ক্যাটেগরিঃ ব্লগালোচনা

ব্লগারস ভোট যুদ্ধ

২০০৮ সালের ডিসেম্বরে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের জীবনে প্রথমবারের মত ভোট দিয়ে এসে একটা পোস্ট লিখেছিলাম নির্বাচন ২০০৮ : ভোট-রঙ্গ । নির্বাচন-২০১১ তার বরাবরের ভোটরঙ্গ নিয়ে উপস্থিত। আমরা রাজনৈতিক নেতা-নেত্রীদের নির্বাচনে ইঁদুর-বিড়াল দৌড় দেখেছি। আমরা তাদের কারো পক্ষে থেকেছি। কারো বিপক্ষে থেকেছি। কারো সাফাই গেয়েছি। কারো হার কামনা করেছি। নেতাদের কৌশলী হতে দেখেছি। সূক্ষ এবং স্থুল কারচুপি হতে দেখেছি। এরপর আমরা সচেতন নাগরিকরা দূর্নীতির ঢালাও সমালোচনা করেছি। পছন্দের প্রার্থীর বিজয়ে আনন্দ মিছিল করেছি। ২০১১ সালে এসে আমরা আবার নির্বাচনের মুখোমুখি। ২০১১ সালের এই ভোট কিন্তু জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ভোট না। কারণ বিরোধী দল এখনো সরকার বিরোধী আন্দোলন জমাতে পারেনি। আওয়ামী লীগ জনগনের আস্থা ও অনাস্থা, অন্ধভক্তি ও বিরক্তি- সবটাই পুঁজি করে এখনো ক্ষমতায় টিকে আছে। আমি এই লেখায় যে ভোটরঙ্গের কথা বয়ান করতে চাই, সেটা নিয়ে সবাই জানেন। এই ভোট-জ্বরে আক্রান্ত সবাই। এই ভোট উৎসবে মুখর নেটিজেনরা। সবার নেটিজেন আইডি হলো ফেসবুক এবং টুইটার। ভোট। ভোট। ভোট ফর ওমুক ভাই। ভোট ফর তুমুক আপা। অথবা যদি আমার ব্লগটি আপনার ভাল লাগে তাহলে প্লিজ প্লিজ আমাকে ভোট করুন!

ডয়চে ভেলের ভোট প্রদানের সাইটের ট্রাফিক বেড়ে যাচ্ছে প্রতিদিন। সবার কম্পিউটারে যোগ হয়েছে বাড়তি একটি ব্রাউজার-উইন্ডো। প্রতিযোগিদের মধ্যে তীব্র প্রতিযোগিতা। ভীষণ রূদ্ধশ্বাস নিয়ে একেকটি ”%” বাড়ছে আর কমছে। লিংকে গেলেই বোঝা যায় কে কতটা সিরিয়াসলি ভোটে মেতেছেন। কে কার কতটা প্রতিপক্ষ হয়ে উঠেছেন। কে নির্বাচন থেকে বলতে গেলে জামানত বাজেয়াপ্ত হওয়ার পথে এগিয়ে যাচ্ছেন। জোর প্রচার-প্রচারণা। যার যার সোশ্যাল নেটওয়ার্কিং পরিচিতিকে কাজে লাগাচ্ছেন প্রার্থী ব্লগাররা। যে যার মত কৌশলী হয়েছে।

যার যার ব্লগের ব্লগারকে সমর্থন দিয়ে জিতিয়ে আনতে ব্লগাধিপতিদেরও কৌশলী হতে হয়েছে। প্রচার-প্রচারনার বিষয়টা অনেক ’প্রফেশনাল’ পর্যায়ে এসে দাঁড়িয়েছে। পেশাদারিত্ব দৃষ্টিভঙ্গিতে নিজ ব্লগের ব্লগারকে সমর্থন প্রদানে একজন ব্লগাধিপতি মন্তব্য করেছেন, তার ব্লগের প্রার্থী ছাড়া বাকি ব্লগগুলো একবার চোখ বুলালেই বোঝা যায় অন্যরা কতটা যোগ্য। অথচ, মজার বিষয় হলো অন্য প্রার্থীদের মধ্যে এমনও কেউ আছে যিনি তারই ব্লগের অসংখ্য গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুগুলোতে অনেকবার আন্তরিকভাবে সক্রিয় থেকেছেন। তাহলে দেখা যাচ্ছে, নেতা-নেত্রীদের যত যাই বলি না কেন, আমরা বাঙালিরা নির্বাচনের সময় ঠিকই পাকা রাজনীতিবিদদের পথ ধরতে পারি।

এই নির্বাচন আমাকেও রাজনীতিবিদ করে তুলেছে। কারণ আমিও এই নির্বাচনের প্রার্থী এবং রাজনীতিবিদদের মত আমিও নির্বাচন প্রচারনায় ’বড় বড় ওয়াদা’ করেছি। আমার নির্বাচনী ওয়াদা – ঘরে ঘরে ব্লগ গড়ে তোলা হবে। “2012” সালে মধ্যে সবার জন্য ব্লগ। ভোট দিন, আপনার ব্লগটি বুঝে নিন। 😉 B-) 😉

প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচন এবং উপলব্ধি

এই বেস্ট ব্লগ নির্বাচন নিয়ে নানা ধরনের প্রশ্ন উঠেছিল গত বছর। এবং প্রশ্নের বহুমুখিতা বেড়েছে এবছরও। যেমন আমাকে একজন ব্লগার এক বুক কষ্ট নিয়ে বলেছে, যদিও আপনি আমার ভোটটা পাবেন, কিন্তু আপনি সামু থেকে কেন নমিনেটেড না! আমি এই ব্লগারের আবেগটা বুঝি। কারণ আমার ব্লগার হয়ে ওঠা তো সামহোয়্যার ইন ব্লগ থেকেই। তবে এই আবেগের পরও বরাবর আমার নিজস্ব একটা দৃষ্টিভঙ্গি ছিল- ব্লগাররা হলো প্রথমত এবং প্রধানত সার্বজনীন। কারণ, কোন ব্লগই তো ব্লগারদের কাছ থেকে মুচলেকা নেয়না যে, তাকে কেবল সেই ব্লগেই লিখতে হবে। বেশির ভাগ ব্লগেই একই লেখা প্রকাশ করা যায়। ব্লগার হিসেবে আমার সার্বজনীনতায় বিশ্বাসের কারণে, সামহোয়্যারে যেমন লিখেছি, তেমনি লিখেছি প্রথম আলো ব্লগে। লিখেছি আমরা বন্ধুতে। লিখেছি চতুর্মাত্রিক ব্লগেও। অনেক সময় একই লেখা প্রকাশ করেছি। অনেক সময় বিষয়বস্তু বুঝে, ব্লগের নিজস্ব ঢং বুঝে ভিন্ন ব্লগে ভিন্ন লেখা দিয়েছি। কিছু কিছু ব্লগ হয় আদতেই বিষয় ভিত্তিক এবং সেখানে সব ধরনের লেখা দেয়া যায় না। এক্ষেত্রে আমার সাম্প্রতিক আগ্রহ সিটিজেন জার্নালিজম নিয়ে বিডিনিউজটোয়েন্টিফোর ব্লগে আমি কিছু লেখার চেষ্টা করে যাচ্ছি।

দ্বিতীয় একটি গুরুত্বপূর্ন প্রশ্ন উত্থাপিত করেছে ব্লগার ডাকপিয়ন। বিডিনিউজটোয়েন্টিফোর ব্লগের একটি পোস্টে তিনি আমাকে উদ্দেশ্য করেই বলেছেন,

ডাকপিয়ন বলেছেন:
সন্ধ্যা ৫.১৫ মিনিট , মঙ্গলবার ২৯ মার্চ ২০১১
এ ধরনের ভোট এবং মনোনয়নের পুরো প্রক্রিয়া খুবই হাস্যকর। ১ মাসের একটি ব্লগ কিভাবে এ ধরনের প্রতিযোগিতায় মনোনয়ন পায়?

তাৎক্ষনিকভাবে রেগেমেগে বোম হয়ে তাকে আমার ৪ বছরের ব্লগিং প্রোফাইল ধরিয়ে দেয়া যেত। কিন্তু তা করা থেকে বিরত থেকেছি। একজন সহ-ব্লগার জানালেন, এই ক্যাটাগরি তো বেস্ট ব্লগ ক্যাটাগরি নয়, বেস্ট ব্লগার ক্যাটাগরি। এখানে একজন ব্লগারই মূখ্য। যৌক্তিক বক্তব্য। তারপরও আমি সেই প্রশ্নের ’জবাব’ ব্যক্তিগত দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেয়নি। কারণ আমি মনে করি, এই প্রশ্নে উত্তর দেবে ডয়চে ভেলে কর্তৃপক্ষ অর্থ্যাৎ প্রতিযোগিতার আয়োজকরা। তাই আমি মন্তব্যটি (লিংক সহ) সহকারে আয়োজকদের একটি ইমেইল প্রদান করেছি। এবং জবাবে আয়োজকদের ইমেইল থেকে যা বুঝতে পারলাম তা হলো,

১. বেস্ট বাংলা ব্লগ ক্যাটাগরিতে একজন ব্লগারকে নির্বাচিত করে সেই ব্লগারের ব্লগ লেখনী এবং বাংলা ব্লগোস্ফিয়ারে তার অবদানকে বিবেচনা করে (bloggers according to the content and their contribution in the Bangla blogosphere all together)।

২. অনেক ব্লগারই একাধিক ব্লগ প্লাটফর্মে লিখে থাকেন। টেকনিক্যাল কারণে একাধিক ব্লগের লিংক প্রদর্শন করার জায়গা রাখা হয়নি। তাই একটি ব্লগ লিংককেই তারা বেছে নিয়েছেন। (There are many bloggers who are contributing in multiple platforms and simultaneously in their own blogs. For technical reasons there was no field for displaying multiple URLs of a blogger.)

৩. এখানে উল্লেখ্য হলো, বেস্ট ব্লগ বাংলা ক্যাটাগরিতে আয়োজকরা ব্লগ প্লাটফর্মটিকে গুরুত্ব দেননি বরং ব্লগারের ব্যক্তিগত ব্লগে বিভিন্ন বিষয় উপস্থাপনা এবং বাংলা ব্লগোস্ফিয়ারে তার গুরুত্ব ও প্রভাবকে প্রাধান্য দিয়েছেন। অর্থ্যাৎ এখানে একজন ব্লগার হলো মূখ্য, ব্লগ গৌণ্য। (Kindly note that we have not emphasized on the platform but the blogger in person and his/her presence and impact in the Bangla blogosphere.)

নির্বাচনী কৌশল এবং সম্ভাব্য দূর্নীতি

আগেই বলেছি, এই ভোট যুদ্ধে প্রার্থীরা যথেষ্ট কৌশলী হয়ে গেছেন এর মধ্যে। এমনকি অনেক ব্লগ কর্তৃপক্ষও। ভোট সংগ্রহে অর্থ্যাৎ প্রার্থির গ্রহণযোগ্যতা বাড়াতে ব্লগারদের কাছে কোন কোন ক্ষেত্রে অনুরোধের চেয়ে একভাবে উর্ধ্বমুখী’ এবং নিম্নমুখী ’চাপ’ প্রয়োগেরও কৌশল নেয়া হয়েছে। ব্লগারের উচ্চমার্গীয় প্রশংসা করে চাপ পূর্বক পোস্ট দেয়ানো হয়েছে। প্রতিযোগিতায় অন্য এক প্রার্থির সহকর্মীকে অনুরোধের ’চাপ’ গিলিয়ে নিজ প্রার্থীর সপক্ষে ক্যাম্পেইনে উদ্বুদ্ধ করা হয়েছে। এর অর্থ ব্লগ প্রতিযোগিতাটি চুড়ান্তরূপে ’সিরিয়াস’ চেহারা নিয়েছে ইতিমধ্যে। বলা চলে এখানে ’প্রফেশনালিজম’ বোধ কাজ করছে কোন কোন ক্ষেত্রে নগ্ন ভাবেই।

সবচেয়ে মজার (এবং আসলে ভয়ংকর হলো) হলো ভোট উন্মাদনা ব্যবসায়িক দিকে মোড় নিয়েছে। আমার সহকর্মীর কাছে ফোন এসেছে, দু’হাজার টাকায় ৫০০ আইডি দিয়ে আমাকে ভোট দিয়ে জিতিয়ে দেয়া হবে। আমার সততার (মতান্তরে হাড় কিপটে, কঞ্জুস, মাক্ষিচুস স্বভাব) কারণে এই প্রস্তাব আর গ্রহণ করা হলো না। এখানে আমরা আশংকা করতে পারি, অন্য কেউ তো এই প্রস্তাবকে লুফে নিতে পারে!

এমনও শোনা গেছে (গুজবও হতে পারে) নিজ ব্লগের ব্লগারকে জিতিয়ে নিতে কোন বড় প্রতিষ্ঠানের সাথে চুক্তি হতে পারে কারো। বিষয়টা সরাসরি আর্থিক লেনদেনের মধ্যে হয়ত যাবে না। তবে এখানে ব্যবসায়িক স্বার্থ-সুসম্পর্ক বিনিময় হওয়ার সুযোগ আছে।

অর্থনৈতিক লেনদেনের কারণে সহজেই এইসব কর্মকান্ডকে সূক্ষ এবং স্থুল ভোট কারচুপি বলা যেতে পারে। কিন্তু এই অনলাইন ভোটিং পদ্ধতিতে যেখানে ফেসবুক-টুইটার আইডি দিয়েই ভোট প্রদান করা যায়, সেখানে যে কেউ একাধিক আইডি ব্যবহার করে ভোটিং ”%” ক্রমাগতভাবে বাড়িয়ে যেতে পারে। এবং এটা হয়ত ভোটিং নীতিমালা বিরোধীও নয় সরাসরিভাবে। তাই আন্তর্জালে একাধিক আইডি/নিক ব্যবহারকারী একজনের জন্য একাধিক ভোট প্রদান অসম্ভব কিছু নয়। যদি অধিক সংখ্যক আইডি নাও থাকে, তবে ক্রমানুসারে আইডি (যেমন, আমারআইডি১, আমারআইডি২, আমারআইডি৩… … … আমারআইডি১০০….আমারআইডি ‘N’ সংখ্যক) খোলা দু:সাধ্য কিছু নয়। শুধু দরকার ’ডেডিকেটেড‘ একজনকে ।

ভোট প্রচারনায় এমন অনেকে পরিচিত নেটওয়ার্কের আওতায় আছেন বলেই ভোট করছেন। এমনও অনেকে ভোট করেছেন, যিনি ব্লগ বিষয়টা এখনো ঠিকমত জানেনই না। তাহলে এখানে বেস্ট ব্লগ/ব্লগার এর শ্রেষ্ঠত্ব আসলে কি করে যাচাই হচ্ছে? কতটুকুই যা যাচাই হচ্ছে? ফলে প্রতিযোগিতা বা এর ভোটগ্রহণ পদ্ধতিটি কতটা স্বচ্ছতা বহনের সুযোগ দেয় সেটা একটি নির্মোহ ভাবনার খোরাক যোগায়।

বিভিন্ন অনলাইন ভোটিং পদ্ধতিতে নিয়ে আমার এখনো বিস্তারিত জানার সুযোগ হয়নি। তবে এই পদ্ধতি নিয়ে আয়োজকরা মনে হয় এখনও ভীষন ব্যতিক্রমী কিছু ভেবে বার করতে পারেননি। এক্ষেত্রে আমরা ব্লগাররা একটি ’ব্রেইন স্টোর্মিং’ আলোচনার সূত্রপাত করতে পারি। এবং এটা যদি বছরখানেক ধরে চালাতে পারি তবে আগামী বছরের প্রতিযোগিতার পদ্ধতিতে নিশ্চয়ই এর প্রভাব পড়বে।

আমাদের টুইটার বিমুখতা

ব্লগ প্রতিযোগিতায় ভোট দেয়া যায় ফেসবুক এবং টুইটার দিয়ে। অনেকের সাথে কথা বলে দেখা গেল, তাদের ফেসবুক আইডি থাকলেও আন্তর্জাতিকভাবে সাড়া জাগানো মাইক্রোব্লগিং প্লাটফর্ম টুইটারের এ্যাকাউন্ট নেই আমাদের অনেকেরই! আবার অনেকের এ্যাকাউন্ট থাকলে লগ-ইন করেন না তারা। বা সেখানে কোন এ্যাকটিভিটি নেই তাদের!

বাংলা ব্লগ/ব্লগারের শ্রেষ্ঠত্ব নির্ণয়ে বিদেশি আয়োজক

এখানে ব্লগার কৌশিক এর একটি দৃষ্টিভঙ্গিকে তুলে ধরা যায়,

এমন একটা প্রতিযোগিতা কেনো বিদেশী একটা সংস্থা আয়োজন করবে? আমাদের দেশে কি কেউ নেই এই প্রতিযোগিতা আয়োজন করার? … … … সবার এ বিষয়ে ভাবার সময় হয়েছে নিশ্চয়। দেশের ভেতরে আয়োজিত হোক এমন একটা প্রতিযোগিতা – হয়তো সেটা মানে ও কলেবরে ছাপিয়ে যাবে আর সকল প্রতিযোগিতা।

ভোট ফর সাবরিনার ব্লগ

বেস্ট ব্লগ ক্যাটাগরিতে সাবরিনাকে ভোট দিন। সবগুলো বাংলা ব্লগকমিউনিটির ভোট এক হলেই সাবরিনা বাঁধ ভাঙা ভোট পাবে নিশ্চিত।

শেষ কথা

কৌশলগত কারণে এটা বলার মতো সময় আসেনি এখনো। কারণ ভোট গ্রহণ এখনো চলছে। 😉