ক্যাটেগরিঃ স্বাধিকার চেতনা

 

পটভূমিকা:

১৯৬৯ এর গণঅভ্যুত্থান স্বৈরশাসক প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খানের মসনদ গুড়িয়ে দিল। সে বছর ২৫ মার্চ আইয়ুব খান ক্ষমতা থেকে সরে দাঁড়াতে বাধ্য হলেন এবং শাসনভার হস্তান্তরিত হল আগা মোহাম্মদ ইয়াহিয়া খানের হাতে। প্রধান সামরিক শাসক হিসেবে ইয়াহিয়া সামরিক শাসন পুনরায় জারি করেন। ৩১শে মার্চ ইয়াহিয়া খান প্রেসিডেট পদে আসীন হন। এরপর সংবিধান স্থগিত করা হয়। সংসদ ভেঙ্গে দেয়া হয়। ’এক ব্যক্তি, এক ভোট‘ (one man, one vote) এই আহবানের জানিয়ে ইয়াহিয়া উন্মুক্ত নির্বাচনের ঘোষনা দেন।

১৯৭০ এর মার্চের শেষে ইয়াহিয়া খান অন্তর্বর্তী সংবিধান জারি করেন। এই বছর ৭ ডিসেম্বর প্রথমবারের মত পাকিস্তানে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। পূর্ব পাকিস্তানের ১৬২ আসনের মধ্যে আওয়ামী লীগ ১৬০ আসনে প্রাধান্য লাভ করে, যা জাতীয় অধিবেশনের ৩১৩টি আসনের মধ্যে আওয়ামী লীগকে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা এনে দেয়।

নির্বাচনের ফলাফলের ভিত্তিতে শেখ মুজিবকে অধিবেশনের প্রধান করা ছিল বৈধ পন্থা। কিন্তু শেখ মুজিবের ছয় দফার কারণে পশ্চিম পাকিস্তানের সামরিক হম্বিতম্বি খর্ব হবে বিধায় শুরু হল গড়িমসি।

সামরিক ষড়যন্ত্র ও ফুঁসে ওঠা মার্চে বাংলাদেশ:

১৩ ফেব্রুয়ারি ১৯৭১। পেশোয়ারে এক ককটেল পার্টিতে ভুট্টো বলেন,

আমিই হবু প্রধানমন্ত্রী

১৫ ফেব্রুয়ারি ১৯৭১। পেশোয়ারে এক সাংবাদিক সম্মেলনে ভুট্টো হুমকি প্রদান করেন,

পশ্চিম পাকিস্তান থেকে কোন সদস্য পরিষদে যোগদানের চেষ্টা করলে পা ভেঙ্গে দেয়া হবে

২১ ফেব্রুয়ারি ১৯৭১। ইয়াহিয়া খান সাধারণ পরিষদ বাতিল ঘোষণা করেন। জান্তা বাহিনী পুরো প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণ ভার নেয়।

২২ ফেব্রুয়ারি ১৯৭১। পশ্চিম পাকিস্তানে শীর্ষ পর্যায় থেকে সিদ্ধান্ত বিধৃত হয় আওয়ামি লীগ ও এর সমর্থকদের নিশ্চিহ্ন করে দেয়া হবে।

১ মার্চ ১৯৭১। শেখ মুজিবর রহমানের সাথে আলোচনা না করেই ইয়াহিয়া খান জাতীয় পরিষদের অধিবেশন অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত ঘোষনা করেন। বাঙালিদের ক্ষোভের বহি:প্রকাশ সেদিন রাজপথে দেখা গিয়েছিল। স্বাধীনতা আর জয় বাংলা স্লোগানে রাজপথে বাঁশের লাঠি হাতে নেমে এসেছিল ক্রুদ্ধ জনতা। জনতার মনে বাংলাদেশের জন্ম সেদিন থেকেই।

শেখ মুজিবের ডাকে প্রতিদিন ২টা পর্যন্ত হরতাল পালিত হতে শুরু হল। পশ্চিম পাকিস্তানের স্বৈরাচারী প্রশাসনকে সার্বিক অসহযোগিতা শুরু হলো। ক্ষমতা ভার গ্রহণ না করেও শেখ মুজিব বস্তুত যেন দেশ শাসন করছিলেন তখন। অফিস-আদালত বন্ধ হলো। সড়ক যোগাযোগ স্থবির হল। পাকিস্তান সেনাবাহিনীকে খাদ্য সরবরাহ বন্ধ হলো। শেখ মুজিব রেডিও ও টেলিভিশন কেন্দ্রগুলোতে বাংলা দেশাত্মবোধক গান প্রচারের নির্দেশ দিলেন এবং পাকিস্তানী জাতীয় সংগীতের পরিবর্তে বাংলা দেশাত্মবোধক গান প্রচারিত হতে লাগল।

হত্যাযজ্ঞের প্রস্তুতি:

ইয়াহিয়া কুটিল রাজনীতির পথে হাঁটতে বদ্ধপরিকর ছিলেন। প্রয়োজনে পশ্চিম পাকিস্তানে রক্তের বন্যা বইয়ে দিতেও তার আপত্তি ছিল না বলে ইয়াহিয়া কণ্ঠে হীন উক্তি উচ্চারিত হয়-

Kill 3 million of them and the rest will eat out of our hands

তাদের ৩০ লক্ষ লোক হত্যা কর আর বাকিরা আমাদের হাতের অন্ন খাবে।

মার্চে পরিস্থিতি যখন ইয়াহিয়া খানের নিয়ন্ত্রণের বাইরে সে সময় বাঙালি বধে ঢাকায় আনা হলো বেলুচিস্তানের কসাই খ্যাত লে: জেনারেল টিক্কা খানকে। ৩রা মার্চ তার দায়িত্বভার গ্রহণের পর পূর্ব পাকিস্তানের সামরিক আইন প্রশাসক লে. জেনারেল সাহেবজাদা ইয়াকুব ঢাকা ত্যাগ করেন। বাঙালিদের উপর ইয়াহিয়া বাহিনী কী বিভৎস আক্রমণ করতে যাচ্ছে, এ সম্পর্কে তিনি ওয়াকেবহাল ছিলেন বলে ধারনা করা হয়। সম্ভবত তিনি পূর্ব পাকিস্তানের সাধারণ জনগনের উপর আক্রমনের পক্ষপাতি ছিলেন না বলেই তাকে দায়িত্ব থেকে অব্যহতি দেয়া হয়। বিপরীতে টিক্কা খান গণবিদ্রোহ নিয়ন্ত্রণে যে কোন পন্থা অবলম্বনে প্রেসিডেন্টে ইয়াহিয়া খানের মতই হিংস্রতার পরিচয় দিতে উৎসাহি ছিলেন। টিক্কা খান প্রেসিডেন্টকে বলেন,

আমাকে আরো ক্ষমতা দিন, আমি ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে ওদেরকে ঠান্ডা করে দেব।

ইয়াহিয়া খান আক্রমণের সার্বিক প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন নিশ্চিতভাবেই।

১। ২২ ফেব্রুয়ারি ১৯৭১ এ পাকিস্তান সশস্ত্র বাহিনীর এক বৈঠকে গৃহীত প্রস্তাবনার ভিত্তিতে মার্চের শুরুতে ১৪তম ডিভিশনের জিওসি মেজর জেনারেল খাদিম হুসাইন রাজা এবং মেজর জেনারেল রাও ফরমান আলি বাঙালি হত্যাযজ্ঞের বর্বরোচিত অধ্যায় অপারেশন সার্চ লাইটের মূল পরিকল্পনা তৈরি করেন

২। পিআইএ বোয়িং ও পাকিস্তান বিমান বাহিনীর সি-১৩০ বিমানগুলো নিয়মিতভাবে সাজ সরঞ্জামসহ যোদ্ধাদের বহন করছিল

৩। দূরবর্তী জেলাগুলো থেকে ট্যাং নিয়ে আসা হয় শহরে

৪। পূর্ব পাকিস্তান রাইফেল বাহিনী ও বাঙালি রেজিমেন্টে থাকা বাঙালিদের আলাদা করে ফেলা হয় ও অস্ত্রহীন করা হয়

৫। এমভি সোয়াত নামের একটি জাহাজে অপারেশনের বড় চালান খালাসের অপেক্ষায় ছিল। ৩রা মার্চ জাহাজটি চট্টগ্রামে পৌঁছে। ক্যাপ্টেন রফিকুল ইসলামের অধীনে ন্যস্ত সৈনিকরা এম. ভি. সোয়াত জাহাজ থেকে অস্ত্র খালাসের পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে। (এই অংশে মেজর জিয়াউর রহমানের ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ)।

৬। ভারতের সাথে উত্তেজনাকর সম্পর্কের অজুহাতে সর্বত্র সেনাবাহিনী জোরদার জারি থাকে।

৭। করাচি বিমান বন্দরের হজ্জ টার্মিনালটি সামরিক বাহিনীর অতিক্রমণ পথ হিসেবে ব্যবহৃত হতে থাকে। ২রা মার্চ থেকে ২৪শে মার্চের মধ্যে পাকিস্তান আন্তর্জাতিক বিমান সংস্থার বাণিজ্যিক ফ্লাইট সিংহল থেকে ঢাকায় (৬০০০ মাইল দূরত্ব) ১২০০০ সেনার আগমন ঘটে

হত্যাযজ্ঞের প্রস্তুতি যখন চলছিল, তখন ইয়াহিয়া এক নাটকীয় প্রহসন করে বসেন। ২৫শে মার্চ পরিষদের অধিবেশনের নতুন তারিখ ধার্য করা হয়। আলোচনার নামে কালক্ষেপণ করে, আলোচনার অসফলতার দোহাই দিয়ে পরিকল্পনা মাফিক তড়িঘড়ি করে কড়া প্রহরায় বিমান যোগে ঢাকা ত্যাগ করেন ইয়াহিয়া। ইয়াহিয়া খানের করাচি অবতরণের পর ইস্টার্ন কমান্ড হেডকোয়ার্টাস থেকে নির্দেশ বার্তা পাঠানো হল –

’Sort them out’ অর্থ্যাৎ বাছাই কর এবং খতম কর বাঙালিদের।

শুরু হল ২৫ মার্চের সেই ভয়াল কালো রাত্রি।

ইন্টেলেকচুয়্যাল মার্ডার – বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ড:

পাক-বাহিনী এবং তাদের দোসর রাজাকার, আল-বদর, আল-শামস কর্তৃক সংগঠিত তালিকাভুক্ত বুদ্ধিজীবীদের হত্যাযজ্ঞের স্মরণে বাঙালি জাতি সশ্রদ্ধ চিত্তে সেই ১৯৭২ সাল থেকে ১৪ই ডিসেম্বরে শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস পালন করে আসছে । বাংলাদেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী, মরহুম তাজউদ্দিন আহমেদ, ১৪ই ডিসেম্বরকে শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস ঘোষনা করেছিলেন কারণ, অপহরণ ও পরে নির্বিচারে হত্যা এই ১৪ই ডিসেম্বরেই অর্থ্যাৎ পাক-বাহিনীর আত্মসমর্পন এবং বাঙালির বিজয় অর্জন তথা বিজয় দিবসের ঠিক দু’দিন পূর্বে, সংগঠিত হয়েছিল সবচেয়ে বেশী।

২০শে ডিসেম্বর ১৯৭১ –এ, মুজিবনগর সরকারের এক মুখপাত্র জানান, ১৬ই ডিসেম্বরে আত্মসমর্পনের পূর্বে পাক-বাহিনী এবং তাদের সহযোগীরা মিলে ৩৬০ জন বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করে । ১৯৯৪ সালে পুণ:মুদ্রিত বাংলা একাডেমী কর্তৃক প্রকাশিত শহীদ বুদ্ধিজীবী সম্পর্কিত তথ্যকোষ ”শহীদ বুদ্ধিজীবী কোষগ্রন্থ” এ শহীদ বুদ্ধিজীবীদের সংখ্যা ২৩২ জন উল্লেখ আছে এবং এই তালিকাটি সর্বমোট নয় এমনকি সম্পূর্ণ নয় ।

এই তথ্যকোষে শহীদ আখ্যায়িত হয়েছেন তারা যাদের পাক-বাহিনী এবং দোসরেরা (রাজাকার, আল-বদর, আল-শামস) বিভিন্ন সময় নির্বিচারে হত্যা করেছিল এবং যারা ২৫শে মার্চ ১৯৭১ থেকে ৩১শে জানুয়ারী ১৯৭২ সময়কাল থেকে নিঁখোজ । লেখক, বিজ্ঞানী, চিত্রশিল্পী, সংগীত শিল্পী, শিক্ষক, গবেষক, সাংবাদিক, উকিল, চিকিৎসক, স্থপতি, ভাস্কর, সরকারি-বেসরকারি কর্মী, নাট্য-কর্মী, জনসেবায় নিয়োজিত কর্মীদের বুদ্ধিজীবী হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে। ১৯৭২ সালে সরকার কর্তৃক প্রকাশিত ”বাংলাদেশ” নামক প্রামাণ্য চিত্রে বলা হয়, স্বাধীনতা যুদ্ধ চলাকালীন সময়ে ৬৩৭ জন প্রাইমারি স্কুল শিক্ষক, ২৭০ জন সেকেন্ডারি স্কুলশিক্ষক এবং ৫৯ জন কলেজ-শিক্ষককে হত্যা করা হয়।

এ ব্যাপারটি পরিষ্কার ছিল যে, পরাজয় সন্নিকটে জেনে, পাক-বাহিনী এবং তার দোসরেরা বুদ্ধিজীবী নিধনের পরিকল্পনা গ্রহণ করে এবং শিক্ষক, সাংবাদিক এবং বিভিন্ন পেশাজীবীর মানুষদের ঘর থেকে ধরে নিয়ে আসে এবং একজনের পর একজনকে হত্যা করে এবং তা বেশীর ভাগই সংগঠিত হয় এই ১৪ই ডিসেম্বরে। এই হত্যাযজ্ঞ পরিকল্পনার উদ্দেশ্য ছিল মূলত জাতি হিসেবে আমাদের মেধাহীন, পঙ্গু করে দেয়া।

দৈনিক পত্রিকাগুলো নিখোঁজ বুদ্ধিজীবীদের নিয়ে ডিসেম্বরের দ্বিতীয় এবং চতুর্থ সপ্তাহে প্রতিবেদন প্রকাশ করে। গোপন তথ্যসূত্রের ভিত্তিতে, ১৮ই ডিসেম্বরে একদল সাংবাদিক ঢাকার পশ্চিমে, রায়ের বাজার এলাকায় পচনশীল, ক্ষত-বিক্ষত লাশের একটি গণ-কবরের সন্ধান লাভ করে। জাতির মেধাবী ব্যক্তিবর্গের দেহগুলো অত্যাচারের সুস্পষ্ট চিহ্ন নিয়ে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে, একে-অন্যের নীচে চাপা পড়ে ছিল । লালমাটিয়ায় শারীরিক প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে সাংবাদিকরা একটি বন্দীশালা আবিস্কার করে, যা ছিল রাজাকার, আল-বদর, আল-শামসদের প্রশিক্ষণ কেন্দ্র।

ঢাকা ইউনিভার্সিটির শিক্ষক আবুল কালাম আজাদ এবং কামালউদ্দিন, চিকিৎসক ফজলে রাব্বী, আব্দুল আলিম চৌধুরী, আবুল খায়ের এবং সাংবাদিক মুহাম্মদ আখতার – পচনশীল লাশগুলো পরিবার কর্তৃক সনাক্ত করা হয় সেদিনই । সাংবাদিক সেলিনা পারভিন এর লাশ সনাক্ত করা হয় পরের দিন। ঢাকা বিশ্ব বিদ্যালয়ের শিক্ষক সন্তোষ চন্দ্র ভট্টাচার্য, সিরাজুল হক, ফাইজুল মহি এবং চিকিৎসক গোলাম মুর্তোজা, আজহারুল হক, হুমায়ুন কবীর ও মনসুর আলী’র লাশ পরবর্তীতে চিহ্নিত করা হয়। লাশ শনাক্তকরণের সময় শহীদ বুদ্ধিজীবীদের পরিবারের সদস্যদের অনেকেই সংজ্ঞাহীন হয়ে পড়ছিলেন।

এরকম আরো বধ্যভূমি ছিল মিরপুর এবং রায়ের বাজার এলাকায়, তেঁজগাঁও এর কৃষি বর্ধিতকরণ বিভাগের প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, মহাখালীর টি.বি. হাসপাতাল সহ সারাদেশের বিভিন্ন জায়গায়। অনেক লাশই পরবর্তীতে শনাক্তকরণের পর্যায়ে ছিলনা । এসময় সংবাদপত্রগুলো নিখোঁজ বুদ্ধিজীবীদের (নভেম্বরের শেষের দিকে এবং ডিসেম্বরের মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত অপহরণ অথবা গ্রেফতারকৃত) নিয়ে নিয়মিত প্রতিবেদন প্রকাশ করছিল।

পাক-বাহিনী এদেশের তরুণ ছেলে-মেয়েদেরকে হত্যা করা শুরু করেছিল সেই ২৫শে মার্চের সময় থেকেই। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছিল তাদের প্রথম লক্ষ্য এবং অনেক প্রফেসরদের হত্যা করা হয় । মূলত যুদ্ধের পুরো নয় মাস জুড়েই চলে বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ড। এমনকি পাক-বাহিনীর দোসরদের (রাজাকার, আল-বদর, আল-শামস) দ্বারা এই হত্যাকাণ্ড সংগঠিত হয় ১৯৭২ এর জানুয়ারিতেও।

চলচ্চিত্রকার জহির রায়হান তার অপহরণ কৃত ভাই শহিদুল্লাহ কায়সারকে (পাক-বাহিনীরা তাকেও হত্যা করেছিল বলে ধারনা করা হয়) খুঁজতে গিয়ে নিখোঁজ হয়ে যান। তাকে শেষ দেখা যায় মিরপুরে বিহারী ও পাক-বাহিনীর দোসরদের ক্যাম্পে। পরবর্তীতে তার সম্পর্কে আর কোন খোঁজ পাওয়া যায়নি। ডা: মনসুর আলীকে ২১শে ডিসেম্বর এবং সাংবাদিক গোলাম রহমানকে ১১ই জানুয়ারী হত্যা করা হয়।

মফিজউদ্দিনের (লাশ বহনকারী বাহনের চালক) স্বীকারোক্তি অনুযায়ী আশরাফুজ্জামান খান, ইসলামি ছাত্র সংস্থার কেন্দ্রীয় কমিটির সাবেক সদস্য এবং পাকিস্তান রেডিও’র সাবেক কর্মী, নিজ হাতে সাত জন শিক্ষককে গুলি করেন। মফিজউদ্দনের স্বীকারোক্তি অনুযায়ী এমন দূর্ভাগ্যজনক ভাবে মৃত্যুবরণকারী শিক্ষকদের লাশ উদ্ধার করা হয় রায়ের বাজার বধ্যভূমি এবং মিরপুরের শিয়াল বাড়ির গণ কবর থেকে। তার ডায়রিতে ২০ জন শিক্ষক সহ আরো অনেক বাঙালির তালিকা ছিল। তার ডায়রিতে ঢাকা বিশ্ব বিদ্যালয়ের ১৬ জন শিক্ষকের নাম ছিল যারা পাক-বাহিনীকে সহযোগীতা করেছিল।

বুদ্ধিজীবী হত্যা পরিকল্পনায় পাক-বাহিনীর ব্রিগেডিয়ার কাসেম এবং ক্যাপ্টেন কাইয়ুম ছিল মূল হোতা । নভেম্বর মাসের কোন এক সময় তারা মওলানা আব্দুল মান্নানের বাসগৃহে মাদ্রাসা শিক্ষক সংঘের প্রেসিডেন্ট সহকারে বৈঠক করে। এই আলোচনাতেই সম্ভবত বুদ্ধিজীবীদের হত্যার মূল পরিকল্পনা করা হয়।

[দ্রষ্টব্য: ক্যাপ্টেন কাইয়ুম সম্পর্কে খুঁজতে গিয়ে একজন সম্পর্কে তথ্য পেলাম ইন্টারনেটে…২০০৪ -এ তিন তারকা বিশিষ্ট জেনারেল হিসেবে অবসর নেন, পরে তাকে পাকিস্তান স্টীল বোর্ডের চেয়্যারম্যান করা হয় এবং একসময় সেখান থেকে তাকে পদত্যাগ করতে হয় …পরবর্তীতে অন্য কোন সংস্থার চেয়্যারম্যান হিসেবে কাজ করেন…আমি ব্যক্তিগতভাবে এখনও পুরোপুরি নিশ্চিত নই এই কাইয়ুম -ই সেই কাইয়ুম কিনা]

শহীদ বুদ্ধিজীবীদের তালিকা

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকবৃন্দ

* এ.এন.এম. মুনির চৌধুরী
* ডা: জি.সি. দেব
* মুফাজ্জাল হায়দার চৌধুরী
* আনোয়ার পাশা
* জ্যোতির্ময় গুহ ঠাকুর
* আব্দুল মুক্তাদীর
* এস.এম. রাশিদুল হাসান
* ডা: এ.এন.এম ফাইজুল মাহি
* ফজলুর রহমান খান
* এ.এন.এম মনিরুজ্জামান
* ডা: সেরাজুল হক খান
* ডা: শাহাদাত আলী
* ডা: এম.এ. খায়ের
* এ.আর. খান কাদিম
* মোহাম্মদ সাদিক
* শারাফত আলী
* গিয়াসউদ্দিন আহমেদ
* আনন্দ পবন

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকবৃন্দ

* প্রফেসর কাইয়ূম
* হাবিবুর রহমান
* শ্রী সুখ রঞ্জন সমদ্দার

এম.সি.এ

* মশিউর রহমান
* আমজাদ হোসেন
* আমিনুদ্দিন
* নাজমুল হক সরকার
* আব্দুল হক
* সৈয়দ আনোয়ার আলী
* এ.কে. সর্দার

সাংবাদিক

* সিরাজুদ্দিন হোসেন
* শহীদুল্লাহ কায়সার
* খন্দকার আবু তালেব
* নিজামুদ্দিন আহমেদ
* এ.এন.এম. গোলাম মোস্তফা
* শহীদ সাবের
* সরকার আব্দুল মান্নান (লাদু)
* নাজমুল হক
* এম. আখতার
* আব্দুল বাশার
* চিশতী হেলালুর রহমান
* শিবসাধন চক্রবর্তী
* সেলিনা আখতার

চিকিৎসক

* মো: ফজলে রাব্বী
* আব্দুল আলীম চৌধুরী
* সামসুদ্দিন আহমেদ
* আজহারুল কবীর
* সোলায়মান খান
* কায়সার উদ্দিন
* মনসুর আলী
* গোলাম মর্তোজা
* হাফেজ উদ্দিন খান জাহাঙ্গীর
* আব্দুল জব্বার
* এস.কে. লাল
* হেম চন্দ্র বসাক
* কাজী ওবায়দুল হক
* আল-হাজ্ব মমতাজউদ্দিন
* ঘাশিময় হাযরা
* নড়েন ঘোষ
* জিকরুল হক
* শামসুল হক
* এম. ওহমান
* এ. গফুর
* মনসুর আলী
* এস.কে সেন
* মফিজউদ্দিন
* আমূল কুমার চক্রবর্তী
* আতিকুর রহমান
* গোলাম সারওয়ার
* এর.সি. দাস
* মিহির কুমার সেন
* সালেহ আহমেদ
* অনীল কুমার সিনহা
* গুনীল চন্দ্র শর্মা
* এ.কে.এম. গোলাম মোস্তফা
* মাকবুল আহমেদ
* এনামুল হক
* এনসুর (কানু)
* আশরাফ আলী তালুকদার
* লেফ: জিয়াউর রহমান
* লেফ.ক. জাহাঙ্গীর
* বাদল আলম
* লেফ: ক. হাই
* মেজর রেজাউর রহমান
* মেজর নাজমুল ইসলাম
* আসাদুল হক
* নাজির উদ্দিন
* লেফ: নুরুল ইসলাম
* কাজল ভাদ্র
* মনসুর উদ্দিন

শিক্ষাবিদ

* জহির রায়হান
* পূর্নেন্দু দস্তিদর
* ফেরদৌস দৌলা
* ইন্দু সাহা
* মেহেরুন্নিসা

শিল্পী ও পেশাজীবী

আলতাফ মাহমুদ
দানবীর রানাদা প্রসাদ সাহা
জোগেষ চন্দ্র ঘোষ
ধীরেন্দ্র নাথ দত্ত
সামসুজ্জামান
মাহবুব আহমেদ
খুরশিদ আলম
নজরুল ইসলাম
মাহফুজুল হক চৌধুরী
মহসিন আলী
মুজিবুল হক

[দ্রষ্টব্য: ১৫ ই জানুয়ারি, ২০০৯ বিকাল ৪:০৮, ব্লগার কালপুরুষ জানিয়েছিলেন , এই হত্যাকাণ্ড ছিল পূর্ব পরিকল্পিত। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের মহান শহীদদের লিস্টে ড: জোহা (ড: সামসুজ্জোহা) স্যারের নাম দেখলাম না। তিনিও পাকবাহিনীর হাতে শহীদ হন।]

নারী নির্যাতন:

মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে গেলে চোখে পড়বে পাক বাহিনী কর্তৃক নারীর সাথে ঘৃণিত আচরণের উপরোক্ত বিকারগ্রস্ত নমুনা। ২ থেকে ৪ লাখ নারী নির্যাতিত, হত্যা হয়েছে পাকবাহিনী ও তার দোসরদের দ্বারা। যাদের বীরাঙ্গনা উপাধিতে সম্মানিত করা হয় [বীরাঙ্গনা দিবস]। নারীদের উপর নির্যাতনের কিছু তথ্য ও চিত্র – ১৯৭১: বীরাঙ্গনা অধ্যায়

প্রপাগান্ডা- লাশ রাজনীতি:

স্বাধীনতা পরবর্তীকালে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা নিয়ে স্বাধীনতা বিরোধী শক্তি কর্তৃক আজ অব্দি যত ধরনের অপপ্রচার চালিত হয়েছে তার মধ্যে একটি উল্লেখযোগ্য হলো ৯ মাসের যুদ্ধে শহীদের প্রকৃত সংখ্যা। ৩০ লাখ শহীদের পরিসংখ্যানকে প্রশ্নবিদ্ধ করার চক্রান্ত, ধৃষ্টতা নানা ভাবে দেখানো হয়েছে। বাংলা ব্লগগুলোতে স্বাধীনতা বিরোধী চক্রের সমর্থকদের ইনিয়ে-বিনিয়ে শহীদ সংখ্যা ৩০ হাজার প্রচার করে যুদ্ধাপরাধের পাপ লঘু করার চেষ্টা করতে দেখা গেছে। এসব মগজ ধোলাইকৃত ব্লগার যারা জামাত-শিবিরের ’পেইড ব্লগার’ হিসেবে পরিচিত, তাদের যুক্তি-তর্ক, তথ্য-উপাত্ত প্রদানের বুদ্ধিবৃত্তিক ক্ষমতা সীমিত। কিন্তু আজকাল আমরা জানতে পেরেছি, তথ্য বিভ্রান্তি ও ইতিহাস বিকৃতির চুড়ান্ত রূপ দিতে ৭১ নিয়ে বিস্তর গবেষণাও চলছে। বলতে গেলে বেশ একটা চমকই আমাদের দিতে পেরেছেন শর্মীলা বোস। শর্মীলা বোস লাশের সংখ্যার বিভিন্ন তথ্য-উপাত্তকে অস্বীকার করেছেন। হাজার লাশকে শতকে নামিয়ে এনেছেন। ৩০ লাখ লাশের হিসেবকে অগ্রণযোগ্য জানিয়ে তার গুনতিতে ৫০ হাজার থেকে ১ লাখ নিহত সংখ্যা ধার্য করেছেন।

অতি সম্প্রতি মুক্তিযুদ্ধে নিহতদের সঠিক সংখ্যা বিতর্কে যোগ দিয়েছেন এলডিপি সভাপতি অলি আহমদ। তিনি ৩০ লাখ শহীদ সংখ্যাকে অবান্তর বলে উড়িয়ে দিয়ে নিহতের সংখ্যা বড়জোর ৩০ হাজারের মধ্যে রাখতে আগ্রহী। [সূত্র: বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম]

বিগত কয়েক বছরের স্মৃতি থেকে যতটুকু মনে পড়ে, যুদ্ধাপরাধীদের সমর্থক ব্লগারদের অনেকে (পাতি রাজাকার গোষ্ঠি) অতি উৎসাহি হয়ে এও বলেছেন, ৭১ সাথে ৩০ লাখ জনসংখ্যাই ছিল না! এক নজরে মুক্তিযুদ্ধে শহীদ সংখ্যা নিয়ে বিভ্রান্তি সৃষ্টির উদ্দেশ্যে বিতর্ক –

১। শহীদ সংখ্যা মূলত ৩ লাখ
২। শহীদ সংখ্যা প্রকৃত পক্ষে ৩০ হাজার
৩। ১৯৭১ সালে জনসংখ্যাই ৩০ লাখ ছিল না
৪। ৩০ লাখের শহীদের কথাটা কোন সভায় বক্তৃতাকালে মুখ ফসকে কেউ বলেছিলেন, এবং সেটাই প্রচলিত হয়ে যায়
৫। বঙ্গবন্ধু ৩০ লাখ শহীদের কথা বলেননি, বলেছিলেন ’মিলিয়ন মিলিয়নস’

যারা বলেন, ৭১ –এ জনসংখ্যা ৩০ লাখ হত কিনা সন্দেহ, তারা সস্তা কথন এড়িয়ে ইতিহাসের পাতা উল্টিয়ে দেখলে পাবেন, ১৯৭১ সালে জনসংখ্যা ৭ থেকে সাড়ে ৭ কোটি ছিল। এন্থনি মাসকারেনহাস এর দ্য রেইপ অফ বাংলাদেশ গ্রন্থে পশ্চিম পাকিস্তান কর্তৃক পূর্ব পাকিস্তানে উপনিবেশিক রাজত্ব কায়েম প্রসঙ্গে বলতে গিয়ে এক পর্যায়ে পূর্ব পাকিস্তানের জনসংখ্যার পরিসংখ্যান দিয়েছিলেন এভাবে [পৃষ্ঠা ৪০],

পূর্ব পাকিস্তানের জনসংখ্যা ১৯৪৯-৫০ সালে ৪১ মিলিয়ন থেকে বেড়ে ১৯৫৯-৬০ সালে ৫৩ মিলিয়নে গিয়ে দাঁড়ায় এবং ১৯৬৯-৭০ সালে জনসংখ্যা গিয়ে দাঁড়ায় ৬৯ মিলিয়নে।

১৯৭১ সালের লাশ সংখ্যাকে প্রত্যাহবান জানিয়ে অপ্রপ্রচারকারী, পাকিস্তানি তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করে গবেষণাকারী ও সভায় বিবৃতি প্রদানকারীদের নিকট প্রশ্ন –

১। ৩০ হাজার বাঙালি নিধনে ইয়াহিয়া তার জান্তা বাহিনীকে এত বড় আকারে প্রস্তুত কেন করছিলেন?
২। এমভি সোয়াত থেকে রসদ খালাস হয়নি বলেই কি ৩০ লাখ মৃতের সংখ্যা অবিশ্বাস্য ঠেকছে?
৩। ২ থেকে ২৪ মার্চের মধ্যে যে ১২০০০ সৈন্য ঢাকায় আনা হয়েছিল তাদের হত্যা দক্ষতা কি কেবল ৩০ হাজার থেকে ৩ লাখের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল?

গণহত্যা- জেনোসাইড:

Raphael Lemkin কর্তৃক জেনোসাইড শব্দটি প্রথম ব্যবহৃত হয় ১৯৪৩/১৯৪৪ সালে। genos, যা সম্প্রদায়, মানবগোষ্ঠি (race, people) অর্থবহন করে এবং cide, যা হত্যাকার্যকে (to kill) নির্দেশ করে। [সূত্র: , ]

শান্তিপরিস্থিতি বিদ্যমানকালীন হোক, অথবা যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতেই হোক, আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী, জেনোসাইড একটি অপরাধ। একটি সম্প্রদায়, গোত্র, ধর্মগোষ্ঠির উপর সম্পূর্ণরূপে অথবা আংশিকভাবে ধংসাত্মক কার্যকলাপ, যেমন- হত্যা, শারীরিক-মানসিক ক্ষতিসাধন, জন্মরহিতকরণ, জোরপূর্বক গোত্র/ধর্মান্তর করণ পরিচালনা জেনোসাইড।

Genocide means any of the following acts committed with intent to destroy, in whole or in part, a national, ethical, racial or religious group as such: killing members of the group, causing serious bodily or mental harm to members of the group, deliberately inflicting on the group conditions of life calculated to bring about its physical destruction in whole or in part, imposing measures intended to prevent births within the group, forcible transferring children of the group to another group.

সূত্র: United Nations Convention on Genocide, 1948

জেনোসাইড দায় তাদের সকলের উপরের বর্তায় এবং তারা সকলেই শাস্তিযোগ্য যারা গণহত্যার পরিকল্পনাকারী এবং গণহত্যার নির্দেশনা প্রদানকারী, পরিচালনাকারী।

Genocide is not a wild beast or a natural disaster. It is mass murder deliberately planned and carried out by individuals, all of whom are responsible whether they made the plan, gave the order or carried out the killings.

সূত্র: http://www.ppu.org.uk

লাশ গুনে নিন:

এ লেখাটি ৩০ লাখ শহীদের হিসেবের যোগফল মেলানোর জন্য নয়, তবে হত্যাযজ্ঞের যে বিভৎস চিত্র ৭১’এর পরতে পরতে লেগে আছে তার সামান্য কিছু তথ্য-উপাত্ত তুলে ধরাটাই উদ্দেশ্য। যাদের সন্দেহ হয়, তারা লাশের স্তুপ থেকে লাশ সরিয়ে লাশ গুনে নিক।

***
২৫শে মার্চের রাতের পরিকল্পিত হত্যাযজ্ঞ চালনার প্রস্তুতি হিসেবে ১৯ মার্চ ঢাকার ২২ মাইল দূরে জয়দেবপূরে অর্ডন্যান্স কারখানা পাহারারত পূর্ব পাকিস্তান রাইফেল বাহিনীর একটি দলকে নিরস্ত্রকরণে আসে পশ্চিম পাকিস্তানি সামরিক জান্তা। এতে স্থানীয় জনগনের সাথে জান্তা বাহিনীর সংঘর্ষ হয়। ইয়াহিয়া সরকারের হিসেব মতে সাধরণ জনগনের নিহতের সংখ্যা ২ জন্য এবং আহতের সংখ্যা ৫ জন। আওয়ামী লীগের হিসেব মতে সেনাবাহিনীর গোলাগুলিতে নিহতের সংখ্যা ছিল মূলত ১২০ জন।

***
২৫ মার্চ ১৯৭১। মধ্য রাতের পর। পাকিস্তানী সাঁজোয়া বাহিনী পিলখানায় পূর্ব-পাকিস্তান রাইফেল বাহিনী ও রাজারবাগ পুলিশের প্রধান কার্যালয় আক্রমণ করে। অপ্রস্তুত ৫০০০ হাজার বাঙালি নির্বিচারে মারা পড়েছিল।

***
বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ও শিক্ষকদের আবাস হলগুলোতে আক্রমণ চালানো হয়। নিহত হয় শত শত। ইকবার হল ও হিন্দু ছাত্রাবাস জগন্নাথ হল কয়েক মিনিটের টানা গুলি বর্ষণে ছাত্রদের হত্যা করা হয় এবং হত্যার পর হলের বাইরে মাটি খুঁড়ে কিছু লাশ চাপা দেয়া হয়, কিছু পচনের জন্য ফেলে রাখা হয় ছাদে।

***
শাঁখারি পট্টি, তাঁতিবাজার, রেসকোর্স ময়দানে দু’টো মন্দিরের আশেপাশের হিন্দুদের উপর আক্রমণ চালিয়ে ৮০০০ হাজার নারী-পুরুষ-শিশু হত্যা করা হয়েছিল।

***
২৬ মার্চ ১৯৭১। সান্ধ্য আইন ভঙ্গের দায়ে কয়েকশ লোককে গুলি করে হত্যা করা হয়।

***
৩ আগস্ট ১৯৭১। পত্রিকার শিরোনাম ছিল – “70 anti-state elements killed in Mymensingh”, সংবাদ থেকে জানা যায় রাজাকার কর্তৃক ময়মনসিংহ, শেরপুরে আক্রমনে হতাহতের সংখ্যাও ছিল অনেক।

***
বিচ্ছিন্নতাবাদী কিংবা ভারতীয় দালাল নামকরণে রাজাকার কর্তৃক হত্যাযজ্ঞ জারি থাকে। ৮ আগস্ট ১৯৭১ এর প্রতিবেদন থেকে খুলনায় এক সংঘর্ষে ৮ এবং অপর এক সংঘর্ষে ৪ জন বিচ্ছিন্নতাবাদী রাজাকার বাহিনী দ্বারা হত্যার কথা জানা যায়। ১২ আগস্ট এর প্রতিবেদনে রাজাকার বাহিনী দ্বারা আরো ২৫ জন ’ভারতীয় দালাল’ হত্যার সংবাদ প্রকাশিত হয়।

***
৪ সেপ্টেম্বর ১৯৭১। পত্রিকার শিরোনাম –বুড়িচংয়ে ৬ ভারতীয় দালাল হত্যা (six Indian agent killed in Burichang)।

***
৪ সেপ্টেম্বর ১৯৭১। পত্রিকার শিরোনাম –বুড়িচংয়ে ৬ ভারতীয় দালাল হত্যা।

***
নভেম্বর ১৯৭১। পত্রিকার শিরোনাম –রাজাকার কর্তৃক ১৯ ভারতীয় দালাল বধ (razakars kill 19 indian agent)।

***
নভেম্বর ১৯৭১। পত্রিকার শিরোনাম – রাজাকার কর্তৃক ৭ ভারতীয় দালাল বধ (seven indian agents killed by razakars)।

***
নভেম্বর ১৯৭১। পত্রিকার শিরোনাম – রাজাকার কর্তৃক ৫ ভারতীয় দালাল বধ (five indian agents killed by razakars)।

***
মোসা. জোবেদা খাতুন, ২ শহীদ মুক্তিযোদ্ধার জননী। এক ছেলে মিজানুর রহমান মিজু, অপর জন ওবায়দুর রহমান ওযু। ওযুকে ১৯৭১ সালের ১ এপ্রিল সৈয়দপুর সেনানিবাসে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী নির্মমভাবে হত্যা করে। মিজুকে ১৯৭১ সালের ১ ডিসেম্বর ঘোড়াশালে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী গুলি করে হত্যা করে। [দৈনিক প্রথম আলো]


[ছবি: দৈনিক ইত্তেফাক]

***
ঠাঁকুরগাঁওয়ের ইসলামনগর মহল্লা। পাক আর্মির তালিকাভুক্ত ৭ জনকে ২৪ মে ট্রাকে করে নিয়ে যাওয়া হয় টাঙ্গন নদীর পুরোনো ব্রিজের কাছে এক বধ্যভূমিতে। সেখানে আরো ৮ জনের সাথে, যাদের ধরে আনা হয়েছিল বালিয়াডাঙ্গি থেকে, ওই ৭ জনকে গুলি করে হত্যা করা হয়। তারপর মাটি চাপা দেয়া হয়। [http://ctg-news.blogspot.com, শনিবার, ১০ ডিসেম্বর, ২০১১]

”ঠাকুরগাঁওয়ে ‘৭১-এ নির্মম গণহত্যার শিকার ৭ মানুষ” শীর্ষক প্রতিবেদনটি দৈনিক করতোয়া পত্রিকাতে প্রকাশিত হয়েছে ২৯ মার্চ ২০১২

***
ব্লগার ত্রিশোংকু’র স্মৃতিচারণমূলক গ্রন্থ ’উনসত্তর থেকে পঁচাত্তর ‘ প্রকাশিত হয়েছে অমর একুশে বইমেলা ২০১১ -তে। বইটির ১৪৭ পৃষ্ঠায় তিনি লিখেছেন –

পাহাড়তলী আর জাফরাবাদের মাঝে পাকিস্তান বাজার বলে একটা ছোট মহাসড়কের ওপর। ওখানে এক জনপ্রিয় হোটেলে অনেক জন খাওয়াদাওয়া করছিল। পাকিস্তানি সেনা বাহিনীর একটা জিপ হোটেলটা অতিক্রমকালে হোটেল থেকে চিৎকার ভেসে আসে “ফাকিসতাইন্যা চুদানী ফুয়া”। গালিটি শুনতে পায় জিপের পাকিরা। ‘৬৯ থেকে এদেশে থাকতে থাকতে চিটাগাংয়ের এসব গালির অর্থ তারা বুঝতো। গাড়ি থেকে নেমে হোটেলে ঢুকে পরে তাদের সবাই।

মিনিট দু’য়েকের মধ্যে আহাররত সবাই ও দোকানের কর্মচারীদের হত্যা করে(একটা বয় ছিল ৭/৮ বছরের) অত্যন্ত খোশ মেজামে গাড়িতে উঠে রওয়ানা দেয় (নভেম্বরে ফৌজদারহাটে কর্মরত এক পাকি প্রত্যক্ষদর্শী থেকে শোনা)।

বইয়ের পৃষ্ঠা ১৭৮ থেকে –

ফয়েজ লেকে ঢোকার রাস্তা দিয়ে এগিয়ে ডানে ছিল টিলার মত একটা জায়গা। পুরো জায়গাটা স্যাণ্ডেল, জুতো, পরিধেয় বস্ত্র, টুপি ইত্যাদি দিয়ে ছড়ানো। রাস্তা থেকে নেমে একটা ঢাল বেয়ে যেতে হয় গুহার মত একটা জায়গায়।

প্রথমেই চোখ পড়ল মাঝারি সাইজের একটা ছুরি গুহার মুখে ডান পাশে পড়ে আছে। ছুরির আগা থেকে বাঁট পর্যন্ত কালচে রক্ত জমাট বেঁধে আছে। … … গুহাটার ভেতর আলো ছিল কম। চোখ সয়ে আসতেই চারিদিকে তাকালাম। ছোট্ট একজোড়া স্পঞ্জের স্যান্ডেল। আমার সবচেয়ে ছোট তিন বছরের বোনটির পায়েও লাগবে না। কয়েকটা ওড়না, দু’চারটি বোরকা ইতস্তত ছড়ান। গুহার এক কোনে চোখ গেল। মানুষের জটলা থেকে দূরে, গোলচে সাদা মত কি যেন। প্রথমে ভেবেছিলাম পাথর হবে। পরে কি মনে করে যেন কাছে গেলাম। অতি ক্ষুদ্র একটা মাথার খুলি। চামড়া ফেটে হাড্ডির সাথে লেগে আছে। …

গুহার বাইরে এসে নরম রোদে চোখ অভ্যস্ত হতেই দেখলাম অদূরে হাজার লোকের ভীড়। মানুষের দেয়াল গলে এগিয়ে গেলাম। একটা ছড়া। স্বচ্ছ পানি বয়ে চলছে। ছড়ার অপর পাড়টি উঁচু। বহমান পানির ধার থেকে দেড় মানুষ সমান উঁচু, ৫০-৬০ জন লোক পাশাপাশি দাঁড়ালে যতটুকু জায়গা লাগবে ততটুকু চওড়া একটি স্থানে থরে থরে সাজানো মানুষের খুলি। … … জবাই করেই ক্ষান্ত হয়নি তারা, ধড় থেকে মুণ্ডুটি আলাদা করেছে, তারপর সাজিয়ে রেখেছে।

পৃষ্ঠা ১৭৯ থেকে –

ফয়েজ লেক থেকে আমরা গেলাম শেরশাহ কলোনীতে। কলোনীর প্রতিটি ইমারত সারির পেছনে পয়: ট্যাংক লাইন ধরে। লোকে লোকারণ্য। সবাই উত্তেজিত। চোখে মুখে চরম জিঘাংসার অভিব্যক্তি। ভিড় ঠেলে অনেক কষ্টে পৌঁছুলাম ট্যাংকের ধারে। ট্যাংকের ঢাকনি খোলা। উঁকি দিলেই দেখা যাচ্ছে মানুষের হাত, পা, ধড়। কালচে হয়ে আসা একটি অতি ছোট শিশুর শরীর দেখতে পেলাম। হাঁটু ভাঁজ করা তার পায়ের পাতাটি ঠিক আমার দিকে ফেরানো।

শের শাহ কলোনীর ঐ পয়ঃ ট্যাংকগুলোতে কত শত হতভাগ্য নিরীহ মানুষের লাশ যে ছিল, ধারনার মধ্যে আনতে পারিনি। তবে আন্দাজ করছি, একটা রেলগাড়িতে কত শত লোক থাকতে পারে।
লাশগুলো ছিল ঝাউতলা থেকে আসা ট্রেনের মানুষদের।

***
দৈনিক করতোয়ার ২৯ মার্চ ২০১২ সংখ্যায় করতোয়া ডেস্ক রিপোর্ট শিরোনাম ছিল – আজ কাহালু, নন্দীগ্রাম, আক্কেলপুর, লালপুর, উল্লাপাড়া ও আটোয়ারী হানাদারমুক্ত দিবস

লোকালয় হত্যাযজ্ঞের বিবরণ
কাহালু (বগুড়া) পাকসেনারা বিনা উস্কানিতে উপজেলার জয়তুল, নশীরপাড়া, গিরাইল, লক্ষ্মীপুর, মুরইল, ডোমরগ্রাম ও কাহালু সদর এলাকার অনেক নিরীহ মানুষকে হত্যা করা ছাড়াও মানুষের বাড়িঘর আগুন দিয়ে পুড়ে দিয়েছে।
নন্দীগ্রাম (বগুড়া) কিছু মুক্তিযোদ্ধাকে পাকসেনা ও তাদের দোসররা ধরে নিয়ে গিয়ে তাদের গুলি করে হত্যা করে। তারা হলো চাকলমা গ্রামের আকরাম হোসেন, বাদলাশন গ্রামের আব্দুল ওহেদ, রুস্তমপুর গ্রামের মহিউদ্দিন (মরুমন্ডল), ভাটরা গ্রামের আব্দুর সোবাহান, নন্দীগ্রামের মোফাজ্জল হোসেন, হাটকড়ই গ্রামের ছমিরউদ্দিন ও তার দুই পুত্র আব্দুর রাজ্জাক ও আব্দুর রশিদ।
আক্কেলপুর (জয়পুরহাট) বেয়নেট চার্জ করে কিশোর মুক্তিযোদ্ধা ফজলুল করিমকে নির্মমভাবে হত্যা করে কুঠিবাড়ি ঘাটে তুলসীগঙ্গা নদীতে তাঁর মরদেহ ফেলে দেয় হানাদার বাহিনী। এছাড়া হিলি সীমান্তে অক্টোবর মাসে হাস্তাবসন্তপুরের ইউনুছ আলী, নূর নগর গ্রামের সামছুউদ্দিন, ভাটকুরীর আজাহার, চিয়ারীগ্রামের আইন উদ্দিন, তিলকপুরের রফিকুল ইসলাম এবং বামনী গ্রামের তোজাম্মেল শহীদ হন। আক্কেলপুরের অদূরে রোয়ার গ্রামে পাশে মাঠ দিয়ে যাওয়ার সময় স্বাধীনতা বিরোধী চক্র খোকনকে ধরে পাক সেনাদের হাতে তুলে দেয়। পাক সেনারা স্থানীয় মাদ্রাসা ক্যাম্প হতে পাশেই সি,এন্ড,বি রাস্তার ধারে রেয়নেটের আঘাতে নির্মমভাবে হত্যা করে।
লালপুর (নাটোর) ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে রাজশাহীর ২৫ নম্বর পাঞ্জাব রেজিমেন্টের অধিনায়ক কর্নেল বালুচ এবং টুওয়াইসি মেজর রাজা আসলামের নেতৃত্বে পাকবাহিনীর বর্বরতায় শহীদ হন লালপুরের এমএনএ নাজমুল হক সরকার, অবাঙ্গালী হাফিজ সাত্তার, এড: বীরেন সরকার, শিল্প ব্যাংকের ম্যানেজার সাইদুর রহমানসহ আরও অনেক সাধারণ জনগণ।

১৭ এপ্রিল দুয়ারিয়া ইউনিয়নের রামকান্তপুর গ্রামে পাকবাহিনী হত্যাযজ্ঞ চালিয়ে ১৮ জনকে হত্যা করে।

৩০ মার্চ ময়নায় সম্মুখ যুদ্ধে মুক্তি সেনারা হানাদারদের ২৫ নং রেজিমেন্ট ধ্বংস করে দেয়। সেদিন প্রায় ৮০ জন মুক্তিযোদ্ধা শহীদ ও ৩২ জন আহত হন। ওই দিনই পাক সেনাদের ছোঁড়া একটি সেলের আঘাতে চামটিয়া গ্রামে ৩ জন শহীদ হন।

১২ এপ্রিল ধানাইদহ ব্রিজের নিকট প্রতিরোধ যুদ্ধে ১০/১২ জন শহীদ হন। নাটোর জেলার যে কয়েকটি স্থানে পাক হানাদাররা নৃশংস হত্যাযজ্ঞ চালায়, তার মধ্যে নর্থ বেঙ্গল সুগার মিলের গণহত্যা ছিল সবচেয়ে নির্মম ও হৃদয় বিদারক।

৫ মে পাক হানাদার বাহিনী সমস্ত চিনিকল এলাকা ঘেরাও করে মিলের তৎকালীন প্রসাশক লেঃ আনোয়ারুল আজিমসহ কর্মরত প্রায় অর্ধশত শ্রমিক, কর্মচারী ও কর্মকর্তাকে চিনিকলের অফির্সাস কলোনীর পুকুর পাড়ে দাঁড় করিয়ে ব্রাশ ফায়ারে হত্যা করে। ওইদিনই গোপালপুর বাজারে ৭ জন এবং গোপালপুর-লালপুর রাস্তায় আরও ৫ জন টমটম আরোহীকে গুলি করে হত্যা করে।

২৯ মে খান সেনাদের একটি দল চংধুপইল এর পয়তারপাড়া গ্রামে নদীর পাড়ে ধরে এনে ৫০ জনেরও অধিক নিরীহ লোকজনকে গুলি করে হত্যা করে।

২৫ জুলাই গোপালপুর থেকে ধরে এনে ২২ জনকে লালপুর নীলকুঠির নিকটে হত্যা করা হয় এবং ২৬ জুলাই একই স্থানে ৪ জনকে জীবন্ত কবর দেওয়া হয়।

২০ জুলাই রামকৃষ্ণপুর গ্রামে অগি্নসংযোগ ও ৫ জনকে হত্যা করে।

৩০ জুলাই বিলমাড়িয়া হাট ঘেরাও করে বেপরোয়া গুলিবর্ষণ করে ৫০ জনেরও অধিক লোককে হত্যা করে।

৮ ডিসেম্বর পাঞ্জাব পুলিশ ও খানসেনারা থানা ত্যাগ করে। ৯ তারিখে অধিকাংশ রাজাকাররা থানা ত্যাগ করে।

১০ই ডিসেম্বর মুক্তিবাহিনী থানা দখল করে। জনতা সেদিন উল্লাসে মেতে উঠে। কিন্তু হঠাৎ ১৩ ডিসেম্বর বর্বর খান সেনারা ঝটিকা আক্রমণ করে মহেশপুর গ্রামে ৩৬ জনকে হত্যা করে পালিয়ে যায়।

আটোয়ারী (পঞ্চগড়) পাক সেনারা এলাকার কতিপয় চিহ্নিত রাজাকারের সহযোগিতায় উপজেলার রাধানগর গ্রামে হামলা চালায়। সেখানে আলোয়াখোয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ডাঃ হাফিজের পুত্র আহসান হাবীব, জামাতা খাদেমুল ইসলামসহ একই গ্রামের আলী আহসান ও ছুটু পাইকার নিহত হন।

***
২৫ মার্চকে আন্তর্জাতিক গণহত্যা দিবস হিসেবে ঘোষনার দাবিতে নিউইয়র্কে বিশেষ কর্মসূচী পালন করা হয়েছে। আয়োজক সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল ক্যাম্পেইন এগেইনস্ট জেনোসাইড এন্ড ওয়ার ক্রাইমস এর প্রধান ও বাকসুর সাবেক জিএস ড. প্রদীপ রঞ্জন কর বলেন,

একাত্তরের ২৫ মার্চ রাতে অর্ধ লক্ষাধিক এবং এরপরের ৯ মাসে দৈনিক গড়ে ১১ সহস্রাধিক বাঙালিকে হত্যা এবং ৯ মাসে দু’লাখ মা-বোনের সম্ভ্রমহানীসহ এক কোটি মানুষকে দেশান্তরী করার বিস্তারিত তথ্য সাধারণ আমেরিকানদের অজানাই ছিল।

***
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম নিউজ সাইটে বদ্ধভূমি ও গণকবরের ইতিহাস নিয়ে প্রকাশিত হয়েছে ’বদ্ধভূমির গদ্য’। ৩৯৪ পৃষ্ঠার এই ই-বুকের পাতায় পাতায় রয়েছে পাক বাহিনী ও তাদের দোসরদের নৃশংসতার চিত্র।

বদ্ধভূমি হত্যাযজ্ঞের বিবরণ
কক্সবাজার জেলা
বাহারছড়া বধ্যভূমি বর্তমান স্মৃতিস্তম্ভের কাছে অসংখ্য মুক্তিযোদ্ধা, সাধারণ মানুষ ও নারীদের গুলি করা হতো। উদ্ধারকৃত অধিংকাশ লাশই নারীর হিসেবে চিন্হিত হয়। মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের তথ্যসূত্র মতে রেস্ট হাউজে ৭টি লাশ পাওয়া যায়, তন্মধ্যে ২টি ছিল গলাকাটা। রেস্ট হাউজের সামনের কূপে ১১টি নরকঙ্কাল পাওয়া যায়।
টেকনাফ বধ্যভূমি অধ্যাপক মাহবুবুল হকের তথ্যমতে যুদ্ধশেষে এই বদ্ধভূমি থেকে ১১৫ জন মানুষের হাড় ও মাথার খুলি উদ্ধার করা হয়। অন্য আরেক সূত্র থেকে জানা যায়, সেনানিবাসের সামনের কবর থেকে ৭৭টি কঙ্কাল পাওয়া যায়।
মহেশখালীর বধ্যভূমি ৩টি বদ্ধভূমি রয়েছে, যেখানে নারী ও পুরুষদের ধরে নিয়ে হত্যা করা হতো নির্মমভাবে।
অন্যান্য বধ্যভূমি বেশ কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধা হত্যাকাণ্ডের স্মৃতিচিহ্ন আর নেই। মধ্যম নুনিয়া ছড়া ফিসারি ঘাট এলাকায় ৬ জন মুক্তিযোদ্ধাকে হত্যা করা হয়।
কিশোরগঞ্জ জেলা
বড়ইতলায় ১৩ই অক্টোবর গ্রামের ৩৬৫ জনকে হত্যা করা হয়। আহত হয় দেড় শতাধিক।
হোসেনপুরে কুঁড়িঘাট বদ্ধভূমি ১৬ আগস্ট রাতে রাজাকারদের সহায়তায় ১৫০ জন নারী-পুরুষকে হত্যা করা হয়, যার অধিকাংশ ছিল হিন্দুধর্মাবলম্বী।
ইটনা বয়রা বদ্ধভূমি বিশেষত হাওর অঞ্চলের হিন্দু পরিবারগুলোকে নিশ্চিহ্ন করে দেয়া হয়। গুলি করা হত। জ্যান্ত পুঁতে ফেলাও হত। রাজাকার, আল বদরদের সহায়তায় সংগঠিত হত এসব।
শোলমারা বদ্ধভূমি আগস্টের কোন একদিন এক সাথে হত্যা করা হয় ১০ জনকে। মুক্তিযুদ্ধের ৯ মাসে শোলমারা সেতুতে চলে আরো অনেক হত্যাকাণ্ড। অনেক লাশ ভেসে যায়। অনেক লাশ কুকুর-শেয়াল খেয়ে, মাছে খেয়ে নষ্ট করে। ৯টি অজ্ঞাত শহীদের লাশ উদ্ধার করে গণকবর দেয়া হয়।
পানাউল্লাহচর-আলগরা বদ্ধভূমি ১৪ই এপ্রিল ৫ শতাধিক (মতান্তরে ছয়শ/সাতশ) নারী-পুরুষকে ব্রাশফায়ারে হত্যা করা হয়।
কুমিল্লা জেলা
ময়নামতি সেনানিবাসের বধ্যভূমি কুমিল্লা সেনানিবাসে ২৫ মার্চের পর চলে নারকীয় হত্যাকাণ্ড। সেনানিবাসের জুতো মেরামতকারী মনসুর আলী একটি গর্তে ২৪ জনকে মাটি চাপা দেয়ার তথ্য দেন। এরকম আরো অসংখ্য গর্তে মাটি চাপা দেয়া হয়েছিল কয়েক হাজার লাশ। সেনানিবাসের ব্রিগেড মসজিদের উত্তর পাশে গণসমাধি আবিষ্কৃত হয় ১৯৭২ সালের ১১ জুন, যেখানে প্রায় ৫০০ লাশ পাওয়া যায়।
লাকসাম সিগারেট কারখানা বধ্যভূমি এলাকাবাসীর কাছে এই স্থান হত্যাপুরী নামে পরিচিত। ট্রেন থেকে ও গ্রামে হানা দিয়ে যাত্রী, যুবক-যুবতীদের ধরে এনে অত্যাচার, ধর্ষণ, গণহত্যা করা হত।
বেলতলির বধ্যভূমি হত্যা করে মাটিয়ে পুঁতে রাখা হয়। অসংখ্য হাড়-কঙ্কাল উদ্ধার করা হয় পরবর্তীতে।
ধনাঞ্জয়ের খন্দকারবাড়ির হত্যাযজ্ঞ ১১ সেপ্টেম্বর এখানে চলে নারকীয় তাণ্ডব। ঘরের দরজা ভেঙ্গে ঢুকে এলোপাতারি গুলি ছুঁড়ে পাকসেনারা মেরে ফেলে ২৬ জনকে। বাড়ির বিভিন্ন অংশে গুলি চালিয়ে আরো ১০ জনকে হত্যা করা হয়।
মুদাফফরগঞ্জের নগরীপাড়ার গণকবর পাকসেনারা রাজাকারদের সহায়তায় ১০ জন পুরুষকে বট গাছের সাথে বেঁধে সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করিয়ে গুলি করে হত্যা করে।
হোমনার বদ্ধভূমি জুলাইয়ের দিকে ১০ জনকে, আগস্টের মাঝামাঝিতে ১০/১৫ জনকে, সেপ্টেম্বরে ২৫/৩০ জন নারী-পুরুষ-শিশুকে ধরে এনে হত্যা করে অথবা জীবদ্দশাতেই মাটি চাপা দেয়া হয়।
রসুলপুর ও দিশাবন্দের বদ্ধভূমি নিরীহ বাঙালিদের ধরে এনে তাদের দ্বারা কবর খুঁড়িয়ে, কবরে নামিয়ে ব্রাশফায়ার করা হত। এভাবে ২০০০ জনকে হত্যা করা হয়।
হাড়াতলি গণকবর পাকিস্তনি সেনাদের সাথে যুদ্ধে ৫ জন মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হন।
নারায়ণপুর গণকবর ৬ জন মুক্তিযোদ্ধা ১৮ সেপ্টেম্বর সম্মুখযুদ্ধে শহীদ হন।
হাড়ং গণকবর ১৮ জন মুক্তিযোদ্ধাকে গণকবর দেয়া হয়।
বেতিয়ারা গণকবর ১১ নভেম্বর পাক বাহিনীর সাথে যুদ্ধে শহীদ হন ৯ মুক্তিযোদ্ধা।
কুড়িগ্রাম জেলা
কারারক্ষীর বদ্ধভূমি ১৯৭১ সালের ৭ এপ্রিল। পাকবাহিনী কুড়িগ্রাম কারাগার থেকে কারাগার ইনচার্জ ও ৫ কারারক্ষীকে ধরে এনে বিকাল ৫টায় রাস্তার পূর্বদিকে কৃষ্ণচূড়া গাছের নিচে সারিবদ্ধ ভাবে দাঁড় করিয়ে ৬ জনকে গুলি করে। গুলিবিদ্ধ কারারক্ষী আব্দুল জলিল ভাগ্যক্রমে বেঁচে যান। ৫টি লাশ উদ্ধার করে কারাগারের পাশে বড় গর্ত খুঁড়ে কাফন ছাড়া দাফন হয়।
সার্কিট হাউজ বদ্ধভূমি পলাশবাড়ি থেকে ১৪/১৫ জনকে ধরে এনে নির্যাতন শেষে হত্যা করা হয়
ফুড অফিস বদ্ধভূমি ৭ এপ্রিল কুড়িগ্রাম শহরে পাকসেনারা গণহত্যা চালায়
হাতিয়ার দাগারকুটি বদ্ধভূমি ১৯৭১ সালের ১৩ নভেম্বর পাকসেনারা কুড়িগ্রামের উলিপুর উপজেলার হাতিয়া ইউনিয়সের দাগারকুটি এলাকায় তাণ্ডব চালিয়ে ৬৯৭ জন নারী-পুরুষ-শিশুতে খালের পাড়ে জড়ো করে কাউকে গুলি করে এবং কাউকে পুড়িয়ে হত্যা করে। মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর সংগৃহিত তথ্যে বলা হয়ে, পাকবাহিনী ৭৬৪ জনকে হত্যা করে। প্রত্যক্ষদর্শী অনন্তপুরের তাহফেল মিয়া জানান, অন্তত ৪০০ লোককে গুলি করে হত্যা করতে দেখেছেন।
হাতিয়ার দাগারকুটি বদ্ধভূমি ১৯৭১ সালের ১৩ নভেম্বর পাকসেনারা কুড়িগ্রামের উলিপুর উপজেলার হাতিয়া ইউনিয়সের দাগারকুটি এলাকায় তাণ্ডব চালিয়ে ৬৯৭ জন নারী-পুরুষ-শিশুতে খালের পাড়ে জড়ো করে কাউকে গুলি করে এবং কাউকে পুড়িয়ে হত্যা করে। মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর সংগৃহিত তথ্যে বলা হয়ে, পাকবাহিনী ৭৬৪ জনকে হত্যা করে। প্রত্যক্ষদর্শী অনন্তপুরের তাহফেল মিয়া জানান, অন্তত ৪০০ লোককে গুলি করে হত্যা করতে দেখেছেন।
কুষ্টিয়া জেলা
খাগড়াছড়ি জেলা
খুলনা জেলা
গাজীপুর জেলা
গাইবান্ধা জেলা
গোপালগঞ্জ জেলা
চট্টগ্রাম জেলা
চাঁদপুর জেলা
চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা
চুয়াডাঙ্গা জেলা
জয়পুরহাট জেলা
জামালপুর জেলা
ঝালকাঠী জেলা
ঝিনাইদহ জেলা
টাঙ্গাইল জেলা
ঠাকুরগাঁও জেলা
ঢাকা জেলা
রাজারবাগ পুলিশ লাইন বদ্ধভূমি বদ্ধভূমি ১৯৭১ সালে ২৫ মার্চ প্রায় ২০০০ পুলিশ সদস্যকে হত্যা করা হয়। যুদ্ধকালীন সময়েও এখানে পুলিশ ও নারী নির্যাতন করা হয়।
রোকেয়া হল গণকবর ২৫ মার্চ রাতে রোকেয়া হলে অবস্থানরত চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারী ও তার পরিবারপরিজনসহ মোট ৪৬জনকে হত্যা করা হয়।
জগন্নাথ হল বদ্ধভূমি ২৫-২৬ মার্চ জগন্নাথ হলের ৩ জন শিক্ষক, ৩৪ জন ছাত্র, ৪ জন কর্মচারীকে হত্যা করে বিরাট গর্তে লাশ পুঁতে ফেলা হয়। এরপর বুলডোজার দিয়ে মাটি চাপা দেয়া হল।
রমনা কালীবাড়ি বদ্ধভূমি ২৭ মার্চ রমনা কালীবাড়িতে ৫০-৬০ জনকে গুলি করে হত্যা করা হয়।২৯ মার্চ বাঙালি ইপিআর অফিসার ক্যাপ্টেন আজাদ সহ ২০ জন ইপিআর সদস্যকে হত্যা করা হয়।
দিনাজপুর জেলা
নওগাঁ জেলা
নড়াইল জেলা
নরসিংদী জেলা
নাটোর জেলা
নারায়ণগঞ্জ জেলা
নীলফামারী জেলা
নেত্রকোনা জেলা
নোয়াখালী জেলা
পঞ্চগড় জেলা
পটুয়াখালী জেলা
পাবনা জেলা
পিরোজপুর জেলা
ফরিদপুর জেলা
ফেনী জেলা
বগুড়া জেলা
বরগুনা জেলা
বরিশাল জেলা
বাগেরহাট জেলা
বান্দরবান জেলা
ব্রাক্ষ্মণবাড়িয়া জেলা
ভোলা জেলা
ময়মনসিংহ জেলা
মাগুরা জেলা
মাদারীপুর জেলা
মানিকগঞ্জ জেলা
মুন্সীগঞ্জ জেলা
মেহেরপুর জেলা
মৌলভীবাজার জেলা
যশোর জেলা

“একাত্তরে মা-বোনদের সম্ভ্রম নষ্টকারী, হত্যাকারী সেইসব ঘৃণিত যুদ্ধাপরাধীদের বিচার চাই”

যাদের সন্দেহ হয়
তারা বদ্ধভূমি খুঁড়ে হাড় গুনে নিক আজ
যাদের সন্দেহ হয়
তারা গণকবরের শ্লীনতাহানি করে
খড়খড়ে খুলি গুনে নিক আজ
আমার গুনতিতে ভুলচুক ঘটেছিল কিছু
সেদিন আমার চোখে অশ্রু ছিল
সেদিন আমার দৃষ্টি ঝাপসা ছিল
লাশের স্তুপ পেরিয়ে
লাশ গুনে নিতে পারিনি আমি
গলিত লাশের বহর থেকে
লাশ গুনে নিতে পারিনি আমি
আমার আঙ্গুল অসাড় ছিল
আমার হৃদয়ে স্বজন হারানো ক্ষত ছিল
আমি ভারসাম্যহীন ছিলাম
আমি উম্মাদপ্রায় ছিলাম
রক্তের নদী ডিঙাতে পারিনি বলে
তাই ভুল হলে হতে পারে আমারো…
পঁচা লাশের গুনতিতে…!
তোমরা গুনে নাও একে একে
অস্থি-মজ্জা সহ
রক্ত কণিকা সহ
ছিন্ন ভিন্ন উদর
বেয়নেটে বিক্ষত পাঁজর
সব জুড়ে জুড়ে জলজ্যান্ত লাশ গুণে নাও। … … [২৫ মার্চ ২০১২/ সকাল ১০:২১]

***
অপরাপর তথ্যসূত্র:
১. জেনোসাইড বাংলাদেশ
২. বিদ্রোহী