ক্যাটেগরিঃ স্যাটায়ার

 

পৃথিবী থেকে দুই আলোকবর্ষ দূরে রকনিক গ্যালাক্সির সমৃদ্ধিশালী গ্রহ প্লটোনিক। এই গ্যালাক্সির ম্যাল্কান এবং সানবার্ণেও প্রাণের অস্তিত পাওয়া গেছে। কিন্তু প্লুটোনিকের সমৃদ্ধির তুলনায় বাকি দুটোর অগ্রগতি তেমন কিছুই নয়। আর প্লুটোনিকের এই অভাবনীয় অগ্রগতির পেছনে ‘আর্থ রিসার্চ এ্যান্ড ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং ইন্সনস্টিটিউট’ এর অবদান সবচেয়ে বেশী। এই ইন্সনস্টিটিউট ধবংসপ্রাপ্ত মানব সভ্যতার বিভিন্ন দেশ নিয়ে গবেষণা করে। আর গবেষণা লব্ধ ফলাফলের ভিত্তিতে নিজেদের পরিবর্তিত করে।

যেমন, এক গবেষণায় পাওয়া গেল- চরম দুর্নীতির কারণে একটি দেশের মানুষেরা যোগ্যতা অনুসারে চাকরী পাচ্ছিল না। দেশ চালানোর ক্ষমতায় আসীন দলের সাপোর্টার না হলে সেখানে বেকার জীবন যাপন করতে হত। এর ফলে সে দেশে এক বিশাল হতাশাগ্রস্ত শিক্ষিত তরুণ শ্রেণীর সৃষ্টি হয়। তারা ধীরে ধীরে মাদকাসক্ত হয়ে পড়ে। ছিনতাই আর খুনখারাবিতে জড়িয়ে পড়ে। যোগ্যতার দাম না থাকায় সে দেশের বাবা-মা’রা ছেলেমেয়েদের স্কুলে পাঠানো বন্ধ করে দেয়। শিক্ষাথী বিহীন স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় গুলো এক সময় বন্ধ হয়ে যায়। শিক্ষাবিহীন দুর্নীতিগ্রস্ত দেশটির অগ্রগতি থেমে যায়। এক সময় বিদেশি অগ্রাসনে সে দেশটি নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়।

এই গবেষণার ফল প্রকাশের সাথে সাথে প্লুটোনিক গ্রহে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসে। গবেষণার সুপারিশ অনুযায়ী তখন থেকে প্লুটোনিকবাসীর সবার নাম পরিবর্তন করে শ্রেণী অনুযায়ী সিরিয়াল নাম্বার দেয়ার ব্যবস্থা চালু হয়। যেমন, ডাক্তারদের অভিজ্ঞতা অনুসারে DOCTOR এর প্রথম তিন অক্ষর নিয়ে DOC-1, DOC-2, DOC-3 নাম দেয়া হয়। আবার ইঞ্জিনিয়ারদের স্কিল অনুসারে ENG-1, ENG-2 করা হয়। এমনিভাবে সবার নতুন নাম জারি হয়। অনেকটা ক্লাশে মেধা অনুসারে রোল নাম্বার দেয়ার মত। এর ফলে এখন আর প্লুটোনিকের রোগীদের ডাক্তারদের কাছে যাবার আগে যাচাই করতে হয় না- কে কার চেয়ে বেশী ভাল। ইঞ্জিনিয়ারদের চাকরী পেতে আর দুর্নীতির সুযোগ থাকে না, ঠিকাদারদের কাজ পেতে আর তদবিরের অবকাশ থাকে না।

আজ ৩১ শে মার্চ, ২৯৮০। আজ আর্থ রিসাচ এ্যান্ড ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং ইন্সষ্টিটিউটের হলরুমে আয়োজন করা হয়েছে ইয়ারলি কনফারেন্স। পুরো প্লুটোনিকে আজ রাষ্ট্রীয় ছুটি। সবাই যার যার হলোগ্রাফিক ডিভাইসের মাধ্যমে সরাসরি অংশ নিচ্ছে সেই কনফারেন্সে। আজ গবেষণা পত্র উপস্থাপন করবেন প্লুটোনিকের প্রধান বিজ্ঞানী SCI-1। চলুন আমরাও এখান থেকে সরাসরি অংশ নেই সেই কনফারেন্সে…….

“সম্মানিত প্লুটোনিকবাসী, আমি SCI-1 ‘আর্থ রিসার্চ এ্যান্ড ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং ইন্সষ্টিটিউট এর পক্ষ থেকে আপনাদের সবাইকে এই সম্মেলনে জানাচ্ছি স্বাগতম। পৃথীবিতে মানব সভ্যতার অন্যতম অগ্রগতি সূচিত হয়েছিল তাদের সৃষ্টি রহস্য উদ্ঘাটনের মাধ্যমে। আর আজ আমরা মানব সভ্যতার ধবংস রহস্যভেদ করার চেষ্ট্য অনবরত কাজ করে যাচ্ছি। আমাদের এ বছরের গবেষণার বিষয় ছিল পলিটিকাল স্টেটমেন্ট। ধবংসাত্নক আর মিথ্যা রাজনৈতিক বিবৃতি কিভাবে একটি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে অকেজো করে ফেলেছিল তাই আমরা খুজে পেতে চেষ্টা করেছি।

সেখানে অথনৈতিক অগ্রগতি রুদ্ধ হবার প্রধান কারণ ছিল হরতাল নামক একটি ধবংসাত্নক ব্যবস্থা। এর মাধ্যমে সমাজ ব্যবস্থা অচল করে দেয়া হত আর এ হরতাল সফল করতে আগের দিন শতাধিক পাবলিক ট্রান্সপোটে জীবন্ত মানুষ পুড়িয়ে মারা হত। নির্বাচনের আগে সকল দল হরতাল না করার ব্যপারে প্রতশ্রুতি দিয়ে পলিটিক্যাল স্টেটমেন্ট দিত। কিন্তু হেরে গেলে সেই প্রতিশ্রতি তারা দেয়নি বলে দাবি করত। নিশ্চিত এই মিথ্যাচার কীভাবে সে দেশের জন সাধারণ মেনে নিত তা এখনও আমাদের কাছে এক বিরাট রহস্য।

সেদেশে সরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রধান প্রতিবারই কৌতুক প্রিয় চরিত্রের হতেন। কখনও তিনি কোন হত্যাকান্ড ঘটলে সেখানে গিয়ে সান্তনা দিয়ে বলতেন, “আল্লাহ’র মাল আল্লাহ নিয়ে গেছে, আমাদের সরকারের কিছু করার নেই।” আবার আতংকবাদীরা প্রকাশ্যে ঘোরাফেরা করলেও না দেখার ভান করে বলতেন, “we are looking for শত্রুস” আবার দিনে বিশটা খুনের ঘটনা ঘটলেও বলতেন, “আইন শৃংখলা পরিস্থিতি আগের চেয়ে অনেক ভাল”

সে দেশের বাণিজ্যমন্ত্রীরা কখনও বলতেন, “আপনারা কম কম খান।” কখনও বলতেন, “বাজারে গিয়ে জিনিসপত্রের দাম অজথা বাড়াবেন না।” সেদেশের শেয়ার ব্যবসায় ধবস নামলে চিহ্নিত দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিয়ে অর্থমন্ত্রী বলতেন, “জুয়া খেলা আর শেয়ার ব্যবসা একই কথা। তাই এখানে ধবস নামা অস্বাভাবিক কোন কিছু না।”

সেখানে বিদ্যুত ও জালানী ব্যবস্থাপনা বলতে কিছু ছিল না বললেই চলে। যদিও বিদ্যুত মন্ত্রণালয়ের জন্য হাজার হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ হত কিন্তু তার ৯০ ভাগই সংশ্লিষ্ট বিভাগ চুরি করে বিদেশী ব্যংকে জমা করত আর বাকি ১০ ভাগ দিয়ে খাম্বা-খুটি বসিয়ে জনগণকে ধোকা দেয়া হত। সাধারণ মানুষ সোনালী স্বপ্ন ভবিষ্যতে সত্যি হবার আশায় দৈনিক ১৫ ঘন্টা করে লোডশেডিং মেনে নিত, কিন্তু তাদের সেই স্বপ্নের প্রহর প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে চলত। সরকারের কাছে কৈফিয়ত চাইলেই বলত, “বিগত সরকারের সীমাহীন দুর্নীতির কারণে এই সেক্টরে কোন কিছুই অবশিষ্ট নেই। আমাদেরকে সময় দিন। আপনারা ধৈর্য ধরুণ।”

সেদেশের মন্ত্রীরা নিজ মন্ত্রণালয়ের চেয়ে অন্য মন্ত্রণালয় বেশী পছন্দ করত। যেমন, পররাষ্ট্র মন্ত্রী পছন্দ করত স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। নৌ-মন্ত্রী পছন্দ করত যোগাযোগ মন্ত্রণালয়। আবার যোগাযোগ মন্ত্রী পছন্দ করত পূর্ত মন্ত্রণালয়। যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের সীমাহীন দুর্নীতির আর চরম অব্যবস্থাপনার কারণে শতকরা ৬০ ভাগ মানুষ সড়ক দুঘটনায় মৃত্যুবরণ করত। তারপরও নৌ-মন্ত্রী তার দলীয় ড্রাইভারদের লাইসেন্সের সুপারিশ করে যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠাত। একটি চিঠির কিছু উল্লেখযোগ্য অংশ ছিল এরকম- “আমি পত্রে উল্লেখিত এই ২০ হাজার জনের পরীক্ষা নিয়েছি। গত কোরবানীর ঈদে আমি এদের দিয়ে বিভিন্ন হাট থেকে গরু ও ছাগল হাদিয়া স্বরূপ গ্রহন করেছি। এরা যথাযথভাবে তা আমার বাড়ি পৌছে দিয়েছে। তাই উহাদের অবিলম্বে লাইসেন্স দেয়া হোক। তা’নাহলে এরা অতি শীঘ্রী আমার নিদেশে লাইসেন্স ছাড়াই গাড়ি চালনা শুরু করবে।”

দলীয় আনুগত্য না থাকলে সে দেশে জীবনযাপন অসম্ভব হয়ে পড়েছিল। অন্যদিকে দলীয় অনুগত্য এবং দুর্নীতির মাধ্যমে সেখানে মুক্তিযুদ্ধের ১০০ বছর পরও ২৮ বছরের সন্ত্রাসী ক্যডার মুক্তিযোদ্ধা কোটায় প্রথম শ্রেণীর সরকারী কর্মকতা হিসেবে নিয়োগ পেত। সেখানে চিহ্নিত ফাসির আসামী মুক্তি পেত আর নিরপররাধ কিশোরদের কখনো গণপিটুনিতে আবার কখনও ক্রস ফায়ারে মারা হত। বিচার বহির্ভূত হত্যাকান্ডে মৃত্যুর হার ১০% এ গিয়ে পৌছেছিল। এ হত্যাকান্ড বন্ধ করার ওয়াদা করে ক্ষমতা গ্রহণ করলেও ক্ষমতায় এসে বলত, “এগুলো একদিনে বন্ধ করা সম্ভব নয়।”

স্বাস্থ্যমন্ত্রী নিজ সাফল্যের ফিরিস্তি গেয়ে বলত, “দেশের সাস্থ্য-ব্যবস্থা যে কোন সময়ের চেয়ে ভাল। আমরা এখন দেশেই কম খরচে বিশ্ব মানের সেবা দেবার ব্যবস্থা করেছি। অথচ রাষ্ট্র পরিচালনার কোন কর্তা ব্যক্তিই দেশে চিকিৎসা করাতো না।

সেদেশে মন্ত্রী-এম.পি রা এতটাই দীনহীন ছিল যে কোটি টাকার গাড়ি কিনতে পারলেও সেটার ট্যাক্স পরিশোধ করতে পারত না। তাই আইন করে তাদের ট্যাক্স মাফ করে দেয়া হয়। সেদেশে প্রধানমন্ত্রী বলতেন, “আমি আমার দেশের জন্য রক্ত দিব” অথচ তার নিরাপত্তারক্ষীদের কড়াকড়ির কারণে তিনি ধীরে ধীরে মশা নামক প্রাণীটির কথা ভুলে গেলেন।

এ গবেষণা কাজে আমরা প্রতি মুহূর্তে বিস্ময়ে হতবাক হয়েছি, সেই সময়কার রাজনীতিবিদদের মানসিক দৈন্যতা আর নগ্ন মিথ্যাচার কীভাবে পুরো জাতিকে নিমম হতাশায় নিমজ্জিত করেছিল তা অকল্পনীয়। এ ধরণের মিথ্যাচার মুখ দিয়ে করা সম্ভব নয়। কারণ মিথ্যা বলার সময় প্রকৃতিগত ভাবেই হার্টবিট বেড়ে যায় এবং মস্তিষ্কের নিউরণগুলো অস্বাভাবিক ভাবে অন্দোলিত হতে থাকে। এমতাবস্থায় মুখের স্বাভাবিক বাচনভঙ্গি ঠিক রেখে মিছিল-মিটিং বা প্রেস কনফারেন্সে অংশ নেয়া অসম্ভব।

এ গবেষণায় সময়সাপেক্ষ বৈজানিক পরীক্ষা এবং সকল বিজানীর মতানৈক্যের মাধ্যমে সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয়েছে যে সে সময়কার ঐ রাজনীতিবিদেরা মুখ দিয়ে এসব বিবৃতি দিতেন না। তারা পশ্চাৎদেশ দিয়ে কথা বলার এ প্রক্রিয়াটি এমনভাবে সম্পন্ন করতেন যা সাধারণ মানুষেরা বুঝতে পারত না। এই পশ্চাৎদেশীয় কথামালা দিয়ে তারা দীঘদিন ক্ষমতায় টিকে থেকে সাধারণ নিরপরাদ মানুষদের শোষণ করে গেছেন। এর ফলে সমাজে শ্রেণী বৈষম্যের সৃষ্টি হয় আর তা রূপ নেয় জাতিগত দাঙ্গায়। ঐক্যমত্যবিহীন অচল গণতান্ত্রিক কাঠামোর সুযোগ নিয়ে ভীনদেশী শত্রুরা এক সময় দেশটি দখল করে নেয় এবং ঐ জাতির সকীয়তা বিলুপ্ত হয়ে যায়।

তাই আমাদের রাজনীতিবেদদের পশ্চাৎদেশীয় কথামালার সম্ভাবনা চিরতরে রহিত করে দেবার জন্যে এ বছর ‘আর্থ রিসার্চ এ্যান্ড ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং ইন্সষ্টিটিউট এর পক্ষ থেকে আমি, SCI-1 প্লুটোনিকের সকল রাজনীতিবিদের পশ্চাৎদেশ বন্ধ করে দেয়ার সুপারিশ করছি।”

পরিশিষ্টঃ গবেষণা পত্রের সুপারিশ অনুসারে প্লুটোনিকের সকল রাজনীতিবিদের পশ্চাৎদেশ বন্ধ করে দেয়া হল। তবে পশ্চাৎদেশীয় অত্যাবশ্যকীয় কর্মকান্ড চালু রাখার সুবিধার্থে চিরতরে বন্ধ করে দেয়ার পরিবর্তে সেখানে জীপার লাগানো হল। টাট্টিখানা ব্যতীত মিছিল-মিটিং-প্রেস কনফারেন্স সহ অন্য সকল স্থানে রাজনীতিবিদদের সেই বিশেষ জীপার খোলা রাখা নিষিদ্ধ করা হল। এভাবে প্লুটোনিকে রাজনীতিবিদদের পশ্চাৎদেশীয় কথামালার সম্ভাবনা রহিত করা হল আর প্লুটোনিক সভ্যতা আরো একধাপ এগিয়ে গেল।