ক্যাটেগরিঃ নাগরিক আলাপ

তিন বন্ধু হেটে যাচ্ছে।
নির্জন রাস্তায় হাটতে হাটতে নানান বিষয়ে কথা হচ্ছে। হঠাৎ একজনের চোখ আটকে যায় রাস্তার পাশে পড়ে থাকা পুটলিমত একটা জিনিসের দিকে। সেইজন এগিয়ে গিয়ে কৌতুহল বশত সেটা হাতে তুলে নেয়। পরক্ষণেই বুঝতে পারে ওটা আসলে রুমালে বাধা কড়কড়ে টাকার একটা বান্ডিল। ওই বন্ধুটি খুশিতে আত্বহারা হয়ে বাকি দু’জনকে ডেকে বলে, “দোস্তো, দেখ দেখ ‘আমি’ কী পেয়েছি!”
বাকি দু’জনও এগিয়ে যায়। হঠাৎ পাওয়া জিনিসে আনন্দ পেলেও যে টাকাটা খুঁজে পেয়েছে সে টাকার কোন ভাগ বাকি দু’জনকে দিতে চায় না।
বন্ধু তিনজন আবার হাটতে থাকে। কিছুদূর যাবার পর দেখতে পায় কয়েকজন পুলিশ সেই রাস্তা ধরে তাদের দিকে আসছে। তখন ওই বন্ধুটি কাঁদো কাঁদো কন্ঠে বলে, “দোস্তো, ‘আমরা’ মনে হয় বিপদে পড়েছি”

উপরের ঘটনাটি কল্পিত। কিন্তু ওই স্বার্থপর বন্ধুটির ‘আমিত্ব’র ছায়া আমাদের সমাজে বিদ্যমান। আমার মাঝে বিদ্যমান, বিদ্যমান হয়তো আপনার মাঝেও।

হ্যা, আপনার যা অর্জন তার কৃতিত্ব আপনারই। কিন্তু একটু ভেবে বলুন তো, আপনার জীবনে এ পর্যন্ত যা কিছু প্রাপ্তি তা কি শুধুমাত্র আপনার একান্ত চেষ্টায় পাওয়া? এতে কি আপনার পরিবারের অংশ নেই? আপনার বাবা-মা’র শ্রম নেই? বড় বোনের স্বপ্ন নেই? সমাজের সাহায্য নেই? দেশের মানুষের অবদান নেই?

অবশ্যই আছে। আপনার পরিবারই আপনাকে একটি ভাল স্কুলে পাঠিয়েছে। আপনার বোনই আপনাকে বড় হবার স্বপ্ন দেখিয়েছে। দেশের মানুষই আপনার পাবলিক ভার্সিটিতে পড়ার খরচ মিটিয়েছে। তাইতো আপনি, আমি, আমরা সবাই আজ এ জায়গাটাতে দাঁড়িয়ে।

হ্যা, আমরা দাঁড়িয়েই আছি। একেবারে স্ট্যাচুর মত।
কিন্তু আমাদের তো এভাবে দাঁড়িয়ে থাকার কথা না। জীবন গাড়ি যে গতিতে আজ এ স্টপেজে এসে দাড়িয়েছে, তার চেয়েও দ্বিগুন গতিতে আমাদের ছোটার কথা নতুন গন্তব্যের দিকে। কিন্তু আমরা দাঁড়িয়ে আছি।
কারণ সামনের পথটি জঞ্জালে পরিপূ্র্ণ। ইঞ্জিনবিহীন নষ্ট ব্যাটারী লাগানো তেল ফুরিয়ে যাওয়া গাড়িগুলোর তৈরী করা কৃত্তিম ট্রাফিক জ্যাম দেখে আমরা ভীত। আমাদের শ্বেতশুভ্র চিরশুচি বিবেকে অশুচিতার কালিমার আঁচড় লাগার শংকায় আমরা শংকিত। যে অগ্রজের রঙ্গিন স্বপ্ন দেখে আমি স্বপ্ন বুনতে শিখেছি সেই স্বপ্নের বিভৎস কংকাল পাশের গলির ডাস্টবিনে পড়ে থাকতে দেখে আমি শিহরিত।

আমরা স্বপ্নের জাল বুনে বসে আছি। কিন্তু তাতে রঙ চড়াতে পারছি না। উদ্দ্যম নিয়ে সামনে এগিয়ে যেতে চাচ্ছি অথচ পথ খুঁজে না পেয়ে গলি-ঘুপচিতে অযথাই ছুটে মরছি।

এখন যদি কেউ প্রশ্ন করে, তোমার স্বপ্ন কি আরেকজন পূরণ করে দিবে? সামনে বলার পথ কি আরেকজন তৈরী করে দিবে?

না, কখনোই না।

আমার স্বপ্ন আরেকজন পূরণ করবে না। সামনে চলার পথও আরেকজন তৈরী করে দিবে না।
কিন্তু আমার ফিকে রঙ স্বপ্ন রাঙ্গিয়ে তোলার জন্য দরকারী রঙের দোকান তো আপনারা বন্ধ করে দিয়ে কালোবাজারী ব্যবসা শুরু করেছেন। আমার সামনে চলার পথ রুদ্ধ করে সে জায়গায় স্টেডিয়াম তৈরী করে সংবিধানকে ফুটবল বানিয়ে খেলায় মেতে উঠেছেন।
আপনাদের একজন স্বশিক্ষিত, আরেকজন ডিগ্রীধারী সুশিক্ষিত। একজন পিতৃস্বপ্ন বাস্তবায়নের কান্ডারী, আরেকজন স্বামীস্বপ্ন লালনকারী।
কিন্তু অশ্রদ্ধার বিরানভূমিতে শ্রদ্ধার মিনার যে টিকে থাকে না তা বুঝি আপনারা ভুলে গেছেন। মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্ব কে দিয়েছে তা নিয়ে আমাদের মত সাধারণ মানুষের যেমনি কোন সন্দেহ নেই, ঠিক তেমনি স্বাধীনতার ঘোষনা কে দিয়েছে সেটার ব্যাপারেও কোন প্রশ্ন নেই। কিন্তু আপনারা উভয়ের অবদান অস্বীকার করে উপরের দিকে তাকিয়ে একজন আরেকজনের দিকে যে থুথু ছিটাচ্ছেন তাতে যে আপনারাই অপবিত্র হয়ে পড়ছেন তা বোধহয় বুঝতে পারছেন না বা বোঝার চেষ্টা করছেন না।
কিন্তু চোখ বন্ধ করে আঁধার খোজার চেষ্টা করলেই যে সূ্র্য অন্ধকার হয়ে যায় তা কিন্তু না।

সোনার বাংলা গড়ার স্বপ্ন কিন্তু শুধুমাত্র নামের জন্য উড়োজাহাজ বিহীন বিমান বন্দর বানানোর মধ্যে প্রোথিত না। আর বহুদলীয় গণতন্ত্রের স্বপ্নও কিন্তু হরতাল দিয়ে সাধারণ মানুষের গাড়ি ভাংচুরের মধ্যে নিহিত না।
আপনারা যা করছেন সেটা স্রেফ নিজেরা ক্ষমতায় থেকে ভোগ বিলাস করা, পূর্বসূরীদের স্বপ্ন বেচে খাওয়া আর আপনাদের বংশধরদের ক্ষমতায় প্রতিষ্ঠিত করার প্লাটফর্ম তৈরী করা।
আপনারা বলতেই পারেন যে, আমাদের কাজ আমরা করছি। তোমাদের আটকেছে কে? তোমরা এগিয়ে যাও।
হ্যা, আমরা এগিয়েই যেতে চাই। কিন্তু আমাদের আগুনজ্বালা মশাল যে একটাই। আর সেই মশালটা আমরা তুলে দিয়েছি আপনাদের হাতে। সুরঙ্গ শেষের আলো দেখার প্রত্যাশায় আমরা রয়েছি আপনাদেরই পেছনে, আপনাদের সহযোগী শক্তি হয়ে। কিন্তু আপনারা তো পথের মাঝে হঠাৎ কুড়িয়ে পাওয়া সুখ আনন্দে বিভোর। আমাদের নিয়ে ভাববার সময় আপনাদের হবে কিনা তা শুধুমাত্র সৃষ্টিকর্তাই জানে!

এখনো বুঝি কিছু সময় আছে। মোহাবিষ্ট হয়ে প্রমোদ খাচায় বন্দী না থেকে বাইরে বেরিয়ে আসুন। এসে দেখুন, আমরা দাঁড়িয়ে আছি।
আমরা দাঁড়িয়ে আছি আমাদের ফিকে রঙ স্বপ্ন রাঙ্গিয়ে তুলতে। আমরা দাঁড়িয়ে আছি সামনে এগিয়ে চলার পথ খুজতে।

দু’জন মহান মানুষের স্বপ্ন পূরণ করতে গিয়ে ষোল কোটি সাধারণ মানুষের স্বপ্ন হত্যা করা বোধহয় উচিত হবে না। আমাদেরকে আমাদের স্বপ্ন পূরণ করতে দিন। দেখবেন তাদের স্বপ্নও পূরণ হয়ে গেছে। কারণ তারা ছিলেন গণমানুষের নেতা। আমাদেরকে নিয়েই ছিল তাদের স্বপ্ন।

আপনাদের ‘আমিত্ব’ থেকে এখনি বেরিয়ে আসুন। তা’নাহলে আপনাদের অবস্থা হবে একেবারে শুরুতে বলা সেই গল্পটির মত। যে বন্ধুটি টাকা পেয়ে বলে ‘আমার’ টাকা আর সেই টাকায় ডেকে আনা বিপদে পড়লে বলে ‘আমাদের’ বিপদ।
বিপদে যখন পড়বেন তখন কিন্তু আমাদের পাশে পাবেন না। ষোল কোটি স্বপ্ন হত্যার দায়ে বিচারকের কাঠগড়ায় সাক্ষী দিতে আমরা মোটেও ভুল করব না।