ক্যাটেগরিঃ ব্লগালোচনা

৪:০০টায় সময় ফোন। রাজ্জাক ভাই। আড্ডায় পৌঁছে গেছেন! এদিকে আড্ডার সময় ৪:৩০টায়!!! আমার বোধদয় হল, পুলিশ ঘটনার আগেই পৌঁছে যাবেন, এমনটাই তো আমরা নাগরিকেরা চাই! ঝটপট খোঁজ নিয়ে জানলাম ব্লগার কৌশিক আহমেদ পথিমধ্যেই আছেন। কিছুক্ষণ পরেই আশিকুর_নূর এর ফোন। তিনিও পৌঁছে গেছেন। আশ্চর্য! আমরা কি তাহলে জাতি হিসেবে সময়ানুবর্তী হয়ে উঠছি!

বস্তুত আমি তখনও আড্ডাস্থল থেকে দূরে! সাথে কিছু বন্ধুরা আছে, একখানে জমায়েত হয়ে রওনা দিচ্ছি। আরো আছে তিনটা বাচ্চা ভয়ংকর, কাচ্চা ভয়ংকর। সংসদ ভবন যাওয়া হবে শুনে দু’জন পথের ধুলোতে আনন্দে লুটোপুটি খাচ্ছে। কিন্তু অন্যজন হাঁড়িমুখ। তার পা সরছেই না। জিজ্ঞেস করতেই, ঝর ঝর করে কেঁদে দিল। কী কারণ জানা গেল না! অগত্যা তাকে রেখেই রওনা [আড্ডার মাঝপথে ফোনে জানা গেল যে জামাটা সে পড়েছিল তা নাকি ময়লা ছিল, এতেই এত নিশ্চুপ-অভিমান!!!]। তিনবন্ধু, দুই দুর্ধর্ষ পিচ্চি আর একজনের আম্মা (আন্টি) মিলে একটা ক্যাবে রওনা দিলাম।

ক্যাব চলতে না চলতেই পুলিশ আটকালো। গত বৃহস্পতিবার থেকে সিএনজি ক্যাব থামিয়ে কাগজপত্র চেকিং চলছে। কাগজপত্র না পেলে সিএনজি তুলে নিয়ে যাচ্ছে। চালকেরা যাত্রীদের অবশ্য বেশ নরম সুরে অনুরোধ জানিয়ে দেয়, ’পুলিশে জিগাইলে বইলেন মিটারে যাইতাসি’। ক্যাবচালকও ঠিক এভাবেই বলল। আমি বললাম, হু! আপনার কাগজপত্র ঠিক আছে তো? চালক আশস্ত করে। কিন্তু ওদিকে পুলিশ আর চালকের আলাপ শেষই হয় না। পেছনে উঁকিঝুঁকি মেরে বোঝার চেষ্টা করলাম, কাহিনী কোন দিকে জট পাকাচ্ছে! নাকি নেমেই যাব? ঠিক ওই সময়ই চালক ফিরে আসল, রাগে গজ গজ করতে করতে। পুলিশকে উদ্দেশ্য করে খিস্তি-খেউরও চলল। কী হল জানার চেষ্টা করলাম আমরা। টাকা নিল কিনা জানতে চাইলাম। না, টাকা নেয়নি। তবে দু’টো কেস দিয়েছে। চালকের রাগের কারণ হল, একটা কেস দিতে পারে, কারণ ঢাকায় ছিল না বলে সে একটা ডেটলাইন মিস করেছে। তবে পুলিশ তাকে মুখে একটা কেস এর কথা বললেও কাগজে দু’টো ধারা লিখেছে বলে তার অভিযোগ। যা হোক … ক্যাব চলা শুরু হল। কিন্তু শুক্রবারেও যানজট কম নয় মোটেও!

এর মাঝে ফয়সাল পৌঁছে গেছেন বলে জানালেন। ব্লগার কৌশিক আহমেদ -ও পৌঁছে গেছেন। কিন্তু কেউ কাউকে খুঁজে পাচ্ছেন না ঠিক মত। নম্বর জানিয়ে দেয়া হল যেন তারা খুঁজে নেন। বেশ একটা খোঁজ-দি সার্চ ব্যাপার-স্যাপার!

লেকে পাড়ের সারি সারি কৃষ্ণচূড়া গাছ দেখে মন ভাল আর খারাপ দু’টোই হল। ভাল লাগল, কৃষ্ণচূড়ার ঝিরি পাতা দেখে। আর খারাপ লাগল, মে মাসে এ জায়গায় আসলে মনে হয় যেন আগুন লেগে গেছে গাছে গাছে, জুনে সেই আগুন আর নেই! কনকচূড়া শেষ। লাল সোনাইল (পিংক শাওয়ার) -ও চোখে পড়ল না। তবু লালিমা নিয়ে এখনও কিছু কৃষ্ণচূড়া আড্ডাবাজদের ডেকে যাচ্ছে। প্রচুর লোকজন আশেপাশে, লেকের সিঁড়িতে, ব্রিজের উপর!

1
এই সেই কৃষ্ণচূড়া…

2
কত্ত মানুষ!!!

3
কৃষ্ণচূড়া ঝিরি পাতার মত মৃদু বাতাসে লেকের পানিতে ঝিরি ঝিরি স্রোত থাকে

4
একজন ভাবুক…

ব্রিজ পার হয়ে ব্লগারদের ফের খোঁজ-দি সার্চ! ব্লগাররা মাঠে সবুজ ঘাসের উপর গোল হয়ে বসে আড্ডা জুড়ে দিয়েছে ততক্ষণে। আমিও গিয়ে বৃত্তের পরিধিতে অবস্থান নিলাম। অল্প বিস্তর পরিচয় পর্ব হয়েই ছিল, তবুও আরেক প্রস্থ শুরু হল।

6
ব্লগার মো: আশরাফ এবং ব্লগার আব্দুর রাজ্জাক

7
এনারা মনোযোগ দিয়ে কারো কথা শুনছেন, কিন্তু কার?

10
এনারা কারো কথায় মজা পাচ্ছেন, কিন্তু কার?

5
কথা বলছিলেন ব্লগার মোত্তালিব দরবারী

8
ব্লগার মোত্তালিব দরবারী অপ্রতিরোধ্যভাবে বলে চলেছেন…

ব্লগার মো: আশরাফ মাস কয়েক হল যোগ দিয়েছেন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম ব্লগে। আড্ডায় কাঙ্খিত মুখ হিসেবে ছিলেন ব্লগার মো: আব্দুর রাজ্জাক ভাই। ছিলেন ফয়সল। তিনি অবশ্য ব্লগার নন। বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমে ফিচার বিভাগে কাজ করতেন। যোগাযোগটা সেভাবেই। ছুটির দিনে আড্ডা দেয়ার লোভ সামলাতে না পেরে চলে এসেছেন। ছিলেন ব্লগার কৌশিক আহমেদ। সুদূর ময়মনসিংহ থেকে এসেছেন মোত্তালিব দরবারী। উবুন্তু পাগল আশিকুর_নূরকে আড্ডায় দেখা গেল যথারীতি ফায়ারফক্স টি-শার্ট পরিহিত। ওপেনসোর্স পাগল আর ফেসবুক বিদ্বেষী (তিনি সব সময়ই সতর্ক করেন, ফেসবুক একটি পেন্টাগন প্রজেক্ট এবং ফেসবুক ব্যবহারকারীদের সকল তথ্য পেন্টাগনের নজরদারিতে থাকে) রিং ভাই এর সাথে দেখা হল সেই ১১/১১/১১ তারিখের বিশেষ আড্ডার পর। তাদের সাথে ছিল টেকি-পাগল আরো একজন। তবে তিনি ব্লগার নন। আরো ছিলেন ব্লগার দুরন্ত বিপ্লব, যিনি এক সময় কৃষি বিষয়ে ব্লগে নিয়মিত লিখতেন। দুরন্ত বিপ্লব এখন ব্লগে তেমনভাবে সময় না দিলেও কৃষি নিয়েই মেতে আছেন। বাংলা ব্লগের চলতি ধারা নিয়ে তার কিছু রুক্ষশুষ্ক দৃষ্টিভঙ্গি আছে। সেই মতের সাথে আমাদের অনেকের মতানৈক্য ঘটছিল। আলোচনাটা তাত্ত্বিক দিকে চলে যাচ্ছিল দেখে রাজ্জাক ভাই তাড়াতাড়ি আমাদের সবাইকে নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নিলেন!

12
পরিচয় পর্বে ব্লগার রিং

13
পরিচয় পর্বে ব্লগার আশিকুর_নূর

মাঝে অবশ্য টুকটাক খোলামকুচি চাবানো হয়ে গেল। একবার চাওয়ালা এসে ঘুরে গিয়েছিল। চিপসওয়ালা ঘুরে গেল। কিন্তু কেউ কিছু নিতে চাইল না। অদূরের ফুচকাওয়ালা এসে সফল হল। এক’দু প্লেট ফুচকা দিতে বলা হল। রাজ্জাক ভাই চটপটি নিলেন। একটু টক চাইতেই, ফুচকাওয়ালা গল গল করে উনার প্লেটে টক ঢেলে প্লেট ভাসিয়ে দিল। এই নিয়ে হাসাহাসি হল একচোট- টকের পানি নিশ্চয়ই লেক থেকে নেয়া।

আড্ডা ফাঁকে ফাঁকে এদিকে-সেদিকে দেখে নিচ্ছিলাম। আষাঢ়ের প্রথম দিন। মেঘের রঙ -ও তাই জানান দিচ্ছে। মাঝে মাঝে এমনভাবে বাতাস উঠছে, ধূলো উড়ছে যেন ঝড়-বাদল শুরু হয়ে যাবে এখুনি! প্রকৃতির লুকোচুরি খেলার সাথে টেক্কা দিয়ে পুরো মাঠ ছেলে-বুড়ো-কপোত-কপোতিতে জনারণ্য। কাছে বাচ্চারা ক্রিকেট খেলছে। রঙিন প্লাস্টিকের ফুটবল বিকিকিনি এখানে নিত্য হয়। গতবছরও ছিল। ওটাই এপাশ-ওপাশ তাকিয়ে খুঁজলাম। চোখেও পড়ল। বিক্রেতা যখন হাতের মুঠোর সূতোতে টান দিয়ে উপরে তোলে তখন তার চারপাশ ঘিরে থাকে রঙিন ফুটবল। কেমন একটা পেখম মেলা ভাব হয়। আবার মনে হয় ওগুলো একেকটা গ্রহ, যার নাটাইয়ের সূতো ওই বিক্রেতার হাতেই। আমাদের একটু পাশেই ৮-১০ জনের আরেকটা গোলাকার বৃত্ত। বাঙালি আড্ডাবাজ এ কথা বলতে হয় গর্ব করেই!

22
বরষার প্রথম দিনে, ঘন কালো মেঘ দেখে…

9
ক্রিকেট ক্রিকেট

14
আগামির সাকিব আল হাসান

17
ওরে কত আড্ডা দেয় রে!!!

23
রঙিন গ্রহ…

ফুচকা-চটপটির বিল দেয়ার সময় দেখা গেল অনেকেই আগ্রহী! কিন্তু বিল শুনে আকাশে বিজলী না চমকালেও আমাদের উপর বাজ পড়ল যেন! যোগ-ভাগ করে দেখা গেল একেকটা ফুচকার দাম ৮ টাকা!!! হবে নাই বা কেন! সংসদ ভবন এলাকা বলে কথা!

15
পার পিস ৮ টাকার ফুচকা আসলেই টক!!!

ফুচকা পর্ব শেষ হওয়ার পর পরই এলেন ব্লগার আজমান আন্দালিব। উনি এসেই আমাদের ফুচকা সাধলেন! চটপটি সাধলেন! কিন্তু আমরা সকলে মুখে কুলুপ এঁটে ভদ্র মানুষের মত মাথা নেড়ে না-না করলাম। আজমান আন্দালিব অবশ্য হাল ছাড়লেন না। তিনি এবার কফি সাধলেন। এতে কিছুটা কাজ হল। কেউ কেউ কফি নিলেন। মুখে দিয়ে ব্লগাররা বেকুব। এটা না চা, না কফি। সাথের আন্টি বলে উঠলেন, এটা চাফি। কফিওয়ালার সামনে প্রতিবাদ জানানো হল। কফিওয়ালা বিজনেস স্ট্যাটিজি পাল্টালো তৎক্ষণাত। গ্রাহক সেবা দিতে হাতে কফির মিনি প্যাকেট থেকে কফি পাউডার কফিপানকারীদের কফি গ্লাসে ঢেলে ঢেলে দিল। আমি এদিকে দু’প্যাকেট শনপাপড়ি নিলাম। তবে তার আগে সাবধানতা স্বরূপ দাম জেনে নিলাম।

18
যোগ দিলেন ব্লগার আজমান আন্দালিব

19
চাফি সাধাসাধি চলছে

20
চাফিতে কফি পাউডার মেশানো হচ্ছে

প্রকৃতি অবশ্য আমাদের একটু ভড়কে দিল। বেলাও শেষ হয়েছে ততক্ষণে। অবস্থা দেখে মনে হল, এই বুঝি ঝড়-বৃষ্টি নামে। ব্লগারদেরও ফিরব ফিরব প্রস্তুতি। উঠেই যাচ্ছিল সব, এমন সময় ব্লগার মাহবুবুর রহমানের ফোন- আমরা আছি কিনা এখনও…। মাহবুবুর রহমানের জন্য আমরা কেউ কেউ তখন অপেক্ষায় থাকলাম। যাওয়া প্রস্তুতিতে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে গল্প চলছিল, সেটা আবারো বসে আয়েশ করে চলতে শুরু হল। আড্ডায় রাজ্জাক ভাই থাকলে ১০০১ আড্ডাতেও গল্প ফুরাবে না!

21
চাফি হাতে তিনজন

মাহবুবুর রহমান একা আসেনি, সাথে ছিলেন ব্লগার আবু সুফিয়ান_অনুসন্ধানী প্রতিবেদক। আসামাত্রই কৌশিক’দা তার হাতে তুলে দিলেন শনপাপড়ির প্যাকেট। অন্যটা মাহবুব খাওয়া শুরু করল। কোনফাঁকে পাশে এসে দাঁড়িয়েছে ঝালমুড়িওয়ালা। আন্দালিব ভাই ঝালমুড়ি দিতে বললেন। এক প্যাকেট মুড়ি নিয়ে মনে হল, এটা একদমই মজা হবে না। কিন্তু মুখে দিয়ে দেখি দারুণ মজা! মুড়িওয়ালার কাছে পরপর ঝালমুড়ির অর্ডার পরে গেল কয়েকটা। সুফিয়ান ভাই আবার মুড়িওয়ালার কাছে গিয়ে দেখছিলেন ফরমায়েশ দিচ্ছিলেন, মনে হচ্ছিল এবার এক প্যাকেট অনুসন্ধানী ঝালমুড়ি হতে যাচ্ছে!

ব্লগারদের গল্প আরো চলবে, কিন্তু আমার ওঠা লাগবেই … সাথে বন্ধুদেরও ফিরতে হবে। দু’প্যাকেট বাড়তি ঝালমুড়ি হাতে, গল্পে মাতোয়ারা ব্লগারদের বিদায় জানিয়ে ফেরার পথ ধরলাম।

দেখা গেল, রাতে এখানে আড্ডা বেশি জমাটে। লেকের পাড়ে, সিঁড়িতে গানের আসর জমজমাট। সোডিয়াম আলোতে কৃষ্ণচূড়া বেশ রহস্যময় হয়ে উঠেছে। আলোতে-আঁধারিতে সিঁড়ির উপর জোড়ায় জোড়ায় যুগল। ওরা কতজন আর জনমেও হংসমিথুন থাকবে সে কথা জানিনা, তবে বিষয়টা উপভোগ্য চলতি পথিকদের কাছে – কেউ টিপ্পনি কাটছে, কেউ মজা করছে, কেউ আড় চোখে দেখে নিয়ে সোজা হাঁটা দিচ্ছে… কিন্তু যুগলদের কি আর সে খেয়াল রাখলে চলে!

25
সোডিয়াম বাতি: নগরের সন্ধ্যাসূর্য

24
রহস্যময়ী কৃষ্ণচূড়া

হাতের ঝালমুড়ি খেয়ে বন্ধুরাও মজা পেল। কিন্তু ঝা-আআ-ল! আশেপাশে প্রচুর আইসক্রিমওয়ালা। অরেঞ্জ ললিপপ পটাপট কেনা হয়ে গেল কয়েকটা। পিচ্চিরাও মুখ মেখে আইসক্রিম খাচ্ছে, আমরাও! ওরা খুব খুশি … দারুণ একটা দিন গেছে ওদের জন্য। খোলা মাঠ .. মুক্ত হাওয়া … সারা সপ্তাহের কাজের ধকলের পর একটা দিন ভাল গেল আমাদেরও …প্রকৃতির মাঝে, পরিচিত-অপরিচিত মুখদের সাথে … … … … … শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত জেনেছিলাম অবশিষ্ট, অপরাজিত আড্ডাবাজরা উদ্যান ছেড়ে আরো কোথায় জানি গিয়ে আরেক পর্ব চায়ের মধ্য দিয়ে আড্ডার আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি ঘোষণা করেছিলেন!

26
ভূত – দ্য গোস্ট!!!

***
গতবারের আড্ডার স্মৃতি ধারণ ও চারণ:
১। লেকের দিকে মোড় নেয়ার কালে মূল রাস্তায় সিগন্যালে থেমে মনে হল, গত বছর এই সিগন্যালে গোলাপ বেচতে আসা এক কিশোরীর ছবি নিয়েছিলাম [ছবি লিংক]
২। রঙিন গ্রহ বিক্রেতাদের ভিড় গতবছরও ছিল। আলাপের ফাঁকে ফাঁকে ক্যামেরা তাক করছিলাম, একটা মোক্ষম ময়ূরী বিভঙ্গ ধারণ করতে ক্যামেরায় [ছবি লিংক]