ক্যাটেগরিঃ প্রশাসনিক

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালীন পটভূমির উপর চিত্রিত দ্য বয় ইন দ্য স্ট্রাইপড পাজামাস (The Boy in the Striped Pajamas, ২০০৮) চলচ্চিত্রটির অন্তিম দৃশ্যকে মানবিক বোধে ধারণ করা অস্বস্তিকর যন্ত্রণাময়। নাৎসী (Nazi) বাহিনীর অত্যাচার ক্যাম্পগুলোতে (মূলত মৃত্যুকূপ, যাকে বলা হত extermination camp) মৃত্যুকক্ষ হিসেবে ব্যবহৃত গ্যাস চেম্বারের ভারী দরজার আড়ালে চাপা পড়ে ইহুদীদের (Jews) মৃত্যু যন্ত্রনার বেদনার্ত চিৎকার এমনকি বাতাসে ছড়িয়ে পড়ারও সুযোগ পেতনা। ৮ বছরের ব্রুনো সমবয়সী ইহুদী বন্ধুর বাবাকে খুঁজতে নিজের পোশক বদলে বন্দিদের পোশাকে ক্যাম্পে প্রবেশ করে। ব্রুনো যতই ক্যাম্পের ভেতরে প্রবেশ করতে থাকে ততই তার কাছে প্রকট হয় বন্দীদের দুর্দশা, আর্তচিৎকার। দুর্ভাগ্যক্রমে ব্রুনো আর তার বন্ধুটি একটি দলের সাথে ভিড়ে যায়, যাদের নিয়ে যাওয়া হয় গোসলকক্ষ হিসেবে পরিচিত একটি বদ্ধ কক্ষে। ঘোষনা করা হয়, বন্দীরা যেন তাদের পরিধেয় খুলে ফেলে। বোকা বন্দীরা যখন প্রতীক্ষারতম গোসলের জন্য ঝরণা ধারার, তখন চলচ্চিত্রতে চোখ রাখা বাকরুদ্ধ অথর্ব দর্শক দেখতে পান একজন নাৎসী সৈনিক গোসলখানা হিসেবে পরিচিত গ্যাসচেম্বারের ছাদে গ্যাসচেম্বারের ফানেলে ঢেলে দেয় সায়ানাইড গুড়ো (হাইড্রোজেন সায়ানাইড, যা পানির সাথে মিশে প্রতিক্রিয়া করে, সাইক্লোন বি হিসেবেও পরিচিত এই রাসায়নিক পাউডার নাৎসি বাহিনী ব্যবহার করত ইহুদী নিধনে)। কক্ষের ভেতরে ব্রুনো তার বন্ধুটির হাতে হাত চেপে দাঁড়িয়েছিল, আর কক্ষের বাইরে নির্দেশ আসে ’ডেথ এক্সিকিউশন‘ এর … তারপর দর্শককে বিমূঢ় করে গ্যাস চেম্বার বন্ধ, ভারী দরজার উপর নিশ্চল হয়ে থাকে ক্যামেরার চোখ…।

মনে হবে এত সিনেমা, বাস্তব নয়! অথবা ভাবা যেতে পারে, এ হয়েছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ই, এমন হত্যাযজ্ঞ বর্তমান নয়। অথচ গত ২৪ নভেম্বর নিশ্চিন্তপুরের তাজরিন গার্মেন্টস এর শ্রমিকে এমনই এক মৃত্যুকুপে পুড়ে কয়লা হয়ে গেল! এবং তাদের দগ্ধ দেহাবশেষ জানান দিল, এই প্রথমবার নয়, এভাবে বহুবার পুড়ে পুড়ে ছাই হয়েছে গার্মেন্টেস এর বহু শ্রমিক বহুবার! টনক নড়েনি মালিকপক্ষের, টনক নড়েনি সরকারের। সময় সময় কেবল প্রকাশ হয়েছে শোক বার্তা। পত্রিকার পরিসংখ্যান মোতাবেক পোষাক শিল্পে দগ্ধ শ্রমিকের লাশের হিসেবেটা এরকম [সূত্র: দৈনিক কালের কণ্ঠ]-

দেশের পোশাক শিল্প কারখানায় অগি্নকাণ্ডে বছরে গড়ে ৪১ জন শ্রমিকের মৃত্যু হচ্ছে। ২০০০ সাল থেকে এ পর্যন্ত আগুনে পুড়ে কমপক্ষে ৪১৪ জন গার্মেন্টস শ্রমিক প্রাণ হারিয়েছেন। ১৯৯০ থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত আগুনে পুড়ে মারা গেছেন ৩৫০ জনেরও বেশি শ্রমিক। ৫০০-এর বেশি কারখানায় আগুনের ঘটনায় আহত হয়েছেন তিন হাজারেরও বেশি শ্রমিক।

যদি এ হিসেবটাকে নেহায়েত ’প্রাকৃতিক দুর্ঘটনা’ হিসেবে চালিয়ে দেয়া হয় তবে আরো কিছু দগ্ধ-শ্রমিকের ছাই কুড়িয়ে নেয়া যাক (সূত্র:দৈনিক কালের কণ্ঠ ) –

– ২০০৬ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি চট্টগ্রামের কেটিএস কম্পোজিট টেক্সটাইল মিলসে আগুন ধরলে ৯১ জন শ্রমিক পুড়ে মারা যায়
– একই বছরের মার্চ মাসে সায়েম ফ্যাশন লিমিটেড নামের এক গার্মেন্টসে অগ্নিকাণ্ডে তিন মহিলা শ্রমিক নিহত হয়
– ২০০৫ সালের ৭ জানুয়ারি নারায়ণগঞ্জের একটি গার্মেন্টস কারখানায় আগুনে ২২ শ্রমিকের মৃত্যু হয়
– ২০০৪ সালের ডিসেম্বরে নরসিংদীর শিবপুরে একটি গার্মেন্টস কারখানায় অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় ৪৮ শ্রমিক নিহত হয়
– ২০০৪ সালের ৩ মে মিসকো সুপার মার্কেট কমপ্লেক্সের এক গার্মেন্টসে আগুন ধরলে ৯ শ্রমিক মারা যায়
– ২০০১ সালের ৮ আগস্ট ঢাকার মিরপুরের মিকো সোয়েটার লিমিটেডে আগুন ধরার গুজবে পা-চাপা পড়ে নিহত হয় ২৪ গার্মেন্টস শ্রমিক
– উপরের ঘটনার সপ্তাহখানেক পূর্বে মিরপুরের কাফরুলে অগি্নকাণ্ডের ঘটনায় আরো ২৬ শ্রমিক মারা যায়
– ২০০০ সালের ২৫ নভেম্বর নরসিংদীর চৌধুরী নিটওয়্যার অ্যান্ড গার্মেন্টস লিমিটেডে আগুনে দগ্ধ হয়ে মারা যায় ৫৩ শ্রমিক
– ১৯৯৯ সালের আগস্টে গ্লোব নিটিং কারখানায় আগুনে মারা যান ১২ শ্রমিক

উপরের হিসেবের সাথে যুক্ত হয়েছে তাজরীন গার্মেন্টস এর আরো শতাধিক শ্রমিকের পোড়া লাশ। লাশের জন্য শোক হয়েছে, কিন্তু লাশের দায়ভার কোন কর্তৃপক্ষ নেয়নি। লাশের পরিবারের জন্য লাখ টাকা ধার্য হয়েছে, কিন্তু এরা পুড়ে মরল কেন, সেই কারণ প্রকাশ পায়নি! যদিও কারণ আমরা জানি! প্রতিবার একেকটা দুর্ঘটনায় সেই একই কারণ টেবিলের উপর বিছিয়ে টক-শো হয়, পত্রিকায় প্রতিবেদন হয়। দুর্ঘটনার কারণ নির্নয়ে বছরের পর বছর সেই একই চর্বিত চর্বন (সূত্র: দৈনিক কালের কণ্ঠ ) –

– আবাসিক ও বাণিজ্যিক ভবনে কারখানা তৈরি করা – দুর্ঘটনার সময় জরুরি অবতরণের জন্য পর্যাপ্ত বিকল্প সিঁড়ি না রাখা
– সিঁড়ির মুখে লোহার গেটে তালা লাগানো থাকায় অগ্নিকাণ্ডের সময় শ্রমিকদের বের হতে না পারা
– বস্তা, পোশাক ও আবর্জনা রেখে সিঁড়ির প্রবেশ পথ বন্ধ করে রাখা
– অগ্নিনির্বাপণের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা না থাকা
– বিকল্প সিঁড়ির অপর্যাপ্ততা
– কারখানায় পেট্রোলিয়াম জাতীয় রাসায়নিক পণ্য থাকা, যা আগুনের সংস্পর্শে এসে দাহ্য হয়ে অক্সিজেনের অভাব সৃষ্টি করে দ্রুত

এসবই জানা আছে আমাদের সবার। তথাপি কর্তৃপক্ষ কী করে সু ব্যবস্থাহীন পোষাক কারখানাগুলোকে টিকিয়ে রেখেছেন? পোশাক শিল্পে ২ হাজার কোটি ডলার আয় বাড়ার (সূত্র: দৈনিক জনকণ্ঠ, ৩০ নভেম্বর ২০১২) বিনিময়ে কতগুলো লাশের সমাধি রচিত হচ্ছে কারখানাগুলোতে সেই হিসেবে কে দেবে – কারখানার মালিক? বিজিএমইএ? নাকি সরকার?

বিজিএমইএ বলছে, শতভাগ কমপ্লায়েন্স ব্যবস্থাপনাসম্পন্ন ১ হাজার কারখানা রয়েছে। কিন্তু তবু দ্বিমত আছে। প্রশ্ন আছে। ভ্রুকুটি আছে। এখনো কেন তবে কারখানার ’কমপ্লায়েন্স’ প্রশ্নবিদ্ধ হয়? এখনো কেন তবে সরকারকে বলতে হয়, বহিরাগমনের সুব্যবস্থা না থাকলে কারখানা বন্ধ করে দেয়া হবে? ২৪ নভেম্বরে শতাধিক লাশ পোড়ার পূর্বে কি এই সব কারখানার ’কমপ্লায়েন্স’ ইস্যু বিবেচনাবোধের অন্তরালে ছিল? বারবার দায়িত্বহীনতাকে ক্ষমা করা যায় না, তখন আর দুর্ঘটনাকে নিছক দুর্ঘটনা বলা যায় না। মৃত্যুকে আর মৃত্যু বলা যায় না। তাই এ কথা সরবেই উচ্চারিত হচ্ছে, শ্রমিকের মৃত্যু ঘটছে না, শ্রমিকদের হত্যা করা হচ্ছে। এ প্রশ্ন মুখে মুখে ফিরছে শ্রমিকদের কেন বের হতে দেয়া হয়নি সময় মত? সন্দেহদানা বাঁধছে, হিসেবের বাইরে প্রকৃত লাশ সংখ্যা কত? আতংক জাগছে, তাজরিনের ডে-কেয়ার সেন্টারের শিশুগুলোর কী হল? দাবি উঠছে, তাজরীনের মালিকপক্ষ এখনো আইনের হাতে বন্দী নয় কেন?

শ্রমিকের দাবি নিয়ে, শ্রমিকের অধিকার নিয়ে, শ্রমিক হত্যার নিন্দা জানিয়ে রাজপথ উত্তপ্ত হয়ে উঠছে ইতিমধ্যে। গত শনিবার, ৮ ডিসেম্বর ২০১২ শাহবাগের জাতীয় জাদুঘরের সম্মুখে এমনি এক সমাবেশ হয়ে গেল। গণজাগরনি গানে, গগনবিদারী প্রতিবাদে মুখর ছিল শাহবাগ অঙ্গন। জাগরণের পাঠশালা, মার্কসবাদের প্রথমপাঠ, বিজ্ঞানচেতনা পরিষদ, প্রগতির পরিব্রাজক দল(প্রপদ), গণমুক্তির গানের দল, ল্যাম্পপোষ্ট, শহীদ রফিক স্মৃতি পাঠাগার, মঙ্গলধ্বনি এবং প্রগতিশীল ব্যক্তিবর্গের আহবানে আয়োজিত এই সমাবেশের কিছু উল্লেখযোগ্য স্থিরচিত্র –

সমাবেশস্থলে বেধে রাখা মাইকে ধ্বনিত হচ্ছিল বক্তাদের দাবি – শ্রমিকেরা করবেটা কী? জমায়েত হওয়া মানুষ আতংকিত হয়েছে আশুলিয়াতে ভেসে ওঠা শ্রমিকদের বেনামি লাশের কথা জেনে!

ব্লগার রাশেদুজ্জামানের পোস্ট থেকে জানা যায়, সরকার ও গণমাধ্যমগুলো ১৩০ জন শ্রমিক নিহত হয়েছে জানালেও স্থানীয় শ্রমিকদের দাবি অন্তত দেড় হাজার শ্রমিক নিহত হয়েছেন। জানা যায় যে, কারখানার মালিক কর্ণফুলী ইন্সিওরেন্স থেকে ক্ষতিপূরণের চেক গ্রহণ করতে যাচ্ছেন! এসব তথ্য আদতে কিসের ইঙ্গিত বহন করে?

লেবার ল, লেবার রাইটস এসব ভস্মিভূত! ’লেবার পেইন‘ প্রবল হয়ে উঠছে! বারবার আগুন লাগাকে অজ্ঞতার অজুহাত দেয়ার সুযোগ নেই। আগুন লাগা কারখানা থেকে শ্রমিককে বার না হতে দেয়ার এই অভিযোগ কোনভাবেই এড়ানো যাবে না। বরং এ অভিযোগই সত্য প্রমাণিত হওয়ার পথে যে, এসব আদতে স্বার্থবাদীচক্রের উদ্দেশ্য প্রনোদিত হত্যাযজ্ঞ- সিসটেমেটিক কিলিং। আমাদের শ্রমিকেরা কারখানায় নয়, বন্দি হয়ে আছে extermination camp -এ!