ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

 


স্বপ্নহত্যার এক বছরঃ আমাদের ক্ষমা করো সম্রাট শিরোনামে একটি পোস্ট দিয়েছিলাম গত বছরের ২০ শে মে, সম্রাটের প্রথম মৃত্যুবার্ষিকীর কিছুদিন আগে।

আজ ২৭ শে মে। সম্রাটের দ্বিতীয় মৃত্যুবার্ষিকী। সময়ের নিয়মে সময় চলছে। পরিবর্তিত সময়ের প্রভাবে পরিবর্তন হচ্ছে পারিপার্শ্বিকতার। কিন্তু বন্ধ হয়নি স্বপ্নহত্যার মিছিল।

সম্রাটের মৃত্যু কোন ঘটনার শুরু নয়, নয় কোন লেখনীর ভূমিকা। সম্রাটে’রা উৎসর্গীকৃত মহত প্রাণ। এই আত্নদান আমাদের চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় আমাদের সিস্টেমের দুর্বলতাগুলো , চেতনা জাগায় অবচেতন মনের, আশা জাগায় পরিবর্তনের। কিন্তু দু’শো বছরে ভিন প্রভুদের ছলছাতুরির ছায়ায় বেড়ে ওঠা ভেতো বাঙ্গালীর বিবেক আজ এক পরগাছা। আর তাইতো আজও আমরা স্বদেশী প্রভুদের ছলনায় ভুলি। মিথ্যা আশ্বাসে মাথা দোলাই।

যে কারণটি বছরে ২০,০০০ মানুষের মৃত্যু ডেকে আনে তা কোনভাবেই দূর্ঘটনা হিসেবে বর্ণনা করা যায় না। তাই সড়কগুলোতে আজ দূর্ঘটনায় মানুষ মারা যাচ্ছে না বরং সড়ক হত্যার মাধ্যমে আমরা ঝাকে ঝাকে মানব নিধন করছি।

চলুন, ঘুরে আসি কয়েকটি রক্তাক্ত স্থান। স্মৃতি হাতড়ে দেখি আমরা কি মনে রেখেছি আর কি ভুলে গেছি-

২৭ শে জুন, ২০১১: ঢাকা-টাংগাইল মহাসড়কের আশুলিয়ায় ট্রাক হিউম্যান হলারকে ধাক্কা দিলে ৪ জন শ্রমিক মারা যায়।

১১ ই জুলাই, ২০১১: চট্রগ্রামের মীরসরাইয়ে ট্রাক নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ডোবায় পড়ে গেলে প্রাণ হারায় ৪৫ জন স্কুলছাত্র।

১৩ ই আগস্ট, ২০১১: তারেক মাসুদ-মিশুক মনির সহ পাচ জন মানিকগঞ্জে বাস-মাইক্রোবাস সংঘর্ষে প্রাণ হারান।

২৫ শে সেপ্টেম্বর, ২০১১: মাগুরা জেলার সাইত্রিশে দ্রুতগামী ট্রাক অটোরিক্সাকে ধাক্কা দিলে ঘটনাস্থলেই ১২ জনের মৃত্যু হয়।

১৩ ই অক্টোবর, ২০১১: বড়পুকুরিয়ায় ট্রাকের চাপায় দু’জন মোটর সাইকেল আরোহী প্রাণ হারায়।

১২ই নভেম্বর, ২০১১: কক্সবাজার থেকে ঢাকাগামী বাস নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে খাদে পড়ে গেলে ৪ জনের তাৎক্ষণিক মৃত্যু হয়। এদের মধ্যে ছিল সদ্য বিবাহিত ঢাকা ইউনিভার্সিটির ছাত্রী নাদিয়া।

২৩ শে ডিসেম্বর, ২০১১: দ্রুতগামী ট্রাকের চাপায় গাজীপুরে একজন গামেন্টস শ্রমিকের মৃত্যু হয়।

১৪ ই জানুয়ারী, ২০১২: বান্দবনের থানচিতে বাস খাদে পড়ে গেলে ঘটনাস্থলেই ১৭ জন প্রাণ হারায়।

২৪ ষে ফেব্রুয়ারী, ২০১২: মাদারীপুরে বাস নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে খাদে পড়ে গেলে ১৪ জন প্রাণ হারায়।

১৯ শে মার্চ, ২০১২: উত্তরায় মাছ বোঝাই ট্রাক চাপায় দু’জনের মৃত্যু হয়।

২৮ শে এপ্রিল, ২০১২: ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের ত্রিশালে বাস-হিউম্যান হলারের মুখোমুখি সংঘষে ৪ জন মারা যায়।

১১ ই মে, ২০১২: ঢাকা-সিলেট মহাসড়কে বাস-ট্রাক সংঘষে ৮ জনের প্রাণহানি ঘটে।

শুরু করেছিলাম গত বছরের জুন মাস থেকে, শেষ করলাম এ বছরের মে মাস দিয়ে। এই ১২ মাসের ১২টি রক্তাক্ত দৃশ্যপটে প্রাণহানি ঘটেছে ১০০শ জনেরও বেশী। আর শারীরীক-মানসিক পঙ্গুত্ব বরণ করেছেন হাজার খানেক।

ঘটনার ভয়াবহতা আমার এলোমেলো বাছাই করা ১২ দিনের ১২ টি দৃশ্যপটে সীমাবদ্ধ নয়। ওই ১২ মাসের প্রায় প্রতিটি দিনেই ঘটেছে এমন সড়ক দূর্ঘটনা। এমনকি আমার বর্ণনা করা দিনগুলোতেও ঘটেছে একাধিক দূর্ঘটনা। তাইতো এখানে আসেনি গত বছরের ২০ শে আগস্টে বাস-ট্রাক সংঘর্ষে প্রাণ হারানো সিলেট ওসমানী মেডিক্যাল কলেজের ছাত্র শাকিল কিংবা এ মাসের ১১ তারিখে বাস চাপায় নিহত ইন্ডিপেনডেন্ট পত্রিকার সাংবাদিক বিভাস চন্দ্র সাহার নাম।

যদি বলি সড়ক হত্যা বন্ধ করুন, তবে প্রভুকূল হতে জবাব আসে- ‘তোমরা সচেতন হও’

আমাদের সচেতনতা কি পারবে রাস্তাগুলোর বেহাল অবস্থা সারিয়ে তুলতে?
আমাদের সচেতনতা কি পারবে হাইওয়ে পুলিশকে কর্মদক্ষ করে গড়ে তুলতে?
আমাদের সচেতনতা কি পারবে পরীক্ষা ছাড়া ড্রাইভিং লাইসেন্স দেয়া বন্ধ করতে?
আমাদের সচেতনতা কি পারবে কঠোর আইন প্রণয়ন করতে?
আমাদের সচেতনতা কি পারবে সড়ক হত্যাকান্ডের সর্বোচ্চ সাজা নিশ্চিত করতে?
–অবশ্যই না।
আর এর প্রতিকার যদি আমাদেরই করতে হয় তবে প্রভুকূলের আর প্রয়োজন কি? প্রভুকূল কি সড়কপথে ছাপোষা ভৃত্যগুলোর রক্তের হোলি খেলা দেখতে ক্ষমতার কুরশীতে চড়ে বসেছেন?
তাই যদি হয় তবে আর আমার কিছু বলার নেই। তবে আর আমি সম্রাট-তারেক-মিশুক হত্যাকাণ্ডের বিচার চাই না।

সম্রাট, তোকে বলছি- আগেভাগে বিদায় নিয়ে ভাল করেছিস রে ভাই। সোনার দেশটাকে উন্নতির শিখরে নিয়ে যাবার যে স্বপ্ন নিয়ে তুই ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে ভর্তি হয়েছিল সেই দেশটার সব জায়গায় অবনতির প্রতিযোগিতা তোকে আর দেখতে হল না।

তারেক মাসুদ, আপনাকে বলছি- আপনি চলে গিয়ে বেচেছেন। স্বপ্নের ফেরিওয়ালা এই আপনাকে দু:স্বপ্নের হাহাকার আর স্পর্শ করবে না।

মিশুক মনির, শুনতে কি পাচ্ছেন?- আপনি চলে গিয়ে আমাদের দায়মুক্ত করেছেন। তা নাহলে গুটি কয়েক দানব সর্দারের বিরুদ্ধে ষোল কোটি মানুষের পবিত্র শক্তির পরাজয়ের ক্লেশ নিয়ে আপনার সামনে দাড়াতে পারতাম না।

মহাসড়কগুলোতে ৫ লক্ষ ড্রাইভার গাড়ি চালাচ্ছে ভুয়া ড্রাইভিং লাইসেন্স নিয়ে; এটা আমার মনগড়া কোন তথ্য না। সরকারী সংস্থা বিআরটিএ’ র পরিসংখ্যান। ১৯৯০ সালে ১ লাখ ৮৯ হাজার ড্রাইভারকে লাইসেন্স দেয়া হয় কোন পরীক্ষা ছাড়াই- যা আজও চলছে। বিভিন্ন সময়ে সরকার সড়ক দূর্ঘটনা রোধে কঠোর আইন করার উদ্যোগ নিলে এ পর্যন্ত অন্তত ১০ বার পরিবহন শ্রমিকেরা ধর্মঘট দিয়ে সারা দেশে যান চলাচল বন্ধ করে তা প্রতিহত করে।

সত্যিই এক আশ্চর্য দেশে আছি আমরা। এদেশে শীর্ষ ব্যবসায়িক নেতা হন দেশপ্রধানের ব্যবসায়িক উপদেষ্টা আর পরিবহন শ্রমিকদের নেতা গিলে ফেলেন পরিবহন মন্ত্রীর পদটি। তাই আমাদের ভাগ্য নির্ধারণী দায়িত্বপ্রাপ্ত লোকটি অবলীলায় বলে ফেলতে পারেন- গরু ছাগলের পার্থক্য বিভেদ করণই হবে ড্রাইভিং যোগ্যতার মাপকাঠি। একজন ড্রাইভারের হাতে শত মানুষের জীবনের জিম্মা দিয়ে আমরা যে হাজার মাইল পথ পাড়ি দেই, তারও যে প্রকৃত শিক্ষার প্রয়োজন আছে, তারও যে জীবনের মূল্য বোঝার দরকার আছে তা আমরা বুঝলেও না বোঝার ভান করে থাকেন আমাদের প্রভুকূল।

দানবকূলের সর্দারদের দিয়ে যে মনুষ্যকূলের সেবা হবে না তা আমরা বুঝে গেছি। তাই আর কোন কথা বাড়িয়ে লাভ নেই।

শেষ করছি হামীম হত্যা স্মরণ করিয়ে।

হামীম শেখ। বয়স ৫। উইলস লিটল ফ্লাওয়ারে পড়ুয়া ফুটফুটে এই শিশুটিকে হত্যা করা হয় ২০১০ সালের ৩’রা ফেব্রুয়ারি।
যে দেশে বাঘ হত্যা করলে সাজা হয় ১০ বছরের কারাদণ্ড, সে দেশের সংবিধানে সড়কপথে এই হামীম’দের হত্যার শাস্তি সর্বোচ্চ ৩ বছর।

আসুন, দানবকূলের ভয়ে ভীত হয়ে খুপরি ঘরের কোনার দিকের নিরাপদ স্থানটি বেছে নিয়ে জুবুথুবু হয়ে বসে থাকি- ঠিক এখন যেমনটি আছি। আর বাইরে দৈত্যের দল হামীম’দের দেহ ছিন্নভিন্ন করে খেতে থাকুক।

নজরুলের পংক্তি অবশেষে আজ সত্যি-
‘তেত্রিশ কোটি দেবতার পাপে স্বর্গ সে টলমল,
দেবতার পাপ পথ দিয়া পশে স্বর্গে অসুর দল’