ক্যাটেগরিঃ ফিচার পোস্ট আর্কাইভ, ব্যক্তিত্ব

 

একটা সময়ের পর হুমায়ুন আহমেদ পড়া ছেড়ে দিয়েছি। ইন্টেলেকচুয়্যাল হয়ে ওঠার গল্পে হুমায়ুন আহমেদের জায়গা হয় না আর। অন্যের প্রিয় লেখকের তালিকায় যখন কেবল হুমায়ুন আহমেদ এর নামটাই শুনেছি, তখন হতাশ হয়েছি, এ প্রজন্ম বুদ্ধি প্রতিবন্ধী হয়ে উঠছে কি তবে! না হলে বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চার বই-প্রবন্ধ-নিবন্ধ-সাহিত্য কেন ওরা পড়ে না! যদিও আমি নিজে এক কালে হুমায়ুন আহমেদ কেবল পড়িনি… গিলেছি! হিমুর সাথে রাত-বিরাতে অন্ধকার পথে নেমেছি। ভাতের রেস্তোরায় মধ্য রাতের পর বেঁচে যাওয়া ভাত, টক হয়ে যাওয়া ডালের সাথে অমৃতের মত খেয়েছি। কিংবা বিরিয়ানীর দোকানে শেষরাতের টক টক বিরিয়ানি চিবিয়েছি এমনভাবে যেন রাজভোগ! অথবা মিসির আলীর সামনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থেকে বোঝার চেষ্টা করেছি মানুষের চিত্রবিচিত্র, রহস্যপূর্ণ মনস্তাত্বিক জগৎকে। ফ্যাকাশে চামড়ার, মোটা চশমার ’ব্রিলিয়ান্ট’ শুভ্রের হাত ধরে নির্লজ্জের মত ঘুরে এসেছি দারুচিনি দ্বীপ। এই আমি, এখন মগজ খাটানো লেখা যতই পড়িনা কেন, আমি নিজে তো ঠিক জানি, একটা সময় হুমায়ুন আহমেদের একেকটা বই পড়ে দু’তিন দিন-রাত ঘোরে ঘোরে চলেছি-উঠেছি-বসেছি-ঘুমিয়েছি!

বিটিভি আমলে হুমায়ুন আহমেদের নাটকগুলো দেখে দেখে রাগ প্রশমনের উপায় শিখেছিলাম। না, গ্লাস ভাঙ্গা ইচ্ছে হলেও চেষ্টা তেমন করিনা, তবে উল্টো করে গোনার বাতিকে ভালভাবে ধরেছিল। একবার মাসখানেকের জন্য মশা মারা বন্ধ করে দিলাম। সে তো বোধহয় হুমায়ুন আহমেদের এক গল্পেই তো পড়েছিলাম, একটা শিশু মশার ব্লাড কালেকশন মিশনের কথা। আমি সে বারই উপলব্ধি করেছিলাম মশাদের কত রিস্ক নিয়ে বসতে হয়, কারো ঘাড়ে, হাতে! কী রোমহর্ষক সেই মিশন! শিশু মশাটা কখন না জানি মানুষের হাতের চোটের থাবায় থেতলে যায়- পড়তে পড়তে চিন্তায় কপালে ভাঁজ পড়েছিল আমার! তারপর থেকে আমি হাতে বসা মশা তাড়ানো বন্ধ রেখেছিলাম। আমি বাতিকগ্রস্তের মত নিশ্চল থেকে সুযোগ করে দিতাম, যেন হাতে বসা মশাটা নির্বিঘ্নে রক্ত খেয়ে ঢোল হতে পারে। তারপর হাত নেড়ে উড়িয়ে দিতাম! মশাদের বাঁচিয়ে রাখতে আমার কী চেষ্টা! ওদের পিষে মারায় ভীষণ অপরাধবোধ হত তখন!

সেই ঘোরগ্রস্ত আমি হুমায়ুন আহমেদের হালকা-পলকা লেখা পাঠের মোহ থেকে সরিয়ে এসেছিলাম। হুমায়ুন আহমেদের লেখা কখনো রেফারেন্স হিসেবে ব্যবহার করার নয় বলেই মনে করেছি। কিছুটা ধাক্কাও খেয়েছিলাম তার কাছ থেকে। তার ব্যক্তিগত জীবনাচরণের কিছু খরবাখবর প্রচণ্ড বিরক্ত করেছিল। কিন্তু তার চলচ্চিত্রের গানগুলো গুনগুন করতে ভুল হয়নি আমার! কোন কোন গান চোখে জল টলমল করিয়ে ছাড়ে। কোন কোন গানে প্রেম জাগে মনে! অথচ ততদিনে আমি রীতিমত হুমায়ুন আহমেদ উন্নাসিক!!! অথচ চন্দ্রগস্ত হয়ে ’অবাক জোছনা’ গায়ে মেখে নেয়া শিখেছি হিমুর কাছ থেকে। বর্ষার প্রথম দিনের ঝুম বৃষ্টিতে ভিজতে শিখেছি শুভ্রর সাথে।

ভেবেছিলাম অনেক বড় দেশে চিকিৎসা করতে গেছেন, সুস্থ হয়ে ফিরবেনই! কিন্তু হিমু’রা আনপ্রেডিক্টেবল হয়! আচমকা পুনরায় গুরুতর শারীরিক অসুস্থতার খবর এল পত্রিকায়। ভেবেছিলাম, উন্নত দেশের চিকিৎসকরা এই চ্যালেঞ্জও পার করে ফেলবেন। কিন্তু হিমুদের আসা-যাওয়া আমাদের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয় না! মিসির আলী ঠিক জানেন, কখন তার কী করণীয়! শুভ্র জানে শরীরে বয়ে চলা জীবানুদেরও জীবন আছে, তাদেরও আছে বেঁচে থাকার অধিকার। ওরা দখল করে নেয় শরীর। হিমু নিস্পৃহ চোখে তাকিয়ে দেখে। মিসির আলী সরু চোখে বুঝতে থাকেন জীবানুদের জগৎকে! আর শুভ্র গুনতে থাকে কয় লক্ষ জীবানুর কতক্ষণ লাগে একটা আস্ত শরীরকে কাবু করতে!

নাহ! খবরটা আমাকে শোকে মূহ্যমান করেনি। বরং বহুদিন পর আমি পুনরায় ঘোরগ্রস্ত বোধ করছি। আর আমি এই ঘোরে সম্পূর্ণ ডুবে যেতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করছি। এতটা স্বাচ্ছন্দ্য কোন ইন্টেলেকচুয়্যাল আলাপে আমি পাইনি!

হ্যা, খবরের শিরোনামে আমার প্রবল আপত্তি আছে! পত্রিকা বলছে – হুমায়ূন আহমেদের জীবনাবসান!

অথচ হিমু’দের জীবনাবসান হয় না! এ বড়জোর স্থান বদল …. লোকালয় বদল … হিমু এখন আনন্দলোকে, মঙ্গলালোকে … ওখানে সবাই সাদা ধবধবে পোশাকে ঘোরে হয়ত… কেবল হিমুর পড়নে হলুদ পাঞ্জাবি!