ক্যাটেগরিঃ মতামত-বিশ্লেষণ

 

রাজা, রাজ্যধিপতি বা বাদশাহ এ সবই একচ্ছত্র ক্ষমতার অধিকারী অতীব প্রতাপশালী কাউকে নির্দেশ করে। শুধুমাত্র জাতি-ধর্ম বা স্থান-কাল বিশেষে নামকরণের বিশেষণ পরিবর্তন হয়। হিন্দু সমাজে রাজা, মধ্যযুগে আরবে খলিফা আর পরবর্তীতে ইসলামী শাসন ব্যবস্থার রাষ্ট্রনায়ক বাদশাহ হিসেবে পরিচিত।

আমরা জানি চীনের কনফুসিয়াসকে যিনি বিচারক থেকে রাষ্ট্রনায়ক হন, আমরা জানি খলিফা আবু বকর সম্পর্কে যিনি রক্তপাতহীন প্রেক্ষাপটে ইসলামের প্রথম খলিফা হিসেবে নির্বাচিত হন। আমরা জানি বাদশাহ আকবরকে যিনি হিমুকে পরাজিত করে সিংহাসন নিশ্চিত করেন। এদের কেউ কেউ ছিলেন তৈমুর লঙ্গের মত হিংস্র, কেউ ছিলেন উমরের মত প্রজাদরদী, আবার কেউবা ছিলেন হুমায়ুনের মত আবেগী।

শত-শহস্র কালের রাষ্ট্র পরিচালনার আদিমতম যন্ত্রের ব্যবহার এখনো রয়ে গেছে আপন মহিমায়। কালের বিবর্তনে আমরা দেখেছি শুধুমাত্র এর বাহ্যিক মুখোশের পরিবর্তন। খ্রীষ্টপূর্বের কনফুসিয়াসের প্রজ্ঞার গভীরতা আমরা পেয়েছি মহাত্মা গান্ধীর মাঝে আর তৈমুর লংয়ের হিংস্রতা দেখেছি হিটলারের কার্যকলাপে।

মুখে বলি গণতন্ত্র। কিন্তু ভোট ভিক্ষার বৈতরনী পার হলেই শুরু হয় স্বৈরাচারী একনায়কতন্ত্র। আপনি হয়তো বলবেন আধুনিক সব গণতান্ত্রিক দেশের জন্য আমার এই কথাটি সঠিক নয়। হয়তো উদাহরণ হিসেবে বলবেন আমেরিকা, ইটালী বা ফ্রান্সের কথা। কিন্তু আসলে তা নয়। আসল সত্যটি হচ্ছে- প্রতিটি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার সর্বোচ্চ আধুনিক প্রতিনিধিটি হচ্ছে ইতিহাসের আদিমতম রাজা। তারা যখন যা ইচ্ছা তাই করেন। আধুনিক রাজারা তেলের দখল পোক্ত করার জন্য অগণতান্ত্রিক সেনা শাসনের সাথে আতাত করেন। তারা দূর্বল রাষ্ট্রগুলোতে দাবার গুটির মত রাজা পরিবর্তন করেন। তারা গণহত্যা চালিয়ে লাশের দেখভাল করার জন্য রেডক্রসের সাহায্য পাঠান।

আধুনিক সব রাজাই এক। শুধুমাত্র তাদের মুখোশটি ভিন্ন। সিংহাসনে থাকাকালে তারা যেন দুধের শিশু আর সিংহাসনচ্যুত হলে তাদের কারোর বের হয় ছয় হাজার কোটি ডলারের হিসাব, কারোর বের হয় দেড় টন স্বর্ণের তথ্য আবার কারোর বের হয় খাম্বা-বেচা অর্থ্ জমা রাখা সুইস ব্যাংকে খোলা অ্যাকাউন্টের খবর। কিন্তু এই গোলক ধাধার সমাধান কেউ দিতে পারবে না। ইতিহাসের পাতায় আমরা যেমন পড়িনি কোন রাজা-বাদশাহর বিচারের দৃষ্টান্ত তেমনি আমাদের পরবর্তী প্রজন্মও আধুনিক কোন রাজার বিচার দেখতে পাবে না।

ওবামা করবে না বুশের গণহত্যার বিচার। আমর মুসা বা এল-বারাদি করবে না মোবারকের অপশাসনের বিচার। আর আমাদের বর্তমান রাজাও করবে না পূববর্তী রাজার করা চুরির বিচার। কারণ এটা একটা সাইক্লিক সিস্টেম। ব্যালটের মাধ্যমে নিদিষ্ট সময়ান্তে রাজার মুখোশ চেঞ্জ হবে, বুলি কপচানোর ঢং পাল্টাবে, রাজপ্রাসাদের স্থান পরিবর্তন হবে, কিন্তু সিংহাসনে বসা রাজার স্বভাব পরিবর্তন হবে না। কারণ সিংহাসন যে সেই একটাই। সেই সিংহাসনে বসলেই রাজা হবে দেবতা জিউস। তার সব কথা হবে বাণী অমৃত। আর সব কাজ হবে পদ্ম জলের ন্যায় পবিত্র। কাজেই রাজারা হবেন ধনী। তার আশেপাশে সৃষ্টি হবে সুবিধাভোগী কতিপয় ধনীক শ্রেণী। গরীব প্রজারা তাদের ত্রিসীমানায় ঢুকতে পারবে না।

কথায় আছে না- “রাজায় রাজায় লড়াই, উলুখাগরার প্রাণান্ত” এই লড়াইটা আসলে হয় লোক দেখানো। সিংহের সার্কাস যেমনি করে আমরা তময় হয়ে দেখি, ঠিক তেমনি রাজনীতিতে দুইপক্ষ লড়াই করে সাধারণ জনগণের গণজাগরণ দমিয়ে রাখার জন্য। গরীব প্রজারা আশ্চর্য হয়ে দেখতে থাকে দুই রাজার শৌ্র্য-বির্যের লড়াই। সেই লড়াইয়ে রাজা নিহত হওয়া তো দূরে থাক, সামান্য আহতও হয় না। অথচ লোক-দেখানো লড়াই দেখতে থাকা বহু গরীব প্রজা প্রাণ উৎসর্গ করে দেয় মহান রাজার উদ্দেশ্যে। আওয়ামীলীগ বিরোধী দলে থাকলে বলে বি.এন.পি’র দুঃশাসন চলছে, দেশ গোল্লায় যাচ্ছে, খাম্বা-খুটি বসানোর নামে হাজার কোটি টাকা চুরি হচ্ছে। কিন্তু ক্ষমতায় এসে তারা এতটাই ব্যস্ত যে তাদের সেই চুরির হিসেব নেবার সময় এখন আওয়ামীলীগের নেই। বি.এন.পি’ও যখন ক্ষতায় আসবে তখনও বর্তমান চুরির কোন সুরাহা হবে না। বর্তমান শেয়ার কারসাজীর কোন সুরাহা হবে না, যেমনি ভাবে ৯৬’এরও হয়নি। গরীব প্রজার লক্ষ কোটি টাকা হাতানো চিহ্নিত ব্যক্তিটিরও কিছুই হবে না, কারণ তিনি যে মহান রাজার উপদেষ্টা। শেয়ার কারসাজীতে হাতানো টাকার শেয়ার ঠিক সময়েই পৌছে যাবে রাজার দপ্তরে। শেয়ার চুরির টাকায় কেনা বিমানে রাজা একদিন হয়তোবা যাবেন আনন্দ-বিহারে। আর এই প্রমোদভ্রমণে রাজা হয়তো সঙ্গে নেবেন সুবিধাভোগী ভেড়ার মত সংগ দেয়া জামাত বা জাতীয় পার্টির কোন পাতি রাজাকে যাদেরকে ক্ষমতায় গেলে সিংহাসনের পায়ার সাথে গলায় দড়ি বেধে আটকে রাখা হয় যার উপরে মাঝে-মধ্যে আচড় কেটে হবু রাজা ক্ষণিকের কোন ক্ষোভ প্রশমিত করেন।

পূর্ববতী রাজার সৃষ্টি করা বিশেষ বাহিনীর যখন নির্দয়ভাবে কেটে নেয় লিমনের পা তখন সাবেক রাজা বেশ তৎপর কিন্তু যখন এই বাহিনীটিই শত শত গরীব প্রজার প্রাণ হরণ করেছে তখন তারা নির্বিকারভাবে বলেছে “এগুলো বিচ্ছিন্ন ঘটনা”। সত্যিই তো, রাজ বাহিনীর সদস্যরা দয়া করে আমাদের প্রাণ হরণ করেছেন- এটা তো আমাদের ভাগ্য। দু-পায়ে হাটার কষ্ট কমিয়ে দিতে লিমনের পা কেটে নিয়েছেন- এটা তো লিমনের প্রতি রাজার বিশেষ করুণা। আমাদের মত কতিপয় কিছু বোকা আযথাই বিচার বিচার করে চেচাই। কবে না আবার মহান রাজার কৃত পাপকর্ম জনসম্মুখে তুলে ধরার অপরাধে বিশেষ বাহিনী আমার প্রাণ নিয়ে আমাকে ধন্য করবেন তা শুধু বিধাতাই জানেন। আমাদের মনে রাখতে হবে রাজাদের শত ব্যস্ততার হাজারো কাজের মাঝে দু-একটা ভুল হয়ে যেতেই পারে। সেই ভুলের মাশুল হয়তোবা দিতে হবে লক্ষ লক্ষ গরীব প্রজাকে যারা সহায়-সম্বল বেচে জীবনটাকে টিকিয়ে রাখতে কিছু শেয়ার কেনে। সেই ভুলের মাশুল হয়তো দিতে হবে ভূখা-নাঙ্গা লিমনদের যারা পড়া-লেখার টাকা যোগাতে ইটভাটায় কাজ করে। কিন্তু রাজার কৃত ভুলের বিচার কোনমতেই চাওয়া যাবে না। কারণ তারা যে রাজা।

কাজেই তিউনিশিয়ায় হতাশাগ্রস্থ তরুণ যুবার পেট্রোল সিক্ত হয়ে আত্মাহুতির আগুনের আচ তাড়িয়ে বেড়াবে হাজারো বেকার যুবককে। ফিলিস্তিনে বোমা হামলায় মৃত সন্তানের পাশে বসা মায়ের আহাজারি কাঁদাবে লক্ষ কোটি মা’কে। তাহরির স্কোয়ারের উন্মত্ত প্রতিবাদ দেখা যাবে পৃথিবীর বিভিন্ন জায়গায়। কিন্তু আদতে পরিবর্তন কিছুই হবে না। মেঘের পরে সূর্য হাসলেও আমাদের মত গরীব প্রজাদের হতাশার আকাশে আশার আলো কোনদিনও ফুটবে না। ধনী রাজার তীব্র প্রতাপে পুড়ে ছারখার হয়ে আমরা শুধু হেটে চলি আপন জীবনের রাস্তা ধরে। চির হতাশার কফিন বয়ে বেড়াই সারাটি জীবন ধরে। মৃত্যুর আগে গোলামির শিকল পড়িয়ে যাই পরবর্তী প্রজন্মের পায়ে।