ক্যাটেগরিঃ গণমাধ্যম

 

সরকারি নীতিমালা মানেই নিয়ন্ত্রণ আরোপ হবে এটা আমাদের ধূসর মস্তিষ্কে ’প্রোগ্রাম’ করা আছে। নিয়ন্ত্রণ অর্থ স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ। স্বাধীনতা হীনতায় কে বাঁচিতে চায়- এই মনোভাবে উদ্বুদ্ধ হয়ে ’বাই ডিফল্ট’ আরোপের বিপক্ষে অবস্থান গ্রহণ তাই সহজাত প্রবৃতি। অথচ শিশুকালেই স্বাধীনতার সমান্তরালে এও শেখানো হয় স্বাধীনতা অর্থ স্বেচ্ছাচারিতা নয়। নিয়ম, আরোপ, রীতি আর আইন – এ সবই সেই স্বেচ্ছাচারিতার স্থানগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য তৈরি হয়। তাই বলে আইন সবক্ষেত্রে ’বান্ধব’ হবে এমনটা হয় না। আইনের অপপ্রোয়েগের এই আশংকা নির্ভর করে তিনটি ক্ষেত্রের উপর – আইন প্রস্তাবনাকারী/প্রণয়ণকারী, আইনি ধারা ও ধারা বর্ণনা, আইন প্রয়োগকারী । আইন প্রস্তাব ও প্রণয়নে যারা ভূমিকা রাখবেন, তাদের উদ্দেশ্য, গবেষণা মান, সংশ্লিষ্ট তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহের পরিমাণ এবং সর্বোপরি ’কেস স্টাডি’ জ্ঞান আড়েবহরে কতটা গভীর, কতটা সুবিস্তৃত, তার উপর নির্ভর করে আইনি ধারার যুগপোযুগীতা। আইনগত বিষয়ে সার্বজনীন অভিযোগ যে, আইনি ধারার বর্ণনা অবোধগম্য হয়ে থাকে! আইনের ফোঁকড় এই অংশেই তৈরি হয়। অপপ্রোয়েগের সুযোগ ও সম্ভাবনাও এখানে নিহিত থাকে। একই সাথে প্রয়োগকারী নীতিবিভ্রম দোষে দুষ্ট হলে তার তত্ত্বাবধানে এই আইন মারনাস্ত্র হয়ে উঠতে পারে। উচিত ধারা ও সমুচিত ধারা বর্ণনা না হলে আইন ’দুর্বল’ হতে পারে, আইন ’কাল’ হয়ে দেখা দিতে পারে। এই দুই রুপেই আইনের প্রতি নাগরিকেরা আস্থাহীনতা পোষণ করেন। এতে যে বীতশ্রদ্ধতা তৈরী হয়, তার বিষাদ ফল ভোগ করতে হয় সরকারকেই।

এই পরিস্থিতিতে সৃষ্ট যে তিক্ততা তার আরো একটি ফল হল, বিশেষ কোন ধারার কারণে পুরো আইন –ই বিতর্কিত হয়ে যায়। এমনটা হতে পারে তখন, যখন প্রস্তাবিত ও প্রবর্তিত আইনকে যারা পর্যবেক্ষণ করছেন, আইনের সারতা-অসারতা তুলে ধরছেন, তাদের প্রদত্ত ব্যাখ্যার ধরণ থেকে। বিশ্লেষণের সময় এটা প্রথম ও শেষ পর্যন্ত উপলব্ধিতে থাকা জরুরী পূর্ণাঙ্গ আইনের গ্রহণযোগ্যতা-অগ্রহণযোগ্যতা একটি আলোচনা, আর আইনের বিশেষ কোন ধারাকে কেন্দ্র করে বিতর্ক আরেকটি আলোচনা। আইন বলবত রেখেও বিশেষ কোন ধারা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করা যেতে পারে, সংশোধন বা বর্জনের দাবি তোলা যেতে পারে। কিন্তু কোন একটি বা একাধিক আইনি ধারাকে অসমর্থন জানাতে গিয়ে পূর্ণাঙ্গ আইন –ই যে অপ্রোজনীয় হয়ে যায় না, সেটা বুঝতে যদি আলোচকরা অসমর্থ হন, তবে মূল বিষয়বস্তু ভিন্ন দিকে মোড় নেবে অবধারিত ভাবে। তাতে বিস্তারিত আলোচনা বাধাগ্রস্ত হবে, কারণ ততক্ষণে আইন নিয়ে যে ভীতি সঞ্চারিত হয়েছে, তাতে সুনির্দিষ্ট আইনটির প্রয়োজনীয়তা স্বীকার করার বদলে তাকে সম্পূর্ণরূপে খারিজ করতেই ’প্রোগ্রামড’ মস্তিষ্ক সংকেত পাঠাবে। এই যে একটা হচপচ দশা এর থেকে উত্তোরণের পথ কী?

সহজ পথ হলো আইন প্রস্তাবনাকারী কর্তৃপক্ষ আইন প্রণয়ণের পূর্বে পর্যাপ্ত সময় হাতে রাখবেন আলোচনার সুবিধার্থে। এবং অবশ্যই খসড়া নীতিমালা এবং সম্ভাব্য চুড়ান্ত নীতিমালা সকলের পাঠের জন্য উন্মুক্ত থাকবে। যারা প্রতিক্রিয়া জানাবেন তাদেরও প্রধানতম দায়িত্ব হলো পুরো আইন/নীতিমালার আদ্যোপান্ত পড়ে দেখা এবং খুঁতযুক্ত ধারাগুলোকে সুনির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত করা। একটি অভিযোগ রয়েছে, যারা আইন প্রণয়ন করেন, তারা সংশ্লিষ্ট বিষয় নিয়ে পূর্ণাঙ্গ ধারনা রাখেন না। যেমন ডিজিটাল সরকারের আমলে খোদ সরকার প্রযুক্তি নিয়ে কতটা বাস্তবিক ধারণা রাখেন তা নিয়ে অনেকেই সন্দিহান। ডিজিটাল জগতে অনলাইন কার্যক্রম সন্দেহাতীতভাবে জনপ্রিয়। অথচ সরকার অনলাইন জগত সম্পর্কে অজ্ঞ এরকমটাই বিশ্বাস অনলাইনবাসীদের। এই অংশে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তোলা অতিব জরুরী- অনলাইন ব্যবহারকারীরাও কি অনলাইনের সংজ্ঞা-ব্যপ্তি-ব্যবহার সম্পর্কে আক্ষরিকভাবে সঠিক জ্ঞান রাখেন? বাংলা অনলাইন কমিউনিটির মধ্যে একটি বদ্ধমূল ধারণা আছে অনলাইন মানেই ব্লগ-ফেসবুক। সাইবার মানেই ব্লগ-ফেসবুক। এমনকি প্রযুক্তি মানেও ব্লগ-ফেসবুক। এ ধারনাপোষণকারীরা এতটাই ’অনলাইন কুসংস্কারাচ্ছান্ন’ যে প্রযুক্তি আইন কিংবা সাইবার আইনকে ব্লগ আইন আখ্যায়িত করেন অবলীলায়। তারপর সাইবার আইনের প্রয়োজনীয়তার বিরুদ্ধচারণ করেন। প্রযুক্তি আইন বাতিলের মতামতও প্রকাশ করেন। ইন্টেলেকচুয়্যাল প্রোপার্টি (আইপি) আইনকেও ব্লগ-ফেসবুক বিরোধী আইন গণ্য করেন। প্রতিক্রিয়ার এই নেতিবাচক বহিঃপ্রকাশ হালে ঘটছে অনলাইন গণমাধ্যম নীতিমালা ২০১২ –কে ঘিরে। কারণটা অবশ্যই প্রস্তাবিত নীতিমালার শিরোনামে ‘অনলাইন’ শব্দটির অবস্থান।

অনলাইন কমিউনিটির মুখপাত্র হিসেবে ব্লগ-ফেসবুকের কল্যানে যাদের প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে তারা ’ব্লগার’ হিসেবে প্রতিক্রিয়া দিচ্ছেন আর প্রতিক্রিয়ার বৃহত অংশজুড়ে অনলাইন গণমাধ্যম বলতে ব্লগকে ঠাওরে যাচ্ছেন। কেউ কেউ দাবি করছেন, নীতিমালাতে অনলাইন গণমাধ্যমের সংজ্ঞা দেয়া উচিত। এই দাবির উদ্দেশ্য হল, ব্লগ এই নীতিমালার আওতায় কিনা তা নিশ্চিত হতে চাওয়া। আলোচকগণ খসড়া নীতিমালাটি নিজে পুরোটা পড়েছেন নাকি নীতিমালা নিয়ে বিভিন্ন প্রত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদনের একটি-দুটি অংশ পড়েই অনলাইনে পোস্ট/নোট/সাক্ষাতকার প্রকাশ করছেন তা প্রশ্ন সাপেক্ষ। এটা সত্যি যে, নীতিমালা বা আইন যে বিষয়/আচরণ/মাধ্যমের জন্য প্রযোজ্য হবে সে সবের সংজ্ঞায়ন নীতিমালায় থাকা জরুরী। যা যা এই আইনের আওতামুক্ত থাকবে স্বচ্ছতা রক্ষার জন্য তারও উল্লেখকরণ জরুরী। সাধারণত ব্যবহৃত শব্দাবলীর (টার্ম) আইনি অর্থ প্রদান করা থাকে নীতিমালায়/আইনে। এক্ষেত্রে যদি মূল নীতিমালায় অনলাইন, গণমাধ্যম ও ব্যবহৃত অন্যান্য সকল গুরুত্বপূর্ণ শব্দাবলীর সংজ্ঞা/অর্থ ’না’ থাকে তো তা চূড়ান্ত নীতিমালায় আবশ্যিকভাবে অন্তর্ভূক্ত হওয়ার দাবি অমূলক নয়।

সোশ্যাল মিডিয়া অবশ্যই অনলাইন ভিত্তিক মিডিয়া। সোশ্যাল নেটওয়ার্কিং শক্তিশালী বিকল্প মিডিয়া। সোশ্যাল মিডিয়াকে মূলধারা গণমাধ্যমের সমকক্ষও ধরা হয়। কিন্তু এই ’ধরা’ আলোচনা পর্যন্তই। এই ’ধরা’ বৈশ্বিকভাবে ’প্রতিষ্ঠানিক’ পর্যায়ে রূপ নেয়নি এখনো। ফলে অনলাইন গণমাধ্যম নীতিমালা ২০১২ যে ব্লগের জন্য প্রযোজ্য নয়, তা প্রাথমিকভাবে পরিষ্কার হয়ে যায়। তবুও অনলাইন শব্দটা পুনরায় ধূসর মস্তিস্কে খচখচ করলে, খসড়া নীতিমালাটি একবার পড়ে নিলেই এর বিভিন্ন ধারা বর্ণনা দেখেই বুঝে নেয়া যায়, সোশ্যাল নেটওয়ার্কিং জগতের চলনের সাথে এই নীতিমালা কোনভাবেই মেলে না –এই নীতিমালা অনলাইন ভিত্তিক সংবাদমাধ্যম ও প্রচারণমাধ্যমগুলোর কার্যক্রমের জন্য প্রযোজ্য।

২০টি মূল ধারা সম্বলিত এই খসড়া নীতিমালার একটি বড় অংশ লাইসেন্স কেন্দ্রিক। অপরাপর গুরুত্বপূর্ণ অংশে আছে (১) সম্প্রচার শর্তাবলি, (২) পেশাগত ও কারিগরি মান, (৩) মনিটরিং কমিটি। নীতিমালার প্রারম্ভেই [২(ক)] অনলাইন গণমাধ্যম পরিচালনাকারীদের আবেদনের কথা জানানো হয়েছে। এই অংশে যে বর্ণনা পাওয়া যায়, যেমন অফিস অবকাঠামো, জনবল, শিক্ষা সনদ, অভিজ্ঞতা সনদ, ব্যাংক স্টেটমেন্ট, তা থেকে বোঝা যায় অনলাইন গণমাধ্যমের কার্যক্রম ‘ভার্চুয়্যাল’ হলেও প্রতিষ্ঠানের ’ফিজিক্যাল’ অস্তিত্ব থাকতে হবে। লোকবল থাকতে হবে। বিনিয়োগ থাকতে হবে। একটি প্রতিষ্ঠানের যেমন থাকে। এই ক্ষেত্রে এভাবে বলা ভাল, মুদ্রণ সংবাদপত্র কিংবা টিভি চ্যানেল কার্যালয়গুলোতে যেমন থাকে। ১১(চ) ধারায় নির্দেশনা আছে অনলাইন গণমাধ্যম পরিচালনাকারীদের(পত্রিকার ক্ষেত্রে সম্পাদক) শিক্ষাগতযোগ্যতা নিয়ে। একই সাথে বলা আছে, সাংবাদিকতায় অভিজ্ঞতা ও প্রশিক্ষণ থাকার আবশ্যকতা। এসব সোশ্যাল নেটওয়ার্কিং চর্চায় কোনভাবে প্রযোজ্য হয় না, বরং প্রযোজ্য হয় সংবাদ ভিত্তিক গণমাধ্যমগুলোর জন্য।

নীতিমালার ১২,১৩,১৪ ধারায় রয়েছে সম্প্রচার শর্তাবলী। এখানে বিভিন্ন উপধারায় যে সকল উল্লেখযোগ্য শব্দ (টার্ম) রয়েছে তা হল – সংবাদ, অনুষ্ঠান, প্রচার সময়(টাইম স্লট), সম্প্রচার। ১২(ঘ) ধারায় ’টাইম স্লট’ বিক্রি করে (বিজ্ঞাপন প্রচার) অর্থ সংগ্রহের কথা বলা আছে। ’টাইম স্লট’ শব্দ দুটোর ব্যবহারে এ ধারা পাঠে কোন ’টেক্সট’ সংস্করণ ওয়েবসাইটকে কল্পনা করা সম্ভব হয় না, বরং এই অংশটি অডিও-ভিজ্যুয়াল মাধ্যমের জন্য লিখিত বলেই ধরা যায়। এই অংশে এটাও স্পষ্ট হয় যে, অনলাইন কমিউনিটি রেডিও নীতিমালা থেকে অনলাইন গণমাধ্যম নীতিমালার কাঠামো দাঁড় করানো হচ্ছে। ১৩(গ) ধারাটি পাঠে অনলাইন গণমাধ্যম বলতে যে সংবাদ মাধ্যমগুলোকে বোঝানো হয়েছে তা আরো স্পষ্ট হয়। এই ধারায় রাষ্ট্রপতি আর প্রধানমন্ত্রীর ভাষণ বিনামূল্যে সম্প্রচারের নির্দেশ প্রদান করা হয়েছে। এই ধারাও সোশ্যাল নেটওয়ার্কিং চর্চায় খাটে না।

দেখা যাচ্ছে, অনলাইন গণমাধ্যম নীতিমালাকে ঘিরে প্রাসঙ্গিক আলোচনা ব্যতিরেকে অপভ্রংশ আলোচনাই অধিক, যা ভিন্নধারার উতকণ্ঠা তৈরী করছে। এতে মূল নীতিমালাটিকে ঘিরে সার আলোচনা করে একে সমৃদ্ধ করার যে সুযোগ আছে হাতে, তা অস্বচ্ছ আলোচনাতেই বিনষ্ট হচ্ছে। বিপরীতে সোশ্যাল নেটওয়ার্কিং কমিউনিটিকে জোরপূর্বক এই অনলাইন গণমাধ্যম নীতিমালার সাথে সম্পৃক্ত করে সোশ্যাল নেটওয়ার্কিং জগতকে অস্থিতীশীল দশায় যারা ধাবিত করছে, তাদের উদ্দেশ্য-দৃষ্টিভঙ্গি-দায়িত্বশীলতা-দূরদর্শীতার উপর অনাস্থা ও সন্দেহ পোষণ করার সুযোগ সৃষ্টি হচ্ছে। কারণ, অনলাইন গণমাধ্যম নীতিমালা নিয়ে প্রাসঙ্গিকভাবে সমালোচনার জায়গা যে নেই তা কিন্তু নয়।

যেহেতু অনলাইন বিষয়ক, তাই এই নীতিমালায় প্রযুক্তিগত দিক নির্দেশ করে বক্তব্য সংযুক্তিকরণ প্রত্যাশিত। ১১(ঝ) ধারায় বলা আছে হোস্টিং বাংলাদেশে স্থাপিত সার্ভারে করতে হবে। কিন্তু যদি কোন অনলাইন গণমাধ্যম ক্লাউড প্রযুক্তি সার্ভিস নিতে চায়, সেক্ষেত্রে এই ধারা সহায়ক হচ্ছে নাকি প্রতিবন্ধক হচ্ছে অথবা কোন সুষ্পষ্ট বক্তব্য বহন করছে কি? ১২(ক) ধারায় বলা আছে, সম্প্রচারিত ’কনটেন্ট’ ৯০ দিন পর্যন্ত সংরক্ষণ করতে হবে। এই অংশটি মাত্র একটি লাইনে শেষ হওয়াটা দায়সারা ঠেকে। অনলাইনে কনটেন্ট (অডিও-ভিডিও-টেক্সট) যাই হোক না কেন, সার্ভারে তা আজীবন সংক্ষরণ করতে সমস্যা নেই। এই ডাটাবেজ মেইনটেইন করতেও সমস্যা নেই। ৯০ দিন অতিবাধিত হলে গণমাধ্যম কর্তৃপক্ষ কি যে কোন কনটেন্ট মুছে ফেলার অধিকার ’রাখেন’? নাকি বিশেষ কারণবশত বা নির্দেশনা (যেমন সরকারি) ছাড়া গণমাধ্যম কর্তৃপক্ষ স্বপ্রণোদিত হয়ে ৯০ দিন পূর্বে কোন কনটেন্ট মুছে ফেলার অধিকার ’রাখেন না’? উল্লেখ্য পাঠকের জন্য অনলাইন সংবাদ প্রতিবেদনের পাতাটি ’আনএ্যাভেইলেবল‘ হয়ে যাওয়া মানেই সেটা সার্ভার থেকে মুঝে গেছে, ডাটাবেজ থেকে হাওয়া হয়ে গেছে তা নয়। নীতিমালার এই অংশে ‘অনলাইন আর্কাইভ’ সংযুক্তির নির্দেশনা রাখা যেত। একই সাথে অনলাইন গণমাধ্যমের প্রযুক্তিগত অবকাঠামো নিয়েও বিস্তারিত দিকনির্দেশনা প্রদান করা যেত।

অনলাইন গণমাধ্যম নীতিমালা নিয়ে সাংবাদিকদের মতামত জানতে চাওয়া হয়েছে এবং নীতিমালা মনিটরিং কমিটিতে সোশ্যাল নেটওয়ার্কিং কমিউনিটির কেউ অন্তর্ভূক্ত নেই – এমন আক্ষেপ মিশ্রিত অভিযোগ উঠেছে। যেহেতু সংবাদ ভিত্তিক মাধ্যম নিয়েই এই নীতিমালা তাই সাংবাদিকদের মতামতকে প্রাধান্য দেয়া ছাড়া গত্যন্তর নেই। আর যেহেতু এই নীতিমালার চলন সোশ্যাল নেটওয়ার্কিং চর্চার সাথে খাপ খায় না, তাই এই কমিউনিটির কেউ স্বভাবতই অন্তর্ভূক্ত হয়নি। তথাপি ’অনলাইন গণমাধ্যমের প্রতিনিধি‘ হিসেবে ৪ জন সদস্য অন্তর্ভুক্তকরণের বিষয়টি উল্লেখ রয়েছে নীতিমালায়। এখানে বরং লক্ষ্যনীয় এই কমিটিতে পুলিশ ও আইনজীবীদের মধ্যে থেকে কোন অভিজ্ঞ প্রতিনিধি রাখার কথা উল্লেখ নেই। যদি কোন অভিযোগ উত্থাপিত হয়, তাহলে প্রাথমিকভাবে অভিযোগ উত্থাপনকারী নীতিমালা প্রণয়ণকারীর কাছে ছুটবে না, যাবে পুলিশের কাছে। পুলিশ যেহেতু প্রাথমিক SPOC (Single Point Of Contact), তাই পুলিশের এই ধরনের নীতিমালা নিয়ে সম্যক ধারণা থাকা জুরুরী। আর নীতিমালার আইনি রূপ, ধারার দুর্বলতা, শক্তিমত্তা নিয়ে আইনি দৃষ্টিকোণ থেকে আলোচনা তরান্বিত করতে পারেন একজন আইনজীবী। কমিটিতে পুলিশ ও আইজীবী প্রতিনিধির উপস্থিতি কমিটিকেই শক্তিশালী করবে বলে আশা করা যায়।

নীতিমালার একটি আলোচিত অংশ হল ২ লক্ষ টাকা লাইসেন্স ফি ও ৫০ হাজার টাকা নবায়ন ফি। এটি পরিষ্কার যে অনলাইন গণমাধ্যমকে একটি পূর্ণাঙ্গ প্রতিষ্ঠানের মত গণ্য করা হচ্ছে, যেখানে বিনিয়োগ আছে, খরচ আছে, আয় আছে। সে অর্থে লাইসেন্স ও নবায়ন ফি ধার্যকরণ প্রাসঙ্গিক। বিতর্ক ও আশংকা তৈরী হতে পারে ধার্যকৃত অর্থের পরিমাণ নিয়ে। টিভি চ্যানেলগুলোতে বিজ্ঞাপন প্রচার থেকে আয় হয়। মুদ্রিত সংবাদপত্রে বিজ্ঞাপন মানে আয়। সার্কুলেশন মানে পত্রিকার কাটতি। বিপরীতে পাঠককে অনলাইন পত্রিকা কিনে পড়তে হয় না। তাই অনেকে বুঝতে পারেন না, অনলাইন পত্রিকাগুলো ’সার্ভাইভ’ করে কী করে! প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়িক গ্রুপের বিনিয়োগে কোন অনলাইন পত্রিকা সটান দাঁড়াতে পারে। ৫-৬ বছর ধরে একটি অনলাইন পত্রিকা আস্থা অর্জন করে প্রতিষ্ঠিত হতে পারে। এ ধরণের ক্ষেত্রে এককালীন ২ লক্ষ আর বাতষরিক ৫০ হাজার অসুবিধাজনক নয়। কিন্তু অনলাইন গণমাধ্যম হিসেবে ’দৈনিক মাথাভাঙ্গা’ (http://mathabhanga.com/) পত্রিকাটির ক্ষেত্রে, লাইসেন্স ফি আর নবায়ন ফি এই পত্রিকাটিকে আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে দেয়ার সম্ভাবনা তৈরী করছে নাকি? নোয়াখালিওয়েব (http://www.noakhaliweb.com.bd) অনলাইন পত্রিকাটির পক্ষেও কি এই লাইসেন্স ফি চাপ হয়ে দেখা দেবে না? ধারণা করা যায়, জেলা বা স্থানীয় পর্যায়ের অনলাইন পত্রিকাগুলো এই আর্থিক চাপে ক্ষতিগ্রস্থ হবে। প্রতিষ্ঠিত মুদ্রণ পত্রিকা ও গণমাধ্যমগুলোর যে অনলাইন সংস্করণ রয়েছে, সেগুলো যদি অনলাইন গণমাধ্যম নীতিমালার আওতাভূক্ত হয় তবে সেই সকল পত্রিকা ও গণমাধ্যমগুলোর ক্ষেত্রে আর কেবলমাত্র অনলাইন নির্ভর পত্রিকাগুলোর ক্ষেত্রে একই হারে ফি ধার্যকরণও কি সঠিক? এক্ষেত্রে, গণমাধ্যমের ধরণ, অবকাঠামো ইত্যাদি বিবেচনা করে লাইসেন্স ফি ও নবায়ন ফি’র ক্ষেত্রে ভিন্ন ভিন্ন শ্রেণীকরণ(ক্যাটেগরি) করে ফি নির্ধারণ করা যেতে পারে।

অনলাইন বিষয়টিকে দেশের সীমা দিয়ে বাধাটা কষ্টকর। বাংলা ভাষায় প্রকাশিত অনলাইন পত্রিকা, বাংলাদেশি পরিচালক, অথচ কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে বিদেশে, এ ধরণের ক্ষেত্রে বাংলাদেশে প্রণীত নীতিমালা অনুসরিত হবে নাকি ’ক্রসবর্ডার’ নীতিমালার/আইনের (উক্ত দেশের সাথে প্রয়োজন মাফিক আইনি তথ্য-সুবিধা বিনিময়) সুযোগ থাকবে, তা নীতিমালায় আলাদা ভাবে চিন্হিত করা হয়নি।

সংবাদ প্রতিবেদনগুলোতে বলা আছে, অক্টোবর থেকেই এই নীতিমালা প্রণয়ন হবে। হাতে সময় অপ্রতুল। এই তাড়াহুড়ো এড়িয়ে খসড়া নীতিমালার নূন্যতম দু’টো সংস্করণের পরে চূড়ান্ত নীতিমালার প্রবর্তন হলে তাতে সম্মিলিত মতের প্রতিফলন ঘটতো। নীতিমালা প্রবর্তকেরা মতামত থেকে প্রয়োজনীয় ’ইনপুট’ গ্রহণ করবেন, এটা স্বভাবসুলভ প্রত্যাশা, তেমনি নীতিমালা আলোচকেরা সার বিশ্লেষণ করবেন এটাও জরুরী। নীতিমালাকে ভীতিকরভাবে উপস্থাপিত না করার দায়িত্ব প্রবর্তকদের উপর যেভাবে বর্তায়, বিশ্লেষকদের উপরও বর্তায়।

সার আলোচনা হোক, বান্ধব নীতিমালা প্রণয়ন হোক – উদ্যেশ্য হোক অনলাইন গণমাধ্যমের বিকাশ।