ক্যাটেগরিঃ স্বাধিকার চেতনা

laboniblog_1229799905_1-hair-9638
(৪০০,০০০ বীরাঙ্গনাদের মধ্যে একজন; ছবি : Naib Uddin Ahmed/Autograph ABP & Guardian UK)

ত্রিশ লাখ শহীদের রক্তের বিনিময়ে, মা-বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে অর্জিত হয়েছে স্বাধীনতা, এ কথাটুকু বলতে খুব বেশী সময় লাগেনা । অথচ সেসময়ে বাস্তবতা যে কতটা ভয়াবহ ছিল! যে কোন যুদ্ধে হত্যাযজ্ঞের পাশাপাশি অন্য যে ঘটনাটি দেদারসে হয়ে থাকে তা হলো নারী-ধর্ষণ । আমাদের নয় মাসের অর্জিত স্বাধীনতার সংগ্রামের পেছনে রয়েছে পাকসেনা আর রাজাকারদের সেরকমই কিছু কু-কীর্তি ।
***
index

’ইস্ট পাকিস্তান: দ্য এন্ড গেম’ বইটিতে লেখক ব্রিগেডিয়ার সিদ্দিকী লেফটেন্যান্ট জেনারেল আমির আব্দুল্লাহ খান নিয়াজীর একটি বির্তর্কিত উক্তি ফাঁস করেন যেখানে একাত্তরে সংগঠিত ধর্ষণ কীর্তি গুলোর সাফাই গাইতে জেনারেল নিয়াজী বলেন – ”আপনি এরূপ আশা করতে পারেন না যে, সৈন্যরা থাকবে, যুদ্ধ করবে এবং মুত্যু বরণ করবে পূর্ব পাকিস্তানে আর যৌন চাহিদা নিবারণ করতে যাবে ঝিলামে(ঝিলাম পাঞ্জাব প্রদেশের সর্ববৃহৎ নদ)” !

***
laboniblog_1229800409_4-rape1

Brownmiller লিখেছিলেন, একাত্তরের ধর্ষণ নিছক সৌন্দর্যবোধে প্রলুব্ধ হওয়া কোন ঘটনা ছিলনা আদৌ; আট বছরের বালিকা থেকে শুরু করে পঁচাত্তর বছরের নানী-দাদীর বয়সী বৃদ্ধাও স্বীকার হয়েছিল এই লোলুপতার। পাকসেনারা কেবল ঘটনাস্থলে তাদের পৈশাচিকতা দেখিয়েই ক্ষান্ত হয়নি, প্রতি একশ জনের মধ্যে অন্তত দশ জনকে ক্যাম্প বা ব্যারাকে নিয়ে যাওয়া হতো সৈন্যদের জন্য। রাতে চলতো আরেক দফা নারকীয়তা । কেউ কেউ হয়ত আশিবারেও বেশী সংখ্যক ধর্ষিত হয়েছেন ! এই পাশবিক নির্যাতনে কতজনের মৃত্যু হয়েছে, আর কতজনকে মেরে ফেলা হয়েছে তার সঠিক সংখ্যা কল্পনাও করা যাবে না । (Brownmiller, p. 83)

***
নয় মাসের যুদ্ধে সংগঠিত ধর্ষণ, অপহরণ, জোরপূর্বক পতিতাবৃত্তি বাঙালি মা-বোনদের লাঞ্ছনার কেবল প্রাথমিক ধাপ ছিল যেন। প্রধামন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমান কর্তৃক নির্যাতিতা বাঙালি মা-বোনদের যথাবিহিত সন্মান পূর্বক বীরাঙ্গনা উপাধি প্রদান ছিল সমাজে তাদের পূনর্বাসন প্রকল্পের একটি সূচনা । এই প্রকল্পের উদ্দেশ্য ছিল, বিবাহিত মহিলাদের তাদের স্বামীর কাছে ফিরিয়ে দেয়া এবং অবিবাহিতা ও বিধবাদের বিবাহ সম্পন্ন করা । তথাকথিত রক্ষণশীল সমাজ ব্যবস্থায় যেখানে মেয়েদের পর্দানশীলতা এবং শুদ্ধতাই প্রধান সেখানে এসব ধর্ষিত মেয়েদের বিবাহের প্রকল্পটি তেমন সাড়া জাগাতে পারেনি। অন্য দিকে কেউ কেউ এগিয়ে এলেও তারা সরকারের কাছে এর বিনিময়ে যৌতুক দাবী করে বসে। (Brownmiller, Against Our Will, p. 84)

***
index
যদিও হাজার হাজার হিন্দু মহিলাদের ধর্ষণের পর পরই হত্যা করা হয়েছিল, তবে কিছু সংখ্যক সুশ্রী রমণীদের ধরে নিয়ে যাওয়া হতো মিলিটারি ক্যান্টনমেন্টে । যদি কেউ পরনের কাপড় ঝুলিয়ে আত্মহত্যা করার চেষ্টা করত, তাহলে তাদেরকে উলঙ্গ করে ফেলা হতো । কেউ যদি তাদের লম্বা চুল পেঁচিয়ে আত্মহননের চেষ্টা করত, তবে তাদেরকে ন্যাড়া করে দেয়া হতো । এসব নির্যাতিতরা যখন পাঁচ-ছয় মাসের অন্ত:সত্ত্বা হলে তাদেরকে মুক্তি দিয়ে উপহাস করা হতো, ”যখন আমার পুত্র ভূমিষ্ট হবে, তুমি তাকে অবশ্যই আমার কাছে নিয়ে আসবে” । (Daktar: Diplomat in Bangladesh by Dr. Viggo Olsen).

***
পাঁচ সেনা সহ মেজর আসলাম ৩রা অক্টোবরে ঢাকা ইউনিভার্সিটির রোকেয়া হলের মহিলা সুপারিনটেনডেন্টকে তেজগাঁও ক্যান্টনমেন্টে নাচ-গান করার জন্য কিছু মেয়ে পাঠাতে বলেন। সুপারিনটেনডেন্ট জানান যে বেশীর ভাগ মেয়েই হোস্টেল ছেড়ে চলে গেছে এবং মাত্র চল্লিশ জন ছাত্রীই অবস্থান করছে; হোস্টেলের সুপারিনটেনডেন্ট হিসেবে তিনি মেয়েদেরকে এধরনের কাজে পাঠাতে অস্বীকৃতি জানান । রুষ্ঠ হয়ে মেজর আসলাম সেদিন ফিরে যায় এবং পরবর্তীতে ৭ই অক্টোবর, প্রায় রাত্রি প্রায় আট ঘটিকার সময় মেজর আসলাম এবং তার বাহিনী হোস্টেলের দরজা ভেঙে ফেলে মেয়েদেরকে টেনে-হিঁচড়ে বার করে এনে অসহায় সুপারিনটেনডেন্টের সামনে নির্যাতন করে। এই পৈশাচিকতা এতটাই উন্মুক্তভাবে করা হয়েছিল যে এই সংবাদ করাচির একটি পত্রিকাতেও (Dawn) প্রকাশিত হয়।

laboniblog_1229800215_2-women-fighters

স্বাধীনতার সাত দিনের মধ্যে পাকসেনা কর্তৃক অপহরিত প্রায় তিনশত মেয়েদের ঢাকার বিভিন্ন স্থান থেকে উদ্ধার করা হয়। ২৬শে ডিসেম্বর, মুক্তি বাহিনী এবং যৌথ বাহিনীর সহায়তায় নারায়ণগঞ্জ, ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট এবং ঢাকার আশেপাশের অন্যান্য ছোট শহরগুলো থেকে মানসিক ভারসাম্যহীন অবস্থায় প্রায় ৫৫ জন অস্বাভাবিক অসুস্থ এবং অর্ধ-মৃত মেয়েদের উদ্ধার করে রেড ক্রস (Red Cross) । (Genocide in Bangladesh (1972) by Kalayan Chaudhury, Orient Longman, pp 157-158)

***
laboniblog_1229800319_3-rape3

”আমরা বাঙালি নারীদের উপর পাকসেনাদের ধর্ষণ, নির্যাতনের বহু প্রমাণ সংগ্রহ করেছি । পাহাড়তলী, চট্রগ্রামের শহীদ আকবর আলী’র পুত্র রাউফুল হোসেইন সুজা ফয়জ লেকে ঘটে যাওয়া হত্যাযজ্ঞে তার পিতার লাশ খুঁজতে যান। তারা সেখানে প্রায় দশ হাজার(১০,০০০) বাঙালির লাশ দেখতে পান যার বেশীর ভাগই নির্মমভাবে জবাইকৃত । তারা প্রায় চুরাশি (৮৪) জন অন্ত:স্বত্তা রমনীর মৃতদেহ আবিষ্কার করেছিলেন যাদের উদর ছিন্নভিন্ন ছিল। এই রকম নির্মমতার প্রতিচ্ছবি ছিল প্রায় সারা বাংলাদেশে। ” (The Rape of 71: The Dark Phase of History -Dr. M A Hassan)

***
”ডিসেম্বর এবং মার্চ এখন যেন একটি উৎসব পালনের মাসে পরিণত হয়েছে, এসময় আমরা অনুতাপ করি কেন ১৯৭১ এ ঘটে যাওয়া গণহত্যা এবং গন-ধর্ষণের বিচার আজো হলোনা ! বিচারের এই ব্যর্থতা কিন্তু প্রমাণের অভাব নয় কোনক্রমেই ”। (The Lessons We Never Learn – By: Hameeda Hossain )

***
একাত্তরে মা-বোনদের সম্ভ্রম নষ্টকারী, হত্যাকারী সেইসব ঘৃণিত যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসি চাই

***
সূত্র : জেনোসাইড বাংলাদেশ

————————————————-
**এই লেখাটি ব্রিটেন থেকে প্রকাশিত নারী বিষয়ক কাগজ ”নারী”র চতুর্থ সংখ্যা (ফেব্রুয়ারি-এপ্রিল ২০১১) -এ প্রকাশিত হয়েছে