ক্যাটেগরিঃ অর্থনীতি-বাণিজ্য

ঘুমন্ত অবস্থায় ক্ষণিকের যে চিত্র আমাদের মনে ফুটে উঠে সেটাকে আমরা স্বপ্ন বললেও ব্যক্তিগত বা জাতিগত জীবনের স্বপ্নগুলো এমন নয়। বাস্তব জীবনের স্বপ্নগুলো উন্নত ভবিষ্যতের প্রেক্ষিতে সামগ্রিক, সেই সাথে অর্থপূর্ণ। ঘুমের স্বপ্নে মঙ্গলের বুকে নিজের বাড়ি বানানোর চিত্র দেখলেও বাস্তবে তা আমরা আশা করি না। আগামীতে আমরা যা পেতে চাই, যা হতে চাই, যা দেখতে চাই সেটাই আমাদের স্বপ্ন। বাংলাদেশের সৃষ্টি হয়েছে এই স্বপ্ন দেখাতেই। বাংলাদেশের জন্ম সেই স্বপ্নের প্রথম বাস্তবায়ন। অথচ আজ চল্লিশ বছর পড়ে এসেও আমাদের কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যগুলো অর্জিত হয়নি, স্বপ্নগুলো সত্যি হয়নি। সমতার বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখলেও ধনী-দরিদ্রের বৈষম্য বাড়ছে, স্বনির্ভরতার স্বপ্ন দেখলেও পরনির্ভরশীলতা বাড়ছে, কৃষক মুক্তির স্বপ্ন দেখলেও তাদের অবস্থা খারাপ হচ্ছে। স্বপ্নের বাংলাদেশে বাস্তব থেকে ধীরে ধীরে দূরে সরে যাচ্ছে।

আধুনিক বিশ্ব ব্যবস্থায় রাষ্ট্রীয় উন্নতি নির্ভর করে জ্বালানী মজুদ আর তা ব্যবহারের স্বনির্ভরতায়। এক সময় সোনা আর হীরার লোভে বেনিয়া গোষ্ঠীর ছত্রছায়ায় ‘প্রভু’ রাষ্ট্রগুলো দখল করত বিভিন্ন রাষ্ট্র। একারণেই স্বর্ণের দেশ কঙ্গো বিশ্ব মানচিত্রে আজ অস্তিত্ব সংকটে, হীরক খনির দেশ সিয়েরালিওনের অর্থনীতি মৃতপ্রায়। এসব দেশে পরিকল্পিতভাবে নানা সংকট তৈরী করা হয়েছে। যুদ্ধে অর্থ বিনিয়োগ করা হয়েছে। আর পর্দার আড়ালে বিদেশী কোম্পানীগুলো চুরি করেছে তাদের প্রাকৃতিক সম্পদ।

বর্তমান পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে ভবিষ্যৎ সমৃদ্ধি নিশ্চিত করতে ওই ‘ডাকাত’ রাষ্ট্রগুলোই দখল করছে জ্বালানী সমৃদ্ধ দেশগুলো। ওরাই ইরাক দখল করে আর ইরানকে চোখ রাঙ্গায়। আর ঠিক এ কারণেই ‘উদার গণতান্ত্রিক’ রাষ্ট্রের তকমা আটা বাংলাদেশ তার মহামূল্যবান প্রাকৃতিক সম্পদ আর অবস্থানগত ঐশ্বর্য নিয়ে পার করছে এক সংকটকালীন সময়। কিন্তু আমরা অন্য রাষ্ট্রের জন্য যতটা উদার অন্য রাষ্ট্রের উদারতা ততটা আমাদের জন্য নয়। বন্ধুত্বের হাত অন্যদের জন্য আমাদের যতটা প্রসারিত ততটা আমাদের জন্য নয়। আমাদের দীনতা তৈরী হয়েছে চিন্তায়, হীনতা সৃষ্টি হয়েছে মানসিকতায়। আমরা নিজেদের দুর্বলতাগুলো খুঁজে খুঁজে বের করি, আমাদের সক্ষমতার দিকগুলোর দিকে ফিরেও তাকাই না। আমরা বিদেশী কোম্পানীর বিনিয়োগটাই দেখি, তাদের লাভের অংক হিসাব করি না। আমরা বিদেশী বাজারে শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকারটাই দেখি, আমাদের সস্তা শ্রমের অপব্যবহারটা চিন্তাও করি না। তাই এখন প্রশ্ন জাগে উন্মুক্ত বাংলাদেশের বর্তমান অবস্থায় বিশ্ব আমাদের নিকট কতটা উন্মুক্ত? কতটা উদার?

গ্যাস আমাদের দেশের প্রধান খনিজ সম্পদ, কিন্তু একমাত্র নয়। আমাদের মাটি, পানি, বায়ু সবই আমাদের সম্পদ। এ সম্পদ আবেগীয় নয়, বাস্তব। আমাদের মাটিই পৃথিবীতে সবচেয়ে কম জায়গা নিয়ে সবচেয়ে বেশী খাদ্য উৎপাদন করছে। পানি দিচ্ছে সবচেয়ে সুস্বাদু মাছ আর স্রোতের শক্তি। বাতাস সৃষ্টি করছে কার্যকর প্রবাহ আর আমাদের ভৌগলিক অবস্থান দিচ্ছে উপযোগী সূর্যালোক। আমাদের আছে কয়লার মজুদ, আরো আছে তেল। আর বিশাল সমুদ্র সীমানায় যে অফুরন্ত সম্পদ রয়েছে তা অতুলনীয় আর অন্য যে কোন রাষ্ট্রের নিকট ঈর্ষনীয়।
এত কিছুর পরও আমরা নাকি নিঃস্ব-কাঙ্গাল। আমাদের নাকি কিছুই নেই। আমাদের নাকি সব শেষ হয়ে যাচ্ছে। এত কিছুর পরও আমরা আমদানী নির্ভর, কোম্পানী কেন্দ্রিক। করাত-হাতুড়ী-পেরেক-কাঠ থাকার পরও যদি নিজেদের টেবিল নিজেরা না বানিয়ে বিদেশী কোম্পানীকে টেন্ডার দেই, কনসালটেন্ট নিয়োগ করি তবে টেবিল হয়তোবা আমরা পাব কিন্তু পেশীর শক্তিটাকে কখনো বিশ্বাস করতে শিখব না।

বাংলাদেশের মত ঐশ্বর্যমন্ডিত একটা দেশে বেনিয়া গোষ্ঠীকে দাওয়াত দিয়ে আনতে হয় না, তারা আসে নিজ তাগিদে, নিজেদের উন্নয়ন করতে। আর আমাদের সামনে ঝুলায় উন্নয়নের মূলা। আঠারো শতকের ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী আর হালের শেভরণ-নাইকো-তাল্লো’র মধ্যে আদতে কোন পার্থক্য নেই। আগে এরা দেশ দখল করে মানুষ শোষণ করত আর সম্পদ লুটে ব্যস্ত থাকত আর এখন তাদের সৃষ্টি করা কমিশনভোগী শাসকেরা শোষণ করে আমাদের আর সম্পদের খনি ইজারা দেয় তাদের। অসম চুক্তির আড়ালে পাচার হয় আমাদের সম্পদ- অর্থনৈতিক শ্রীবৃদ্ধি হয় ওদের- কাঙ্গাল হতে থাকি আমরা।

কী হত যদি চুক্তি না হত অক্সিডেন্টালের সঙ্গে? কী হত যদি ইজারা না পেত নাইকো কিংবা শেভরণ? কী হত যদি না আসত কনকোফিলিপ্স? আমরা আরও গরীব হতাম? আমাদের অবস্থা কী আরো শোচনীয় হতো? অবশ্যই না।

বরং ওইসব কোম্পানী না আসলে আমরা আমাদের সক্ষমতার চর্চা করতে পারতাম। আমাদের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান আরও শক্তিশালী হত। আমাদের ৫০০ বিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস দূর্ঘটনায় পুড়ত না, এভাবে আমাদের ৪০ হাজার কোটি টাকার সম্পদের ধবংস হত না। আমরা আমাদের কর্তৃত্ব হারাতাম না।

ইজারা ব্যবস্থা রাষ্ট্রের প্রকৃত উন্নয়ন ঘটাতে পারে না। রাষ্ট্রের উন্নয়ন হয় পাবলিক সেক্টরে বিনিয়োগে, সক্ষমতার উৎকর্ষে।

আমাদের যা আছে তা যে এখনই বেচে ফেলতে হবে, ব্যবহার করে শেষ করতে হবে এমনটা তো আর নয়। আমরা নিজেরাই বড় বড় শিল্প কারখানা স্থাপন করতে পারি। আমাদের সম্পদ আরো প্রক্রিয়াকরণের মাধ্যমে ‘ভ্যালু এডিশন’ করে বাইরে রপ্তানীর সূ্যোগ সৃষ্টি করতে পারি। এতে শিল্পের পরিধি বাড়বে, আয় হবে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা, তৈরী হবে ব্যাপক কর্মসংস্থানের সুযোগ, সেই সাথে বাড়বে জিডিপি।

আমরা বিদ্যুৎ উৎপাদনের দোহাই দিয়ে অপব্যবহার করি ‘হোয়াইট গোল্ড’ নামে পৃথিবীজুড়ে পরিচিতি পাওয়া আমাদের অমূল্য গ্যাস সম্পদ। অথচ গ্যাসের অভাবে মাসের পর মাস বন্ধ থাকে আমাদের সার কারখানা। সেই সার আমরা উচ্চমূল্যে কিনে আনি বিদেশ থেকে আর লোক দেখানো ভর্তুকি দিয়ে বিতরণ করি কৃষকদের মাঝে। প্রচলিত-অপ্রচলিত বিদ্যুৎ উৎপাদন পদ্ধতির প্রতিটির জ্বালানী যোগান বাংলাদেশে অসীম। অনাবায়নযোগ্য জ্বালানীর পরিমিত ব্যবহার আর নবায়নযোগ্য জ্বালানীর অপার সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে অল্প সময়ের মধ্যেই বাংলাদেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানী ব্যবস্থা শতভাগ স্বনির্ভর করে গড়ে তোলা সম্ভব। এতে যেমন একদিকে বন্ধ হবে জ্বালানী আমদানী বাণিজ্য অন্যদিকে স্বনির্ভর হবে বাংলাদেশ।

অথচ তা করা হচ্ছে না। সরকারের মহাপরিকল্পনা অনুসারে আগামী ৮ বছরে প্রায় ১ হাজার মেগাওয়াটের নতুন বিদ্যুৎকেন্দ্র হবে আমদানীকৃত তেল নির্ভর, ৭ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট হবে কয়লা নির্ভর যেখানে আবার ৩ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট হবে আমদানীকৃত কয়লানির্ভর। গ্যাস সংকট দেখিয়ে দ্রুত উন্মুক্ত কয়লা খনি প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্র তৈরী করা হচ্ছে আবার অন্যদিকে ৬ হাজার মেগাওয়াটের নতুন গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের টেন্ডার দেয়া হচ্ছে। নবায়নযোগ্য জ্বালানীভিত্তিক হাজার হাজার মেগাওয়াট উৎপাদন সক্ষমতার লক্ষ্যমাত্রা নানাভাবে কমানো হচ্ছে অথচ জনমত উপেক্ষা করে পরিবেশ আর প্রতিবেশের কথা চিন্তা না করে পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের জন্য চুক্তি করা হচ্ছে।

যত বড় প্রজেক্ট-যত জটিল তার প্রক্রিয়া- তত বড় তার আয়োজন- তত বড় তার বরাদ্দ- তত বেশী তার কমিশন- এই নীতিই চলছে শুরু থেকে আজ অবধি। একারণেই আমাদের সম্পদ ব্যবহার করে সক্ষমতা বাড়ে বিদেশীদের, আমরা মুখোমুখি হই নানা ধরণের এক্সপেরিমেন্টের, মানুষ হয়ে জীবন যাপন করি গিনিপিগের।

জ্বালানী খাতে দূর্নীতি একটি দেশের অর্থনীতি ধ্বংস করে ক্যান্সারের মত। এ খাতে অনিয়মের প্রথম প্রকাশ ধটে নিয়মিত এবং অযাচিত মূল্য বৃদ্ধির মাধ্যমে আর কু-প্রভাব ছড়ায় কৃষি, শিল্পখাত, পরিবহন ব্যবস্থার মাধ্যমে এবং প্রসারিত হয় সমাজের প্রতিটি সেক্টরে। প্রভাবিত প্রতিটি খাতেই গড়ে ওঠে একটি করে সুবিধাবাদী কমিশনভোগী নেটওয়ার্ক। এরা নানান উছিলায় মূল্যবৃদ্ধির এই চক্রবৃদ্ধির প্রভাবকে ‘হালাল’ করার চেষ্টা করে। কখনো এরা বলে কৃষকের ন্যায্য মূল্যের কথা আবার কখনোবা বলে মানুষের মানুষের আয় বৃদ্ধির কথা। ফসলের উচ্চমূল্যই যদি দরিদ্র কৃষকের জন্য ন্যায্যমূল্য হয় তবে তাদের অবস্থা কেনো দিন কে দিন খারাপ হয়? আয়ের বৃদ্ধি যদি প্রকৃতই হয় তবে কেনো ব্যয় মেটাতে মানুষ চাপা পড়ে ঋণের বোঝায়? এরকম হাজারো প্রশ্নের উত্তর একটাইঃ সাধারণ মানুষের স্বপ্ন পূরণ হয়ে গেলে, গরীব কৃষকের প্রকৃত উন্নয়ন ঘটলে, জবাবদিহিতামূলক নিয়মতান্ত্রিক ব্যবস্থা চালু হলে শাসকগোষ্ঠীর শোষণ আর কমিশনভোগীদের অবাধ লুন্ঠন চিরতরে বন্ধ হয়ে যাবে। তাই কৃত্তিম সংকট সৃষ্টি করে আমদানী বাণিজ্য তৈরী করা হয়, ভর্তুকির টাকা বরাদ্দ দেখিয়ে হরিলুঠ করা হয়, হাজারো সমস্যা জিইয়ে রেখে শাসকের চাহিদা সৃষ্টি করা হয়। একারণেই সমাজে বাড়ে ধনী আর দরিদ্রের ব্যবধান। এ কারণেই প্রশ্ন জাগে, স্বপ্ন থেকে সত্যি আর কতদূর?

স্বপ্ন আশা জাগায়, তৈরী করে কর্মস্পৃহা। আমরা চল্লিশ বছর ধরে সেই স্বপ্নপূরণে কাজ করে যাচ্ছি আর লাভের গুড় খাচ্ছে এ কালের জগৎশেঠ-মীর জাফরেরা, যারা আমাদের নিয়ত শোষণ করে যাচ্ছে, দেশের সম্পদ ইজারা দিচ্ছে আর আমাদের স্বপ্ন বেচে খাচ্ছে। স্বপ্নগুলো ধীরে ধীরে মরীচিকায় পরিণত হচ্ছে। তবু আমরা স্বপ্ন দেখি সোনালী সকালের, স্বপ্ন দেখি স্বনির্ভর বাংলাদেশের।

পরিশিষ্ট:
অপার সম্ভাবনার বাংলাদেশ চিরকালই যে এসব দুর্বৃত্তায়িত নীতিনির্ধারকদের দ্বারা শোষিত হয়ে যাবে এমনটা ভাবার কোনই কারণ নেই। যে দেশের মানুষ ভাষার জন্য প্রাণ দিতে পারে সে দেশের মানুষ অস্তিত্ব রক্ষার লড়াইয়ে আর কী কী করবে তা জানার জন্য হয়তোবা অপেক্ষা করতে হবে আর অল্প কিছুকাল। রাজনীতিকে যারা ব্যবসা হিসেবে নিয়েছেন, দেশটাকে যারা নিজের সম্পত্তি মনে করছেন, মানুষকে যারা দাস বানাতে চাইছেন আজ সময় এসেছে তাদের পরিণতি নিয়ে ভাববার।