ক্যাটেগরিঃ প্রশাসনিক

Train-Jamuna-Bangabandhu-bridge-02

সাড়ে নয় বছর চাকুরী জীবনের ত্রিশ মাস বাদে বাকী পুরোটা সময়ই আমার চিটাগাং এর। শুধুমাত্র লাবিবার জন্মসালের ঈদের সময়টা ছাড়া প্রতিবছরই ঈদ উৎসবে জামালপুর আসা হয়। ইমার্জেন্সি ছাড়াও কোন কোন বছর একাধিক বার তো আসিই। চট্টগ্রাম থেকে ময়মনসিংহ হয়ে সড়কপথে জামালপুর আসার একমাত্র পরিবহন হচ্ছে রয়েল প্রতিনিধি যা কিনা সন্ধে সাড়ে সাতটায় নগরীর অলংকার বাস স্টেশন থেকে ছেড়ে আসে। কুমিল্লায় আধঘন্টা বিরতি দিয়ে জামালপুর পৌছার সময় নির্ধারিত রয়েছে ভোর সাড়ে পাঁচটায়।

লাবিবার দুই বছর বয়সে কোরবানির এক ঈদের ছুটিতে যথারীতি চট্টগ্রাম থেকে রয়েল প্রতিনিধিতে যাত্রা শুরু করি,পরদিন ভোরবেলায় যখন আমাদের জামালপুর থাকার কথা তখন আমরা পৌছি কেবল ফেনিতে। রাস্তায় গাড়ির দারুণ প্রেসার। হাজার হাজার গাড়ী, নিয়মনীতি মানার কোন তোয়াক্কা নেই। দুই পাশ দিয়ে কে কার আগে যাবে তার প্রতিযোগিতা। রং সাইডে গিয়ে ভয়ংকর দীর্ঘ জটে পড়ে যায় পুরো ফেনী; কুমিল্লা পর্যন্ত। চট্টগ্রামের মীরের সরাইতেই আমাদের সাত ঘন্টা বাসে বসে থাকতে হয়। বাসযাত্রীদের মধ্যে কেউ কেউ বয়স্কও ছিল। লাবিবার বয়সীও ছিল কয়েকজন। গরমকালে বাসের মধ্যে আটকে থেকে তাদেরসহ সবার যে কি পরিমান কষ্ট ,দুর্দশা,যন্ত্রনা পোহাতে হয়েছে পুরো যাত্রা জুড়ে তার বর্ণনা কল্পনারঅতীত। মনে হয়েছিল জীবনে আর কখনো বাসে জামালপুর যাবনা। এ ধরনের দৃশ্য কোন খণ্ডচিত্র নয়,ঢাকা চট্টগ্রাম রোডের প্রায় প্রতিদিনের চির চেনা চিত্র।

বন্ধুর বিয়েতে একবার জামালপুর যাত্রা করে সীতাকুন্ডু পার হতেই গাড়ী নষ্ট হয়ে যায়। মেরামতের কথা বলে আধঘন্টা একঘন্টা করে ওরা পাঁচঘন্টা পার করে দেয়। ধৈর্যের বাঁধভেঙ্গে যাত্রীরা তখন মারমুখো হয়ে গাড়ীর স্টাফদের আক্রমন করে বসে,পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রনে আনতে সীতাকুন্ডু থানাকে জানালে চট্টগ্রাম থেকে অন্য গাড়ী এনে আমাদের যাওয়ার ব্যবস্থা করা হয়,জামালপুর যখন পৌঁছি তখন দুপুর গড়িয়ে বিয়ের পর্ব শুরু হয়ে গিয়েছিল ততক্ষনে।

রাস্তায় দুর্ঘটনা সে তো নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার। গন্তব্যস্থলে পৌঁছার পূর্ব পর্যন্ত আত্মীয়স্বজন সহ সবাই ভয়ে তটস্থ থাকে। আম্মা তো পুরো রাত না ঘুমিয়েই কাটিয়ে দেয়। ফোনের পর ফোন, এখন কোন পর্যন্ত, আর কতক্ষন লাগবে! জার্নি তো নয় পুরোটা সময় একটা ভয়ঙ্কর ভীতির মধ্যে থাকা। কোন উৎসব এলেই তার মাত্রা বেড়ে যায় কয়েকগুন। আমাদের পাশের গ্রামের এক ফ্যামিলি; তার সন্তানসহ তিনজন, এই জামালপুর চট্টগ্রাম রোডেই গত কোরবানীর ঈদের পর গ্রামের বাড়ী থেকে আসতে কুমিল্লায় দুর্ঘটনায় পতিত হয়ে মর্মান্তিক মৃত্যুবরন করেন।

সবসময় ফিল করতাম, যদি চট্টগ্রাম থেকে জামালপুর রোডে একটা আন্তনগর ট্রেন থাকত, তাহলে আমাদের দুর্দশা কিছুটা হলেও লাঘব হত। কোন উৎসবে বাড়ি যাওয়ার ব্যাপারে অন্তত আতঙ্কগ্রস্ত থাকতে হত না । শেরপুরের প্রকৌশলী তফাজ্জল সাহেব অনেকদিন থেকেই চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন অন্তত ময়মনসিংহ পর্যন্ত একটা আন্তনগর ট্রেন চালু করা যায় কিনা, ২০১৩ পর্যন্ত উনি চট্টগ্রামসহ বৃহত্তর ময়মনসিংহ সমিতির সভাপতি ছিলেন, তখন চিটাগাং রেলওয়ের জিএম হিসাবে কর্মরত ছিলেন।আমাদের সকলের প্রাণের দাবিটি উনি অনুধাবন করে উচ্চ পর্যায়ে যোগাযোগ করতে থাকেন। অবশেষে আমরা স্বপ্নের কাছাকাছি চলে আসি, যখন শুনলাম উনি রেলওয়ের মহাপরিচালক হয়েছেন। গতবছর উনি এ পদে আসীন হয়েই রাস্ট্রপতি মহোদয়ের সাথে ময়মনসিংহ সমিতির লোকজনদের সাথে নিয়ে সাক্ষাত করিয়ে আমাদের দারুন কাজটি করেই ফেলেন।

বিজয়ের মাসে বৃহত্তর ময়মনসিংহবাসীদের সেই প্রত্যাশিত আর বহুল কাঙ্খিত বিজয়ের খবর আন্তনগর বিজয় এক্সপ্রেসের শুভউদ্বোধন হল গতকাল। ময়মনসিংহ রেলস্টেশনে এ সার্ভিসের উদ্বোধন করলেন রেলমন্ত্রী মুজিবুল হক। এর মধ্য দিয়ে দুই অঞ্চলের ৩৫০ কিলোমিটারের রেলপথে প্রথমবারের মতো আন্তনগর ট্রেন সার্ভিস চালু হলো। ময়মনসিংহ-চট্টগ্রাম আন্তনগর ট্রেন সার্ভিসের খবরে ময়মনসিংহসহ আশে পাশের জেলার বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ আনন্দ-উচ্ছ্বাস উল্লাস প্রকাশ করেছে ।

ময়মনসিংহ রেলস্টেশন থেকে চট্টগ্রামের উদ্দেশে প্রতিদিন রাত ৮টায় বিজয় এক্সপ্রেস ট্রেনটি ছেড়ে যাবে। চট্টগ্রামে পৌঁছবে সকাল ৫টা ৪০ মিনিটে। অন্যদিকে প্রতিদিন সকাল ৭টা ২০ মিনিটে চট্টগ্রাম ছেড়ে বিকেল সাড়ে ৪টায় ময়মনসিংহ পৌঁছবে। ট্রেনটি সাতটি স্টেশন গৌরীপুর ময়মনসিংহ, কিশোরগঞ্জ, ভৈরববাজার, কুমিল্লা, লাকসাম, ফেনী ও ভাটিয়ারী যাত্রাবিরতি করবে। ময়মনসিংহবাসীর জন্য সুসংবাদের এই শুভ উদ্যোগটি পরিকল্পনা এবং বাস্তবায়নে যাঁরা অক্লান্ত পরিশ্রম করে দারুন ভূমিকা রেখেছেন তাঁদের সবার প্রতি আমাদের কৃতজ্ঞতার শেষ নেই।


লেখক মুহাম্মদ রেজাউল মাসুদ
নিজ জেলা জামালপুর