ক্যাটেগরিঃ পাঠাগার

জনৈক প্রবাসী বাঙালি তার দীর্ঘ দিনের প্রবাস জীবনের কারণে ইংরেজীতে যতটা দক্ষ হয়ে ওঠেন মাতৃভাষায় ততটাই দূর্বল থেকে যান। অনেক বছর আগের কথা; একবার কোন এক রাজনৈতিক নেতার ভাষণ শুনে সেই প্রবাসী বাঙালি আমাকে প্রশ্ন করেন, ’আপামর অর্থ কি?’ এই ক্ষণে বলে নেই, এই শব্দটির প্রতি উক্ত প্রবাসীর আগ্রহের হেতু কি। প্রথমত এই বাংলা শব্দটি তার পূর্বশ্রুত নয়। দ্বিতীয়ত তিনি নিজেই শব্দটিকে ব্যবচ্ছেদ করেন এইভাবে- ’আপা+মর’ ! স্বীয় বিশ্লেষণে তিনি যে শব্দার্থ বোধোদয় করেন (আপা, মর!) তাতে তিনি নিজেই সামান্য বিচলিত হয়ে পরিচয়সূত্রেই আমার দ্বারস্থ নয়। তাকে প্রকৃত অর্থটি বলার পর তিনি স্থির হন এবং একচোট হেসেও নেন নিজের শব্দ বিশ্লেষণী প্রতিভাকে স্বরণ করে।

প্রবাসী বাঙালির গল্পটুকু এবার বিস্মৃত হতে পারি আমরা। এবং মনোযোগ দেই বহুল চর্চিত আপামর শব্দটির দিকে, যার সাথে আমরা জড়িয়ে আছি ওতপ্রোত ভাবে । রাজনীতির মঞ্চে তাবৎ প্রতিশ্রুতির ইন্দ্রজালে আটকাতে সর্বস্তরের জনগণকে সম্বোধন পূর্বক অহরহ ব্যবহৃত একটি শব্দ ’আপামর’। আমরাও নিজেদের দাবি-দাওয়া নিয়ে উচ্চবাচ্যে মেতে উঠলে নিজেদেরকে প্রথমেই আম-জনতার কাতারে দাঁড় করিয়ে ‘আপামর জনসাধারণের’ হয়েই বক্তব্য পেশ করি। অর্থ্যাৎ আপাতদৃষ্টিতে আপামর শব্দটির অর্থ সম্পর্কে আমরা জ্ঞাত। যারা অভিধান ঘেঁটে এই শব্দটির অর্থ কখনো খুঁজে দেখেননি, তারাও জনশ্রুত হতে হতে অর্থ বুঝে নেন এবং সেই অর্থ অনেকক্ষেত্রেই অভিধানে প্রদত্ত অর্থ থেকে যথেষ্ট ব্যতিক্রম নয় একেবারেই।

মোহাম্মদ হারুন-উর-রশিদ সম্পাদিত বাংলা একাডেমী’র ’সহজ বাংলা অভিধান’ -এ বিশেষণ পদের আপামর -এর শব্দার্থ করা হয়েছে, ’সকলে। ছোট-বড় সবাই।’ উদাহরণ হিসেবে এসেছে ’আপামর জনতা’ । [পৃষ্ঠা ৪০, মুদ্রণকাল- ফেব্রুয়ারি, ২০০৩]

আশুতোষ দেব (Ashu Tosh Dev)-এর স্টুডেন্টস’ ফেভারিট ডিকশনারি (Students’ Favourite Dictionary)-তে (বেঙ্গলি টু ইংলিশ) এ্যাডভার্ব (ad; adverb) গোত্রীয় উল্লেখপূর্বক ’আপামর’ শব্দের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে ’ডাউন টু দ্য লোয়েস্ট (down to the lowest), হাই এন্ড লো (high and low), ওয়ান এন্ড অল (one and all)’ । উদাহরণ হিসেবে এসেছে ’আপামর জনসাধারণ’ এবং এর অর্থ বলা হয়েছে ’পিপল অফ অল ক্লাসেস ফ্রম দ্য হাইয়েস্ট টু দ্য লোয়েস্ট (people of all classes from the highest to the lowest)’। [পৃষ্ঠা ১৫৭, মুদ্রণকাল- মে, ১৯৯২]

হাতের কাছে অন্যান্য অভিধান যাচাই-বাছাই করার সুযোগ নেই বিধায় আন্তর্জালের সরণাপন্ন হই। বিমুখ হতে হয়নি বটে বরং শব্দার্থে এবার চরম নাটকীয়তার আবির্ভাবই ঘটে। এভাগ্রিণ বাংলা অভিধান ওয়েবসাইট থেকে জানা গেল শব্দের বুৎপত্তি। উচ্চারণের সুবিধার্তে আপামর শব্দটির অবকাঠামো প্রকাশ করা হয়েছে এরুপে- āpāmara, বোঝা যায় ’আ-কার’ এর উপর জোর দেয়া হয়েছে উচ্চারণে। ক্রিয়া-বিশেষণ পরিচয়ে আপামর -এর শব্দার্থ বর্ণনা করা হয়েছে, ১. পামর বা নরাধমকে বাদ না দিয়ে, পামর পর্যন্ত সকলে এবং ২. উচ্চ-নীচ নির্বিশেষে । সংস্কৃত বিশ্লেষণে আপামর হলো আ+পামর (ā+pāmara)। আম-পাঠকের চোখ বার বার যেখানে আটকে যাবে তা হলো আপামর’কে ভেঙ্গে প্রাপ্ত শব্দ ’পামর’। পামর -কে নরাধম সমতুল্য করায় এর সম্ভাব্য অর্থ অনুধাবন করে পাঠক মাত্রই অস্বস্তি বোধও করতে পারেন এবার।

কথা হচ্ছিল আপামর নিয়ে এখন আবার নতুন ফ্যাঁকড়া পামর! সামসাদ বাংলা-ইরেজী অভিধানের ওয়েবসাইটে ’পামর’ এর অর্থ বলা হয়েছে ’এ মোস্ট সিনফুল অর উইকেড (a most sinful or wicked)’ । বিশেষ্য ও বিশেষণ জাতীয় উল্লেখপূর্বক পামর শব্দের আরো অর্থ গোচরীভূত হয়- পাপিষ্ঠ, নীচ, অধম (সহজ বাংলা অভিধান, পৃষ্ঠা-২৩১)। বলা বাহুল্য, পামর একটি পুংবাচক শব্দ এবং এর স্ত্রী-বাচক শব্দ হলো পামরী।

এতক্ষণে স্পষ্টই বোধগম্য হয় যে, পামর শব্দটি তিরস্কার হিসেবেই কারো উদ্দেশ্যে প্রয়োগ হয়। সাহিত্যাঙ্গনে বহুবার ধিক্কারের ছলে পামর শব্দটির ব্যবহার হয়েছে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের দীন ও দান -এ রাজা ও সন্ন্যাসী’র বাক্যালাপে স্পষ্টবাদী সন্ন্যাসী’কে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করতে অহংকারী রাজা ক্রোধে ফেটে পড়েন এভাবে-
(সূত্র)

রাজা জ্বলি রোষানলে
কহিলেন, ” রে ভণ্ড পামর, মোর রাজ্য ত্যাগ ক’রে
এ মুহূর্তে চলি যাও।”

মীর মোশাররফ হোসেনের বিষাধ সিন্ধু’র উদ্ধার পর্বে (ত্রিংশ প্রবাহ) সভায় বন্দীদের জিগাষাবাদের সময় এক বন্দী আরেক বন্দীকে ধিক্কার জানান এভাবে –
(সূত্র)

জয়নাল আবেদীন বলিলেন, ”রে পামর! তোকে গত নিশীথেই চিনিয়াছিলাম। চিনিয়া কি করিব, আমি নিরস্ত্র! ”

মারওয়ান বন্দি অবস্থাতেই বলিল, ”আমি সশস্ত্র থাকিলেই-বা কী করিলাম! কী ভ্রম! কী ভ্রম! সুযোগ-সুবিধা মত তোমাকে পাইয়াও যখন আমার এই দশা, তখন আর আশা কি? কী ভ্রম!!”

”আরে নরাধম! ঈশ্বর কী না করিতে পারেন, তাঁহার ক্ষমতা তুই কি বুঝবি পামর?”

মারওয়ান -এর স্বরূপ উন্মোচনে জয়নাল আরো বলে চলেন –

জয়নাল গম্ভীরস্বরে বলিতে লাগিলেন, ”এই নরাধম, এই পাপাত্মাই এজিদ পক্ষ হইতে আপনার নাম স্বাক্ষর করিয়া, মহাত্মা হাসানের নিকট মক্কা-মদিনার কর চাহিয়া পাঠাইয়াছিল। এই পামরই হাসান বিরুদ্ধে যুদ্ধ করিতে, পবিত্রভূতি মদিনার স্বাধীনতাসূর্য হরণ করিয়া চিরপরাধীনতার অন্ধকার অমানিশায় আবরণ করিতে সসৈন্যে মদিনায় আসিয়াছিল। যুদ্ধে পরাস্থ হইয়া মায়মুনার যোগে জায়েদার সাহায্যে হীরকচূর্ণ দ্বারা, মহাত্মা হাসানের জীবন অকালে বিনাশ করিয়াছে! এই দুরাচারই কুফা নগরের আবদুল্লাহ জেয়াদকে টাকায় বশীভূত করিয়া মহাবীর মোসলেমের জীবন মিথ্যা ছলনায় কৌশলে শেষ করিয়াছে। এই নারকীই কারবালা প্রান্তরে মহাসংগ্রাম ঘটাইয়াছে। …”

এই পরিচ্ছেদটুকু পাঠ কালে আমরা পামর -এর আরো কিছু সমার্থক শব্দের সাথে পরিচিত হই- পাপাত্মা, দুরাচার, নারকী। পাঠকের এতোক্ষণে মর্মে মর্মে উপলব্ধি হওয়ার কথা, পামর ও এর সমার্থক শব্দগুলো মোটেও ইতিবাচক অর্থে ব্যবহৃত হওয়ার মত নয়। এবং পামর যদি নেতিবাচক অর্থ বহন করে সেক্ষেত্রে আপামর কি কোন রূপ ইতিবাচক আবেদন তৈরী করে যার অন্তর্ভূক্ত হতে পেরে আম-জনতা ধন্য হয়ে যায়?

ড. কাজী দীন মুহম্মদ আপামর এবং পামর প্রসঙ্গে উদাহরণ দিতে গিয়ে বলেছেন, ’…আসমুদ্র হিমাচল, অর্থ্যাৎ যার অর্থ সমুদ্র থেকে হিমাচল পর্যন্ত।’ ’আকন্ঠ নিমজ্জিত’, ’আবক্ষ পানিতে দাঁড়িয়ে’ ইত্যাদি আ-প্রত্যয় বাচক উদাহরণও তিনি টেনেছেন। এর অর্থ দাঁড়ায় যে, মূল শব্দের সাথে আ-প্রত্যয় যোগ শব্দার্থের পরিধিকে বিস্তৃত করে অর্থ্যাৎ পারিপার্শ্বিকতাকে অন্তর্ভূক্ত করে আরো ব্যাপক অর্থে শব্দকে প্রকাশ করে। এই পর্যায়ে ড. কাজী দীন বলেন,” যখন আপামর জনসাধারণ বলি, তখন অর্থ হয় পামর থেকে জনসাধারণ পর্যন্ত -অর্থ্যাৎ পাপিষ্ঠ বা পাপাত্মা থেকে জনসাধারণ পর্যন্ত সবাই।”

হলফ করে বলা যায় যে, আপামর জনসাধারণ বলতে সাধারণ জ্ঞানে এখন পর্যন্ত আমরা যদি সাধারণ, সর্বস্তরের জনগণ বুঝে থাকি তবে তা বড়জোর ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে, ধনী-গরীব সকলকে। সাধারণ জনগণ বলতে আমাদের চিন্তা-ভাবনা, চাওয়া-পাওয়াও সাধারণ হয়ে যায়। এই সাধারণ গোত্রে পাপিষ্ঠ, কীট, অধম জাতীয় কাউকে অন্তর্ভূক্ত হতে দেখলে সাধারণ মানুষ আদৌ স্বস্তি বোধ করবেন কি? এই অস্বস্তি প্রকাশেই বোধহয় কাজী দীন মুহম্মদ আপামর শব্দটিকে অশালীন হিসেবে আখ্যায়িত করেন। ( ভব্য শব্দের পাঠদান, ড. কাজী দীন মুহম্মদ, দৈনিক ইত্তেফাক, ২৭শে নভেম্বর ২০০৯, পৃষ্ঠা-২১ )।

প্রশ্ন আসতে পারে ’আপামর জনসাধারণ’ কি আসলেই একটি প্রায়োগিক ভুল নাকি পরিস্থিতি ভেদে এবং বক্তার অবস্থানভেদে এর ব্যবহার নিয়ে আমাদের একটু ভাবনার অবকাশ রয়েছে। কথা হচ্ছিল একজন সাহিত্যানুরাগীর সাথে এই বিষয়েই। তিনি ’আপামর জনসাধারণ’ এ কোন অসংগতি খুঁজে পেলেন না এমনকি শব্দটির বিষদ অর্থ উদাহরণসহ জানার পরও। বরং তিনি পাল্টা উদাহরণ দেখিয়ে তার যুক্তি দিলেন , যেখানে প্রেক্ষাপট রাজনীতির মঞ্চই, এবং বক্তা কোন এক রাজনৈতিক নেতা। ধরা যাক, একটি সেতু উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে নেতা ভাষণ দিচ্ছেন, ’অত্র এলাকায় আপামর জনসাধারণের জন্য সেতুটি আজকে থেকে উন্মুক্ত করে দেয়া হলো…।’ এর অর্থ, পামর (পাপিষ্ঠ) থেকে জনসাধারণ পর্যন্ত সকলের জন্য সেতুটি ব্যবহারযোগ্য। একটি এলাকাবাসীর জন্য নির্মিত সেতু নির্দিষ্ট করে কেউ কেউ ব্যবহার করবে তা সম্ভব নয়। কে সাধু আর কে দুষ্টু চরিত্রের তা বাছাই করে সেতুতে চলাচলের সুবিধা দেয়াও সম্ভব নয়। অর্থ্যাৎ সেতুটি আক্ষরিক অর্থেই আপামর জনগণের (পামর থেকে জনসাধারণ) জন্য এতে কোন দ্বিমত নেই। তাই এই ক্ষেত্রে ’আপামর জনসাধারণ’ এর ব্যবহারকে প্রায়োগিক ভুল বলতে নারাজ ছিলেন সেই সাহিত্যানুরাগী। গ্রহণযোগ্যতা আর অগ্রহযোগ্যতার দোদুলদোলে আমার অবস্থান দ্বিধান্বিত কিঞ্চিৎ। আমি তখন নিজেকে জনগণের দলে ভিড়িয়ে উদাহরণ পেশ করার চেষ্টা করি । আর দশজন মানুষের মত আমিও কণ্ঠ জোরালো করি, যেমনটা বলি বা বলা হয় হরহামেশাই- ’অচিরেই দেশ দুর্নীতিমুক্ত হোক, এ আপামর জনগণের দাবি।’ কিন্তু সর্ষেই মধ্যেই তো ভুত! পামর সহযোগে এরূপ একটি দাবি কি ন্যায়সঙ্গতার পরিচয় বহন করে আদৌ?

আপামর নিয়ে এই দ্বিধা অথবা বিভ্রান্তি সবার মাথা ব্যাথার কারণ হয়ে ওঠেনি এখনো। একেবারেই নাচক না করে দিয়ে বরং আগের কথার খেই ধরেই বলতে হয় যে, কর্তার(ব্যক্তি) অবস্থানের উপরই ’আপামর’ শব্দটির সঠিক প্রয়োগ নিশ্চিত করা যায়। সেক্ষেত্রে ’আপামর জনগণ’ -এর প্রায়োগিক শুদ্ধতা কর্তার সাপেক্ষেই নির্ধারিত হচ্ছে।

লোক মুখে প্রচলিত হতে হতে অনেক শব্দ এর আদি-অর্থ থেকে হয়ত খানিক নড়চড়ে অবস্থানে এখন। সাধারণ জনগণের কথা বাদ দেয়া গেলেও আজকাল গণমাধ্যমগুলোতে এই ভ্রান্ত চর্চা চলে আসছে। সঠিক অর্থ বুঝে, সঠিক শব্দের সুষ্ঠু প্রয়োগেই ভাষার সঠিক চর্চা নিশ্চিত করা সম্ভব। তবেই আমাদের ভাষাজ্ঞান সমৃদ্ধ হবে।

**********************
ব্যাপক সম্পাদনার পর এই লেখাটা উপসম্পাদকীয়তে একটু জায়গা পেয়েছিল!!! 🙂
সমকাল, ৮ই ডিসেম্বর ২০০৯
**********************