রোল ইউনিটটি মূলত কাগজের ব্যালট ও ব্যালট বাক্সকে প্রতিস্থাপিত করে। স্মার্ট কার্ড দিয়ে নিয়ন্ত্রিত এই ইউনিটটি সহকারী প্রিজাইডিং কর্মকর্তার নিয়ন্ত্রণে থাকবে। এখন যেমন প্রিসাইডিং কর্মকর্তা ব্যালট পেপার ইস্যু করে থাকেন, এক্ষেত্রেও তিনি ইলেকট্রনিক ব্যালট ইস্যু করবেন। কত জন ভোট দিচ্ছেন তা ভোট দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ব্যালট ইউনিটের সামনে স্থাপিত ডিসপ্লেতে প্রদর্শিত হতে থাকবে, যা সব পোলিং এজেন্ট ও নির্বাচন কাজে নিয়োজিত ও বুথে অবস্থানকারী অনুমোদিত ব্যক্তিরা দেখতে পাবে। ব্যালট ইউনিটটি কন্ট্রোল ইউনিটের একটি তারের মাধ্যমে সংযুক্ত। ব্যালট ইউনিটে প্রার্থীদের নাম ও প্রতীক সম্বলিত একটি কাগজ লাগানো থাকে, আর প্রতিটি প্রতীকের পাশে একটি বোতাম থাকে। কন্ট্রোল ইউনিট থেকে সহকারী প্রিজাইডিং কর্মকর্তা ব্যালট ইস্যু করলে একটি সবুজ সঙ্কেত উভয় ইউনিটে জ্বলে উঠবে এবং ভোটার বোতাম টিপে তার পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দিতে পারবেন। ভোটার তার পছন্দের প্রার্থীর প্রতীকের পাশের বোতামটি টিপলে একটা ‘বিপ’ শোনা যাবে। তা শুনে আর প্রতীকের পাশের বাতিটি জ্বলা দেখে ভোটার বুঝতে পারবেন, তার ভোট দেওয়া হয়েছে।

বিতর্কের দর্শক

প্রায় ১৫ লাখ মানুষের নারায়ণগঞ্জ শহরে ভোটার রয়েছে ৪ লাখের বেশি। ভোটযুদ্ধের আগে মঙ্গলবার রাতে বিতর্কে বসছেন মেয়র পদের ছয় প্রার্থী। বিতর্ক অনুষ্ঠানে আগ্রহী ভোটারদের মধ্য থেকে ১৫০ জনকে আমন্ত্রিত হয়ে এসেছেন এ বিতর্ক অনুষ্ঠানে। সুনির্দিষ্ট নীতিমালার ভিত্তিতে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম- এর একজন সিনিয়র সম্পাদক এর নেতৃত্বে একটি দল তাদের বাছাই করেছেন।

রাত ১০টায় অনুষ্ঠান সমাপ্ত হয়।

যেকোনো আপডেট জানতে ও জানাতে প্লিজ ভিজিট করুন আমাদের ফেসবুক গ্রুপ

***
ফিচার ছবি: মুস্তাফিজ মামুন, বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম