ক্যাটেগরিঃ অর্থনীতি-বাণিজ্য

প্রাগৈতিহাসিক কালে মানুষ দলবদ্ধ হয়ে বাস করত। এরা দলগতভাবে হিংস্র জন্তুর মোকাবেলা করত। প্রাকৃতিক দূ্র্যোগে একত্রে গুহায় আশ্রয় নিত, সংঘবদ্ধভাবে খাবার সন্ধানে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় ‘মাইগ্রেট’ করত। এভাবে আমাদের প্রাগৈতিহাসিক পূর্বপুরুষগণ জীবন ধারণ করে গেছেন। বেচে থাকার অদম্য বাসনায় প্রকৃতি থেকে তারা নিয়েছেন আগুন আর শিখেছেন লাঠির ব্যবহার। এই ক্রমোন্নতির বেগ চাকা আবিষ্কারের মাধ্যমে গতি লাভ করে। এভাবে প্রাগৈতিহাসিক কালের জীবনকে কোনমতে ধারণ করার চেষ্টা থেকে মানুষ মধ্যযুগে জীবনকে যাপন করার সংস্কৃতিতে প্রবেশ করে।

মধ্যযুগে মানুষ প্রকৃতির রহস্য উন্মোচনযুগে প্রবেশ করে। সূচিত হয় ‘অ্যস্ট্রনোমিকাল সায়েন্স’ দূর নক্ষত্র দেখে দিক নির্ধারণ করে সমুদ্রযোগে যাতায়াত নিশ্চিত হয়। শুরু হয় ব্যবসা বাণিজ্য, বিকশিত হতে থাকে মানব সমাজ আর তখনই শুরু হয় গোত্রগত সংঘাত। প্রকৃতি সন্ধানী আমাদের মধ্যযুগীয় পূর্বপুরুষেরাই সর্বপ্রথম নিজেদের মধ্যে শ্রেষ্ঠত্বের প্রতিযোগীতা শুরু করে। আর এর ফলে আমরা জীবনকে শুধু যাপন করার রীতি থেকে প্রবেশ করি জীবনকে উপভোগ করার আধুনিক সংস্কৃতিতে।

মানব মনের ভোগবাদী প্রকৃতির কারণে কাল মাক্সের সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা না পেলেও আজ সর্বত্র শেকড় গেড়েছে পুঁজিবাদ। আর ‘কর্পোরেট বিজনেস’ হচ্ছে এই পুঁজিবাদের আধুনিকতম সংস্করণ। এই কর্পোরেট বিজনেসের ‘এথিকস’ নির্ধারিত হয় ‘ইকোনোমিকাল স্ট্র্যাটেজি’ দিয়ে। মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানীর মোড়কে এদের ব্যবসা প্রসারিত হয় একদেশ থেকে আরেক দেশে। আর এর ফলে আমাদের মত তৃতীয় বিশ্বের দেশে আভ্যন্তরীণ ব্যবসার পরিণতি হয় ভয়াবহ। অনৈতিক অর্থ লেনদেনের মাধ্যমে রাষ্ট্রযন্ত্রের যোগসাজশে সমাজে সৃষ্টি হয় কতিপয় ধনিক শ্রেণী। এই শ্রেণী দ্বারা শোষিত সাধারন মানুষ হতে থাকে গরীব থেকে আরো গরীব। এর সর্বগ্রাসী রূপ এতটাই ভয়াবহ যে খোদ যুক্ত্ররাষ্ট্রেই এই কর্পোরেট বিজনেস এর বিরুদ্ধে ‘অকুপাই ওয়াল্ট ষ্ট্রীট’ এর ব্যানারে বিক্ষোভ শুরু হয়েছে যার মূল স্লোগান, ‘we are 99%’ যা ছড়িয়ে পড়েছিল ৮২ টি দেশের ৯৮১ টি শহরে।

বাংলাদেশে কর্পোরেট বিজনেস লিস্টে শীর্ষস্থানীয় একটি টেলিকম কোম্পানী শুধুমাত্র ২০০৮ সালেই বিজ্ঞাপণ, বেতন ভাতা সহ সকল খরচ বাদ দিয়ে দিনপ্রতি প্রফিট বা লাভ করেছে ০.৮ কোটি টাকা। আর বছর শেষে এর প্রফিট দাঁড়ায় প্রায় ৩০০ কোটি টাকা। অথচ সব ধরণের সুযোগ সুবিধার অধিকারী আমাদের দেশীয় কোম্পানী ২০০৮ সালে কোন লাভ তো করেইনি, উপরন্তু লোকসান গুনেছে ১৬২ কোটি টাকা। অথচ ‘টেলিটক’ এর সীম আমরা কিনেছি রাত জেগে লাইনে দাঁড়িয়ে। দেশীয় কোম্পানীটির প্রতি জনসাধারণের আবেগীয় চাহিদা সামাল দিতে সীম বিতরণে করা হয়েছিল লটারীর ব্যবস্থা- যা কিনা কোন কোম্পানীর জন্য অকল্পনীয়। কিন্তু সেবার চাহিদা তো আর আশ্বাসে পূরণ হয় না। যার ফলশ্রুতিতে টেলিটক হারায় এর তুমুল জনপ্রিয়তা।

এই উদাহরণ আমাদের দেশে কর্পোরেট বিজনেসের একটা খন্ডচিত্র মাত্র। এভাবে প্রতিবছর বিদেশী কোম্পানীগুলো লাভের শত হাজার কোটি ডলার বাইরে নিয়ে যাচ্ছে আর স্বদেশী কোম্পানী জনগণের টাকা ভর্তুকি দেখিয়ে লোকসান দিচ্ছে।

এই কর্পোরেট বিজনেসের মূল টার্গেট এখন বিভিন্ন দেশের জ্বালানী সম্পদ। দ্রুত ক্ষীয়মান প্রকৃতি আর ক্রমবর্ধমান চাহিদার এই জ্বালানীর উপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠাই এখন যুক্ত্ররাষ্ট্র, যুক্ত্ররাজ্য, ফ্রান্স, ইতালী সহ চিহ্নিত কিছু শক্তিশালী রাষ্ট্রের মূল টার্গেট। আর এ কারণেই লাদেন ইস্যুতে দখল হয় আফগানিস্তান, পরমাণু অস্ত্রের মিথ্যা অজুহাতে দখল হয় ইরাক, বিপুল পরিমান তেল ও গ্যাস সম্পদের অধিকারী লিবিয়া ও ইরান বিবেচিত হয় তাদের প্রত্যক্ষ শত্রু হিসেবে। আর বাংলাদেশের মত একটা দুর্বল রাষ্ট্রের গণতন্ত্র যেখানে নিয়ন্ত্রিত হয় ব্যবসায়িক রাজনীতিবিদদের দ্বারা সেখানে জ্বালানী সম্পদ দখলে সামরিক শক্তি প্রয়োগের চেয়ে মাল্টি ন্যাশনাল কোম্পানীর গোপন রাজনৈতিক যোগসাজশ যে অনেক বেশী কার্যকর তা বুঝতে আর কারো বাকি নেই। এই কোম্পানীগুলো হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগের স্বপ্ন দেখিয়ে আমাদেরকে বেধে ফেলে কঠিন শর্তের বাধনে। অসৎ রাজনীতিতে শত কোটি টাকা বিনিয়োগে হাতিয়ে নেয় কয়েক গুণ। আর পর্দার আড়ালে পাচার হয় আমাদের জ্বালানী সম্পদ। তাইতো মার্কিন জ্বালানী কোম্পনী ‘’এ্যাক্সন’’ বর্তমান বিশ্বে সবচেয়ে লাভজনক কোম্পানী।

জ্বালানী ও বিদ্যুৎ সমস্যা আমাদের দেশের প্রধান সমস্যা। শুধুমাত্র চট্রগ্রামেই পাঁচ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগে স্থাপিত শিল্প জ্বালানীর অভাবে চালু করা সম্ভব হচ্ছে না। এদেশের ৪৭% মানুষ এখনও বিদ্যুৎহীন। আর ৬-১২ ঘন্টা লোড-শেডিং এখন নিত্য-নৈমিত্তিক ব্যাপার। দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা, ব্যাপক দুর্নীতি আর সুষ্ঠ কর্মপরিকল্পনার অভাবে সৃষ্ট এ সমস্যা সমাধানের জন্য সরকার কুইক রেন্টাল ও রেন্টাল পাওয়ার জেনারেশনের দিকে ঝুকেছিল। জ্বালানী তেলে সরকারের ব্যাপক ভর্তুকি (প্রতি লিটার ডিজেল ও ফার্নেস তেলে যথাক্রমে ২২ টাকা ও ৮ টাকা) এই সেক্টরটিকে বাংলাদেশে একটি লাভজনক ব্যবসাতে পরিণত করেছিল। অনভিজ্ঞ কোম্পানীগুলোও কুইক রেন্টালে যথেষ্ট আগ্রহী। কিন্তু অসচ্ছ চুক্তি আর আমলাতান্ত্রিক অদক্ষতার কারণে অবকাঠামোগত সুবিধা নিশ্চিত না করা ও জ্বালানী তেল সরবরাহ করতে না পারার কারণে সরকারকেই জরিমানার টাকা গোনার মত পরিস্থিতিতে পড়তে হয়েছে। সময়মত বিদ্যুত গ্রীড লাইনে না আসায় লোকসান বাড়ছে লাফিয়ে লাফিয়ে, আর সরকারী অদক্ষতার ফলে লোকসানের দায়ভার জনগণের কাধে চাপানো হচ্ছে জালানী ও বিদ্যুতের মূল্য দফায় দফায় বাড়িয়ে।

বিশ্ববাজারে জালানী মূল্য কখনোই নির্দিষ্ট থাকে না। একারণেই উড়োজাহাজ ব্যবসা, জাহাজ শিল্প, পরিবহন খাত, বিদ্যুত পরিকল্পনা সহ সকল ক্ষেত্রে ভবিষ্যত জ্বালানীর সাম্ভাব্য মূল্য নির্ধারণ করা হয় কিছু সূচকের ভিত্তিতে, প্রতিষ্ঠিত ফর্মূলার আলোকে। কাজেই ‘জ্বালানী তেলের দাম হঠাত বেড়ে গেছে, তাই কুইক রেন্টাল বিদ্যূত কেন্দ্রগুলোতে প্রয়োজনীয় তেল সরবরাহ করা যাচ্ছে না’- এ ধরণের বক্তব্য রাষ্ট্রযন্ত্রের সাথে বিদ্যূত ব্যবসায়ীদের যোগসাজসের লজ্জাস্কর প্রমাণ বহন করে। ধরুন, সরকারী নানা সুযোগ-সুবিধায় আগ্রহী হয়ে আমি কুইক রেন্টাল ব্যবসায় আসলাম। আমাকে দেয়া হল ১০০ মেগাওয়াটের কন্ট্রাক্ট। যেহেতু আমি তেলের ভবিষ্যৎ মূল্য জানি, এবং এও জানি যে সরকারের পক্ষে দীর্ঘসময়ের জন্য এত বিশাল ভর্তুকি দেয়া সম্ভব না, সেহেতু আমি আমদানি করলাম ৭০ মেগাওয়াটের পুরোনো লক্করঝক্কর জেনারেটর যেটা দিয়ে আসলে কিনা ৫০ মেগাওয়াটের বেশী পাওয়া সম্ভব না। এখন তেলের বাড়তি মূল্যের অজুহাতে সরকার আমার প্লান্টে দিচ্ছে ২০ মেগাওয়াটের জ্বালানি তেল। কিন্তু চুক্তি অনুযায়ী অফিস ব্যবস্থাপনা, প্লান্ট পরিচালন ব্যায় ও আমার বিনিয়োগের মুনাফা বাবদ সরকার আমাকে ১০০ মেগাওয়াটের ক্যাপাসিটি চার্জ দিতে বাধ্য। আমি যেহেতু ব্যবসায়ী, আমি আমার সর্বোচ্চ মুনাফা করতে চাইব- এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু সরকার যখন ব্যবসায়ীদের দ্বারা ‘ম্যানেজ’ হয়ে যায় তখন ভর্তুকির টাকায় আমাদের কোন কল্যাণ হয় না, বরং হতাশা বাড়ে। এভাবেই ব্যবসায়ী কোম্পানীগুলোর উপর বিদ্যুৎ উৎপাদনে নির্ভরতা বাড়ছে আর পিডিবি’র উৎপাদন সক্ষমতা ধীরে ধীরে কমছে।

পিডিবি’র হিসেবে গত বছর জ্বালানী খাতে ভর্তুকি ১৪ হাজার কোটি টাকা। আর লোডশেডিংযের ফলে শিল্পায়ন বাধাগ্রস্ত হওয়া, কর্মসংস্থানের অভাব, কৃষির উৎপাদন ব্যাহত হওয়া আর অলস কর্মঘন্টা হিসেব করলে বছর প্রতি এই লোকসান ছাড়িয়ে যাবে কয়েক লাখ কোটি টাকা। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা গ্রহন, দূর্নীতিমুক্ত ব্যবস্থাপনা গঠন ও অবকাঠামোগত পরিকল্পনা গ্রহন করে সহজেই জ্বালানী ও বিদ্যুৎ সমস্যার সমাধান সম্ভব।

বাংলাদেশ সরকার ২০১৫ সালের মধ্যে মোট বিদ্যুত উৎপাদনের শতকরা ৫ ভাগ ও ২০২০ সালের মধ্যে শতকরা ১০ ভাগ বিদ্যুৎ নবায়নযোগ্য শক্তির মাধ্যমে উৎপাদন করার লক্ষ্য নির্ধারন করলেও এর জন্য কোন পরিকল্পনা নেই, নেই প্রয়োজনীয় বিনিয়োগের কোন উপাত্ত। এই খাতে পর্যাপ্ত বিনিয়োগ নিশ্তিত করতঃ ২০১৫ সালের মধ্যে ৭০০ মেগাওয়াট এবং ২০২০ সালের মধ্যে ২০০০ মেগাওয়াট বিদ্যুত প্রাপ্তির নিশ্চিত সম্ভাবনায় কোন আগ্রহ না থাকলেও সমুদ্রবক্ষে অনিশ্চিত গ্যাস সন্ধানকার্যে মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানী কনকোফিলিপ্সের সাথে গোপন চুক্তি ব্যাপক আগ্রহ নিয়ে সম্পাদন করেছে। শুধুমাত্র ২০০১ সালেই বাংলাদেশে ১১০০০ কোটি টাকার দুর্নীতি হয়েছে। আর পরিস্থিতির উন্নতি না হওয়াতে ২০১২ এ এসে তা ২০০০০ কোটি টাকার অংক ছাড়িয়ে গেছে বললেও অত্যুক্তি হবে না। অথচ মাত্র ৩২০০ কোটি টাকার পর্যায়ক্রমিক বিনিয়োগের মাধ্যমে আমরা ২০০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ নবায়নযোগ্য শক্তির মাধ্যমে নিশ্চিত করতে পারি যা পরবর্তীতে ১০০০০ মেগাওয়াটে উন্নীত করা সম্ভব। এতে যেমন জ্বালানী স্বনির্ভরতা আসবে, ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে, প্রযুক্তিগত উন্নয়ন সাধিত হবে, মেধার উৎকর্ষ সাধিত হবে, সেইসাথে আমাদের জ্বালানী চাহিদা মিটবে সম্পূর্ণ দূষণমুক্ত উপায়ে। এজন্য চাই অনুকূল পরিবেশ। আর এই পরিবেশ একমাত্র নিশ্চিত হতে পারে সৎ ও উপযুক্ত নেতৃত্ব দিয়ে। তাই গণতান্ত্রিক রাজনীতির চেয়ে প্রয়োজন নিয়মতান্ত্রিক রাজনীতি। পাঁচ বছর ভিত্তিক লুটপাটের গণতন্ত্র থেকে মাহাথীর মোহাম্মদের ২২ বছরের একনায়কতন্ত্র ঢের বেশী ভাল।

‘জাতিসংঘের মিলেনিয়াম ক্যাম্পেইন’ এর সাবেক পরিচালক সলিল শেঠী বলেছেন, ‘বিশ্ব নেতাদের শপথ ভাঙ্গা পাপ, কিন্তু গরীব রাষ্ট্রনেতার শপথ ভাঙ্গা অনাচার।’ পাপের শাস্তি দেবেন সৃষ্টিকর্তা কিন্তু অনাচারের শিকার আমাদের মত গরীব জনগণ এর কোন বিচার চাইতে পারে না। রাষ্ট্র যখন অপরাধী হয় তখন এর বিচার রাষ্ট্রযন্ত্র দিয়ে করা সম্ভব না। আমাদের ভাগ্য যাদের হাতে তারা কি সেই অনাচার করতে চলেছেন?

তথ্যসূত্রঃ
১)Credit Rating Report of Grameen Phone Ltd.
২) Transparency International Report on “Corruption in South Asia”
৩) Teletalk Bangladesh Ltd. “teletalk2years.pdf”
৪) Yanendra Lal Pradhan, Managing Director of Trishakti Cable Industries, Nepal.
৫) D. M. Rahman et el, “Prospect of Renewable Energy and Its Current Status in Bangladesh”, Proc. of ICCEB, Bonn, Germany, July, 2011, pp. 1-111
৬) N. R. Monir et el, “The Role of Civil Society in Strengthening Democracy and Combating Corruption: Bangladesh Perspective”, Monash University, Australia, pp. 1-25
৭) Daily Prothom Alo, 23th Sept, 16th Oct, 17th Oct, 2011