ক্যাটেগরিঃ প্রযুক্তি কথা

মিসর অথবা তিউনিসিয়ায় টুইটার-ফেসবুক কীভাবে একটি আন্দোলনকে বেগবান করে দেয়, তা ভাবতে ভাবতে বাংলাদেশে বসে টুইটারে টুইট শেয়ার করি আমরা। নয়তো ফেসবুকে একটি স্ট্যাটাস দিয়ে বসি। ইন্টারনেট আমাদের দৈনন্দিন যোগাযোগের অপরিহার্য মাধ্যম এবং এটি সহজলভ্যও হয়ে উঠেছে আমাদের জন্য। যদি ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার প্রাথমিক শর্ত সবার জন্য ইন্টারনেট ব্যবহারের সুযোগ সৃষ্টি হয়, তাহলে আপাতদৃষ্টিতে মনে হতে পারে দেশে ইন্টারনেট ব্যবহারের পরিসংখ্যান বোধ হয় সন্তোষজনক। অথচ ইন্টারনেটওয়ার্ল্ডস্টেটস.কম সাইটটি থেকে জানা যায়, আমাদের দেশে ইন্টারনেট ব্যবহারের আওতায় রয়েছে জনসংখ্যার মাত্র ০.৪ শতাংশ। অন্যদিকে মিসরের বেলায় এই পরিসংখ্যান দেখা যায় ২১.২ শতাংশ। তিউনিসিয়ার বেলায় ৩৪ শতাংশ। ২০০০ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত আমাদের দেশে ইন্টারনেট ব্যবহারকারী বেড়েছে ৫১৭.৩ শতাংশ, মিসরে ৩৬৯১.১ শতাংশ আর তিউনিসিয়ায় ৩৫০০ শতাংশ। এই পরিসংখ্যান বলে দেয় কেন সোশ্যাল নেটওয়ার্কিং সাইটগুলোতে মিসর ও তিউনিসিয়ার সাধারণ জনগণের মতামতের প্রতিফলন ঘটছিল। বাংলাদেশের প্রযুক্তিগত উন্নয়ন ধারার সঙ্গে আফ্রিকার দেশগুলোর তুলনা হয়তো সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। সে ক্ষেত্রে বলতে হয়, আমরা পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত ও পাকিস্তান থেকেও পিছিয়ে আছি। মালয়েশিয়ায় ইন্টারনেট সুবিধার আওতায় রয়েছে ৬৪.৬ শতাংশ জনগণ। আফগানিস্তানের নাম শুনলে আমাদের অনেকের চোখের সামনে পপি চাষের জমি এবং অস্ত্র হাতে যুদ্ধবাজদের ঘোরাফেরার দৃশ্য ফুটে উঠবে। অথচ আফগানিস্তানের ৩.৪ শতাংশ জনগণ ইন্টারনেট সুবিধাপ্রাপ্ত। চমকপ্রদ তথ্য হলো, ২০০০ সালে সেখানে মাত্র এক হাজার জন ইন্টারনেট ব্যবহারকারী ছিল, যা ২০১১ সাল নাগাদ বেড়ে দাঁড়ায় ১০ লাখ। একে একভাবে ইন্টারনেট ব্যবহারের বিস্ফোরণ বলা যায়, যে বিস্ফোরণটা আমাদেরও প্রয়োজন।

আমাদের ইন্টারনেট সেবার ভোক্তারা মূলত শহরকেন্দ্রিক। মোবাইল অপারেটরগুলোর মোবাইল এবং কম্পিউটারে ইন্টারনেট সেবা প্রদানের কারণে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা বৃদ্ধি সম্ভব হয়েছে। এখন পর্যন্ত সুলভ ও সহজলভ্য যে প্রযুক্তিটি শহর-গ্রামের মানুষের হাতে হাতে দেখা যায় তা মুঠোফোন। শহরের বাইরে জীবনযাপন পদ্ধতির কারণে কম্পিউটারের ব্যবহার সীমিত। ইন্টারনেট ব্যবহারের অভ্যস্ততাও কম। যদিও শহরের বাইরে বাস করে ৭৬.৫ শতাংশ লোক। লক্ষণীয়, টেলিকমগুলো মোবাইল ইন্টারনেট সেবার প্রচারে টিভি বিজ্ঞাপনগুলোতে গ্রাম্য পটভূমি, গ্রাম্য জীবনযাত্রাকে প্রাধান্য দিচ্ছে। ইন্টারনেট প্যাকেজ সুবিধাজনক মূল্যেও পাওয়া যাচ্ছে। এরপরও গ্রামাঞ্চলের শিক্ষার হার একটি বিশেষ অন্তরায় ইন্টারনেট ব্যবহারের ক্ষেত্রে। মোবাইল ফোন মূলত কথাযন্ত্র হিসেবেই বহুল ব্যবহৃত হয় গ্রামাঞ্চলে। ইন্টারনেটে ওয়েবসাইট ব্রাউজিং ইংরেজিভিত্তিক বলে গ্রামের স্বল্পশিক্ষিত মানুষ তাতে অনাগ্রহী থাকে। তাই সরকারিভাবে ও বেসরকারিভাবে টেলিকম প্রতিষ্ঠানগুলোর মোবাইলের মাধ্যমে সহজে ইন্টারনেট ব্যবহার পদ্ধতির কর্মশালা আয়োজন করা প্রয়োজন। অনলাইন সংবাদপত্র, চাকরি বিজ্ঞপ্তির ওয়েবসাইট, সরকারি ওয়েবসাইট ইত্যাদি এখন বাংলায় পড়া যায়। গ্রামের ‘টার্গেট অডিয়েন্স’কে (যেমন_ শিক্ষক, ছাত্রছাত্রী, গ্রামের বড়-মাঝারি আড়তদার, কৃষক, কর্মজীবী গ্রাম্য নারী) এই ফিচারগুলোর ব্যবহার শিখিয়ে এর সুবিধার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়া সম্ভব।

সরকারি উদ্যোগে বিভিন্ন স্কুলে কম্পিউটার ল্যাব বসানো হলেও অভিযোগ রয়েছে, অধিকাংশ ল্যাবের অবস্থা বেহাল। এর কারণ প্রয়োজনীয় আর্থিক সহায়তা ও নিয়মমাফিক বণ্টনের অভাব। যদিও সরকার প্রযুক্তি খাত উন্নয়নে ১২ কোটি টাকার বাজেট প্রণয়ন করেছে, ডিজিটাল বাংলাদেশ গঠনে প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা এই বাজেটকে প্রয়োজনের তুলনায় যথেষ্ট অপ্রতুল মানছেন। সরকারি বাজেটের এই সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে উঠতে কম্পিউটার, ইন্টারনেটকে আরও স্বল্পমূল্য সেবার আওতায় আনা জরুরি। মালয়েশিয়ার সঙ্গে টেশিসের যৌথ উদ্যোগে বিশেষত স্কুল-কলেজের ছাত্রছাত্রীদের কাছে প্রযুক্তি পৌঁছে দিতে দশ হাজার টাকায় ল্যাপটপ (নেটবুক) বিতরণের জোর প্রস্তুতির কথা শোনা যাচ্ছে অনেকদিন হলো। ২০১০ সালের সেপ্টেম্বরে টেলিযোগাযোগমন্ত্রী ছয় মাসের মধ্যে এই নেটবুক বিতরণের কথা জানিয়েছিলেন। নেটবুকের কনফিগারেশন গ্রাফিক্সের কাজের জন্য খুব বেশি যুতসই না হলেও ইন্টারনেট ও পড়ালেখার কাজে এই নেটবুক সহায়ক হবে বলে জানান। জানা যায়, প্রতি মাসে ১০ হাজার নেটবুক সরবরাহ করার পরিকল্পনা রয়েছে। সঠিক ব্যবস্থাপনা হলে এই উদ্যোগ গ্রামের স্কুল-কলেজগুলোর শিক্ষক ও ছাত্রছাত্রীদের মাঝে কম্পিউটার চর্চা বাড়িয়ে তুলবে নিঃসন্দেহে। পাশাপাশি সুলভে ল্যাপটপ বাজারজাত করলে গ্রাম ও শহরতলিতে বেশিসংখ্যক কম্পিউটারভিত্তিক ছোট ছোট ব্যবসা প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠার সম্ভাবনা বৃদ্ধি পাবে।

স্বল্প খরচে দ্রুতগতিসম্পন্ন ইন্টারনেট সেবা প্রদান করতে পারলে সামগ্রিকভাবে আমাদের প্রযুক্তি-নির্ভরশীলতাকে বাড়িয়ে ই-যোগাযোগ ব্যবস্থায় বিপ্লব সাধন সম্ভব। তবে প্রতিবন্ধকতা রয়েছে। যেমন- ইন্টারনেট সেবার উচ্চমূল্য, বিদ্যুৎ সমস্যা, গ্রামে-প্রত্যন্ত এলাকায় ওয়্যারলেস ইন্টারনেট সুবিধা প্রদানে বিলম্ব, অভ্যন্তরীণ ফাইবার অপটিক অবকাঠামো তৈরিতে দীর্ঘসূত্রতা ইত্যাদি।

নেপালের একটি পাহাড়ি গ্রামে নিজ উদ্যোগে একজন শিক্ষক একশ’টি গ্রামের অধিবাসীকে ওয়াইফাই সুবিধার মধ্যে আনেন। মাইক্রোওয়েভ প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে উচ্চগতিসম্পন্ন তারবিহীন তথা ওয়্যারলেস ইন্টারনেট সেবা গ্রামাঞ্চলে পৌঁছে দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে অনেক দেশ। এর বড় সুবিধা হলো, ইন্সটলেশন খরচ তার অথবা ফাইবারের চেয়ে অনেক কম। একই সঙ্গে উচ্চগতিসম্পন্ন। নদীভিত্তিক ও পাহাড়ি এলাকায় মাইক্রোওয়েভ একটি অত্যাবশ্যকীয় প্রযুক্তি। আমাদের প্রযুক্তি এখন ধীরগতিতে থ্রিজি থেকে ফোরজির দিকে ধাবিত। হাই ও লো ফ্রিকোয়েন্সির মাইক্রোওয়েভ ফোরজিতে ব্যবহার করা যায়। দুটি টাওয়ারের মধ্যবর্তী ৩০ কিমি দূরত্ব পর্যন্ত মাইক্রোওয়েভ অনেক শক্তিশালী। এমনকি প্রত্যন্ত অঞ্চলে কাছাকাছি দূরত্বে টাওয়ার স্থাপন সম্ভব না হওয়ার কারণে ব্যবহৃত রিসিভার ও ট্রান্সমিটার মাধ্যমেও লো ফ্রিকোয়েন্সির মাইক্রোওয়েভ যথেস্ট শক্তিশালী।

ওয়্যারলেস ইন্টারনেট সুবিধা ব্যবহারকারীর মধ্যে যে মোবিলিটি তৈরি করে তা বস্তুত আমাদের প্রযুক্তিবান্ধবতা বাড়িয়ে তোলে। সামগ্রিকভাবে আমরা প্রযুক্তিবান্ধব হয়ে উঠলে স্বাস্থ্য, শিক্ষার মতো মৌলিক চাহিদাগুলোয় ই-সেবার আদান-প্রদান বেড়ে যাবে। বাংলাদেশে ই-গভর্নেন্স পদ্ধতি প্রয়োগ করতে সরকারকে তিনটি ক্ষেত্রে যোগাযোগে যে প্রযুক্তিবান্ধব সুবিধাগুলো দিতে হবে – ১. জনগণ এবং সরকারের মধ্যে ই-ফিডব্যাক বিনিময়; ২. ব্যবসায়িক ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডগুলো পরিচালনায় ই-ম্যানেজমেন্ট পদ্ধতি গ্রহণ; ৩. সরকারের অভ্যন্তরীণ দাফতরিক কাজের জন্য সেন্ট্রাল ডাটাবেজ এবং প্রশাসনিক কাজে ই-সার্ভিস প্রদান।

কর্মক্ষেত্রে পরিবেশবান্ধব ‘পেপারলেস’ কাজের চর্চা বাড়াতে বলছেন পরিবেশবিদরা। রাজধানীর ওপর জনসংখ্যা, ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান ও আবাসনের চাপ কমাতে সরকারের প্রতি নগর বিকেন্দ্রীকরণের পরামর্শ রয়েছে বিশেষজ্ঞদের। প্রযুক্তিনির্ভরশীলতা সময়ের এই চাহিদা পূরণে সক্ষম। রাজধানীর বাইরে ও গ্রামাঞ্চলে প্রযুক্তির ব্যাপ্তিতে ব্যবসায়িক, প্রাতিষ্ঠানিক, ব্যক্তিগত যোগাযোগ দ্রুততর হবে। এতে রাজধানীর বাইরেও আইটি আউটসোর্সিং ও অন্যান্য বড় প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে বিনিয়োগকারীদের উদ্বুদ্ধ করা যাবে। তাই শহর থেকে গ্রাম পর্যন্ত সর্বাধুনিক প্রযুক্তি সেবাকে পৌঁছে দিতে প্রয়োজনীয় সব রকমের পদক্ষেপ গ্রহণ জরুরি।

***
লেখাটি ১৭ই এপ্রিল ২০১১ তারিখে দৈনিক সমকাল পত্রিকায় প্রকাশিত।