ক্যাটেগরিঃ স্বাস্থ্য

 

“Twisted excursions of the mind
Denote something of a different kind
A hidden self lost within
Free to roam
Unconscious of sin”
[সূত্র: http://lisaacs.wordpress.com/2009/03/ ]

আজকের যুগে হরেক-রকম অসুখ-বিসুখের কথাই শোনা যায়। মানসিক অসুস্থতাও রোগ-ব্যাধির আওতায় পড়ে এবং মানুষের দ্বৈত-স্বত্বা বা বহু-স্বত্বা এরকমই একটি মানসিক ব্যাধি বলে গণ্য করা হয়। যদিও অনেকেই এই অসুখটির প্রকৃত অস্তিত্ব নিয়ে সংশয় প্রকাশ করে থাকে অথবা ধারণা করা হয় কেউ বড় জোর অভিনয় করে চলেছে!

আমরা যখন শিশুদের মাঝে থাকি অথবা সহপাঠীদের সাথে কিংবা বয়োজ্যেষ্ঠদের সাথে কিংবা অশিক্ষিত মানুষদের সাথে কিংবা মেয়েদের সাথে বা উচ্চমার্গের ব্যক্তির সাথে- আমরা কিরকম আচরণ করে থাকি? বস্তুত একেকটি শ্রেনীর বা সম্পর্কের মানুষের উপরই এই আচরণ নির্ভর করে। বিশ্বাস করুন, আমাদের আচরণ, উপস্থাপন ভঙ্গি এমনকি প্রতিক্রিয়া পর্যন্ত নির্ভর করে বিভিন্ন পারিপার্শ্বিকতা, শ্রেনী বা সম্পর্কের উপর। তারমানে কি এই যে আমরা দ্বৈতসত্তা বা বহু-স্বত্বার স্বীকার? যদি তাই হয় তবে বলতেই হবে যে আমাদের সকলেরই দ্বৈত-স্বত্বা/বহু-স্বত্বা আছে; আমরা আমাদের পরিবারের সদস্যদের সাথে, বন্ধুদের সাথে, জীবন-সঙ্গির সাথে এবং কোন অচেনা ব্যক্তির সাথে ভিন্ন ভিন্ন আচরণ করি, তাই না?

এখন আসুন জেনে নেই Split Personality বা দ্বৈত-স্বত্বা/বহু-স্বত্বা বলতে আসলে কি বোঝায়!

দ্বৈত ব্যক্তিত্ব হলো প্রকৃত পক্ষে বিরল এবং বিপরীত ধর্মী মানসিক অবস্থা যেখানে নিজস্ব, স্বাভাবিক ব্যক্তিত্বময় গুণাবলীগুলো বিলুপ্ত হয়ে দুই বা ততোধিক ভিন্নধর্মী, স্বাধীন ব্যক্তিত্বের আবির্ভাব ঘটে। একে বহুরূপী ব্যক্তিত্বের লক্ষণ অর্থ্যাৎ Multiple Personality Syndrome (MPS) বলা যায়।

ব্যাখ্যাঃ দ্বৈত-ব্যক্তিত্ত্ব সংক্রান্ত সরাসরি এমন কোন বিভাগ বা বিবরণ মনোবিজ্ঞানে নেই। তবে ডা: জেকিল এন্ড মিস্টার হাইড জাতীয় নাটকীয় এবং বহুরূপী চারিত্রিক বিশ্লেষণে এই বিশেষণটি বস্তুত প্রচলিত কথাবার্তায় ব্যবহার করা হয় । প্রায়শই (schizophrenia) নামক মানসিক ব্যাধির সাথে একে গুলিয়ে ফেলা হয় কারণ এর শব্দোৎপত্তিগত দিক (from the Greek schizein, to split + phren, mind) খানিকটা ভ্রান্ত ধারনা দেয় যে, স্কিজোফ্রেনিয়া (উচ্চারণটি: স্কিট-জো-ফ্রিনিয়া/স্কিট-জো-ফ্রেনিয়া) একটি দ্বৈত-ব্যক্তিত্ব। যদিও স্কিজোফ্রেনিয়া রোগের ক্ষেত্রে ব্যক্তিত্বের আচরণ, চিন্তাভাবনা, আবেগের হুটহাট পরিবর্তন হয় তবে তা একক ব্যক্তিত্বেরই প্রকাশ। স্কিজোফ্রেনিক রোগী, দ্বৈত বা বহু ব্যক্তিত্বের অধিকারী মানসিক রোগীদের চেয়ে অনেক বেশীই যুঝতে থাকে নিজের সাথে মূলত নিজের ভেতরের চরম বৈশাদৃশ্য নিয়ে।

এবার একটু জেনে নেয়া যাক ব্যক্তিত্ব বলতে আসলে আমরা কি বুঝি।

ব্যক্তিত্বের মূলত তিনটি বিশ্লেষণ আছে; যার দু’টো হলো সাধারণ এবং জনপ্রিয় অর্থে এবং তৃতীয়টি বৈজ্ঞানিক ও মনস্তাত্বিক । ব্যক্তিত্বের প্রথম এবং সাধারণ সংজ্ঞাটি হলো মূলত চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যগত সমষ্টি অর্থ্যাৎ চেহারা, আচরন, অভ্যাস, পছন্দ-অপছন্দ এবং নীতি-আদর্শগত দিক। দ্বিতীয় সংজ্ঞাটি মূলত নির্দেশ করে একজন ব্যক্তি থেকে আরেকজনকে আলাদা করে দেখার বৈশিষ্ট গুলো। প্রথম বিশ্লেষণটি শুধুমাত্র ব্যক্তির নিজস্ব বৈশিষ্ট্যগুলোকে নির্দেশ করে অন্য কারো সাথে কোনরূপ তুলনা ব্যতীত। অন্যদিকে দ্বিতীয় বিশ্লেষণটি একই বৈশিষ্ট্যগুলোকে চারপাশের অন্যান্যদের সাথে মিলিয়ে দেখে এবং তাই উল্লেখ করে যা কেবল অন্যদের থেকে একজনকে আলাদা করে তোলে। দ্বিতীয় সংজ্ঞাটি আসলে নির্দেশ করে একক চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যকে।

তবে তৃতীয় সংজ্ঞাটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ এবং যে কোন গবেষক, দার্শনিক বা মানসিক চিকিৎসকের কাছে একটি মূল ব্যাখ্যা। এই ধারণাটি সম্পূর্ণই মানসিক বৈশিষ্ট্যগুলোকে ইঙ্গিত করে এবং কোন সাধারণ বা সুনির্দিষ্ট কিছু নির্দেশ করেনা। বস্তুত নির্দিষ্ট কোন বৈশিষ্ট্যের চেয়ে মানসিক অবস্থার বিভিন্ন ধাপকেই নির্দেশ করা হয়। মানসিক অবস্থার বিভিন্ন ধাপগুলোর ধারণ ক্ষমতা বা কিরূপে তা বহন করা হয় তাই মূলত ব্যক্তিত্ব বলে মানসিক চিকিৎসক বা দার্শনিকরা মনে করে থাকেন। এভাবে বলা যায় যে, ব্যক্তিত্ব মূলত সচেতনতার একটি প্রবাহ যেখানে প্রশ্নাতীতভাবে কোন একটি বিশেষ অবস্থা স্থির বা স্বাভাবিক বা প্রয়োজনীয় বা অপ্রয়োজনীয় থাকবে। শারীরিক নিদর্শন এখানে কোন ভূমিকা রাখেনা যদিনা তা কোন না কোন ভাবে মানসিক অবস্থাকে প্রভাবিত করে।

দ্বৈত বা বহু-ব্যক্তিত্ব সংক্রান্ত সম্ভাব্য ঘটনাবলী চিকিৎসা শাস্ত্রে অন্তর্ভূক্ত হতে শুরু হয় উনিশ শতক থেকে। যদিও একসময় এই অসুখটিকে প্রায় অস্তিত্বহীন ধরা হতো এবং এই অসুখ সংক্রান্ত ২০০টিরও কম ঘটনা জানা যাবে ১৯৮০ সালের পূর্বেকার সময়ে। এই বিশ্লেষণটি নানা কারণে বেশ গতিপ্রাপ্ত হয় ১৯৮০ সালের দিকে। ১৯৭৩ সালে Flora Schreiber –এর ষোলটি ভিন্ন ব্যক্তিত্বের অধিকারী এক মহিলার কাহিনী নিয়ে Sybil বইটি অভূতপূর্ব সাড়া জাগায়। বহুরূপতা নিয়ে কাল্পনিক বা অন্য কোন গল্প নতুন কিছু ছিলনা অবশ্য; ১৯৫৪ সালে The Three Faces of Eve এবং ১৮৮৬ সালের সেই The Strange Case of Dr. Jekyll and Mr. Hyde, তথাপি Sybil যেন একটি বিশাল আবিস্কার ছিল- শিশুকাল থেকে পারিপার্শ্বিক নেতিবাচক ঘটনার মানসিক চাপ বিস্তৃতি লাভ করে বহুরূপী ব্যক্তিত্বের জন্ম দিতে পারে।

দ্বৈত/বহুরূপী ব্যক্তিত্বের বিশেষ লক্ষণসমূহ

এ ধরনের বিকারগ্রস্ত রোগীদের মধ্যে বিভিন্ন প্রকারের লক্ষণগুলো সময় সময় পরিবর্তিত আকারে দেয়। এই লক্ষণসমূহ কখনও স্বল্পমাত্রায় আবার কখনও ভয়ংকর রূপেও দেখা দিতে পারে। লক্ষণসমূহ –

– বহুরূপী আচার-আচরণ যা বলা চলে একটি আরেকটির সাথে সামঞ্জস্যহীন
– মাথাব্যাথা বা শরীরের অন্যান্য জায়গায় ব্যাথা অনুভব
– সময়ের অবহেলা বা অপচয়
– মনুষ্যত্বহীনতা
– স্মৃতিশক্তিহীন
– বিবেকহীনতা/আবেগহীন
– অতীত দূর্ঘটনা বারবার মনে করা
– ব্যাখ্যাতীত কোন ভয়
– কারণ ছাড়াই হঠাৎ রেগে যাওয়া
– মানুষজনকে এড়িয়ে চলা
– প্রায়শই কোন কাল্পনিক ভয়ে আক্রান্ত হওয়া
– কাল্পনিক কোন ব্যক্তিকে দেখা এবং আপন মনে কথা বলা

চিকিৎসাঃ এধননের মানসিক রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিরা খুব দ্রুত সুস্থ হয়ে ওঠেনা কারণ সময় সময় বিভিন্ন উপসর্গগুলো বদলাতে থাকে। তারপরও এমন বহুরূপী ব্যক্তিত্ব রোগে আক্রান্তদের চিকিৎসায় মূল লক্ষ্যই থাকে তাদের একক, সুনির্দিষ্ট ব্যক্তিত্বে ফিরিয়ে আনা। এধরনের ক্ষেত্রে রোগীকে মানসিক চাপ থেকে বিরত রাখার চেষ্টা করা হয় সবসময়। এছাড়াও সাইকোথেরাপি, মেডিকেশন এসবও প্রযোজ্য হয় রোগীর ক্ষেত্রে। আচরণগত বৈসাদৃশকে শুধরে নিতেও চিকিৎসকরা নানারকম কৌশলী ব্যবস্থা নিয়ে থাকেন যেমন রোগীর শুধুমাত্র একটি নির্দিষ্ট ব্যক্তিত্বের সাথেই প্রয়োজনীয় সাড়া প্রদান করা।

বহু-স্বত্বা রোগে আক্রান্ত ৫৫ বছরের Nira Nevins -কে আদালত ব্যাংক ডাকাতির দায়ে শাস্তি ঘোষনা করেছিল। Nira Nevins আদালতে জানায় যে মাত্র একটি স্বত্বাই ব্যাংক ডাকাতিতে জড়িত ছিল অথচ বিচারের রায়ে সবাইকেই জেলে যেতে হচ্ছে। Nira Nevins দাবি করে ব্যাংক ডাকাতির দিন তার মাঝে একটি শিশুসুলভ স্বত্বা জাগ্রত হয়। ”আমাদের কৃতকর্মের জন্য আমি খুবই লজ্জিত”, নিজের বহু-ব্যক্তিত্ব নিয়ে Nira Nevins আদালতে একথা জানায়। আদালত Nira Nevins -কে ১৮ বছরের হাজতবাসের রায় প্রদান করে ব্যাংকের এক অফিসারকে কিডন্যাপিং করার দায়ে এবং ১৩ বছরের একটানা কারাবাস প্রদান করে ২০০২ সালে ব্যাংক ডাকাতির জন্য। Nira Nevins -কে অবশ্যই ১৫ বছর ৩ মাসের কারাভোগ করতে হবে, প্যারোলে মুক্তির সুবিধাপ্রাপ্ত হতে।

একজন জুরি তাকে ধোঁকাবাজ সাব্যস্ত করে ব্যাংক থেকে $৫০০০ এরও বেশী অর্থ ডাকাতি করার দায়ে এবং তার মাঝে Jimmy নামে একটি শিশু ব্যক্তিত্বের আবির্ভাবে ডাকাতি সংগঠিত হয়েছে এই প্ররোচনার দায়ে।

Nira Nevins -এর এটর্নি আদালতে প্রমাণ করার চেষ্টা করেন যে Nira Nevins বহু-ব্যক্তিত্বের মানসিক রোগে আক্রান্ত এবং তাকে মুক্তি দেয়া উচিৎ তার এই মানসিক ভারসাম্যহীনতার জন্য। Nira Nevins নিজেও এই বক্তব্য প্রদান করে যে, ২০শে মার্চ ২০০২ সালে, সকাল বেলা সে আত্মহত্যা করার চেষ্টা করে এবং পরবর্তীতে সে যতটুকু মনে করতে পারে তা হলো, ব্যাংক ডাকাতির পর সে নিজেকে পুলিশের গাড়িতে আবিস্কার করে।

তবে আদালত Nira Nevins কে সুচতুর মহিলা হিসেবেই মত প্রদান করে, যে কিনা $১,২৪,০০০ -এর ঋণ এড়াতে এরকম ব্যাংক ডাকাতির পরিকল্পনা করে। আদালত Nira Nevins এর বক্তব্যকে মিথ্যে অভিহিত করে জানায় যে Jimmy নামে একটি শিশু ব্যক্তিত্বের উপস্থিতি একটি সাজানো নাটক।

এখন ঠিক কি মনে হচ্ছে আপনার – দ্বৈত্ব-স্বত্বা বা বহু-স্বত্বা রোগটি আসলেই বিদ্যমান নাকি সাজানো নাটক?

এমন তো হতে পারে, কোন একক ব্যক্তির মাঝে ভিন্ন ভিন্ন ব্যক্তিত্বের উপস্থিতি লোকসমাজে তেমন প্রকট ভাবে ধরা দেয় না কিংবা আপাতদৃষ্টিতে তেমন ক্ষতিকারক নয় বলেই এমন ভয়াবহ একটি ব্যাধি আপনার-আমার অজ্ঞাতসারেই আপন ব্যক্তিত্বে বিস্তৃতি লাভ করছে!

আচ্ছা, এমন মনে হচ্ছে না তো যে আপনার মাঝেও এমন অদ্ভূত কিছু বিপরীত ধর্মী স্বত্বা আসলেই লুকিয়ে আছে!!!

সুস্থ মানসিক বিকাশ ঘটুক।
সুস্থ থাকুন, সুন্দর থাকুন।

*** *** ***
তথ্য সূত্রঃ
১. http://ezinearticles.com
২. http://www.bbc.co.uk
৩. http://en.wikipedia.org
৪. http://www.redorbit.com

*** *** ***
কিছু ভয়ংকর/অদ্ভূত কেস হিস্ট্রি:
১. http://www.dichotomistic.com
২. http://www.history.com

*** *** ***

একটা গান শুনে নিন-